মন্দার পথে ভারত: বাড়ছে বেকারত্ব

জাতীয়-আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচনা চলছে। বিশ্বের অন্যতম দ্রুতগতির অর্থনীতি বলে ভারতকে চিহ্নিত করা হয়; কিন্তু সেই গতি এখন আর আগের অবস্থায় নেই। ভারতে বেকারত্বের হার ক্রমশ বাড়ছে। ডিসেম্বরে তা ছিল প্রায় ৯ শতাংশ।

অথচ ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তা ছিল ৮ শতাংশ। একদিকে চড়া মুদ্রাস্ফীতি ও ক্রমবর্ধমান সুদের হার; তার মধ্যেই বেকারত্ব দেড় বছরের মধ্যে শীর্ষে পৌঁছেছে। সব মিলিয়ে অস্থিরতা আরও প্রবল হয়েছে ভারতের অর্থনীতিতে। মন্দা ঘরে কড়া নাড়ছে। 

ডিসেম্বরের শুরু থেকেই ভারতে বেকারত্বের হার উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে অর্থনৈতিক মহলে। প্রথম সপ্তাহে তা ছিল ৮ শতাংশ। ২০২০ সালে করোনা সংক্রমণের কারণে ভারতজুড়ে লকডাউনের পর থেকে বেশিরভাগ সময়েই বেকারত্বের হার ৬ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে ছিল। শুধু ২০২১ সালের মে ও জুন মাসে তা সেই মাত্রা ছাপিয়ে যায়। তখন বেকারত্বের হার ছিল যথাক্রমে হয় ১১.৮ ও ৯.২ শতাংশ। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি (সিএমআইই) এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের বেকারত্বের হার ১ ডিসেম্বর ছিল ৮.১৫ শতাংশ, সেখানে ২০ ডিসেম্বর তা বেড়ে হয়েছে ৯ শতাংশ। ১৭ ডিসেম্বরে তা সর্বোচ্চ ৯.৩১ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২০ সালের এপ্রিলে দেশজুড়ে বেকারত্বের হার আকাশছোঁয়া ছিল। সেই হার ছিল ২৩.৫২ শতাংশ। তখন দেশজুড়ে লকডাউন ছিল। 

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের বক্তব্য, লকডাউন ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এতটাই পরিবর্তন এনেছে অর্থনীতিতে যে তা শুধু বেকারত্বের হার দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যেখানে এক পেশার মানুষ চাকরি হারিয়ে অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছেন। তাতে তিনি বেকার থাকলেন না ঠিকই, কিন্তু অন্য পেশায় গিয়ে তার দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ থাকল না। আবার যত সংখ্যক মানুষ কাজে যোগ দিচ্ছেন, সেই অনুযায়ী কর্মসংস্থানের ধারাবাহিক সুযোগ থাকছে না।

এদিকে ভারতের এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অরগানাইজেশন (ইপিএফও) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের হার কমে গেছে। যা স্পষ্টতই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হারকে শ্লথ করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অক্টোবরে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের অধীনে আসা নতুন গ্রাহকদের সংখ্যা ছিল ৭ লাখ ৩০ হাজার। সেপ্টেম্বরে যেখানে তা ছিল ৯ লাখ ৮০ হাজার। জুলাই মাসে এই সংখ্যা শীর্ষে পৌঁছেছিল। তা হয়েছিল ১১ লাখ ৫০ হাজার।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা গোল্ডম্যান স্যাক্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালে ভারতের জিডিপির হার কমতে পারে। ফলে অর্থৈনতিক বৃদ্ধিও শ্লথ হয়ে পড়বে। চলতি আর্থিক বছরে যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ৬.৯ শতাংশ, তা ২০২৩ সালে ৫.৯ শতাংশ হতে পারে। বর্তমান বাণিজ্যিক পরিসংখ্যানেও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার কমার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। যা মন্দার আশঙ্কাকে আরও পোক্ত করেছে। ভারতের রপ্তানির হার অক্টোবরে কম হয়েছে। এখন রপ্তানির হার কম হওয়ার অর্থ হলো তার প্রভাব অর্থনৈতিক বৃদ্ধির উপরে পড়া। বাস্তবে করোনা সংক্রমণের পরবর্তী সময়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত গত অক্টোবরেই রপ্তানির হার হ্রাস পেয়েছে।

তবে গোল্ডম্যান স্যাক্সের অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু টিল্টন‌ একটি লিখিত নোটে ভারতীয় জিডিপি সম্পর্কে জানিয়েছেন, ২০২৩ সালে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দুটি পর্ব দেখা যেতে পারে। প্রথম পর্বে করোনা সংক্রমণের পরবর্তী সময়ে যে জোয়ার এসেছে অর্থনীতিতে, তাতে কিছুটা ভাটা পড়তে পারে এবং আর্থিক কড়াকড়ির জেরে বৃদ্ধির গতি শ্লথ হতে পারে। দ্বিতীয় পর্বে আবার চাহিদা বাড়তে পারে, বৈশ্বিক ইতিবাচক প্রবণতা অনুসরণ করে বিনিয়োগে ফের জোয়ার আসতে পারে। প্রসঙ্গত, ২০২১-২২ অর্থবছরে ভারতের জিডিপি ৮.৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

চলতি বছরে মুদ্রাস্ফীতি রয়েছে ৬.৮ শতাংশ। ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের প্রত্যাশিত মুদ্রাস্ফীতির হারের তুলনায় এটি অনেক বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহনশীল মুদ্রাস্ফীতির হার ৬ শতাংশ। গত ১০ মাস ধরেই মুদ্রাস্ফীতির এই হার রয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসেও তা থাকবে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। 

করোনা সংক্রমণের পরবর্তী সময়ে চড়া মুদ্রাস্ফীতির কারণে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ-সহ বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার চড়া করেছে। বাদ যায়নি ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকও। এখন সুদের চড়া হারের ফলে স্বাভাবিকভাবেই তা বৃদ্ধির হার কমিয়েছে। ফলে পরিবার থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছে ঋণের খরচ। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের এ পরিস্থিতিতে ব্যয়ে লাগাম টানছেন ভোক্তারা। এ অবস্থায় সংকটের মুখে পড়েছে ভারতের টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্প। 

শিল্প কর্মকর্তারা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট উচ্চমূল্যস্ফীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য বড় বাজারের ভোক্তারা পোশাক কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন। এতে ২০ হাজার কোটি ডলার মূল্যের ভারতের টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্পটি কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে।

যদিও সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি এখনো শক্তিশালী, তবে টেক্সটাইল খাতটিতে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে পড়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে যাচ্ছে এ শিল্পের ক্রয়াদেশ। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে চলতি বছরও এ খাতের নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।

ভারতের মোট রপ্তানি আয়ে প্রায় ২২ শতাংশ অবদান রাখে টেক্সটাইল। খাতটির রপ্তানি টানা সাত মাস ধরে সংকুচিত হচ্ছে। নভেম্বরে এ শিল্পের রপ্তানি এক বছর আগের তুলনায় ১৫ শতাংশেরও বেশি কমে ৩১০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। উচ্চমূল্য এবং আমদানি করা সস্তা পোশাকের কারণে অর্থনীতিতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি সত্তে¡ও দেশীয় পণ্যের বিক্রি মন্থর হয়ে পড়ছে। এতে খাতটির কর্মীরা চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। ভারতের এ শিল্পে সাড়ে চার কোটিরও বেশি মানুষ কর্মরত আছেন।

এমনিতেই দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রতিবছর চাকরির বাজারে প্রবেশ করা লাখ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান তৈরিতে হিমশিম খাচ্ছেন। এর মধ্যে টেক্সটাইল শিল্পের মন্দা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ধারা কমিয়ে দিতে পারে। কর্মী ছাঁটাই হলে তা বেকারত্বের হার আরও বাড়াবে।

ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাকেঞ্জির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনা বিপর্যয় কাটিয়ে টানা ১৮ মাস শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পর ২০২২ সালের মাঝামাঝিতে উচ্চমূল্যস্ফীতি ও হতাশাগ্রস্ত ভোক্তা মনোভাব বিশ্বজুড়ে পোশাকের খুচরা বিক্রিকে নিম্নমুখী করেছে। পাশাপাশি চলতি বছরও পোশাক খাতের সম্ভাবনা অন্ধকারে থেকে গেছে।

উৎপাদন খাত ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ১৬ শতাংশ অবদান রাখে। কাঁচামালের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং দুর্বল চাহিদার কারণে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে তুলার উচ্চ দাম এবং অন্যান্য ব্যয় টেক্সটাইল খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার মার্জিনে আঘাত করেছে। যেখানে আগামী গ্রীষ্মের জন্য বিদেশি ক্রয়াদেশ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল রয়েছে।

এদিকে তুলার আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ দামে ভারসাম্যহীনতার কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন টেক্সটাইল শিল্পের উৎপাদকরা। স্থানীয় তুলার দাম বৈশ্বিক বেঞ্চমার্কের তুলনায় অন্তত ১০ শতাংশ বেশি। এ অবস্থায় স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলোর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে সরকারকে তুলার ওপর ১১ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করতে হবে। এতে মিলগুলো দেশের বাইরে থেকে তুলা আমদানির মতো বিকল্প পাবে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার দাম স্থানীয় সরবরাহকারীদের তুলনায় প্রতি পাউন্ডে প্রায় ১০ সেন্ট কম।

অ্যাপারেল এক্সপোর্ট প্রমোশন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নরেন গোয়েঙ্কা বলেন, ‘আমরা অন্তত আগামী ছয় মাসের জন্য কঠিন পরিস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রধান বাজারগুলো থেকে ক্রয়াদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে।

মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক প্রতিবন্ধকতাগুলো অভ্যন্তরীণ বিক্রিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’ সংকটময় এ পরিস্থিতিতে অনেক টেক্সটাইল প্রস্তুতকারক নতুন করে কর্মী নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে। পাশাপাশি সরকার এ খাতে প্রণোদনা না দিলে কর্মী ছাঁটাইয়ের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। 

বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদন মহামারির আগে নির্ণয় করা মাত্রার থেকে প্রায় ৬ শতাংশের নিচে থাকবে। আরও ধারণা করা হচ্ছে, আয় বৃদ্ধিও হবে ধীরগতির, যা ধনী দেশগুলোর সঙ্গে অন্যদের ব্যবধান হ্রাসের বড় ধরনের অন্তরায়।

তবে ভারতে সংকটের এ সময়ে আগামী বাজেটের দিকে নজর রয়েছে ব্যবসা ও উৎপাদন খাত সংশ্লিষ্টদের। আর এটি ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, তা বলাই বাহুল্য।

আর সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের ঋণই তাদের একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়াবে, আর সেটি পেতে কাটছাঁট করতে হবে বিভিন্ন নাগরিক সেবা। এতে সামাজিক সুরক্ষা খাত আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2023 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //