ফনেটিক ইউনিজয়
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা-ফিরে দেখা
ফ্লোরা সরকার

চীনের চিত্রনির্মাতা লু চুয়ান পরিচালিত ‘সিটি অব লাইফ অ্যান্ড ডেথ (২০০৯)’ সম্পর্কে সমালোচনা করতে গিয়ে চিত্রসমালোচক ব্রোগান মরিস বলেছেন, “পৃথিবীর অধিকাংশ ছবি নির্মাণ করা হয় কারণ, নির্মাতারা সেসব ছবি নির্মাণ করতে চান বলে। কিন্তু কিছু ছবি থাকে, যেমন, ‘সিটি অব লাইফ অ্যান্ড ডেথ’-এর মতো, যেসব ছবি নির্মাণ করা হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সতর্ক করার জন্য, শিক্ষিত করে তোলার জন্য এবং কোন্ প্রেক্ষাপট থেকে ছবির গল্প গড়ে উঠেছিল তা জানান দেয়ার জন্য।” ‘সিটি অব লাইফ অ্যান্ড ডেথ’, যা ‘রেপ অব ন্যানকিং’ নামে খ্যাত, যার প্রেক্ষাপট ছিল ১৯৩৭ সালে, মাত্র ছয় সপ্তাহের ব্যবধানে সংঘঠিত একটা ঘটনা, যে ঘটনায় জাপান কর্তৃক চীনের চল্লিশ হাজার থেকে প্রায় তিন লাখ নাগরিকদের উপর অত্যাচার, হত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদি চালানো হয়। ছবিটা দর্শককে এতোটাই আতঙ্কগ্রস্ত করে যে, রীতিমতো ‘হরর মুভির’ পর্যায়ে চলে যায়। ঐতিহাসিক সত্যের খুব কাছাকাছি থাকার জন্যেই নির্মাতা লু চুয়ান ছবিটা সেভাবে নির্মাণ করেন। সিনেমার সত্য এবং বাস্তব সত্য যেন মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২ সময়কালের মধ্যে আলজেরিয়ায় ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দেশটিতে এফএলএ (ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট) কর্তৃক যে গরিলা যুদ্ধ সংঘঠিত হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপটে, স্বাধীনতা উত্তর (১৯৬২) আলজেরিয়ায়  ১৯৬৬ নির্মিত হয় অন্যতম বিখ্যাত ছবি, ‘দ্য ব্যাটেল অব আলজিয়ারস’। ছবিটা দেখার সময়, যারা আলজেরিয়ার সেই সময়ের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত নন, তাদের কাছেও সেই ইতিহাস ধরতে কোনো অসুবিধা হয়না। এতোটাই বিস্তারিত এবং বাস্তবসম্মত ভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। ছবিটা এখনো দর্শকদের মনে নাড়া দিয়ে যায়।  
অন্যদিকে, ২০১২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ক্যাথেরিন বিগলো পরিচালিত ‘জিরো ডার্ক থার্টি’, ছবিতে আমরা পাই ইতিহাসের অর্ধসত্য। ২৫ মে ২০১২, সোশালিস্ট ওয়েবসাইটের ডেভিড ওয়ালস-এর একটা লেখা থেকে জানা যায়, ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর (২ মে ২০১১) ঠিক আট দিন পর অর্থাৎ ১০ মে, ২০১১, ছবির লেখক মার্ক বোল সিআইএ-র পাবলিক অ্যাফেয়ার্সে কর্মরত জর্জ লিটলকে একটা ই-মেইল পাঠান যেখানে ছবির চিত্রনাট্যকার মার্ক বোল এবং ছবির পরিচালক বিগলো সম্পর্কে উল্লেখ করে জানানো হয়, তারা বিন লাদেন হত্যার এই মহান অভিযানকে কেন্দ্র করে, একটা ছবি নির্মাণ করতে চান। ছবিটা বিন লাদেনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও, তা মূলত ইরাক যুদ্ধের উপরেই নির্মিত হয়েছে। ছবির সত্য যাতে কাহিনীকেও ছাড়িয়ে যায় অর্থাৎ বাস্তবোচিতভাবে নির্মাণ করা যায় সেই লক্ষ্যে তারা সিআইএ এবং তৎসংশ্লিষ্ট অন্যান্য অফিসের সার্বিক সহায়তা কামনা করেন। শুরু হয় সহায়তা পর্ব। এই কাজে ছবির চিত্রনাট্যকার বোল এবং পরিচালক বিগলো যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ, অফিস অব পাবলিক অ্যাফেয়ার্র্স এবং পেন্টাগনসহ যারা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মহাকাব্য রচনা করেছিলেন, তাদের সকলের কাছ থেকে প্রচুর সহায়তা পান। কিন্তু এই সহায়তা গ্রহণের সময় লেখক এবং পরিচালককে ছবির মূল পান্ডুলিপি থেকে অনেককিছু ছেটে ফেলে দিতে হয়। মূল পান্ডুলিপির ওযাটারবোর্ডিং এর অত্যাচারের দৃশ্য, আবুগরিব কারাগারে যুদ্ধ বন্দিদের কুকুর দিয়ে ভয় দেখানোর দৃশ্যসহ অনেক দৃশ্য কেটে ফেলে দেন ছবির পরিচালক বিগলো। এভাবে কাটাছেঁড়ার ফলে, ছবিটা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে সন্ত্রাসকে আরও উসকে দিয়েছে। ঐতিহাসিক সত্যের বদলে নির্মিত হয়েছে ঐতিহাসিক অর্ধসত্য। ছবিটার উপর বিশদ আলোচনা অন্যত্রে করেছি। যে কোনো যুদ্ধ যখন সংঘঠিত হয়, তার পেছনে থাকে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, দার্শনিক- ইত্যাদি সংগ্রামের এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। তাই যুদ্ধের উপর নির্মিত ছবিতে এসব প্রেক্ষাপট, ঘটনাপ্রবাহ যত স্পষ্টভাবে, যুক্তিযুক্তভাবে, সত্যের কাছাকাছি হয়ে উপস্থাপন করা যায়, ছবির মর্ম তত ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায়। তাই আমরা দেখি, ‘সিটি অব লাইফ অ্যান্ড ডেথ’ ও ‘ব্যাটেল অব আলজিয়ার্স’ যতটা সত্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছে, ‘জিরো ডার্ক থার্টি’ ততটা পৌঁছাতে পারেনি। যুদ্ধের উপর নির্মিত যে কোনো ছবির জন্য শুধু সাবধানতা অবলম্বনই যথেষ্ট নয়, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ঐতিহাসিক সত্য ইত্যাদি যথাযথ রাখার প্রয়োজন পড়ে।
এবার আসা যাক আমাদের যুদ্ধভিত্তিক সিনেমা প্রসঙ্গে। এ যাবতকাল আমাদের দেশে, মুক্তিযুদ্ধের উপর যত সিনেমা নির্মিত হয়েছে, সেখানে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকে কিভাবে উপস্থাপিত হতে দেখি? সেসব ছবিতে আমরা আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক- ইত্যাদি সংগ্রামের কতটুকু ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পাই? কতখানি সত্য বা বাস্তবসম্মতভাবে সেসব নির্মিত হতে দেখি? কয়েকটা ছবি নিয়ে আলোচনা করা যাক।
স্বাধীনতা পরবর্তী নির্মিত প্রথমদিকের কয়েকটা ছবি, যেমন ‘অরুণোদয়ের অগ্নিস্বাক্ষী’, ‘ওরা ১১ জন’, ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ থেকে শুরু করে কয়েক বছর আগে নির্মিত ‘গেরিলা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘মেহেরজান’ (মেহেরজান বিতর্কিত হওয়ায় পরবর্তীতে ছবিটা নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়) ইত্যাদি ছবিগুলো যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে কিছু সাধারণ সাদৃশ্য লক্ষ্য করবো। ‘অরুণোদয়ের অগ্নিস্বাক্ষী’ শুরুই হয় ছবির নায়িকার (ববিতা) ধর্ষণ পরবর্তী সময় থেকে। অর্থাৎ পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক ধর্ষিতা হওয়ার পর থেকে। ‘ওরা ১১ জন’-এর শুরুতে একটা চরিত্রের মুখে আমর সংলাপ শুনি, ‘ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লি বসবেনা’ এবং ঠিক তার পরপরই ২৫ মার্চ রাতের হত্যাযজ্ঞ দেখানো হয়। ‘গেরিলা’ শুরু হয় একেবারে ২৫ মার্চের সকাল থেকে, ‘শ্যামল ছায়া’ যুদ্ধ শুরু হওয়ার মধ্যবর্তি সময় অর্থাৎ ১৯৭১ এর আগস্ট মাস থেকে ছবি শুরু হয়। মোটামুটিভাবে বলা চলে, এই পর্যন্ত নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের কোনো ছবিতেই, যুদ্ধ পূর্ববর্তী সময়ের কোনো ইতিহাস আমরা পাই না। যুদ্ধ কেন শুরু হয়েছিল, তার অর্থনৈতিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, কারণ ইত্যাদি সেভাবে উল্লেখিত হতে দেখি না। যেসব কারণ এবং প্রেক্ষাপটগুলো উল্লেখ করা অত্যন্ত প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। ভৌগলিকভাবে পাকিস্তান দ্বিখন্ডিত থাকলেও, রাজনৈতিক ও অন্যান্য দিক থেকে অখন্ড একটা দেশ কী কারণে, কীভাবে দ্বিখন্ডিত হয়ে গেলো, সেসব জানা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন। শুধু অত্যাচার আর নিপীড়ন নামক দুটি শব্দ দিয়ে কোনো দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের কাহিনী দেখানো যায় না। দ্বিতীয় যে বৈশিষ্ট্য দেখতে পাই, প্রায় সব ছবিতেই পাকিস্তানী বাহিনী হয় গ্রামে, না হয় পুরনো ঢাকায় আক্রমণ করে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নতুন ঢাকা বা অন্যান্য শহরে কোনো আক্রমণ চালায় না। সেসব শহরের কোনো গল্প তেমনভাবে দেখা যায় না। অথচ ঐতিহাসিক সত্য এই যে, সাতচল্লিশের ভারত ভাগ থেকে শুরু করে, বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভূথ্যান, দেশের স্বাধীনতা, স্বাধিকারের সংগ্রামে এদেশের শহুরে শিক্ষিত সম্প্রদায়ই সম্পৃক্ত ছিল, সব থেকে বেশি। গ্রামের মানুষেরা শহরের সেই মানুষদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছে। সেসব ইতিহাসের বিস্তারিত কিছু ফুটে উঠতে দেখি না আমাদের ছবিতে। তৃতীয়ত, পাকিস্তানী সেনাদের দেখানো হয়, গ্রামেগঞ্জে আক্রমণ ছাড়াও তারা শুধু মদ খায় এবং নারী ধর্ষণ করে। এই দুইটা কাজ ছাড়া আর কোনো কাজই তারা করতে জানে না। মুক্তিবাহিনী কোথায়, কোন অবস্থানে আছে, এসব খোঁজখবর নেয়া ছাড়াই ছবিতে দেখানো হয় পাকিস্তানী বাহিনী সরাসরি গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে একজন সাধারণ সৈন্যও দেশের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থির খবরাখবর রাখার চেষ্টা করে। ছবিতে এসব খবরাখবর দেখানোর মধ্যে দিয়ে সেই সময়ের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি কিছুটা হলেও দর্শক দেখতে পেতে পারে। একপেশে খলনায়কের চরিত্রে রাখার ফলে, পাকসেনাদের দেখে মনে হয়, এরা যুদ্ধ চেনে না, শুধু মদ আর মেয়েমানুষ চেনে। চতুর্থত, শুধু ১৯৭১-এর নয় মাসকে কেন্দ্র করে, অর্থাৎ শুধু যুদ্ধকালীন সময়কে কেন্দ্র করে এসব ছবি নির্মিত হলেও, মুখোমুখি বা সম্মুখ যুদ্ধের কোনো বাস্তব দৃশ্য দেখা যায় না। দৃশ্যগুলো দেখলে মনে হয়, যেন পূর্ব পরিকল্পিতভাবে ক্যামেরা-অ্যাকশন দিয়ে গোলাগুলির দৃশ্যগুলো সাজানো হয়েছে। যেমন ‘গেরিলা’ ছবিতে তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টে একটা মাত্র বোমা ফাটানোর দৃশ্য দিয়ে পরিচালক নাসিরউদ্দিন ইউসুফ সারাদেশের যুদ্ধংদেহী ব্যর্থ দৃশ্য ফুটিয়ে তোলেন। ছবিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কোনো বাস্তবতা আমরা দেখতে পাইনা, ‘অল কোয়াইট ইন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টে’ ছবিতে যুদ্ধকে যেভাবে চরম বাস্তব করে ফুটিয়ে তুলতে দেখি। পঞ্চমত, এবং সব থেকে যে বড় বিষয় হলো, যে দার্শনিক বা মূলনীতির উপর দাঁড়িয়ে আমাদের এই মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ সংঘঠিত হয়েছিল, তার অনুপস্থিতি। সিনেমা শুধু বিনোদনের ক্ষেত্র নয়। যুদ্ধভিত্তিক ছবি তো আরও নয়। কম-বেশি যেকোনো সিনেমা, তা যত সাধারণ সিনেমা হোক না কেন, কোনো না কোনো দার্শনিক জায়গা থেকে নির্মিত হয়ে থাকে। যুদ্ধভিত্তিক ছবিতে সেটা আরও অধিক পরিমাণে দেখা যাবার কথা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবিগুলোতে অত্যাচার আর নিপীড়নের দর্শন ছাড়া আর কোনো দর্শন চোখে পড়েনা। অথচ, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুই হয়েছিল তিনটি মূল নীতিকে কেন্দ্র করে- সাম্য, সামাজিক ন্যায় বিচার এবং মানবিক মর্যাদা। এই তিন নীতির কোনো একটিরও ছায়া পড়তে দেখি না আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধভিত্তিক ছবিগুলোতে।
লেখাটা শুরু করেছিলাম যুদ্ধভিত্তিক বিদেশি কয়েকটা ছবির আলোচনা দিয়ে। সেখানে দেখেছি ইতিহাসের সত্য থেকে সরে গেলে কীভাবে একটা ছবি অর্ধসত্য হয়ে যায়। আমাদের এখানে মুক্তিযুদ্ধের উপর প্রচুর ছবি নির্মিত হলেও, ইতিহাসের বাস্তবতা থেকে দূরে থাকার কারণে অধিকাংশ ছবি একদিকে যেমন ক্লিশে, এক ঘেয়ে আর গতানুগতিক মনে হয়, অন্যদিকে সত্য হয়েও তা যেন অর্ধসত্য মনে হয়। আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি হয়, যখন ইতিহাসটাকেই অন্যরকম করে ফেলা হয়। এই প্রসঙ্গে আমাদের দেশে নির্মিত না হলেও, ভারতে নির্মিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটা ছবির কথা না বললেই না। ছবিটার নাম ‘গুন্ডে’। ছবির শুরুতেই ধারা বর্ণনায় বলতে শোনা যায়, ‘১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। পাকিস্তান এবং হিন্দুস্তানের মধ্যে তৃতীয় যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটেছে। নব্বই হাজার পাকিস্তানি সেনা, হিন্দুস্তানী সেনার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে (পর্দায় আমরা জেনারেল নিয়াজি এবং অরোরার আত্মসমর্পণের দৃশ্যসহ অন্যান্য দৃশ্য দেখি)।’ তারপরেই বলা হয়, স্বাধীন বাংলাদেশের কথা। কিন্তু আমাদের ‘মুক্তিযুদ্ধ’ কীভাবে ভারত ও পাকিস্তানের ‘তৃতীয় যুদ্ধ’ হলো, তা কিন্তু বোধগম্য হয়নি। শুধু সেখানেই ছবিটা থেমে থাকেনি। এরপর ছবিতে দেখানো হয়, স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে সেই সময়ে বালা ও রাহুল নামে দুই কিশোর অন্যান্য রিফিউজিদের সঙ্গে কলকাতা চলে যায় এবং পরবর্তীতে বড় হয়ে তারা গুন্ডা হয়ে যায়। ছবির শেষে ধারা বর্ণনায় বলা হয়, তারা গুন্ডা ছিল, গুন্ডা থেকে যাবে। কথাগুলো শুধু অশুভ ইঙ্গিতই বহন করেনা, বাংলাদেশ সম্পর্কে ঋণাত্মক ধারণা দেয়া হয়। অথচ আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ বাংলাদেশের এক মহান এবং ঐতিহাসিক ঘটনা। যে ঘটনাকে কোনোভাবেই ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার কোনো অবকাশ নেই। এই কারণে আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমার সংখ্যাবৃদ্ধি নয়, বরং সঠিক এবং সত্যের মুখোমুখি ইতিহাসকে দাঁড় করিয়ে এই ধরণের ছবির মান বৃদ্ধি করার ভীষণ প্রয়োজন। যেসব ছবি শুধু দেশের ভেতরে না, সারা বিশ্বে তা ছড়িয়ে দেয়া যায়। ঠিক যেভাবে, ‘ক্রেন্স আর ফ্লাইং’ ছবির নায়িকা, যুদ্ধে মারা যাওয়া তার নায়ককে ফিরে না পেয়ে, তার জন্য নেয়া ফুলগুলো অন্যান্য যোদ্ধাদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিল। যে ছবি, পুরনো জীর্ণ হয়েও, নতুনভাবে বেঁচে থাকে। ‘সিটি অব লাইফ অ্যান্ড ডেথ’-এর মতো ছবি, যে ছবি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষিত এবং সতর্ক করে তোলে। আমরা আশা করবো, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের উপর রচিত এরকম বা তার চেয়েও ভালো ছবি আমাদের উপহার দেবে।
লেখক : অভিনেত্রী ও চলচ্চিত্র বিশ্লেষক

Disconnect