কচুয়া বাজারের দ্রব্যমূল্য

কচুয়া একটা গ্রামের হাটের মতো জায়গা। কয়েকটা একতলা পাকা দোকান আর তরজার বেড়া দিয়ে গোটা তিরিশেক টিনের চালার দোকান নিয়ে কচুয়া বাজার।

বজল ট্রেডিংয়ের মালিক বজল আলী কচুয়া বাজারের চেম্বার অব কমার্সের স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট। তার আড়তের উপরের তলায় ছাদের উপর চেম্বার অব কমার্সের অফিস। সেখানে একটা চেয়ার আর টেবিল আছে। আর কিছু নেই। কথা নেই বার্তা নেই বজল আলী একদিন সকালবেলা তার আড়তের কর্মচারী সুখেনকে বলে, সুখেন বাবা তুই তো বুঝলি না সুখ কারে কয়। সুখে থাকতে হইলে মাথায় বুদ্ধি থাকতে হয়। সুখেন হাঁ করে বজল আলীর দিকে তাকিয়ে থাকে। বজল আলী ব্যাখ্যা করে, আরে ব্যাটা বুদ্ধি একটা বাইর করছি।

সুখেন তাকিয়েই থাকে। বজল আলী বলে, শোন ব্যাটা অগার মতো চাইয়া থাহিস না। আমি আজ থেইকা এই কউচ্চা বাজারের মেম্বার অব কয়মাসের পেসিডেন। 

পাশেই বসা ছিল কচুয়াবাজার প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক জহুর হোসেন। সে বলে উঠল, বজল আলী যা কইলা সেইটা পুরা ভুল।

-ভুল আবার কী কইলাম?

-ঐ যে ‘মেম্বার অব কয়মাসের পেসিডেন’, ঐটা হইবো, চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট।

বজল আলী একটু রেগেই বলে, এই আপনে গো মতো মানুষের জন্যই যত ভেজাল। হাতিরে যদি মানুষ গরু কইত তাইলে ঐটাই চলত।

এবার জহুর হোসেন আর যুক্তি খুঁজে পায় না। মনে মনে বলে, এই জন্যই মানুষ তোমারে বজলের বদলে আগেপিছে ভেজাল বলে ডাকে। জহুর হোসেন উঠে চলে যায়। সুখেন বলদের মতো বলে, তাইলে আমারে এইবার একটা গতি কইরা দেন।

বজল আলী খ্যাপে, গতি আবার করন যায়? গতি আহে নিজে নিজে দৌড়াইলে। আগে দৌড়া। তারপর তো গতি আইব নাকি! আমি যদি পেসিডেন হই তুইও কিছু একটা হবি। তুই হইলি আমার পুরান কর্মচারী।

এবার সুখেন তার কাজ আবার শুরু করে। 

বজল আলী সেদিনই সন্ধ্যায় দোতলার খুপরি ঘরে মিটিং বসায়। বাজারের বেশিরভাগ দোকানদার সেখানে আসে। অত ছোট ঘরে ঠাসাঠাসি ভিড়। বাজারের সব ব্যবসায়ী এসে হাজির হয়েছে। বজল আলী বক্তৃতা শুরু করে, শোনেন আমি হইলাম এই বাজারের মেম্বার অব কয়মাসের পেসিডেন। সুখেন কোনায় দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে, চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট। কিন্তু বলতে সাহস পায় না। 

বজল আলী বলতে থাকে, আমি গত সাপ্তাহে চিটাগাং খাতুনগঞ্জে গেছিলাম আমার এক ভায়রার বাড়ি বেড়াইতে। আমি সেইখানে শিকখা আসছি কীভাবে জিনিসের দাম বাড়াইতে হয়। ডিমের দোকানদার রহিম বলে উঠল, বজল কাকা মিটিনটা মাঠে করলে ভালো হইতো না? এইখানে তো গরমে সিদ্ধ হইয়া যাইতাছি।

বজল আলী বলে, ছ্যামড়া পাগল নিকি তুই? এই গোপন মিটিং কি মাঠে করন যায়? শোন্, এখন একটু সিদ্ধ হইয়া যে বুদ্ধি নিয়া বাইর হবি সেইটা দিয়া তামাম মানুষেরে সিদ্ধ কইরা ফালাইতে পারবি। 

সবাই হাততালি দিয়ে উঠল। বজল আলী বলে, আগে শিখতে হইবো দাম বাড়ানোর ছুতা। মনে করো কুনো জিনিসের বাইরের দেশে বাজারে দাম বাড়ল এক টাকা।  তুমরা বাড়াইবা তিন টাকা। আবার ধরো জাপানে ভূমিকম্প হইছে, দিলা দাম বাড়াইয়া। এমুনও হইতে পারে, সাগরে নিম্নচাপ হইছে তুমি জিনিসের দামে উচ্চচাপ সান্দাইয়া দিলা। আবার ধরো তোমার বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া। পাইলা একটা ছুতা, দিলা দোকানের জিনিসের দাম বাড়াইয়া। এক কোনা থেকে প্রতিবাদ উঠল, এইটা কোন ছুতা?

বজল আলী হাত তুলে বলে, হইবো না ক্যান? তোমার মন খারাপ, তুমি জিদ কইরা দাম বাড়াইতেই পারো। তাছাড়া মজুদ করা শিখতে হবে।

কাঁচাবাজারের দোকানদার নান্টু হালদার জানতে চায়, আমি ক্যামতে ঝিঙার দাম বাড়ামু? ঝিঙা তো মজুদ করা যাইব না।

- আরে সব কি শিখাইয়া দিতে হইব নাকি? যেদিন বাজারে মনে কর চাপিলা মাছ আর মলন্দি মাছ উঠব মনে করবি সেইদিন গুঁড়া মাছ পাকানের জন্য মানুষ বেশি কইরা ঝিঙা কিনবো। ব্যস দাম বাড়াইয়া দিবি। বৃষ্টিবাদলা, ঝড়-তুফান, অমুক দিবস, তমুক দিবস, এমনকি মনের কষ্টেও জিনিসের দাম বাড়াইতে পারো।

আরেক দফা হাততালি পড়ল।

তারপর? 

তারপর আর কী? সেই থেকে কচুয়া বাজারে জিনিসের দাম ইচ্ছামতো বাড়ে। আর দাম বাড়লেই একদল লোক হাততালি দিয়ে ওঠে।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //