তালেবানদের অধীনে কোন দিকে আফগান অর্থনীতি?

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

তালেবানরা কাবুলের দখল নিয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি। এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠছে, তাদের অধীনে আফগানিস্তানের অর্থনীতি কীভাবে পরিচালিত হবে? বিদ্রোহী থেকে শাসক বনে যাওয়া এই তালেবানদের কি আধুনিক অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনা করার দক্ষতা রয়েছে? বিদেশি দাতারা কি সহায়তা দেওয়ার জন্য তাদেরকে বিশ্বাস করতে পারবে? দেশের খনিজ সম্পদে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে তারা ব্যবসা করতে পারবে কি?

দুই দশক ধরে ক্ষমতায় না থাকলেও তালেবানরা দেখিয়ে দিয়েছে বিদ্রোহ পরিচালনার জন্য তারা সম্পদ জোগাড়ে সক্ষম। অবশ্য তাদের এ সম্পদের বেশিরভাগই এসেছে মাদক ব্যবসা, অবৈধভাবে খনিজ উত্তোলন এবং বিদেশে তাদের সমর্থনকারীদের থেকে পাওয়া অনুদান। এ ছাড়াও নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে পাওয়া কর ও ভাড়া থেকেও তাদের হাতে অর্থ আসতো। বলা হচ্ছে, তালেবানদের হাতে এখন ১০০ কোটি ডলারের মতো অর্থ রয়েছে, যা আফগানিস্তানের বাজেটের তুলনায় কমপক্ষে পাঁচগুণ বেশি। তালেবানরা ২০০১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) তিনগুণ বেড়ে দুই হাজার ২০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। বৈদেশিক সাহায্যের কারণে এর অর্থনীতি বেশ কয়েক বছর ধরে অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে রয়েছে। 

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, আফগানিস্তানের বাজেটের চার-তৃতীয়াংশই আন্তর্জাতিক দাতাদের অর্থায়নে পরিচালিত হয়; আর এসব দাতাদের মধ্যে অগ্রণী অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। 

অর্থনীতি পরিচালনার জন্য আফগান টেকনোক্র্যাটদের একটি দল ছিল; এদের অনেকেই পশ্চিমা শিক্ষিত অথবা প্রশিক্ষিত। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সঙ্গে কাজ করা যে কাউকে তালেবানরা ‘ক্ষমা’ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ধারণা করা হচ্ছে এই টেকনোক্র্যাটদের খুব কম সংখ্যকই আফগানিস্তানে থাকবেন। 

নতুন শাসকদের সবচেয়ে জরুরি যে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হবে, তা হচ্ছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মধ্যে দক্ষতার ঘাটতি। বিদেশি দাতা ও বিনিয়োগকারীরা আস্থা রাখতে পারবে এমন মন্ত্রী ও প্রশাসকদের খুঁজে পেতে তালেবানদের গলদ্ঘর্ম হতে হবে। আর এই মুহূর্তে নতুন দাতা অথবা বিনিয়োগকারীরা কোনোভাবেই তালেবানদের বিশ্বাস করতে পারবে না। 

এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসন আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে এবং দেশটিতে নগদ অর্থ সরবরাহ স্থগিত করেছে। 

বাইডেন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা সম্প্রতি বিবিসিকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ তালেবানরা ব্যবহার করতে পারবে না। আফগানিস্তান ব্যাংকের (ডিএবি) রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার, যার বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্রে গচ্ছিত রয়েছে। ডিএবির সাবেক গভর্নর সতর্ক করেছিলেন আফগান অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। 

আফগানিস্তান থেকে পালিয়ে আসা সাবেক গভর্নর আজমল আহমেদি জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বমোট রিজার্ভ প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী, এই রিজার্ভের বেশিরভাগ মার্কিন ট্রেজারি বন্ড ও স্বর্ণের মতো তরল সম্পদ হিসেবে বিদেশে রাখা হয়েছে। 

তিনি আরও বলেছেন, ‘তালেবানদের নাম এখনো আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। ফলে এ ধরনের সম্পদ জব্দ করা হবে এবং এতে তালেবানরা হাত দিতে পারবে না, এটাই সহজ। বলা যেতে পারে মোট রিজার্ভের দশমিক এক থেকে দুই শতাংশ তাদের হাতে পাবে। এর বেশি নয়।’ 

তিনি আরও জানান, মার্কিন ট্রেজারির অনুমোদন ছাড়া কোনো দাতা তালেবান সরকারের পাশে থাকবে না এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। 

এ ছাড়া ইউরোপের বিভিন্ন দেশ উন্নয়ন সহায়তা স্থগিত করেছে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের রিজার্ভ স্পেশাল ড্রয়িং রাইটসে (এসডিআর) আফগানিস্তানের প্রবেশ বন্ধ করেছে। এসডিআর হচ্ছে, আইএমএফের স্টারলিং, ডলার, ইউরো, ইয়েন এবং ইউয়ানের ওপর ভিত্তি করে বিনিময়ের একক। এ ছাড়াও অর্থনৈতিক সংকট সামাল দেওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসেবে এ মাসেই আফগানিস্তানকে আইএমএফ ৩৭০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা থাকলেও, তা আর দেওয়া হবে না বলে জানা গিয়েছে। শুধু তাই নয়, আইএমএফের ৪৬০ মিলিয়ন ডলার এসডিআরও ব্যবহার করতে পারবে না আফগানিস্তান। 

যখন কোনো একটি দেশের নিজেদের আনুষ্ঠানিক কোনো মুদ্রা থাকে না, তখন এসডিআর কৃত্রিম মুদ্রার মতো কাজ করে, যা আইএমএফের সদস্য রাষ্ট্রগুলো ডলারের মতো অবাধে ব্যবহারযোগ্য মুদ্রার মতো ব্যবহার করতে পারে। একটি নির্ধারিত বিনিময় হারের ওপর ভিত্তি করে দেশগুলো তাদের এসডিআর বিনিময় করতে পারে। এই বিনিময় হার প্রতিদিনই পরিবর্তিত হয় এবং তা আইএমএফের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। 

আইএমএফের একজন মুখপাত্র সম্প্রতি জানিয়েছেন, ‘বরাবরের মতোই আইএমএফ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মতামতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।’ উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আফগান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে বাইডেন প্রশাসনের এমন ঘোষণার পরই আইএমএফ এসব কথা জানায়। 

এ অবস্থায় নতুন অনুদান পাওয়া আফগানিস্তানের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। বিভিন্ন পশ্চিমা সরকার, বহুপাক্ষিক সংস্থা এবং দাতারা পুনরায় অর্থায়ন শুরু করার বিষয়ে কঠোর শর্ত চাপিয়ে দেবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বাধীনতা বিশেষ করে নারীদের এমন শর্তগুলো থাকবে। অনুদানের অর্থের ওপর নির্ভরশীল আফগানিস্তানের অর্থনীতির জন্য এ অবস্থায় টিকে থাকা কঠিন হবে বলে মনে হচ্ছে। 

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, আফগানিস্তানের মোট জিডিপির ২২ শতাংশই উন্নয়নমূলক অনুদান। 

বেইজিং ও মস্কোর আফগানিস্তানের নিরাপত্তা নিয়ে অনেক উদ্বেগ রয়েছে, যা তাদেরকে তালেবান নের্তৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে উৎসাহ দেবে। তবে বড় ধরনের বিনিয়োগ অন্য বিষয়। পশ্চিমাদের তুলনায় আফগানিস্তানে চীনের ব্যাংক ও কোম্পানিগুলো কম ঝুঁকিতে রয়েছে; কিন্তু তারা অস্থিতিশীল অর্থনীতির দিকে ঝুঁকছে। 

ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, এখানে চীনের ঋণগুলো শুধু রাইট ডাউনের পরিস্থিতি এড়াতে পুনরায় নবায়ন করা হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি বড় ধরনের সতর্কতামূলক গল্প। 

বিগত কয়েক বছর ধরেই আফগানিস্তানে বিনিয়োগ করার জন্য বেইজিং কথার ভালো খেলা খেলছে; কিন্তু এর কমই বাস্তবায়িত হয়েছে। কাবুলের কাছেই শো-পিস বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত মেটালুরজিক্যাল করপোরেশনের (এমসিসি) ২ দশমিক ৮ বিলিয়নের তামা প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরেই থমকে রয়েছে। এ ছাড়া আফগানিস্তানের খনিজ খাতে ব্যাপক অবকাঠামো ঘাটতি রয়েছে। পরিবহন নেটওয়ার্কও বেশ দুর্বল। এ অবস্থায় আফগানিস্তান থেকে চীনে খনিজসম্পদ নিয়ে যেতে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। ফলে চীনের বিনিয়োগকারীরা অন্য নিরাপদ স্থানে তাদের অর্থ লগ্নি করতে চাইবে। 

বলা হচ্ছে, তালেবানদের অধীনে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও কিছুক্ষেত্রে আফগান অর্থনীতি লাভবান হবে। স্থানীয় যেসব ব্যবসা বিদেশি বিনিয়োগ অথবা দানের ওপর নির্ভর করে না তারা একটি অনুকূল পরিবেশ পাবে। তবে সব ব্যবসার ক্ষেত্রেই এমন হবে না। বিশেষ করে নারী কর্মীদের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসাগুলো মুখ থুবড়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের নতুন করে ঘুষ ও সুরক্ষার অর্থ দিতে হবে। গত এক দশকে কর্মস্থান খাতে ১৫ বছর বয়সের উর্ধ্বে নারীদের সংখ্যা নাটকীয় হারে বেড়ে গিয়েছে। তালেবানদের অধীনে নারী কর্মসংস্থান মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। 

বিপুলসংখ্যক মানুষ ব্যাংক থেকে তাদের অর্থ তুলে নিতে চাইবে। পাকিস্তানভিত্তিক আফগান ইসলামিক প্রেসের এক প্রতিবেদনে তালেবানদের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ব্যাংক মালিক, মানি চেঞ্জার, ব্যবসায়ী এবং দোকান মালিকদেরকে তাদের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু এরপরেও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। আর্থিক খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা নিশ্চিত হতে চাইছেন যে আফগানিস্তানের আর্থিক ব্যবস্থা সচল থাকবে। এর পাশাপাশি গ্রাহকরা তাদের অর্থের নিরাপত্তা চাইছেন; যা খুব দ্রুত পাওয়া সম্ভব না বলেই মনে হচ্ছে। 

সূত্র: ব্লুমবার্গ, বিবিসি ও আলজাজিরা 

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //