ফনেটিক ইউনিজয়
বি শে ষ সা ক্ষা ৎ কা র
‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অবলম্বন করে বাংলাদেশ এগুচ্ছে না’

আবুল কাসেম ফজলুল হক, বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক, লেখক, গবেষক, অনুবাদক, সমাজবিশ্লেষক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ। বিজয় দিবসের প্রাক্কালে সাম্প্রতিক দেশকালের সঙ্গে সবিস্তারে কথা বলেন তিনি। সেখানে উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে শুরু করে রাষ্ট্র গঠন, সমাজ, ভূ-রাজনীতি, ইতিহাস, মুক্তচিন্তা, গণতন্ত্র, নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহেরীন আরাফাতমাসুদ রানা

এবার ৪৬তম বিজয় দিবস উদযাপন করছে বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার যে বাংলাদেশ ছিল, সেটা থেকে আমরা কতটুকু দূরে আছি বলে আপনার মনে হয়?
মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার খুব ঢিলেঢালা ভাবে বলা হয়। মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষার কি কোনো লিখিত রূপ আছে? ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল যে সরকার ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন বলা যায় যুদ্ধ লেগে গেছে। তারমধ্যে কিছু কথা বলা হয়। এটা যুদ্ধকালীন আবেগ, যুদ্ধকালীন ভয়, যুদ্ধকালীন আশা। এর মধ্যে তো কোনো যৌক্তিক আশার প্রকাশ নাই। বলা যায় যে, ৬ দফা আন্দোলনের মধ্যে ছিল মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্খার। হ্যাঁ, সেটাই বরং বেশি যুক্তিসংগত। ৬ দফার মধ্যে গণতন্ত্র একটা পয়েন্ট ছিল। গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশ কোনো অগ্রগতি সাধন করেনি।

বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বিদেশি অ্যাম্বেসিতে ছোটাছুটি করছে গণতন্ত্রের জন্য। তারা ওয়াশিংটনের স্টেট ডিপার্টমেন্টে যাচ্ছে। তারা তো সম্পূর্ণ গণবিরোধী সাম্রাজ্যবাদের লেজুড় হিসেবে কাজ করছে। জাতীয়তাবাদের কথা ছিল ৬ দফাজুড়ে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরে বাংলাদেশ কি জাতীয়তাবাদের দিকে যাচ্ছে? বাংলাদেশ তো সাম্রাজ্যবাদের দালালি করছে। ভারতের দালালি করছে। আমি বাংলাদেশ বলতে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কথা বলছি। সেই দিক থেকে বলতে গেলে বলতে হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অবলম্বন করে বাংলাদেশ এগুচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা যারা খুব বেশি বলছে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী কাজ করছে। জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে।

মুক্তিযুদ্ধ সময়কালীন আপনি কি কোনো সংগঠনে যুক্ত ছিলেন? সেই সময়ের কথা একটু বলুন।
মুক্তিযুদ্ধে নয় মাসের ঘটনা এক রকম। তবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে কয়েক বছর, বিশেষত ষাটের দশকের রাজনীতি দ্বারাই মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ভিত্তি তৈরি হয়। সেখানে আমি প্রগতিশীল চিন্তাধারা অবলম্বন করতাম। মার্ক্সবাদের প্রতি আমার অনুরাগ ছিল। আমি মার্ক্স, এঙ্গেলসের লেখা পড়েছি, পরবর্তীকালে লেনিন এবং যখন আমাদের দেশে আসতে আরম্ভ করেছে, তখন মাও সে-তুঙ-এর লেখাও খুব মনোযোগ দিয়ে পড়েছি। সেই সঙ্গে গণতন্ত্রের প্রতিও আমার আকর্ষণ ছিল। জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ, এই ব্যাপারগুলোও বুঝতে চেষ্টা করতাম। এরমধ্যে আমার রাজনৈতিক চিন্তার পরিচয় আছে। আমার ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’ এবং তার পরবর্তী লেখাগুলোতে পাকিস্তান আমলে আমার চিন্তার পরিচয় পাওয়া যাবে। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসনের প্রশ্নে আমি দৃঢ় ছিলাম।        
তখন যারা ছাত্র ইউনিয়ন করত তাদের মধ্যে দৃঢ় আগ্রহ ছিল। পরবর্তীতে মস্কোপন্থীরা একরকম আওয়ামী লীগ সমর্থক হয়ে গেছে, আর যারা পিকিংপন্থী বলে পরিচিত হয়েছে তারাও কোনো স্পষ্ট কর্মসূচী অবলম্বন করেনি। এটা তাদের দুর্বলতা। তবে স্বতস্ফূর্তভাবে পূর্ব বাংলা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সৃষ্টি হোক, এই আকাক্সক্ষাটা এইসব সংগঠনগুলোর মধ্যে ছিল। আমি কমরেড তোহা, কমরেড আব্দুল হক, কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলাম গভীরভাবে। লক্ষ্য করেছি যে, তারা শেখ মুজিবের নেতৃত্বের প্রশ্নে কঠোর সমালোচক ছিলেন। মোটামুটি কাছাকাছি বয়সের, যারা মার্ক্সবাদী ভাবাদর্শ অবলম্বন করে চিন্তা করতেন। শেখ মুজিব সম্পর্কে তাদের মন্তব্য ভালো ছিলনা। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে একটা সঠিক গণতান্ত্রিক লাইনেও দেশ যাবে না। একটা সুবিধাবাদী লাইনে যাবে দেশ- এইরকম একটা বক্তব্য ছিল তাদের। কিন্তু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে যে একটা দৃঢতা ছিল ৬ দফা কর্মসূচী নিয়ে, এই দৃঢ়তাটা তারা বুঝতে পেরেছিলেন বলে মনে হয় না। এটা ছিল একটা দিক।
দ্বিতীয় হলো- পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে এই চেতনা আমার মধ্যে ধীরে ধীরে দেখা দিয়েছিল। আমরা যে কথাটা বলতাম- ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা’। স্বাধীন, সমাজতন্ত্র অভিমুখী গণতন্ত্র অবলম্বনকারী পূর্ব বাংলা- এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নানাভাবে আমার তখনকার লেখায় এইসব কথা আছে। সিরজ সিকদার অ্যাকাডেমিক্যালি আমার একবছর জুনিয়র ছিলেন এবং আমরা একসঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নও করেছি। তো, তিনিও মাও সে-তুঙ চিন্তাধারা অবলম্বন করে এই স্বাধীন পূর্ব বাংলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার কথা বলতেন, এমনকি লিন পিয়াও-এর চিন্তাধারাকেও সিরাজ সিকদার তখন খুব গুরুত্ব দিতেন। স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সিরাজ সিকদারেরও একটা দৃঢতা ছিল। আনকম্প্রোমাইজিং। তবে সিরাজ সিকদারের সশস্ত্র লাইন আমি কখনও সমর্থন করি না। আমার কাছে মনে হয়েছে যে, এটা বাস্তব সম্মত নয়। মাও সে-তুঙ-এর কথায় গণলাইনের কথা বলা আছে। জনসাধারণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে, জনসধারণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করতে হবে, সংগঠন করতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে। গণঅভ্যুত্থান দেখা দিলে সেই গণঅভ্যুত্থানের সুযোগ নিতে হবে। গণআন্দোলনের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। এই গণলাইন আমি সবসময় সমর্থন করেছি এবং এই পথ চেয়েছি। কিন্তু সিরাজ সিকদাররা এই পথ ছেড়ে বললেন, গণসংগঠন মানে সুবিধাবাদের দিকে যাওয়া, গণসংগঠন বিলুপ্ত করে কাজ করতে হবে। এই গণসংগঠন বিলুপ্ত করে কাজ করার নীতি আমি সমর্থন করতে পারি না। কিন্তু স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আমাদের মত এক ছিল এবং এই মতের সমর্থক দেবেন শিকদারও ছিলেন। দেবেন শিকদার, আবুল বাশার, তারা একটা সংগঠন ভেঙে বহুদল হয়ে গেলেও তাদের মধ্যে একটা প্রশ্নে মিল ছিল। দেবেন শিকদারের সঙ্গেও আমার ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং তার মতও আমাদের অনেকের মতের সঙ্গে মিলতো। পূর্ব বাংলার জনগণের জন্য স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার প্রশ্নে সিরাজ সিকদারের আচ্ছন্নতা ছিল না। মত স্পষ্ট ছিল। কমরেড আব্দুল হক, কমরেড তোহা- তারাও এমনটাই চাইতেন, আমার ধারণা কখনো কখনো বলতেনও, কিন্তু যেহেতু শেখ মুজিব এই আন্দোলনের নেতৃত্ব নিয়ে আছেন শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আন্দোলন মাঝপথে নষ্ট হয়ে যাবে এবং এই ধরণের নানান কথা বলে তারা একটা অস্পষ্টতা রাখতেন বক্তব্যের মধ্যে। আর শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর কমরেড তোহা যেসব বিবৃতি দিয়েছেন, এগুলো আমি সমর্থনযোগ্য মনে করি না। এগুলো আমি উচচারণও করতে চাই না। আমার মনে হয় যে, সম্পূর্ণ একটা ভুলের মধ্যে তিনি পড়ে গিয়েছিলেন। কমরেড আব্দুল হক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরেও দীর্ঘদিন ‘পূর্ব পাকিস্তান’ কথাটা তার দলের নামের সঙ্গে যুক্ত রেখেছেন, এটাকেও আমি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, বাস্তবতা বিরোধী মনে করি।

আপনি ছাত্র ইউনিয়নে যুক্ত ছিলেন?
হ্যাঁ, আমি ছাত্র ইউনিয়নে ছিলাম। তাছাড়া ঐ সময়টাতে বিভিন্ন গ্রুপ দাঁড়িয়েছিল, তার কোনো কোনোটার সঙ্গে ছিলাম। আমাকে সভাপতি করে একটা দল করেছিলেন শামসুজ্জোহা মানিক, আমজাদ হোসেন। আমজাদ হোসেনের অনেক বই বাজারে আছে। আব্দুল মতিন বলে একজন ছিলেন, আব্দুস সাত্তার, এরকম সাত আটজন ছিলেন ওই দলে। যারা মোটামুটি পরিচিত ছিলেন তখন বামপন্থী ধারায়। আমি সেটার সাথে ছিলাম। আমারও উৎসাহ ছিল।

আপনাদের পার্টির নাম কি ছিল?
পূর্ব বাংলার বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি। এই দলটা মাও সে-তুঙ চিন্তাধারার অনুসারী ছিল। আমার ধারণা, আমজাদ হোসেনের বইতে এই দলের কিছু বিবরণ আছে। আরও কারো কারো লেখায় তা পাওয়া যাবে। এগুলো নিয়ে আমরা কোনো দাবি করতে চাইনি। কারণ যে স্বপ্ন, যে কল্পনা, যে আশা এবং যে কাজ আমাদের ছিল, এটা সংগঠন হিসেবে দানা বাঁধেনি। কারণ, নানাভাবে কেবল ভাঙন। আর আমাদের বয়সও তখন কম। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ৩১ বছর। কাজেই আমাদের চাইতে যারা প্রবীণ ছিলেন, তাদের প্রভাব বেশি ছিল।
একে একে উল্লেখ করেছি অনেকের কথাই, যাদের সান্নিধ্যে থেকে কাজ করেছি। তখন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ছিল। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যারা ছিলেন ওই সময়ে, তাদের মধ্যে আনোয়ার জাহিদ একজন নেতা ছিলেন। নুরুল হুদা কাদের বক্স একজন নেতা ছিলেন, যাদু মিয়া ছিলেন। তারপরে কাজী জাফর আহমদও ন্যাপে মোটামুটি নেতৃস্থানীয় ছিলেন। আরও অনেকে ছিলেন। ন্যাপের উদ্দেশ্য ছিল, পেটি বুর্জোয়া শ্রেণির একটা গণসংগঠন দরকার এবং সেই সংগঠন মার্ক্সবাদ সমর্থক হবে। নেতৃত্ব মার্ক্সবাদী হবে। কিন্তু সাধারণভাবে মার্ক্সবাদের বাইরেও লোকের সমর্থন অর্জন করবে। ন্যাপ তো সেভাবে গঠিত হয়ে উঠলো না। মওলানা ভাসানীকে সভাপতি করা হয়। ভাসানী সম্পর্কে কমিউনিস্ট পার্টি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম মন্তব্য করেছে। অনেক সময় পেটি বুর্জোয়া, সুবিধাবাদী বলে দূরে সরিয়ে রেখেছে। অনেক সময়- তাকে অবলম্বন করেই বিপ্লব সমর্থন করতে হবে, এই রকম মতও প্রকাশ করেছে।
৬ দফা আন্দোলন কিছুটা জনপ্রিয় হয়ে উঠলো, শেখ মুজিব জেল থেকে বেরিয়ে আসলেন, তখন মনি সিংহের নেতৃত্বে যে কমিউনিস্ট পার্টি, তা শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগের সমর্থক হয়ে গেল। সমর্থক যেভাবে তারা হয়েছেন- যদি এমন হতো যে, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, শ্রমিক ফেডারেশন, কৃষক সমিতি এইসব সংগঠন নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট গঠন করছে- তাহলেও হয়তো সেটা সমর্থনযোগ্য হতে পারত। যেখানে নিজেদের বক্তব্য কিছুটা স্থান পাবে। আর আওয়ামী লীগ যদি গণধারা ত্যাগ করে, তাহলে আমরা গণধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাব- এই রকম চিন্তাও হতে পারতো। কিন্তু সেই রকম চিন্তা, বলিষ্ঠতা, পরিচ্ছন্নতা ছিল না। মনি সিংহের বিরাট সম্ভাবনা ছিল ‘বঙ্গবন্ধু’ হওয়ার। কিন্তু মনি সিংহ তো সেই যোগ্যতার পরিচয় দেননি। মনি সিংহ আমাদের শ্রদ্ধেয় নেতা ছিলেন। তার প্রতি এখনও শ্রদ্ধা পোষণ করি। কিন্তু আমাদের দুঃখের অন্ত নাই, যে বিরাট সম্ভাবনা ছিল, তা নষ্ট হয়ে গেল। কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার, কমরেড তোহা, কমরেড আব্দুল হক, এরা আমাদের নেতা ছিলেন। আমরা আশা করেছি, কিন্তু তারা হতাশ করেছেন। দেবেন শিকদারের নেতৃত্বে সেই ক্যালিবার ছিল না। আমি মনে করি দেবেন শিকদারের অনেক বেশি সততা ছিল। বদরুদ্দীন উমর শেষ দিকে এসেছিলেন। বদরুদ্দীন উমরকে তো পার্টি ভালোভাবে গ্রহণই করেনি। সবসময়ই বলেছে যে, উনি পেটি-বুর্জোয়া, বুদ্ধিজীবী। লিখিত সমালোচনাও করেছে। বদরুদ্দীন উমরকে যদি পার্টি সেভাবে গ্রহণ করতো এবং নেতৃত্ব গড়ে তুলতে চেষ্টা করতো, তাহলে তার চিন্তাধারাও আরও সঠিকতার দিকে যেতে পারত। কিছু কথা বললাম। এর মধ্যে আরও কথা আছে।

সিরাজ সিকদারের বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে কি আপনার কোনো যোগাযোগ ছিল?
না, বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই ছিল না। সিরাজ সিকদার আমার এক বছরের জুনিয়র ছিল। আমরা ছাত্র ইউনিয়নের একই কমিটিতে ছিলাম। মেনন সভাপতি, এই কমিটিতে সিরাজ সিকদার একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং আমি ঐ কমিটির ট্রেজারার ছিলাম। সেই সূত্রে যোগাযোগ ছিল। কিন্তু সিরাজ সিকাদার যে গণসংগঠন বিলুপ্ত করে, শ্রেণিশত্রু খতমের চারু মজুমদারের লাইনকে গ্রহণ করেন, এটাকে আমার কাছে সমর্থনযোগ্য মনে হয়নি। সিরাজ সিকদার আমাকে তার দলে টানবার খুব চেষ্টা করেছেন। আলোচনাও হয়েছে অনেকবার। কিন্তু আমাদের সম্মতি হয়নি। আমার সম্পর্কে সিরাজ সিকাদারের কোনো কোনো লেখায় ‘পেটি বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী’ বলে সমালোচনাও রয়েছে। আবার খুব কঠোর সমালোচনা যে করেছে, তাও না। আমি গুপ্তহত্যার কোনো রাজনীতি কখনো সমর্থন করিনি, করতে পারিনি। আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা ভুল। পৃথিবীর কোথাও গুপ্তহত্যার রাজনীতি সফল হয়নি।

মাও সে-তুঙ-এর দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইন কি সমর্থন করতেন?
দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের যে লাইন, বা ‘প্রোট্র্যাক্টেড ওয়ার’ এসব লেখা তো আমি অনুবাদ করেছিলাম এবং অনুবাদ করতে গেলে আগে পড়তে হয়। মাও সে-তুঙ-এর যত লেখা বাংলায় অনুবাদ হয়েছে, কোনো না কোনোভাবে সেগুলো আমার অনুবাদ। পিকিং থেকে যেগুলো বেরিয়েছে, সেগুলোও আমার অনুবাদ।
চীনের বাস্তবতায় দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধের লাইন অবলম্বন করা হয়েছে। সেটা সমর্থনযোগ্য অবশ্যই। কিন্তু মাও সে-তুঙ যে পপুলার লিডার ছিলেন, তিনি তখনও যদি নির্বাচনে দাঁড়াতেন, ভোটধিক্যে পাশ করতেন, এই দিকটাও মনে রাখতে হবে। মাও সে-তুঙ এমন কোনো নেতা ছিলেন না যে, তাকে লোকে চিনতো না। এমন কোনো নেতা ছিলেন না যে, জনমত তার কাজের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। এই মাস লাইন, গণলাইন কথাটা মাও সে-তুঙ-এর লেখায় মাঝে মাঝেই আছে। মাও সে-তুঙ একটা কথা বারবার বলতেন, বিভিন্ন লেখায় আছে যে, Seek truth from facts. মানে তথ্য অবলম্বন করে সত্যের সন্ধান করো। যে বিষয়ে যে সমস্যা, সে সমস্যার সমাধান কি হবে এটাকে যদি সত্য মনে করো, তাহলে ওই সংক্রান্ত বর্তমান তথ্য, অতীতের তথ্য এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিচার করে সমাধানে যাও। এটাকেই তিনি বুঝাতেন, Seek truth from facts.    
এখন মুক্তিযুদ্ধের একপাক্ষিক একটা ইতিহাস আমাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে বামপন্থীদের ভূমিকা সম্পর্কে একটু বলুন।
একটু আগে বললাম যে, কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার, কমরেড তোহা, কমরেড আব্দুল হক তাদের বক্তব্য অস্পষ্ট ছিল। কিন্তু তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপ তো কয়েক বছর ধরেই আমাদের হয়েছে। তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। তা থেকে আমি মনে করি, সমাজতন্ত্র অভিমুখী স্বাধীন পূর্ব বাংলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তাদের সমর্থন ছিল। কিন্তু শেখ মুজিবের নেতৃত্বের প্রতি তাঁদের কোনো আস্থা ছিল না। তাঁরা শেখ মুজিবের সমবয়সী। সমবয়সীদের মধ্যে নিজেদের ত্রুটি-বিচ্যূতি একজন অন্যজন অনেক বেশি দেখে। সেই হিসেবে শেখ মুজিবের ত্রুটিগুলো তারা খুব ভালোভাবে নির্দেশ করতেন। কিন্তু বাংলাদেশ যে প্রতিষ্ঠা হবে, এটা ঐতিহাসিক অনিবার্যতা। আর এই অনিবার্যতাকে বাস্তবসম্মত করে তোলা এবং সমাজতন্ত্র অভিমুখী করা- এটা ছিল তখন পার্টির দায়িত্ব। জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে পার্টির ধারণা সবসময়ই দোদ্যুল্যমান এবং ভুল ছিল। একটা জাতীয় পর্যায়ে তো কাজ করতে হবে। মাও সে-তুঙ চীনা জাতি অবলম্বন করে চীনের পরিসরে কাজ করেছেন। লেনিন রুশ জাতি অবলম্বন করে রাশিয়ার কন্টেক্সটে আলোচনা করেছেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন রাশিয়াকে অবলম্বন করে গঠিত হয়েছে। পরে এর মধ্যে অন্যকিছু রাষ্ট্র যুক্ত হয়ে এটা বড় হয়েছে। আমাদের দেশেও তো, গোটা পাকিস্তানব্যাপী আন্দোলনের বাস্তবতা ছিল বলে আমার মনে হয় না যে, প্রকৃতপক্ষে কমরেড সুখেন্দু দস্তিদার, কমরেড তোহা, কমরেড আব্দুল হক কিংবা অন্য কেউ মনে করতেন। চিন্তাভাবনা ষোলআনা পূর্ব বাংলাভিত্তিক। কিন্তু এই কথাটা তারা যুক্তিসংগতভাবে লিখিতভাবে, স্পষ্টভাবে বলেননি। তাদের লেখার মধ্যে সবসময় একটা অস্পষ্টতা থেকেছে। কথাবার্তা বলে তারা স্বীকার করেছেন। কিন্তু সবসময় তারা বলতেন এর জন্য তো একটা প্রস্তুতি লাগবে। আমাদের দল সেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু বছরের পর বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে তাদের কোনো অগ্রগতি ছিল না। বরং তাদের নিজেদের মধ্যে ঐক্য ছিল না। কমরেড তোহা, কমরেড আব্দুল হক দুজনের মধ্যে বিবাদ তো আমরা  প্রকাশ্যভাবেই দেখেছি। নেতৃত্ব নিয়েই বিবাদ ছিল। বাইরে আদর্শগত পার্থক্য বলছেন। তো, এরকম দুর্বলতা ছিল অনেক বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে। কিন্তু একটা বিরাট সংখ্যক মানুষ, তরুণ, জীবন উৎসর্গ করে এই আন্দোলনে আসছিল। যদি মনি সিংহের নেতৃত্বে গোটা জিনিসটা ধরা হয় তাইলেও তো বিরাট শক্তি। আর যদি মনি সিংহ মস্কোপন্থী বলে বাদ দিয়ে বাকিটাকে ধরা হয় তাহলেও একটা বিরাট শক্তি। বিরাট সম্ভাবনা ছিল। মওলানা ভাসানীর মতো সংগ্রামীকে কিভাবে কাজে লাগাবেন, এই বিষয়টা তারা স্থির করতে পারেননি। ভাসানীকে অবলম্বন করেই এগুনো যেত। অথবা ভাসানীকে একজন সামাজিক নেতা হিসেবে রেখে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অন্যভাবে গড়ে তোলাা যেত। কিন্তু এইসব বিষয় তারা পারেননি। আমি বলব এক ধরনের Half heartedness ছিল। আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল। তাত্তি¦ক জ্ঞানেরও অভাব ছিল। একটা জিনিস লক্ষ্যণীয় যে, কমরেড তোহা তো মার্ক্স-এঙ্গেলসে ‘হাফেজ’ ছিলেন। কথা উঠলেই তাদের লখা উদ্বৃত করে কথা বলতেন। তার প্রখর বুদ্ধিও ছিল। কিন্তু কেমন যেন একটা স্পষ্ট রাজনীতি করেননি। একসময় জিয়াউর রহমানের দিকে ঝুঁকে গেলেন। যেটাকে আমরা মনে করেছি যে, তিনি সম্পূর্ণ ভুল দিকে চলে গেছেন।

দেশের বর্তমান যে রাজনৈতিক পরিবেশ সেইখানে সামনে নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনের ক্ষেত্র কতটুকু প্রস্তুত বলে আপনি মনে করেন?
যদি আমরা জনগণের গণতন্ত্র, সর্বজনীন গণতন্ত্র, সব মানুষই গণতন্ত্রের সুফল কমবেশি পাবে- এইভাবে চিন্তা করি, তাহলে দেখবো এখানে তা নেই, নির্বাচনের মধ্যে গণতন্ত্র নেই। এক কথায় বলা যায়, এটা নির্বাচনতন্ত্র। নির্বাচনের মাধ্যমে কায়েমী স্বার্থবাদীরা সরকার গঠন করবে এবং এই কায়েমী স্বার্থবাদীদের মধ্যে আছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াত। প্রধানত এই চারটা দল আছে। জামায়াত নানাভাবে যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে দুর্বল অবস্থায় চলে গেছে এখন। কিন্তু জামায়াত শেষ হয়ে গেছে, এটা মনে হয় না। মনে হয় জামায়াত তো আছেই। এখন এই যে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন, সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন- এই কথাগুলো তো আমরা পাচ্ছি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের নেতাদের কাছ থেকে। আমরা পাচ্ছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে। আমি আজকের কথা কিন্তু বলছি না। গত পঁচিশ-ত্রিশ বছর ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, ব্রিটিশ প্রাইম মিনিষ্টার, ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থাৎ এককথায় দুনিয়াব্যাপী যাদেরকে সাম্রাজ্যবাদী বলা হয়, সেই মহলের কথা। আর এই কথাগুলো আমরা সরাসরি পাচ্ছি, যারা আমাদের দেশে সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন (সিএসও) করে। সিএসও কথাটা ভারতে খুব চালু আছে। আর আমাদের এখানে চালু আছে এনজিও। যারা এনজিও কর্তা, যারা সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনের বুদ্ধিজীবী, তারাইতো এই অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনে কথা বলেন। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মধ্যেও তো অনেক কথা ছিল আমাদের দেশে। শেরে বাংলা ফজলুল হক, শেখ মুজিব, সোহরাওয়ার্দী তারা অনেক কথা বলেছেন, ভাসানী তো আরও অনেক বেশি কথা বলেছেন। এগুলোর সাথে কোনো সম্পর্ক আছে আজকে? আওয়ামী লীগ, বিএনপি- এরা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের কথা নিয়েই আছে। কাজেই আমার বিবেচনায় এর মধ্যে যে গণতন্ত্র, এই গণতন্ত্রের প্রতি বাংলাদেশের শতকরা ৯৫ ভাগ লোকের কোনো আস্থা স্থাপন করা, কোনো আশা স্থাপন করা উচিৎ নয়।
আমরাও চাই অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন। আমরা কি চাই না? আমরাও চাই দেশে বাক স্বাধীনতা থাকুক। মানুষের যে মৌলিক মানবাধিকার সেগুলো থাকুক। তার সঙ্গে আমরা চাই যে সব মানুষই খেয়ে পরে বাঁচতে পারে, এরকম সামাজিক ন্যায় আরেকটু বাড়ানো অর্থনীতিতে। আমাদের সংস্কৃতিকে উন্নত করা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মিথ্যা দিয়ে বিকৃত করে ফেলছে। এই জায়গায় আমাদের কাছে মাও সে-তুঙ-এর ওই কথাই প্রাসঙ্গিক- We should seek truth from facts. এখন তথ্যই যদি বিকৃত করে ফেলি, তাহলে তো গোটা জিনিসটাই বিকৃত হয়ে যায়। আর একটা জাতির ইতিহাস যখন এভাবে বিকৃত হয়, তখন সেই জাতির মন, সেই জাতির আত্মা বিকৃত হয়ে যায়। আমরা সেই বিকারপ্রাপ্ত মন, বিকারপ্রাপ্ত আত্মা নিয়ে আছি। কিভাবে সুস্থ হওয়া যায়, সেটাই আমাদের বড় প্রশ্ন। এই গণতন্ত্রে অন্যদের মতো আমিও গতানুগতিক কথা কিছু বলি।                         
কারণ আমাকে তো সমাজে বাঁচতে হবে, বাস করতে হবে। কিন্তু এর প্রতি আমি আন্তরিক তাগিদ বোধ করি না।

এই যে নির্বাচকালীন সরকার নিয়ে অনেক ধরনের কথা হচ্ছে, নির্বাচন কমিশনের সংলাপেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অনেক ধরনের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই নির্বাচনকালীন সরকার দলনিরপেক্ষও যদি হয়, তাহলে কি সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে এগুতে পারবে?
না। এখানে একটা কথা হলো, যাকে নিরপেক্ষ বলা হয়- যদি আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ভারত এইরকম দেশগুলোর কথা ধরি, সেই নিরপেক্ষতার মধ্যেও কিছু না কিছু পক্ষপাতিত্ব থাকে। হয়তো শতকরা ৫ ভাগ বা ১০ ভাগ পক্ষপাতিত্ব থাকে। কিন্তু এই পক্ষপাতিত্ব নিয়ে বড় রকমের কোনো অভিযোগ ঐসব দেশের রাজনীতিক নেতারা তুলেননা। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হন, তারাও তুলেননা। তারা মনে করেন যে, এইটাই অনিবার্যতা। মানুষতো সম্পূর্ণ ভালো পাওয়া যায় না। কোনোকালেই ছিল না, এখনও নেই, কবে পাওয়া যাবে বলা যায় না। কাজেই মানবিক ত্রুটি বিচ্যূতি আমার মধ্যেও আছে, অন্যদের মধ্যেও আছে। এটা মেনে নিয়ে চলা ভালো। এই একটা ব্যাপার।
দ্বিতীয় হলো, এই অন্যায়-অনিয়মের মাত্রা যদি অনেক বড় হয়ে যায়, তখনই তো অভিযোগ উঠে। তো বাংলাদেশে সেটাই চলছে। কাজেই বাংলাদেশে নিরপেক্ষ, অবাধ, সুষ্ঠু এগুলো কথার কথা। এনজিও, সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন তারা বলছে। এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ এগুলোর পেছনে সহায়তা দিচ্ছে। আর আওয়ামী লীগ, বিএনপির নেতারা অ্যাম্বেসিতে অ্যাম্বেসিতে চলে যায় গণতন্ত্রের জন্য। তোমাদের সাহায্য চাই। গণতন্ত্রের জন্য সাহায্য চাইতে তারা ওয়াশিংটনে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের নির্দিষ্ট ডেস্কে চলে যায়। আমাদের দেশের পত্রিকায়ও সেই খবর ছাপা হয়। বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা খুব বড় করে খবর দেয়। তো এই বিষয়গুলোর প্রভাব আমাদের উপর আসছে। আমাদেরকে শুনতে হচ্ছে। কখনো কখনো কিছু মন্তব্যও করতে হচ্ছে। কিন্তু এগুলো আমাদের অন্তরের কথা না। সমাজে বাঁচবার জন্যে আমরা হয়তো এমন অনেক কথা বলি।
আমি গত কয়েক বছর ধরে যেমন দেখছি, তাতে আমার মনে হয় আওয়ামী লীগ অনেক প্রবল। এটা আওয়ামী লীগের রাজনীতি, ঠিক এটা আমি বলছি না। এই রাজনীতি দূষিত। অন্য দলগুলোর রাজনীতির মতোই। কিন্তু এই দূষিত রাজনীতির পরিমাণ বলে আওয়ামী লীগ এতো প্রবল দল হিসেবে এবং অন্য দলগুলো এতো দুর্বল যে, অন্য কোনো দলের তৎপরতায় কোনো সুফল আসবে না। তবে হ্যাঁ, আওয়ামী লীগ যদি তার চেহারা রক্ষার জন্য যাকে বলে ফেস সেভিং, যদি কিছু দেয়, তাহলে বিএনপিকে কয়েকটা সিট দিতে পারে। অন্য দলগুলোকেও ৫-১০টা সিট, বা একটা দুইটা করে দিতে পারে ছোট ছোট দলকে। এর বেশি এই তৎপরতার কোনো ফল হবে বলে মনে করি না- যদি নির্বাচন হয়। আর নির্বাচন দিয়ে সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনের বুদ্ধিজীবীরা যেমন আশা করেন, মানুষের মধ্যে আশা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন, এটাকে আমি অন্যায় মনে করি। আমার এতো আশা করার কী আছে? জনগণের মধ্যে এতো আশা সৃষ্টি করার কী আছে? যে রকম চলে আসছে, বিশেষ করে ১৯৯১ থেকে, সে রকমই হবে। হঠাৎ করেই কী খুব ভালো কিছু হয়ে যাবে? ভালো করার, ভালো হওয়ার প্রস্তুতি কোথায়? ভালো করার, ভালো হওয়ার প্রস্তুতির মধ্যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক দল। আধুনিক রাষ্ট্রে সরকার গঠিত হয় দল দিয়ে। ইসলাম হল ইরানের রাষ্ট্রীয় আদর্শ। কিন্তু রাজনৈতিক দল গঠিত হয়। রাজনৈতিক দল নিয়ে গঠিত হয় সরকার। কোনো সন্দেহ আছে? অর্থাৎ ইসলাম হলেও রাষ্ট্রের প্রকৃতি বহুলাংশে আধুনিক। তাই না? আর যদি সম্পূর্ণ ইসলামিক রাষ্ট্র হতো, তাহলে ইরান কী টিকতে পারতো? আধুনিক রাষ্ট্র, তার মধ্যে ইসলামকে তারা রাষ্ট্রীয় আদর্শ বলে অবলম্বন করছে। এটা তাদের ঐতিহ্যে খাপ খায়। সব দেশের ঐতিহ্য তো এক রকম না। ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসছে। তারা কী হিন্দুত্বকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ ঘোষণা করছে? ধর্ম নিরপেক্ষ আদর্শ অবলম্বন করেই রাষ্ট্র চলছে। এর মধ্যে হিন্দুত্ববাদী ভাবধারা তারা অবলম্বন করছে। তারা বলছে, আমাদের ভারতীয়ত্ব হিন্দুত্বের সঙ্গে সমন্বিত। আমাদের হিন্দুত্ব সবকিছুর উপরে বললে তো টিকতে পারতো না।

নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন দেশের তৎপরতা দেখতে পাচ্ছি। এই বিষয়কে আপনি কিভাবে দেখেন?
আওয়ামী লীগ ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলতে চায়। আমেরিকা আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় থাকুক এটা চায় না। অন্য কোনো দল আসুক। বিএনপিকে চায় তা বলা যাবে না। কিন্তু বিএনপির নেতারা আমেরিকার অ্যাম্বেসিতে ধর্ণা দেয়। স্টেট ডিপার্টমেন্টে তদবির করে। গত চার বছর ধরে অনেক বেশি, আগে এতোটা ছিল না। আওয়ামী লীগ, বিএনপি প্রায় সমান সমান ছিল। কিন্তু গত চার বছর ধরে তো বিএনপি একেবারেই আমেরিকা নির্ভর হয়ে গেছে। আর ভারত এবং আমেরিকার মধ্যে বাংলাদেশে কারা ক্ষমতায় থাকবে, এটা নিয়ে একটা প্রতিযোগিতা আছে। এই প্রতিযোগিতা আগে কম ছিল। জিয়াউর রহমানের আমলে আমেরিকান লাইন নিয়েছিল। এরশাদের আমলেও আমেরিকান লাইন নিয়ে চলছিল। খালেদা জিয়ার আমলেও আমেরিকান লাইন। আর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরে একটু লাইন বদল করার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রথম পাঁচ বছর এগোয়নি সাহস করে। আমেরিকার উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করেই চলেছে। পরে যখন দেখা গেছে যে, আমেরিকা তো ভীষণভাবে তৎপর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য, তখন হাসিনা রাজনৈতিকভাবে আমেরিকার বিরোধিতা করেছে। আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ আশরাফ তো বক্তৃতায় পাবলিক মিটিংয়েই বলেছিলেন, ‘দুই আনা দামের মন্ত্রী আমাদেরকে উপদেশ দিতে আসেন’। জিওপলিটিক্যালি বাংলাদেশের একটা গুরুত্ব আছে। যে অবস্থান থেকে একদিকে ভারত, বিশেষ করে ভারতের রাজনীতিকে প্রভাবিত করার জন্য আমেরিকা, ব্রিটেন, রাশিয়া, চীনের কাছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা বাংলাদেশে প্রো-আমেরিকান সরকার রাখতে চায়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়াতে তার স্বার্থ রক্ষার জন্য। আর ভারত তার নিরাপত্তার প্রয়োজনে বাংলাদেশে প্রো-ইন্ডিয়ান গভর্মেন্ট রাখতে চায়। কিছুতেই প্রো-আমেরিকান গভার্মেন্ট রাখতে চায় না। ভারতের নিরাপত্তা আমেরিকার দিক থেকেও বিঘিœত। ভারতের ৭ রাজ্য, বা সেভেন সিস্টারসের আন্দোলন, সেটাও একটা দিক বটে। কিন্তু তার চাইতে বড় আমেরিকা নানাভাবে ভারতকে বন্ধুত্ব থাকা সত্তে¦ও ডিস্টার্ব করে। এইসব কারণে বাংলাদেশে কোনো প্রো-আমেরিকান গভার্মেন্ট হোক এটা ভারত চায় না। এখন ব্যাপার হলো, গত কয়েক বছরের চেষ্টায় তো আমেরিকা পারছে না। ভারতের যেহেতু বর্ডারেই বাংলাদেশ, সেহেতু ভারত সে চেষ্টায় সফল। এখন শোনা যাচ্ছে, আগামী নির্বাচনের পক্ষে আমেরিকা এবং ভারত একমত হয়ে পরামর্শ করে কাজ করবে। অসম্ভব না সেটাও।

আমরা তো এর আগে দেখেছি যে, ভারতে বিজেপি সরকার যখন ক্ষমতায় আসলো, তখন সম্ভবত বিজেপি সরকার আওয়ামী লীগকে খুব একটা সাপোর্ট করেনি। আবার মোদি যখন বাংলাদেশ সফরে আসেন, তখন বিএনপি তাঁর প্রশংসা করেছে। সে ক্ষেত্রে প্রো-ইন্ডিয়া...
এখানে আমার মনে হয় যে, আগের কংগ্রেস সরকার বা এখন বিজেপি সরকার- ভারতের যে পররাষ্ট্রনীতি, এটা তারা সর্বভাবে রক্ষা করে চলে। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের রিফ্লেকশনটা খুব ধীর গতিতে করে। মোদির অপছন্দ হলো জওহরলাল নেহেরু, মোদির অপছন্দ হলো কংগ্রেস। তিনি সেই নীতি ইন্টারনালি নিয়ে চলছেন। পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে এই জিনিসগুলো ওরা দেখায় না। আর পরিবর্তন করলেও খুব সূক্ষ্ণ। মোদির একটা মূলনীতি- পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্টতর করতে হবে। এজন্যই তারা বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্টতর সম্পর্ক করতে চায়। আর কংগ্রেস যে নীতি নিয়ে চলছিল- এখানে কোনো প্রো-ইন্ডিয়ান গভর্মেন্ট ছাড়া প্রো-আমেরিকান গভর্মেন্ট দেওয়া চলবে না- মোদিও এটাই চাইছে। আমাদের দেশে অনেক লোক আছেন তীব্রভাবে অ্যান্টি-ইন্ডিয়ান। তাদের সেই অ্যান্টি-ইন্ডিয়ানিজম এতোটা হওয়া ভালো না। কারণ আমাদের তো প্রতিবেশীসুলভ বৈশিষ্ট্য রক্ষা করে চলতে হবে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে বামপন্থী দলগুলোর একটা জোট হওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। সিপিবি-বাসদ-গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার কয়েকটি দল এতে রয়েছে। নির্বাচনে তাদের অবস্থানটা কেমন হতে পারে?
জোট তারা করে থাকলে, সেখান থেকে স্পষ্ট করে বলতে হবে, আমরা নির্বাচন করবো, নির্বাচনের পরেও আমরা জোট রক্ষা করে জনগণের রাজনীতি করবো, অথবা আদর্শগত রাজনীতি করবো, তখন তাদের অবস্থানটা বোঝা যাবে। এই ভাসা ভাসা ধারণা নিয়ে আধো আধো চেষ্টা এগুলো তো সবসময় নির্বাচন আসলে করা হয়। কখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে কোনো কোনো গ্রুপ, কখনও করে না। এখানে সিপিবি, বাসদ- এরা তো আগে থেকেই নির্বাচন করে আসছে। জোনায়েদ সাকিরাও তো আছে এই দলে। ওরা নির্বাচন করার দল, নির্বাচন করতে পারে। কিন্তু দল বলতে যা বোঝায়, এদের কোনোটাই তো সে রকম দল হয়ে উঠেনি। জনগণের মধ্যে এদের মেনিফেস্টোর (দলীয় ইশতেহার) প্রচার নাই। দুই, মেনুফেস্টো বা কোনো কর্মসূচী প্রচার করলেই দেখা যায়, এটা বাস্তবসম্মত হয় না। না আদর্শগত, না বাস্তবসম্মত। যদি তারা প্রকৃতই জোট গঠন করে, আমরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে চাই, জোট গঠন করেই আমরা জনগণের জন্য কাজ করতে চাই- সেভাবে ঘোষণা দিয়ে যদি কাজ করে, তাহলে অবশ্যই সেটা ভালো হবে। কিন্তু তাদের অতীত রেকর্ড বলে, তারা সেরকম করে না। নির্বাচন উপলক্ষে কিছু একটা করলাম, নির্বাচন হয়ে গেলে তখন এটা ভুলে যায়। দরকার রাজনৈতিক একটা প্রক্রিয়া। বামপন্থীদের খুব সুযোগ আছে। তারা সুযোগের সদ্ব্যবহার করলে জনগণের সমর্থন পেতে পারে।

আওয়ামী লীগের যে প্রবল অবস্থা- যেমনটা আপনি উল্লেখ করেছেন, আওয়ামী লীগ কিছু কিছু দলকে কিছু কিছু সিট দিতে পারে। এখন সেই জায়গা থেকে বামপন্থীরাও কি সিট পেতে পারে?
অসম্ভব না। দুয়েকটা সিট তো ,দুয়েকটা দল পেতেই পারে। যেমন এরশাদের দলকে তখন জোর করে টেনে নিয়ে গেছে। এরশাদকে তো জেলখানায় না নিয়ে হাসপাতালে নিয়েছে। সেখান থেকে আবার তাকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করেছে। তার দলের কয়েকজনকে মন্ত্রীত্ব দিয়েছে। যেহেতু এরশাদ রাজি হননি, তখন তারা বেগম রওশন এরশাদকে ধরে নিয়ে এই কাজ করেছে। কাজেই ততোটা পর্যন্ত আওয়ামী লীগ যেতে পারে। এটাতো কোনো রাজনীতি না। কাজেই বামপন্থীদের তারা ১টা, ২টা, ৩টা সিট দিলেও দিতে পারে।

এবার দেশের কথা কিছু বলি। গণতন্ত্র, সুশাসন, নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের সমালোচনা রয়েছে। প্রধান বিচারপতির ইস্যুটি নতুন সংযুক্তি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থানকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?
সরকার যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। নির্বাচন একটা করতে চাইছে। সেই নির্বাচন গতবারের মতো হবে না। কিন্তু ভালো কিছু হবে, এটা আশা করার কোনো কারণ দেখি না। প্রধান বিচারপতি যেভাবে দেশত্যাগী হয়েছেন, এটা সরকারের প্রতি জনমত অল্প হলেও বিরূপ হয়েছে। এভাবে সুপ্রিম কোর্টের উপরে হস্তক্ষেপের কোনো দৃষ্টান্ত দুনিয়াতে আছে বলে আমি জানি না। এটা একটা ব্যাপার- প্রধান বিচারপতি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। এখনতো রাজনীতিই সরকার পরিচালনা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা নির্বাচনকালীন সরকার এইসব বিতর্ক। এখানে আওয়ামী লীগ তার অবস্থান থেকে একবিন্দুও সরবে বলে মনে হয় না। তবে পাবলিক ওপিনিয়ন যদি শক্তিশালীভাবে অন্যরকম হতো, অতীতে যেমনটা কখনো কখনো দেখা গেছে, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারতো। কিন্তু বিএনপি দলটা তো প্রায় ১১ বছর ধরেই ক্ষমতাচ্যূত। এতোগুলো বছরের মধ্যে এমন কোনো বক্তব্য জনগণের মাঝে তারা দেয়নি, যাতে জনগণ আকৃষ্ট হতে পারে। আইয়ুব খানের আমলে খুব দূরবস্থা ছিল। কিন্তু সেই সময়ে ৬ দফা কর্মসূচী দিয়ে শেখ মুজিব জনপ্রিয় হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ জনপ্রিয় হয়েছিল। এখনও সুযোগ আছে, ভালো কর্মসূচী দিয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করলে জনপ্রিয় হওয়ার। কিন্তু বিএনপি তো সেভাবে যেতে চায় না। যেভাবে বিএনপি ক্ষমতায় যাবে বলে আশা করে, ওইভাবে ভালো কিছু হবে না।

সমাজের মধ্যে বিভিন্ন স্তরে বিভক্তি বাড়ছে, গণতান্ত্রিক উন্নত দেশ গড়ার ক্ষেত্রে এটি কতটুকু প্রতিবন্ধক?  
অত্যন্ত বড় প্রতিবন্ধক। সোসাইটিটা এলিয়েনেটেড। মানে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা। মানুষের মধ্যে সংহতি নেই। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস নেই। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। পরিবারের মধ্যে সমস্যা সবসময় থাকে। কিন্তু গত ৫-৭ বছর ধরে যে ঘটনা দেখা যাচ্ছে পরিবার ধসে যাচ্ছে। মেয়েদের প্রতি যে মনোভাব সমাজের থাকা উচিত, ঠিক তার বিপরীতে অবস্থান করছে। যে রকম ধর্ষণের খবর, এখন কিছু কমছে, হয়তো নানান দিক থেকে এই খবর দেওয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ আসছে। পরিবার ভেঙে যাওয়া, ধর্ষণ এবং আরও নানান অসামাজিক কার্যকলাপে সমাজটা ভরে গেছে। প্রস্টিটিউশন কমে গেছে। কিন্তু গোটা সমাজের ভেতরেই প্রসটিটিউশন ছড়িয়ে পড়েছে। এগুলো ভালো লক্ষণ না। আমি বলছি না যে, নারী-পুরুষ একই ধারণা নিয়ে চলবে দীর্ঘকাল। নারী-পুরুষ সম্পর্কের ধারণার মধ্যেও পরিবর্তন হবে। কিন্তু ধারণা পরিবর্তনের জন্য তো লেখালেখি দরকার, চিন্তা দরকার, বক্তব্য দরকার। এটাতো কোনো রাজনৈতিক নেতা, কোনো বুদ্ধিজীবী করছেন না। করতে পারছেন না। এই নিয়ে পার্লামেন্টে আলোচনা দরকার। পার্লামেন্টের কোনো সদস্য পার্লামেন্টের ভিতরে বা বাইরে ভুলেও সামাজিক বিভক্তি নিয়ে কোনো আলোচনা করছেন না। গণতন্ত্র নেই, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কোনো সম্ভাবনাও নেই, সেজন্য এগুলো বাড়ছে।

দেশে গুম, খুন, জঙ্গি তৎপরতা বেড়েছে, মুক্তচিন্তার বিকাশে বাধা সৃষ্টিতে তার প্রভাব কতটুকু?
এখানে একটা কথা বলতে চাই যে, বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার অর্থ দাঁড়িয়েছে ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা। মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বলা। আমার কথাটা স্পষ্ট যে, এভাবে মুক্তচিন্তা করে বিরাট ক্ষতির কারণ হয়েছে। হুমায়ুন আজাদ মারা গেছেন। আজকে অভিজিৎ, দীপন, রাজীব অনেকে মারা গেছে। এর বাস্তবতা তো ওইসব প্রপাগান্ডা দিয়ে তৈরি হয়েছে। যারা খুন করেছে, তারা জল্লাদ। তাদের বিচার হওয়া উচিত, শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু খুনের বাস্তবতা যারা তৈরি করেছে, তাদেরও তো অপরাধ আছে। তাদেরও তো শাস্তি হওয়া উচিত। সে বিষয়টি আমাদের লক্ষ্য করা উচিত। তাদের শাস্তি রাজনৈতিকভাবে হওয়া উচিত। রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা যদি বদলে যায়, তারা যদি এভাবে ক্ষমতায় থাকতে না পারে, তাহলে অবস্থা অন্যরকম হবে। কিন্তু এই লোকগুলোই তো এখানে পুরস্কার পাচ্ছে, ওইখানে সংবর্ধনা পাচ্ছে। এক রকম লুটেপুটে নিচ্ছে না পুরস্কার, সংবর্ধনা? প্রতিদিন পত্রিকায় তাদের দেখা যায়, কিন্তু তারা তো ভালো ভূমিকা পালন করছে না। আত্মবিক্রিত বুদ্ধিজীবী, দলদাস এসব কথা বলছে না লোকে? তো, এখানে স্বাধীন চিন্তাশীলতা আছে কার? বাংলাদেশে সেই লেখক, সেই বুদ্ধিজীবী, সেই শিল্পী কোথায় যার মূল্যবান কোনো চিন্তা আছে? যদি মূল্যবান চিন্তা থাকতো এবং মূল্যবান চিন্তার প্রতি জনগণেরও কিছুটা আগ্রহ থাকতো, জনগণ বলতে আমি শিক্ষিত জনগণের কথা বলছি। তাহলেই হতো মুক্তচিন্তা। দমন করে কি টিকে থাকা যায়? সাময়িকভাবে হয়তো যায়। কিন্তু আমাদের এখানে যাকে মুক্তচিন্তা বলছে, আসলে তো সেরকম চিন্তা খুঁজে পাই না।
 
উত্তরণের উপায় কী?
প্রথমত, উত্তরণের উপায় কারা চায়, তাদের উপর নির্ভর করে। ঠিক চাওয়ার মতো চাওয়া যদি দেখা দেয়, তাহলে উপায় বের করা যাবে। প্রথমে স্টাডি সার্কেল (পাঠচক্র) করা, চিন্তা প্রকাশ করা, প্রচার করা, যদি তাতে জনগণের সমর্থন পাওয়া যায়, তাহলে সাংস্কৃতিক সংগঠন করা। যদি তাতে জনগণের সমর্থন পাওয়া যায়, তাহলে রাজনৈতিক দল করা। অথবা প্রচলিত কোনো দলকে সমর্থন দিয়ে এটা গড়ে তোলা। এই প্রক্রিয়াই অতীতে ইতিহাসে আমরা পাই। কিন্তু এখন জনগণও সমর্থন দেয় না, জনগণের চেতনাও বিনষ্ট হয়ে গেছে, যারা বুদ্ধিজীবী তারাও আত্মবিক্রিত, দলদাস। ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলে তারা পরিবেশ নষ্ট করেছেন। ধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। তারা সাম্রাজ্যবাদের দালাল হিসেবে কাজ করছেন। বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ ইত্যাদি। এগুলোর দ্বারা তারা পরিবেশ নষ্ট করে রাখছেন। এবং এই নষ্ট লোকদেরই কর্তৃত্ব। ভিন্ন চিন্তাকেন্দ্র, ভিন্ন কর্মকেন্দ্র যত ছোট করেই হোক, আরম্ভ করার দরকার। আমি চেষ্টা করি, কিন্তু সাড়া পাই না। হয়তো আরও কেউ কেউ চেষ্টা করেন। ওইরকম চিন্তার ভিন্ন কেন্দ্র, মত প্রকাশের ভিন্ন কেন্দ্র, তারপরে সংগঠন গঠন করা যায়। আর প্রথমেই সরকারের বিরুদ্ধে একেবারে ভয়ানক মত প্রকাশ করতে হবে, এমনটা দিয়ে তো কোনো ফল হবে না। জনজীবনকে উন্নত করা, আমাদের রাষ্ট্র গঠন করার বিষয়ে এই মত প্রকাশ করা। আমি যেখানেই সুযোগ পাই লিখি, বলি। আজকে থেকে না, আরও ৩৫ বছর আগে থেকে। আমার সমর্থক নেই। আমি যে বক্তব্য বলি, এটাই যে সমর্থন করতে হবে, তা না। সত্যনিষ্ঠা নিয়ে আরও কেউ কেউ যদি মত প্রকাশ করতেন, তাহলে আমাদের একটা সম্মিলিত প্রচেষ্টা দাঁড়াতো। কিন্তু চিন্তা কোথায়? টাকার সামনে তো অসহায় আমাদের বাঘা বাঘা সব বুদ্ধিজীবী। আর রাজনীতিবিদদের কথা কী বলবো? সবাই লক্ষ্য করছেন যে, রাজনীতি মানেই ব্যবসা, টাকা-পয়সা আয় করা, ক্ষমতা করা, বিদেশে ছেলে-মেয়েকে পড়ালেখার জন্য পাঠানো, তাদের বিদেশি নাগরিক করে নেওয়া। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটাকে গড়ে তুলতে চায়, এ রকম ব্যক্তি কোথায়? আমি তো দেখি না খোঁজ করে, পাই না। যারা বাংলাদেশের নের্তৃত্ব করছে, কর্তৃত্ব করছে, মীর জাফরও তো এর থেকে একটু উন্নত চরিত্রের ছিল। যখন ক্লাইভের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে, তখন নাকি মীর জাফর বলে উঠেছিল, দেশটা কি বিক্রিই করে দিলাম? এ রকম একটা আক্ষেপবোধ। আমাদের এই বুদ্ধিজীবীদের, রাজনীতিবিদদের তো সে আক্ষেপবোধটুকুও নেই। এদের কি কোনো আক্ষেপ হবে, যদি আমেরিকান, বা ইন্ডিয়ানরা নিয়ে নেয় দেশ? জনগণের মধ্যে চেতনা দরকার। গণজাগরণ মঞ্চ- এটা কী আসলেই কোনো গণজাগরণ? প্রকৃত গণজাগরণ চাই। যার মধ্যে মানুষের মহৎ গুণাবলীর প্রকাশ ঘটবে। যার মধ্যে মহৎ কিছু অর্জন করার লক্ষ্য থাকবে। যার মধ্যে ভালো নেতৃত্ব থাকবে। যার মধ্যে জ্ঞানের কার্যকারিতা থাকবে। এর কোনোটাইতো আমাদের নাই। এই সবগুলোই হলো- একটার পর একটা হুজুগ।

শেষ প্রশ্ন। আপনার সন্তান দীপন হত্যার পর আপনি বলেছিলেন যে, আপনি এই হত্যার বিচার চান না। তখন সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে আপনার অনেক সমালোচনা হয়েছিল। এই বিচার না চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতটা বাংলাদেশে বিরাজমান বলে মনে করেন কিনা, একটু ব্যাখ্যা করুন।
আমি বিচার চাই না আমার ছেলের হত্যার। আমি কোনো অস্পষ্টতা না রেখে, স্পষ্টভাবে বলছি। কেন চাই না, এই কথা আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করছেন। আমি উত্তর দেইনি। আমি বলছি, দেশের বাস্তবতা লক্ষ্য করেন। দেশের বাস্তবতায় বিচার আছে এইটা আমার কাছে মনে হয়নি। কতোজনের সন্তান নিহত হয়েছে, কতোজনের বাবা নিহত হয়েছে, কতোজনের মা নিহত হয়েছে, কতোজনের স্ত্রী-স্বামী নিহত হয়েছে, এগুলোর বিচারের যে অবস্থা দেখেছি টেলিভিশনের পর্দায়; কান্নাকাটির কিছু দৃশ্য দেখেছি- তাতে আমার মনে হয়েছে যে, বিচার চাওয়ার চাইতে না চাওয়া ভালো। এটাই কারণ। কিন্তু আমি সেই সঙ্গে এ কথাও বলছি, বিচার করা সরকারের দায়িত্ব। কারণ দেশে আইনের শাসন রাখতে হলে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিচার দরকার। আমি আমার সন্তানের লাশ পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া মানে সরকারের হাতেই তুলে দেওয়া। আমি চাই দেশে আইনের শাসন। আইনের শাসনের জন্য সরকার বিচার করবে। আমরা ক্ষতিগ্রস্থ; আবার আমরাই টাকা খরচ করে, মামলা করে, বিচার করতে গিয়ে আরও ক্ষতিগ্রস্থ হবো। বিচার কবে শেষ হবে কে জানে। এই কথাগুলো আমার মনে ছিল, আমি এরকম একটা কথাও বলিনি। এটা হল আমার একটা দিক। দ্বিতীয় হলো, আমাকে অপছন্দ করেন, এরকম লোকের সংখ্যা প্রচুর। আমি দেখি, বিশেষত পাওয়ারফুল লোকজন, বড় বড় বুদ্ধিজীবী, অনেকেই আছেন। আমি চিন্তা করি, কেন তারা আমায় অপছন্দ করেন? আর যেখানেই সুযোগ পান আমার ক্ষতি করেন। এবং সেই ক্ষতি স্বীকার করে নিয়েইতো আমি চলছি। তো আমি যেটা বুঝতে পারি, আমার মতামত তারা সহ্য করতে পারেন না। আমার মতামতকে তারা মনে করেন তাদের ক্ষমতার জন্য, তাদের টাকা-পয়সার জন্য, তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তির জন্য অসুবিধাজনক। তাছাড়া ঈর্ষা বলেও একটা ব্যাপার আছে। আমার কিছু কিছু কাজকে তারা ঈর্ষা করে। এইগুলোই আমার বিরুদ্ধে প্রচারণার কারণ। আমার ছেলে দীপন, তার বিরুদ্ধে প্রচার করার কিছু আছে? সে কোনো খারাপ কাজ করেছে? আমার নিন্দা করতে পারে আমার নিন্দা করছে। আমাকে একদল বলছে তিনিতো অ্যান্টি-আওয়ামী লীগ। আমি কি অ্যান্টি-আওয়ামী লীগ? আওয়ামী লীগের সমালোচনা করি। আওয়ামী লীগ দেশের একটি রাজনৈতিক দল। এই হিসেবে আওয়ামী লীগের মঙ্গল আমি কামনা করি। আমি কি অ্যান্টি বিএনপি? বিএনপি যেমনই হোক, আমার দেশের একটি দল। বিএনপি ভালো হোক, সেটা আমি চাই। বামপন্থী দলগুলো ভালো কাজ করে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাক। একটা ভালো প্রসেস ডেভলপ করুক। এটুকুই তো আমার কথা। কিন্তু তা সহ্য করতে পারেনা অনেকেই। বুদ্ধিজীবীদের চরিত্র তো অত্যন্ত নিকৃষ্ট। এখন তারা পুরস্কারের লোভে, সংবর্ধনার লোভে যা করছে, তা অপরাধমূলক কাজ। সমাজে যারা পুরস্কৃত হওয়া উচিত, তারা অবহেলিত। যারা পুরস্কৃত হওয়া উচিত না, তাদেরকেই সমাজ নমস্কার করছে, পুরস্কার দিচ্ছে। এ সমাজের মঙ্গল কি করে হবে? ভালো-মন্দের ডিস্টিংশন আছে না? যে অবস্থায় চলছে সমাজ এ অবস্থায় থাকবে না। মানুষের মধ্যে যে শুভ বুদ্ধির উদয়ের কথা বলছিলাম, শুভবুদ্ধি এখন পরাজিত, অবদমিত। সেই অবদমিত, পরাজিত শুভবুদ্ধি ধীরে ধীরে জাগবে। তারা সমাজে প্রাধান্য বিস্তার করতে চাইবে। এবং সেই চাওয়াটা যখন দেখা দিবে তখনই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া আরম্ভ হবে।

Disconnect