ICT Division

ব্রিটেনের অর্থনীতিতে ধস কি আসন্ন

ব্রিটেনের অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিকসের এক হিসাবে বলা হচ্ছে, ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাসের মাঝে দেশটির অর্থনীতি শূন্য দশমিক ১ শতাংশ সঙ্কুচিত হয়েছে। অথচ এ বছরের প্রথম তিন মাসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে বিবিসি বলছে, সামনের দিনগুলোতে অর্থনীতিতে ধস নামার আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে করোনার প্রণোদনা শেষ হয়ে যাওবার সঙ্গে সঙ্গে খুচরা বাজারে ক্রেতার চাহিদা কমে যাওয়াকে দায়ী করা হয়েছে। 

ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ২০২২ সাল শেষ হওয়ার আগেই ব্রিটেনের অর্থনীতি মন্দার মাঝে পড়তে যাচ্ছে। টানা ছয় মাস অর্থনীতির নিম্নগতিকেই অর্থনৈতিক মন্দা হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। ব্রিটেনের বার ও রেস্তোরাঁর মালিকরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাদের এখনই মন্দার অনুভূতি হচ্ছে। মানুষ বাড়ি থেকে কম বের হচ্ছে; জীবনযাত্রার খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। এছাড়াও পোলট্রি থেকে শুরু করে ভোজ্যতেল, সবকিছুরই মূল্য বেড়ে গেছে। উল্টোদিকে ক্রেতারা খরচ কমাতে চাইছে। এমতাবস্থায় ব্যবসাগুলো এখন কোনোমতে বেঁচে থাকার চেষ্টা চালাচ্ছে। 

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ব্রিটেনে জ্বালানির মূল্য এতটাই বেড়েছে যে, নাগরিকেরা তাদের খরচের হিসাব রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। তাদের জ্বালানির মিটারের ব্যালান্স দেখতে দেখতেই শূন্যের কোঠায় চলে যাচ্ছে। রান্না করার মাঝেই কারো কারো জ্বালানি চলে যাচ্ছে। আর যারা রাষ্ট্রীয় সহায়তা নিয়ে বেঁচে আছে, তাদের হাতে এখন বিদ্যুতের বিল পরিশোধের পর বাড়িভাড়া দেওয়ার অর্থও থাকছে না। ২৬ আগস্ট ব্রিটেনের জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা জানিয়েছে, নাগরিকদের বার্ষিক জ্বালানি খরচ ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে। অথচ গত এপ্রিল মাসেই জ্বালানি খরচ বেড়েছে ৫৪ শতাংশ! এর ফলে গড়পড়তা একেকটা বাড়ির জ্বালানি খরচ ২ হাজার ৩০০ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৪ হাজার ২০০ ডলার হতে চলেছে।

সর্বশেষ এই মূল্যবৃদ্ধি অক্টোবরের প্রথম দিন থেকে কার্যকর হতে চলেছে। আর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে এই খরচ আরও বেড়ে ৪ হাজার ৭০০ ডলার অতিক্রম করবে। ‘জি-৭’ বা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ৭টা দেশের মাঝে ব্রিটেনের মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি। আর ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয় করে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে কয়েক মাস ধরেই দেশজুড়ে রেলশ্রমিক, ডাক বিভাগের শ্রমিক, বন্দরের শ্রমিক, আইনজীবী, এমনকি পরিচ্ছন্ন কর্মীরাও ধর্মঘটে নেমেছে। জুলাই মাসে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্রিটেনের মূল্যস্ফীতি গিয়ে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ১ শতাংশে; যা কিনা ৪০ বছরের মাঝে সর্বোচ্চ!  

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্স এবং সিবিআইয়ের যৌথ এক গবেষণায় বলা হচ্ছে, জুলাই থেকে আগস্ট মাসের মাঝে ব্রিটেনের ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর যতটা দ্রুত উৎপাদন হারিয়েছে, তা ২০০৯ সালের পর থেকে দেখা যায়নি। এসঅ্যান্ডপির অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ২০২০ সালের মে মাসে করোনার লকডাউনের পর থেকে উৎপাদন সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। আগস্ট মাসে ব্রিটেনের বেসরকারি খাত অর্থনৈতিক স্থবিরতার আরও কাছাকাছি গেছে। তবে সেবা খাত সামান্য ভালো করায় পুরো অর্থনীতি এখনো ধসে যায়নি। সিবিআইয়ের অর্থনীতিবিদ আলপেশ পালেহা বলেছেন, কারখানাগুলো যখন কাঁচামালের উচ্চমূল্য ও সরবরাহ পেতে দেরি হওয়ার মতো সমস্যার মাঝে রয়েছে, তখন অর্থনৈতিক মন্দা হাজির হয়েছে। কাজেই বছরের বাকি মাসগুলোতে উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক হবে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি এখন ব্যাংকের উচ্চ সুদের মাঝেও পড়তে হচ্ছে কারখানাগুলোকে। সুদের হার বর্তমানে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালের বসন্তে ৪ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস দিচ্ছে কেউ কেউ। 

ব্রিটিশ এনজিও ক্রিশ্চিয়ান্স এগেইনস্ট পভার্টির জন টেলর বলেন, যে মানুষগুলো কখনোই ঋণদায়গ্রস্ত ছিল না, এখন তারা ঋণের মাঝে পড়ে যাচ্ছে। তাদের অনেকেই জানে না যে কৗভাবে তারা তাদের পরবর্তী বিল পরিশোধ করবে, অথবা কীভাবে তারা বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য ক্রয় করতে পারবে। জোসেফ রাউনট্র্রি ফাউন্ডেশনের গত মে মাসের গবেষণায় বলা হয়েছে, ১০ লাখ ব্রিটিশ পরিবার জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে নতুন করে অতিরিক্ত ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। ফাউন্ডেশনের প্রধান অর্থনীতিবিদ রেবেকা ম্যাকডোনাল্ড বলেন, এরকম দারিদ্র্য পরিস্থিতি তারা গত কয়েক দশকে দেখেননি। ব্রিটিশ সরকার বলছে, তারা আসছে শীতে সব পরিবারকে ৪৭০ ডলার করে দেবে। কিন্তু অনেকেই বলছেন, এর পরিমাণ দ্বিগুণ হওয়া উচিত। 

দৈনিক টেলিগ্রাফ বলছে, কয়েক শতকের জনসংখ্যা বৃদ্ধির পর এখন জন্মহার কমে যাওয়ায় ব্রিটেনের অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে করদাতার সংখ্যাও কমতে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন সমস্যা। 

জ্বালানি কোম্পানি ইডিএফের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ফিলিপ কোমারেট বিবিসিকে বলেছেন, ব্রিটিশ সরকার যদি জনগণকে জ্বালানি খরচের জন্য আরও সহায়তা না দেয়, তাহলে ব্রিটেনের অর্ধেক মানুষ শীতকালে ‘জ্বালানি দারিদ্র্যে’র মাঝে পড়বে। এর অর্থ হলো, জ্বালানির খরচ পরিবারের ব্যয়ের ১০ শতাংশের বেশি হয়ে যাবে। নতুন হিসাব বলছে, লকডাউনের কারণে ২০২০ সালে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে ৩০০ বছরের মাঝে সবচাইতে বড় ধস নেমেছিল। এখন ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ৪০ বছরের মাঝে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের পদত্যাগের পর পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব অনেক কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

‘গ্লোবাল ব্রিটেন’ নামের ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে ব্রিটেন যেভাবে ব্রেক্সিটের দিকে এগিয়েছে, করোনার দুর্যোগের পর বৈশ্বিক জ্বালানি সমস্যার কারণে সেই চিন্তাগুলো খুব দ্রুতই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে নিতে বিপুল সামরিক সহায়তা দিচ্ছে ব্রিটেন। তবে আসন্ন অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ২০২৩ সালে আফ্রিকায় আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্য ও ইন্দোপ্যাসিফিকে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, উত্তর ও পূর্ব ইউরোপের নিরাপত্তায় নেতৃত্ব দেওয়ার মতো ‘গ্লোবাল ব্রিটেন’-এর ভূরাজনৈতিক চিন্তা বাস্তবায়নের উপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সেটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। 

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //