মিসরে নিয়ন্ত্রিত স্থিতিশীলতা কতদিন?

মিসরে এবারের ঈদুল ফিতর উদযাপন অন্যান্য অনেক দেশের মতো ছিল না। করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বিষয় উল্লেখ করে মিসরের সরকার ধর্মীয় উপাসনার ক্ষেত্রে বেশকিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকেই এই বিধিনিষেধগুলো আসতে থাকে।

রমজান মাসে মসজিদে রাত্রিকালীন তারাবির নামাজ আদায় করাটা নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার নামাজ ৩০ মিনিটের মাঝে সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছিল। এরপর রমজানের শেষ ১০ দিনে রাতের বেলায় মসজিদে তাহাজ্জুদ নামাজ পুরোপুরিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর ঈদের নামাজের বিষয়ে আসে সর্বোচ্চ কড়াকড়ি। খোলা ময়দানে ঈদের জামাত নিষিদ্ধ করা ছাড়াও শুধু সরকারের অনুমোদিত কিছু মসজিদে ঈদের জামাত আদায় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তদুপরি নামাজের খুতবাতে কি থাকবে, সেটাও সরকার ঠিক করে দেবে বলে বলা হয়।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘মিডলইস্ট আই’ বলেছে, মিসরে এই মুহূর্তে করোভাইরাসের সংক্রমণ তেমন কিছু নয়। আর উপাসনা বাদে কনসার্ট ও ফুটবল খেলা এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানসহ সব ক্ষেত্রেই সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ উঠিয়ে ফেলা হয়েছে। অথচ সরকার অনুমোদিত মসজিদের ইমামরা তাদের যার যার মসজিদের দরজায় তালা দিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সেলফি ছবি তুলে সোশাল মিডিয়াতে পোস্ট করেছে। এই বিষয়গুলো মিসরে ব্যাপক জনরোষের সৃষ্টি করে। বেশিরভাগ মানুষেরই ধারণা সরকার এই বিধিনিষেধগুলো দিচ্ছে বড় কোন জনসমাবেশ এড়াবার উদ্দেশ্যে; কারণ সরকার হয়তো ভাবছে যে, ধর্মীয় উপাসনাকে কেন্দ্র করে গণজমায়েত অর্থনৈতিক দৈন্যতাকে পুঁজি করে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দিতে পারে। 

ব্যাপক জনরোষের ফলস্বরূপ সরকার রমজানের শেষ তিন রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার অনুমতি দিয়েছিল; সেটাও আবার স্বল্পসংখ্যক সরকারি অনুমোদিত মসজিদে। ২৭ এপ্রিল ‘আরব নিউজ’- এর মতে, প্রথমে সরকার বলেছিল, মাত্র ১০ মিনিটের মাঝেই নামাজ শেষ করতে হবে। এরপর সেই বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করে সরকারি বার্তায় বলা হয়, নামাজের ৩০ মিনিট আগে মসজিদ খোলার সময় দেওয়া হয়েছে। আর সর্বশেষ ঈদের দিন খোলা জায়গায় ঈদের নামাজ পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে ঈদের জামাতে লাখো মুসল্লির জমায়েত হয়। 

২০১৩ সালে আব্দেল ফাত্তাহ এল সিসির সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকে মিসরে সরকারবিরোধী জনসমাবেশ একপ্রকার নিষিদ্ধ রয়েছে। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে মিসরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরকার বিরোধী জনসমাবেশ আয়োজিত হয়েছিল মসজিদগুলোতে জুমআর নামাজের পর। একজন প্রাক্তন সরকার নিযুক্ত ইমাম এসাম তেলাইমা ‘মিডলইস্ট আই’কে বলেছেন, মিসরের সরকার যে কোনো জনসমাবেশের বিষয়ে মারাত্মক শঙ্কিত থাকে। এটা অদ্ভূত যে সরকার সমজিদের ভেতরে ঈদের নামাজ পড়তে বিধিনিষেধ দেয়নি; কিন্তু খোলা জায়গায় নামাজ পড়তে নিষেধ করেছে। অথচ করোনাভাইরাসের কথাই যদি বলা হয়, তাহলে তো খোলা স্থানে নামাজ পড়াটাই বেশি উপযুক্ত হবার কথা ছিল। 

মসজিদ ব্যতিত করোনার বিধিনিষেধ কি অবস্থায় রয়েছে, সেটার বর্ণনা দিয়েছে ‘গালফ নিউজ’। এ পত্রিকার ভাষ্য মতে, মিসরে এখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ একেবারেই নেই। এজন্যই দুই বছরের মাঝে এবারের ঈদের আমেজ অনেক বেশি ছিল। বিশেষ করে মিসরের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘খাক’ তৈরি করা বেকারি দোকানগুলো খুব ব্যস্ত ছিল। করোনার বিধিনিষেধগুলো তুলে নেওয়ার পর থেকে দোকানগুলোতে উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। দোকান ও রেস্টুরেন্টগুলোকে রাত ২টা পর্যন্ত খোলা রাখা অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। রমজানের মধ্যে রাস্তায় দান করার কর্মসূচিগুলোকেও সরকার অনুমোদন দিয়েছিল।

গত মার্চ থেকেই করোনার বিধিনিষেধগুলো সরকার উঠিয়ে নিতে থাকে। এপ্রিল পর্যন্ত মিসরে ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষকে করোনার সম্পূর্ণ টিকা দেওয়া হয়েছে; এর মধ্যে ২০ লক্ষাধিক মানুষকে বুস্টার টিকা দেওয়া হয়েছে। 

মার্কিন ‘লাইব্রেরি অব কংগ্রেস’- এর এক লেখায় মিসরের সরকারের রমজান মাসে তারাবির নামাজ পড়তে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হয়। কারণ এর আগের দুই বছর করোনার কারণে মসজিদে তারাবির নামাজ পড়তেই দেওয়া হয়নি। ‘ইউনাইটেড স্টেটস কমিশন অন ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডম’- এর ২০২২ সালের প্রতিবেদনে মিসরের বর্তমান ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সবচেয়ে খারাপ ১৫টা দেশের মাঝে রাখা হয়নি; যেখানে চীন ও পাকিস্তানের নাম রয়েছে। তবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খারাপ অবস্থানে থাকা ১২টা দেশের মধ্যে মিসরের নাম রাখা হয়। এই প্রতিবেদনে মূলত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কথাই উল্লিখিত হয়েছে।

অর্থাৎ মিসরের মতো মুসলিম অধ্যুষিত দেশে সংখ্যালঘু খ্রিস্টানদের চেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকারের বিষয়টা একেবারেই অবহেলিত রয়েছে। তবে পশ্চিমা মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’- এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিসরে কোথায় এবং কখন নামাজ পড়তে হবে, তা নির্দিষ্ট করে দিয়ে দেশটার সরকার মানুষের ধর্মীয় অধিকারের উপর অগ্রহণযোগ্য বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। প্রতিবেদনে মিসরের সরকারের এহেন বিধিনিষেধকে বাকস্বাধীনতা হননের আরেকটা পদ্ধতি বলে উল্লেখ করা হয়।

২১ এপ্রিল নামাজের সময়ের বিষয়ে সোশাল মিডিয়ায় এক ভিডিওতে সমালোচনা করার অপরাধে সাফা আল কোরবিজি নামের এক নারী সাংবাদিককে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেপ্তার করে নিয়ে তার বিরুদ্ধে ভুয়া খবর রটানোর অভিযোগ দায়ের করে। 

কনসার্ট, ফুটবল খেলা এবং অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের বিধিনিষেধ উঠে গেলেও তারাবি, তাহাজ্জুদ ও ঈদের নামাজ পড়ার বিষয়ে মিসর সরকারের বিধিনিষেধ আরোপ এলো সিসির সামরিক সরকারের ক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়ে দুশ্চিন্তাকেই তুলে ধরে।

অন্তত ২০১১ সালের আরব বসন্তের মতো আরেকটা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সরকার এড়াতে চাইছে; কিন্তু দেশটার অর্থনৈতিক দৈন্যদশা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গমের সরবরাহে ঘাটতি ও দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি এল সিসির অবস্থানকে আরো দুর্বল করে দিয়েছে।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //