শ্রীলংকার বিপর্যয় ঝুঁকি কাটেনি এখনো

মোহমেদ রাজাদিনের চার চাকার হলুদ মিনি ট্রাকটি কলম্বোর পেট্টা মার্কেটের সামনে একটি কোনায় দাঁড়িয়ে। এ ধরনের গাড়িকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় টেম্পো। পেট্টা মার্কেট শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা। রাজাদিনের টেম্পোর পেছনের অংশটির তিন দিকই নিরাবরণ। সেখানে সাজানো নতুন-পুরনো নানা পণ্যের পসরা। এসব পণ্য বিক্রি করে চলে রাজাদিনের সংসার।

টেম্পোর এক কোণে রাখা ধূসর টুলবক্সটিতে রয়েছে স্প্যানার (সাঁড়াশিবিশেষ), রকমারি তার ও গাড়ির জ্যাক। টুলবক্সের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে রাজাদিন বলেন, আগে এটি বিক্রি হতো ৫ হাজার বা ৬ হাজার শ্রীলংকান রুপিতে। এখন এর দাম ১০ হাজার শ্রীলংকান রুপি। এ বক্সটি এনেছেন ৩ মাস আগে। অবিক্রীত রয়ে গেছে এখনো। সুসময়ে প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৩টি টুলবক্স বিক্রি হতো।

চলতি বছরের মার্চ থেকে অভূতপূর্ব মন্দার মধ্যে রয়েছে শ্রীলংকা। পেট্রল, ডিজেল সরবরাহ সীমিত। আর জ্বালানি সংগ্রহে ১ কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন এখন রাজধানীতে নিত্যদিনের স্বাভাবিক ঘটনা। ভোগ্য ও খাদ্যপণ্যে একইভাবে প্রভাব ফেলছে মূল্যস্ফীতি। বিশ্লেষকরা এর জন্য দায়ী করছেন বিভিন্ন বিষয়কে। এর মধ্যে বিপুল অঙ্কের ঋণের বোঝা, পর্যটন ও প্রবাসী আয় হ্রাস এবং রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনাই মূল।

রাজাদিনের ভাষ্য, আমাদের দেশের অবস্থা খুব খারাপ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। দ্বীপরাষ্ট্রটির লাখো মানুষের মতো ৩৫ বছরের রাজাদিনের দিনযাপনেও প্রভাব ফেলছে মন্দা। ভবিষ্যৎ নিয়ে আর সবার মতোই শঙ্কিত তিনি। ‘কীভাবে চলবে?’ এ প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর নেই। রাজাদিন বলেন, ‘গ্রাহকের কাছে অর্থ নেই। তাই কম কিনছেন তারা।’ স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া হয়ে ওঠেনি রাজাদিনের। বড় ছেলে হিসেবে পরিবারের সদস্যদের দায়িত্ব বর্তায় তারই উপর। তাই ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কাটা যেন একটু বেশিই তার। 

খাবার নিয়ে ভাবতে হয় দুইবার

জুনে শ্রীলংকায় খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ঠেকেছে ৮০ শতাংশে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৬০ লাখ শ্রীলংকান এখন খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। লবণ থেকে চাল- সব রকম প্রধান খাদ্যের দাম আকাশছোঁয়া। খাদ্য তালিকা থেকে শুরু করে জীবনযাপন পরিবর্তন- সবকিছু নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে শ্রীলংকার সাধারণ মানুষকে। এক কথায় শ্রী হারিয়েছে শ্রীলংকা। 

রাজাদিন বলেন, দাম বেড়ে যাওয়ায় সবজি রান্না হচ্ছে কম। এখন আর প্রতিদিন মুরগির মাংস খাওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারেন না। খাবারের কথা উঠলেই দুইবার ভাবতে হয়। ৭৫০ মিলিলিটার দুধ কিনতে গুনতে হয় ৪৫০ শ্রীলংকান রুপি। অথচ আগে একই পরিমাণ দুধ পাওয়া যেত ২২০ রুপিতে। 

এই শ্রীলংকার দিকে নজর দিলে আশ্চর্য হতে হয়। এই দেশটিই কোনো এক সময় তার উচ্চ জীবনমান ও স্থিতিশীল অর্থনীতির জন্য পরিচিত ছিল বিশ্বে। কয়েক দশক আগে শ্রীলংকার মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ছিল ভারতের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেশি। 

কিন্তু এখন শ্রীলংকার অর্থনীতি মুক্ত পতনের মধ্যে রয়েছে। সংকটের আনুমানিক কারণগুলোও যথেষ্ট পরিষ্কার। কোভিড-১৯ এবং ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের মতো আন্তর্জাতিক কারণ থেকে উদ্ভূত সমস্যাগুলোর পাশাপাশি শ্রীলংকার নিজস্ব নীতিগত ভুলের কারণে জটিলতা আরও বেড়েছে।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেটে লেখা এক নিবন্ধে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বলেছেন, রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাকসে (এখন দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন) ২০১৯ সালে কিছু বিষয়ে কর কমানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন, যা দেশটিকে অতি প্রয়োজনীয় রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করেছিল। এরপর ২০২১ সালে তার সরকার হঠাৎ রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক আমদানি নিষিদ্ধ করে। এই নীতির লক্ষ্য ছিল বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ বন্ধ করা। কিন্তু এরূপ অদূরদর্শিতার প্রধান ফল অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়া। এতে চলতি বছর তীব্র খাদ্য ঘাটতির দিকে যাচ্ছে শ্রীলংকা। রুপিকে কৃত্রিমভাবে শক্তিশালী রাখার জন্য সরকারের চেষ্টা ছিল অনেক। কৌশলগতভাবে শ্রীলংকা ব্যবহার করেছে ‘সফট পেগ’। অর্থনীতির পরিভাষায় এটি একটি বিনিময় হার নীতি। এ নীতির মাধ্যমে সরকার সাধারণত বাজারকে মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণের অনুমতি দেয়। কিন্তু রুপি-ডলার বিনিময় হার লক্ষ্য করলে দেখা যায়, শ্রীলংকার জন্য সফট পেগ একরকম অপপ্রয়োগ। বছরের পর বছর প্রতি ডলারের বিপরীতে শ্রীলংকার মুদ্রার মান ১৭৫-২০০ রুপির মধ্যেই ওঠা-নামা করেছে। অর্থনীতিবিদ নোয়া স্মিথের ব্যাখ্যা, রুপির মান বাড়াতে নিয়মিত ডলার বিক্রি করছিল শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

কিন্তু নানা জটিলতায় চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ডলারের বিপরীতে রুপির মান অস্বাভাবিক হারে কমতে শুরু করে। কয়েক মাসের মধ্যে, প্রতি ডলারের বিপরীতে শ্রীলংকান মুদ্রা নেমে আসে ৩৫০ রুপিতে। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলারের রিজার্ভ অদৃশ্য হয়ে যায়। মে মাসে বৈদেশিক ঋণ খেলাপি হয়েছে শ্রীলংকা। তখন শ্রীলংকা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পুনরুদ্ধার কর্মসূচিগুলো কঠোর নীতি সংস্কারের উপর শর্তযুক্ত হওয়ায় সেখানে না গিয়ে নতুন করে ঋণ গ্রহণের জন্য শরণাপন্ন হয় চীনের কাছে। সে সময় দেশটির কোষাগার শূন্য হওয়ার পথে। এ পদক্ষেপ কেবল ঋণের বোঝা আরও বাড়িয়েছে। 

চীন থেকে ঋণ নিয়ে অনেক আগে থেকেই ফাঁদে পড়েছে শ্রীলংকা। এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত হিসেব উল্লেখ করা যায় হাম্বানটোটা বন্দরের নাম। এ প্রকল্পটি মাহিন্দা রাজাপাকসের শাসনামলে নেওয়া হয়েছিল। ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত লংকা অধিপতি ছিলেন মাহিন্দা রাজাপাকসে। গোতাবায়া রাজাপাকসের ভাই। চীনা অর্থায়নে বাস্তবায়িত হাম্বানটোটা বন্দরটি উদ্বোধন করা হয় ২০১০ সালে মাহিন্দা রাজাপাকসের জন্মদিনে। কিন্তু শ্রীলংকা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বন্দরটি চলে যায় চীনের হাতে। ৯৯ বছরের জন্য হাম্বানটোটা বন্দর ইজারা নিয়েছে চীন। 

এক সময়ের সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশটি কীভাবে এত ভুল করেছিল, প্রশ্ন ওঠে স্বাভাবিকভাবেই। ছোট করে এর উত্তর দিলে বলতে হয়, আজকের অর্থনৈতিক সংকটের বীজ অনেক আগে বপন করেছিল রাজনীতি। প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের নিবন্ধে কৌশিক বসু জানিয়েছেন, রাজাপাকসের নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৯ সালে লিবারেশন টাইগারস অব তামিল ইলমকে পরাজিত করে এবং শ্রীলংকায় কয়েক দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধের অবসানের পর ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। এটি দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে, সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করেছে এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগগুলো সরিয়ে দিয়েছে। কর্তৃত্ববাদ সাধারণত একটি অর্থনীতিকে ধ্বংস করলেও কিছু স্বৈরাচারী সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঠিক রাখতে এবং স্থিতিশীলতা প্রদানে সক্ষম হয়েছে। কিছু সময়ের জন্য রাজাপাকসে সরকার এই শ্রেণিতে পড়তে পারে বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু যেহেতু এটি পপুলিজমকে বেছে নিয়েছিল, তাই ‘ক্রনি ক্যাপিটালিজম’ই ছিল শ্রীলংকার ভাগ্য। ব্যবসায়িক নেতা এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা, পারস্পরিক সুবিধাজনক সম্পর্ক দ্বারা চিহ্নিত একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নাম ক্রনি ক্যাপিটালিজম।

২০১৯ সালে যখন আবার রাজাপাকসের সামনে ভুল শুধরে নেওয়ার সময় আসে ঠিক তখনই কর কর্তনের ঘোাষণা দিয়ে কঠোর সমালোচনার সম্মুখীন হন। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় সাবেক অর্থমন্ত্রী মঙ্গলা সামারাউরার একটি টুইটকে। টুইটে তিনি সতর্কবার্তা দেন। বলেন, গোতাবায়ার কর পরিকল্পনা শ্রীলংকাকে এক্সপ্রেস ট্রেনের গতিতে দেউলিয়া করতে চায়। কিন্তু রাজাপাকসে তার গতিতেই নিচে নামতে থাকেন।

এই সংকটের শেষ কোথায়, তা অস্পষ্ট। এখনো অনেক ঝুঁকি রয়েছে। আলোচনার জন্য একটি কার্যকর সরকার না হওয়া পর্যন্ত আইএমএফ একটি পুনরুদ্ধার কর্মসূচি দিতে পারে না। তবে সার্বভৌম ঋণদাতাদের তহবিল এবং প্যারিস ক্লাব উভয়কেই সংকটের এই তীব্র পর্যায়ে শ্রীলংকাকে সাহায্য করার জন্য কিছু আমলাতান্ত্রিক নিয়ম স্থগিত করে সক্রিয় হতে হবে। এটি ব্যর্থ হলে, একটি মানবিক বিপর্যয়ই হবে এর সম্ভাব্য পরিণতি।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //