খাগড়াছড়ির নতুন আকর্ষণ

গা ছমছম ‘বাদুড় গুহা’

পাহাড়, নদী, উপত্যকা, ঝরনা আর ঝিরি নিয়ে গড়ে ওঠা পাহাড়ি জনপদ খাগড়াছড়ি পর্যটকদের কাছে বরাবরই দারুণ আকর্ষণীয়। পাহাড়ের পর পাহাড়ে সাজানো চিরসবুজ অরণ্য দেশের যে কোনো অঞ্চল থেকে এই জনপদকে আলাদা করেছে। সাম্প্রতিককালে এই অঞ্চলে মানুষের যাতায়াতও বেড়েছে বহুগুণ। নতুন নতুন ঝরনা, গুহার সন্ধান পাওয়ায় এখানে পর্যটকরা সারাবছরই ভিড় করেন। পর্যটকদের জন্য নতুন আকর্ষণ হতে পারে ‘বাদুড় গুহা’। স্থানীয় ভাষায় এটি ‘তকবাক হাকর’ নামেই পরিচিত। যার আভিধানিক অর্থ ‘বাদুড় গুহা’। 

সবুজে মোড়ানো পথ ধরে যেতে হবে প্রায় ১০ কিলোমিটার। খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের আট মাইল এলাকা থেকে ভেতরে যেতেই চোখে পড়বে সবুজ ল্যান্ডস্কেপ। বিভিন্ন পাহাড়ি জাতিসত্তার চেনা-অচেনা গ্রাম। পুরো পথজুড়ে নীবরতা। চলাচলে একমাত্র যান ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল কিংবা লক্কড়-ঝক্কড় চাঁদের গাড়ি। পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথ পেরোতে সময় লাগবে ২০ মিনিটেরও বেশি। ঘন সবুজ আর নীরবতা এই পথের সঙ্গী। 

পাহাড়ি পথ পেরিয়ে কাঁচা মাটির সরু রাস্তা। এরপর ঢিলা আর পাহাড়ঘেরা পথ এগোতে হয় মোটরসাইকেলে। এই পাহাড়ি পথে ঘাম ঝরাতে হবে পর্যটকদের। উঁচু পাহাড় বেয়ে নামতে হবে অন্তত ৫০০ ফুট। গভীর খাদে রয়েছে টারশিয়ান যুগের কালো পাথর। তার পাশে বয়ে গেছে ঝিরি। নীরবতা ভেঙে পাথরের গা বেয়ে নামছে জলধারা। এমনই রোমাঞ্চ গুহায় ঢোকার আগে। উঁচু নিচু পাহাড় বেয়ে নামার কষ্টটা ঠিক পুষিয়ে যাবে। পাহাড় ভেদ করে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এই গুহা দেখে হতবাক হবে যে কেউ।


প্রায় ৩০-৩৫ ফুট উঁচু গুহা। দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬৫ ফুট। প্রস্থ গড়ে ৪ থেকে ৫ ফুট। পুরো গুহার রাজ্যজুড়ে অন্ধকার। আলোর ভরসা মশাল। মশাল নিয়ে গুহার ভেতরে যেতেই চমকে দেবে গুহার ভেতরের শীতল পরিবেশ। কিছুদূর যেতেই গুহা আরও সংকীর্ণ হয়ে ওঠে। তবে চোখ আটকে যাবে গুহার ওপরের অংশ দেখে। নিপুণ শিল্পীর মতো পাহাড়ের ওপরে খাঁজ কাটা। গুহায় যেতে যেতে মনে হবে এই কোনো অচেনা পৃথিবী! গুহাজুড়ে বাদুড়ের আস্তানা।

পুরো গুহা ঘুরে আসতে বেশ সময় লাগবে। গুহা থেকে বেরিয়ে এলে চোখে পড়বে খুম। পাহাড়ের ক্যাসকেড থেকে তীব্র শব্দে বয়ে আসে পানির স্রোত। স্বচ্ছ সবুজাভ পানি মুগ্ধ করবে সবাইকে। ফেরার পথে চোখে পড়বে বড় ঝরনা। শীতে পানির স্রোত কম হলেও বর্ষায় এটি ভরা থাকে। ঝরনার পাশে দড়ি বা গাছের লতা বেয়ে প্রায় ১শ’ ফুট নিচে নামতে হবে।

এখানে ঘুরতে আসা পর্যটক নয়ন দাশ, বিজন বড়ুয়া ও অজিত বড়ুয়া জানান, ‘বাদুড় গুহার সন্ধান পেয়েছি স্থানীয় ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে। গুহার প্রাকৃতিক গঠন ও রোমাঞ্চ ভাষায় বর্ণনা করে শেষ হবে না। তবে এটি খাগড়াছড়ির নতুন পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা খাগড়াছড়ি ও সাজেক বেড়াতে আসেন। এটি ঘুরে দেখলে পর্যটকরা দারুণভাবে মুগ্ধ হবেন। যাতায়াত ব্যবস্থাও বেশ রোমাঞ্চকর। পাহাড় বেয়ে নামার অভিজ্ঞতাটা এখানে নিতে পারবেন পর্যটকরা।’


গুহায় যাতায়াতে নিরাপত্তার ব্যবস্থাও রয়েছে। স্থানীয় গাইডরা পর্যটকদের গুহায় ঘুরিয়ে নিয়ে আসেন। ইউপি সদস্য ঘনশ্যাম ত্রিপুরা জানান, ‘এখানে কেউ বেড়াতে এলে তাকে নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হবে না। স্থানীয় গাইডরা সুন্দরভাবে গুহায় পর্যটকদের ঘুরিয়ে আনতে পারবে।’

প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এই বাদুড় গুহা পরিদর্শন করেন দীঘিনালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ উল্ল্যাহ।

তিনি জানান, ‘গুহাটি দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। যে কোনো পর্যটক এখানে এলে রোমাঞ্চের ছোঁয়া পাবেন। পর্যটকদের কাছে এটি নতুন আকর্ষণ হতে পারে। পর্যটকদের যাতায়াতসহ অন্যান্য সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসন থেকে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে প্রকৃতির কোনো ধরনের ক্ষতি না করে প্রকৃতিবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।’

বাদুড় গুহা ঘুরে এসে দীঘিনালা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কাশেম জানান, ‘গুহাটি বেশ আকর্ষণীয়। খাগড়াছড়ি থেকে পর্যটকরা খুব সহজেই গুহাটি ঘুরে দেখতে পারবেন। পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য নতুন সড়ক নির্মাণসহ পর্যাপ্ত অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে।’

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh