ডেল্টা প্লাস নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে ইউরোপে

ভারতে ডেল্টা ধরণ আবার রূপ বদলে হয়ে গেছে ‘ডেল্টা প্লাস’ বা ‘এওয়াই.১’। প্রতীকী ছবি

ভারতে ডেল্টা ধরণ আবার রূপ বদলে হয়ে গেছে ‘ডেল্টা প্লাস’ বা ‘এওয়াই.১’। প্রতীকী ছবি

ব্রিটেনের পর পর্তুগালেও করোনাভাইরাসের ভারতীয় বা ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। করোনার মারাত্মক ছোঁয়াচে ডেল্টা ধরন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে। ব্রিটেনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক দেশেও করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে এই ভ্যারিয়েন্টের অনুপাত বেড়ে চলেছে। 

এর মধ্যে আবার আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ‘ডেল্টা প্লাস’ বা ‘এওয়াই.১’ ভ্যারিয়েন্ট। ভারতের ডেল্টা ধরণ এখন আবার রূপ বদলে হয়ে গেছে ‘ডেল্টা প্লাস’ বা ‘এওয়াই.১’। জিনোম সিকোয়েন্সিয়ে দেখা গিয়েছে, কে৪১৭এন মিউটেশন হয়েছে ডবল মিউট্যান্ট স্ট্রেনের। 

ডেল্টা প্লাস অনেক বেশি সংক্রামক বলে জানা গেছে। গত ৭ জুন পর্যন্ত কানাডা, জার্মানি, রাশিয়া, নেপাল, সুইজারল্যান্ড, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রে শনাক্ত হয়েছে এই ডেল্টা প্লাস ধরনটি। 

এর ফলে করোনা মোকাবিলায় গত কয়েক মাসের যাবতীয় সাফল্য ম্লান হয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। অপরদিকে ফ্রান্স, জার্মানিসহ ইউরোপের অনেক দেশ আপাতত বিধিনিষেধ শিথিল করার পথে এগোচ্ছে।

ইউরোপে টিকাদান কর্মসূচিতে কিছু অগ্রগতি হলেও ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ার আগে যথেষ্ট সংখ্যক মানুষের টিকার দুটি ডোজ পাবার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইউরোপ বিভাগের প্রধান করোনা সম্পর্কে আবার সাবধান করে দিয়েছেন।

অপরদিকে ভারতে করোনার ভয়াবহ দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্য অনেকে দায়ী করেছেন ডেল্টা ধরণকে। সেই ধরনই এখন আবার রূপ বদলে হয়ে গেছে ‘ডেল্টা প্লাস’ বা ‘এওয়াই.১’। জিনোম সিকোয়েন্সিয়ে দেখা গিয়েছে, কে৪১৭এন মিউটেশন হয়েছে ডবল মিউট্যান্ট স্ট্রেনের। তাই দেশটির সরকারের আশঙ্কা সময়ের আগেই কি করোনার তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে।

পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ডের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে ৬৩ জনের শরীরে পাওয়া গেছে ডেল্টা প্লাস। অন্যদিকে, ১১ জুন পর্যন্ত ভারতের ছয়জনের শরীরে পাওয়া গিয়েছে এই নতুন স্ট্রেন। এছাড়াও কানাডা, জার্মানি, রাশিয়াতে করোনাভাইরাসের নতুন স্ট্রেনের একজন করে আক্রান্ত হওয়ার খবর এসেছে। এছাড়া নেপালে দুইজন, পোল্যান্ডে নয়জন, জাপানে ১৩ জন ও যুক্তরাষ্ট্রে ১৪ জন ডেল্টা প্লাসে আক্রান্ত হয়েছেন।

তবে এখনো এই ধরনকে উদ্বেগজনক বলছেন না বিজ্ঞানীরা। তার কারণ হিসেবে গবেষকরা জানিয়েছেন, ইউরোপ, আমেরিকায় প্রভাব বিস্তার করলেও আপাতত ভারতে দ্রুত ছড়াতে শুরু করেনি এই প্রজাতি। 

তবে চিন্তার বিষয়, এই ধরনের কাছে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি রুখে দেয়ার ক্ষমতা থাকতে পারে। অর্থাৎ অ্যান্টিবডি ককটেলকে আটকে দিতে পারে এটি। দিল্লির সিএসআইআর ইনস্টিটিউট অব জিনোমিকস অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ বায়োলজির বিজ্ঞানী বিনোদ স্কারিয়া জানিয়েছেন, নয়া এই ধরন মিউটেশনের ফলে মানবদেহে প্রবেশের পথ আরো সুগম করেছে।

সিএসআইআর আইজিআইবির ডিরেক্টর চিকিৎসক অনুরাগ আগরওয়াল জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ টিকা নেয়া ব্যক্তিদের প্লাজমা নিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে হবে ডেল্টার পরিবর্তিত রূপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটা গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে।

ভারতের মিউনোলজিস্ট বিনীতা বালের মতে, এই নতুন প্রজাতি কতটা আশঙ্কার বিষয় তা বুঝতে গেলে প্রথমেই দেখতে হবে এর সংক্রমণে হার কতটা। যত তাড়াতাড়ি বেশি সংখ্যক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে, তত ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হবে। তাই যাদের সংক্রমণে এই নতুন ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাদের পর্যবেক্ষণ রাখা প্রয়োজন।

গত বৃহস্পতিবার ব্রিটেনে করোনার দৈনিক সংক্রমণ প্রায় চার মাস পর আবার ১০ হাজারের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। নতুন করে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতংশই ডেল্টা সংস্করণ বহন করছে। ফলে হাসপাতালের ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটের উপর চাপ ও মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। এখনো পর্যন্ত ব্রিটেনে তরুণরা যথেষ্ট টিকা না পাওয়ার কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেছেন। 

সরকার গতকাল শুক্রবার (১৮ জুন) থেকেই ১৮ বছরের বেশি সবার জন্য করোনা টিকা নেবার সুযোগ করে দিয়েছে। সরকারের প্রধান চিকিৎসা উপদেষ্টা প্রোফেসর ক্রিস উইটি করোনা মহামারির নতুন ঢেউ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন। ভারতে ডেল্টা ভেরিয়েন্ট মাথাচাড়া দেবার পর সেখানে ভ্রমণের উপর ঠিক সময়ে নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণ না চাপানোর কারণে ব্রিটেনের সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা বাড়ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতেও ডেল্টা ধরন ছড়িয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পর্তুগালের রাজধানী লিসবন আড়াই দিনের জন্য দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হবে। বৃহস্পতিবার দেশটিতে হঠাৎ সংক্রমণের হার বেড়ে যাবার ফলে প্রশাসন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পর্তুগালে করোনা পরিস্থিতির অবনতির জন্য ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টকে দায়ী করা হচ্ছে।

রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকেও সংক্রমণের হার বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে দৈনিক সংক্রমণের হার প্রায় তিন হাজার থেকে সাত হাজার ছুঁয়েছে৷ সেখানেও ডেল্টা অথবা অন্য কোনো ছোঁয়াচে সংস্করণকে পরিস্থিতির অবনতির জন্য দায়ী করা হচ্ছে।

ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে করোনা সংক্রমণের হার বাড়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও একের পর এক দেশ বিধিনিয়ম শিথিল করছে। ফ্রান্সে প্রকাশ্যে মাস্ক পরার নিয়ম প্রত্যাহার করা হয়েছে; প্যারিসের উপকণ্ঠে ডিজনিল্যান্ড প্রায় আট মাস পর দর্শকদের জন্য খোলা হয়েছে। 

অস্ট্রিয়া জুলাই থেকে নাইটক্লাব খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জার্মানি ২৫ জুন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলো থেকে করোনা টিকাপ্রাপ্ত মানুষদের প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে।

শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) শীর্ষ বিজ্ঞানী সৌম্য স্বামীনাথান বলেছেন, ডেল্টা সংক্রমণ ক্ষমতার উচ্চহারের কারণে প্রচলিত করোনাভাইরাস ও এর অভিযোজিত অন্য তিনটি ধরনকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতিতে আমাদের সামনে বড় দুর্যোগ অপেক্ষা করছে। কারণ প্রচলিত সার্স-কোভ-২ (করোনাভাইরাস) ও তার প্রধান চারটি ধরনের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ডেল্টা। বিশ্বজুড়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ ইতিমধ্যে ডেল্টায় আক্রান্ত হয়েছেন।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //