পুতিনের রুশ আধিপত্যের নতুন বিশ্বব্যবস্থা

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর রাশিয়া ও রুশভাষীরা যে দুরবস্থার মধ্যে পড়েছিলেন, সেটাই দেশটির প্রেসিডেন্টভ্লাদিমির পুতিনের রাজনীতির মূল ভিত্তি। তাই নিজের সুদৃঢ় অবস্থান কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় নীতির প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুতিন সেই রাজনীতির প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। 

প্রসঙ্গত সোভিয়েতের ভাঙনে ২ কোটি ৫০ লাখ রুশভাষী রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। তাদের ব্যাপারে সব সময় সরব পুতিন। তার মতে, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে এই লোকজন ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের এই পতনকে ‘ভূরাজনৈতিক বিপর্যয়’ বলে মন্তব্য করেন। ওই রুশভাষীদের রক্ষা করার কথা বলে তিনি ইতোমধ্যে আশপাশের কয়েকটি দেশে সামরিক অভিযান চালিয়েছেন। এবার পুতিন রুশ আধিপত্যকে সামনে রেখে নতুন পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করেছেন। যেখানে কার্যত এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার ছবিই উঠে এসেছে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর নতুন পররাষ্ট্রনীতির অনুমোদন দেন রুশ প্রেসিডেন্ট। ওই পররাষ্ট্রনীতিতে চীন ও ভারতকে কাছে টানার পাশাপাশি স্লাভিক দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গেও রাশিয়ার সম্পর্ক জোরদারের কথা বলা হয়েছে। সমালোচকদের মতে, পুতিন এই পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পশ্চিমা আধিপত্যের বদলে নতুন এক ‘রুশ আধিপত্যের’ বিশ্ব গড়তে চান। ইউক্রেনে সামরিক অভিযানের ছয় মাস পরে ঘোষিত ৩১ পৃষ্ঠার ওই পররাষ্ট্রনীতিকে ‘মানবিক নীতি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনকে নাৎসিমুক্ত ও দেশটির রুশভাষী লোকজনকে রক্ষার কথা বলেই সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। এর মাধ্যমে মূলত ইউক্রেন ও জর্জিয়ায় নিজেদের সামরিক অভিযানকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কারণ রুশভাষীদের রক্ষা করার কথাই অভিযানের পক্ষে প্রচারণায় বারবার বলা হয়েছে।

রাশিয়ার পক্ষ থেকে তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে মানবিক কৌশলের কথা বলা হলেও এতে মূলত রুশ রাজনীতি ও ধর্মীয় সরকারি নীতির ধারণাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু কট্টরপন্থী বিষয় যুক্ত হয়েছে, যাতে ইউক্রেনের কিছু অংশে মস্কোর দখলকে বৈধতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া বিচ্ছিন্ন রুশপন্থিদের প্রতি সমর্থনের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে।

নতুন পররাষ্ট্রনীতিতে বলা হয়েছে, রাশিয়া স্লাভিক দেশগুলোর সঙ্গে যেমন সহযোগিতা বাড়াবে, তেমনি চীন-ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে তৎপর থাকবে। মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করা হবে। এছাড়া ২০০৮ সালে জর্জিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের পর মস্কোর পক্ষ থেকে স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেওয়া আবখাজিয়া ও ওসেটিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা হবে। একইভাবে ইউক্রেনে দোনেৎস্ক পিপলস রিপাবলিক ও লুহানস্ক পিপলস রিপাবলিকের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করার কথাও বলা হয়েছে।

এদিকে রাশিয়ার উপর প্রায় ১১ হাজার ছোট-বড় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে পশ্চিমা দেশগুলো। ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে অভিহিত করা হয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও রাশিয়ার অর্থনীতি অতটা দুর্বল হয়নি। যে কারণে গত ৭ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার ভ্লাদিভস্টকে ইস্টার্ন ইকোনমিক ফোরামে দেওয়া দীর্ঘ ভাষণে পুতিন নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ার প্রত্যয় জানিয়ে বলেন, ‘পশ্চিমারা নগ্নভাবে সবাইকে তাদের কথামতো চলতে বলছে, আর সবাইকে সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে তাদের কাছে নতজানু হতে বলছে। তারা পুরনো বিশ্বব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চায়, কারণ এটি কেবল তাদের জন্য সুবিধাজনক। এই নীতি তারা বহুদিন ধরে অনুসরণ করছে।’ ভাষণে পুতিন দাবি করেছেন, ‘এসব নিষেধাজ্ঞা করোনা ভাইরাস মহামারিকে ছাপিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রধান হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। আমি পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার বাতিকের কথা বলছি। পশ্চিমারা তাদের মত বিশ্বের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাদের ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র এখন এশিয়ায়। বিশ্বের গতিশীল, প্রতিশ্রুতিশীল অর্থনীতির দেশ ও অঞ্চল মূলত এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল।’

এশিয়ায় মূলত বিশ্বের সবচেয়ে বড় পণ্যের বাজার বা সবচেয়ে বেশি ভোক্তা হলো চীন ও ভারতে। অর্থনৈতিকভাবে চীনের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের পরই। সেই সঙ্গে সামরিক ও আঞ্চলিক আধিপত্যের ক্ষেত্রেও চীন খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। অপরদিকে ভারতের অর্থনীতি খুব বেশি শক্তিশালী না হলেও এটি এক বিশাল বাজার। তাই জনবহুল এ দেশ দুটিকে পাশে চান পুতিন। এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে রাশিয়া। পর্যটক আকর্ষণ থেকে বাণিজ্য বাড়ানো পর্যন্ত ক্ষেত্রগুলোয় রাশিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়াচ্ছে ওই দেশগুলো। এর মাধ্যমে ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমার মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা এবং কোভিডের বিপর্যয় কাটিয়ে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা নিয়ে পশ্চিমাদের হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়িয়ে দিয়েছে ভারত। দেশটি মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করে। তবে রুশ জ্বালানির দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় দেশটি রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছে। জ্বালানি তেলের পাশাপাশি রাশিয়া থেকে কয়লা আমদানিও বাড়িয়েছে ভারত। পাশাপাশি আরও বেশকিছু বিষয়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়াতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন দেশ দুটির কর্মকর্তারা। 

এদিকে থাইল্যান্ড জানিয়েছে, রুশ পতাকাবাহী এয়ারলাইনস অ্যারোফ্লট অক্টোবরের শেষে মস্কো ও ফুকেটের মধ্যে পুনরায় নিয়মিত পরিষেবা চালু করবে। রুশ পর্যটকদের কাছে ফুকেট জনপ্রিয় একটি গন্তব্য। তবে ইউক্রেনে রুশ আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সংগতি রেখে রুটটি স্থগিত করা হয়েছিল। জিরো কোভিড নীতির আওতায় কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকায় থাইল্যান্ডে চীনা পর্যটকের সংখ্যা কমে গিয়েছে। এজন্য গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে সবচেয়ে বিদেশি পর্যটক এসেছিল রাশিয়া থেকে। গত মে মাসে দেশ দুটি এক বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণেও সম্মত হয়েছে। এর মাধ্যমে ২০২৩ সালে এক হাজার কোটি ডলার বাণিজ্যের লক্ষ্য থাই ও রুশ কর্তৃপক্ষের। থাইল্যান্ড গাড়ি ও খাদ্য রপ্তানি করে রাশিয়ায় এবং রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও সার আমদানি করে। 

গত ১৮ আগস্ট গম রপ্তানি সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা করেছে ভিয়েতনাম ও রাশিয়া। রুটি ও নুডলস তৈরিতে ভিয়েতনামে শস্যটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। হ্যানয় সম্ভবত রাশিয়া থেকে আমদানি বাড়িয়ে দেশে দাম কমানোর চেষ্টা করছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভিয়েতনামের পক্ষে ছিল এবং মস্কো ও হ্যানয় আজও সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। গত জুলাইয়ে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ভিয়েতনাম সফর করেন। অপরদিকে মিয়ানমারকেও সঙ্গে নিয়েছেন পুতিন। পুতিনকে ‘বিশ্বনেতা’ বলে উল্লেখ করেছেন মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং। ভ্লাদিভোস্তকে ইস্টার্ন ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনের ফাঁকে মিয়ানমারের জান্তার সঙ্গে পুতিনের বৈঠক হয়। 

ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের শুরুর পর প্রথমবার বৈঠকে বসছেন  পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর উজবেকিস্তানের সমরখন্দে অনুষ্ঠিতব্য সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনের সাইড লাইনে দুই নেতার সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে। তার আগে পুতিন বলেছেন, ‘রুশ তেল কিনতে গ্যাজপ্রমকে চীনা মুদ্রায় মূল্য পরিশোধ করতে পারবে চীন। এ ক্ষেত্রে অর্ধেক রুশ মুদ্রা রুবল ও বাকি অর্ধেক চীনের মুদ্রায় ইউয়ানে পরিশোধ হবে।’ সাংহাই সহযোগিতা সংস্থাটি চীন, ভারত, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, রাশিয়া, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তান নিয়ে গঠিত। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, পরাশক্তির দুই নেতার বৈঠক চীন-রাশিয়ার সম্পর্ক আরও জোরদারের সংকেত দেবে। হংকংয়ের নাটিক্সিসের প্রধান এশিয়া প্যাসিফিক অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া হেরেরো বলেন, ‘এশিয়ার সম্ভাব্য নতুন জ্বালানি পাইপলাইনসহ যৌথ অর্থনৈতিক প্রকল্পের ঘোষণা আসতে পারে বৈঠক থেকে।’ এর ফলে ইউরোপের বদলে রুশ জ্বালানি এশিয়ায় যাবে। আর এই বাণিজ্যকে স্থিতিশীল ও দীর্ঘস্থায়ী করতে যে কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি দরকার, সে পথেই এগোচ্ছে রাশিয়া। আর এটি পুতিনের রুশ আধিপত্যের নতুন বিশ্ব গঠনেরই অংশ।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //