জীবন দিয়ে সংবিধান পরিবর্তনের পথ উন্মুক্ত করলেন শিনজো আবে

গত ৮ জুলাই জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এক আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। আবের হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুদিনের মাথায় জাপানের ক্ষমতাসীন লিবারাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের নির্বাচনে বড় বিজয় পেয়েছে। অনেকেই বলছেন যে, এর ফলে জাপানের রাজনীতিতে বহুদিনের আলোচিত বিষয় সাংবিধানিক পরিবর্তন একটা ফলাফল দেখবে। 

২০১৯ সালের নির্বাচনে ৪৯ শতাংশ মানুষ ভোট দিলেও এবার দিয়েছে ৫২ শতাংশ মানুষ। জাপানের কিয়োদো বার্তা সংস্থা বলছে, এটা ২০১৩ সালের পর থেকে এলডিপির সবচাইতে বড় বিজয় ছিল। বিরোধী দল কন্সটিটিউশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব জাপান, যারা সংবিধান পরিবর্তনের বিরোধী, তারা ছয়টা আসন হারিয়েছে। দলের নেতা ইউকো মোরি বলছেন, শান্তিবাদী সংবিধানের মাধ্যমে আশেপাশের দেশগুলোর সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক গভীর হয়েছে। এই সংবিধান পরিবর্তন করলে, বিশেষ করে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে। আঞ্চলিকভাবে অস্ত্র প্রতিযোগিতা এখানকার শান্তি বিনষ্ট করবে।

জাপানের সাংবিধানিক পরিবর্তন আঞ্চলিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় জাপানের সংবিধান লেখা হয়েছিল; যেখানে বলা হয়েছে যে, জাপান অস্বীকার করছে যে, যুদ্ধ করতে পারাটা একটা সার্বভৌম রাষ্ট্রের অধিকার। আল জাজিরা মনে করিয়ে দিচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শিনজো আবে পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে আঞ্চলিকভাবে চীনের বহির্মুখী পররাষ্ট্রনীতি এবং উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে জাপানে সংবিধান পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলেছিলেন। এর সপক্ষে জনমতও গড়ে উঠছিল বেশ কয়েক বছর ধরেই। 

জাপানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের নির্বাচনের আগে সবাই মোটামুটিভাবে জানতেন, ক্ষমতাসীন দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন ছিল বিজয়ের ব্যবধান নিয়ে। কারণ এর উপরেই নির্ভর করবে জাপানের শান্তিবাদী সংবিধান পরিবর্তন করা যাবে কিনা। সংবিধান পরিবর্তনে উচ্চকক্ষের ২৪৮ আসনের মাঝে দুই-তৃতীয়াংশ বা প্রায় ১৬৬টা আসনের সমর্থন প্রয়োজন হবে। 

কিয়োদো বলছে, এবারের নির্বাচন সংবিধান পরিবর্তনের জন্য সবচাইতে বড় বিজয় এনে দিয়েছে। কারণ ক্ষমতাসীন এলডিপি দল ও তাদের কোয়ালিশন দল কোমেইতো নতুন করে মোট ৭৬টা আসন পেয়েছে। এর ফলে ক্ষমতাসীন দলের জোট ছাড়াও সংবিধান পরিবর্তনের পক্ষে বিরোধী দল জাপান ইনোভেশন পার্টি ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ফর দ্য পিপল মিলে মোট আসন হবে ১৭৯টা; যা দুই-তৃতীয়াংশ আসনের চাইতে অনেক বেশি। এই দলগুলোর ইতোমধ্যেই পার্লামেন্টের নিম্নপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। কোমেইতো একটা শান্তিবাদী দল হলেও মাত্র কিছুদিন আগেই তারা জাপানের সামরিক বাহিনীর সাংবিধানিক ভিত্তি পরিবর্তনের ব্যাপারে সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

জাপানের সংবিধান পরিবর্তনের সঙ্গে শুধু পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তনই নয়, সামরিক বাজেটের পরিবর্তনের কথাও উঠেছে। সামরিক বাজেট বৃদ্ধির পক্ষে জাপানে একটা শক্ত জনমত গড়ে উঠেছে বেশ কিছুদিন ধরেই। নিগাতা প্রদেশের এলডিপি দলের নেতা কাজুহিরো কোবাইয়াশি বলেছেন, একসময় সংবিধান পরিবর্তনের ব্যাপারে কাউকে কিছু বলাই যেত না; এখন মানুষ মনোযোগ দিয়েই শোনে। আপাতত জাপানের প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ১ শতাংশের মতো থাকলেও সরকার চাইছে তা দ্বিগুণ করে ২ শতাংশে উন্নীত করতে। 

তবে কেউ কেউ মনে করছেন যে, কাজটা সহজ হবে না। জাপানের রিতসুমেইকান এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ইয়োইচিরো সাতো আল জাজিরার এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বলেন, জাপানের সামরিক বাজেট বৃদ্ধিটা সম্ভবত ধীরে ধীরেই হবে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই হঠাৎ বাজেট বৃদ্ধি করাটা কঠিন। শুধু সামরিক বাজেট নয়, জাপানের বৃদ্ধ জনগণের পেনশন, করোনা মহামারির কারণে বিভিন্ন ভর্তুকি, অর্থনীতিতে গতি আনার লক্ষ্যে নতুন ব্যবসা শুরুর ক্ষেত্রে প্রণোদনা দেওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রের জন্যও অনেক অর্থায়ন প্রয়োজন হবে। এই অর্থায়ন দ্রুত আনার একটা পদ্ধতি হলো ‘কনজাম্পশন ট্যাক্স’ বা মানুষের খরচের উপর কর; যা মানুষের কাছে অত্যন্ত অপ্রিয় হবে। জাপানের অনেকগুলো অভ্যন্তরীণ সমস্যা রয়েছে; যার মাঝে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং মানুষের আয়ে স্থবিরতা অন্যতম।

কিছুদিন আগেই জাপানের সরকারি টেলিভিশন এনএইচকের এক জরিপে বলা হয়, দেশের ৪২ শতাংশ জনগণই দেশের অর্থনৈতিক নীতির ব্যাপারে বেশি খেয়াল রাখছে; মাত্র ১৭ শতাংশ মানুষ দেশের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তাকে চিন্তার কেন্দ্রে রেখেছে। তদুপরি জাপানে ধীরে ধীরে জনমত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফিনানশিয়াল টাইমস বলছে, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জাপানের জনমত অনেকটাই প্রভাবিত হয়েছে। একসময় কেউই বিশ্বাস করত না যে চীন তাইওয়ানকে আক্রমণ করতে পারে। কিন্তু ইউক্রেনের উপর রুশ হামলার পর অনেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন যে, চীন এহেন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়ালে জাপান কিছু করার জন্য প্রস্তুত কিনা। 

জাপানের রাজনৈতিক পত্রিকা ইনসাইডলাইনের প্রধান সম্পাদক তাকাও তোশিকাওয়ার মতে, দুই দশকের মাঝে এবারের নির্বাচনেই প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হয়েছে। তবে জাপানের নিরাপত্তা চিন্তার ক্ষেত্রে সবচাইতে বড় প্রভাবক হলো যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক নিরাপত্তার ব্যাপারে, বিশেষ করে চীনকে নিয়ন্ত্রণে জাপানকে আরও কর্মক্ষম দেখতে ইচ্ছুক। ১৯৪৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রচিত জাপানের সংবিধান দেশটাকে শান্তিকামী করে রেখেছে। এখন সেই একই সংবিধানকে পরিবর্তনে অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আবের মৃত্যু জাপানের সংবিধান পরিবর্তনের প্রচেষ্টাটাকে এগিয়ে নিলেও এর মাধ্যমে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেই অনেকের ধারণা। 

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //