মুসলিম-বিদ্বেষে পশ্চিমবঙ্গে মোদির ভোটপ্রচার

ভারতের যে কোনো বিষয়ে কথা বলতে গেলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি নেতারা মুসলিমদের দোষারোপ করেন। নির্বাচন এগিয়ে এলে এই দোষারোপ বেড়ে যায়। তারা দেখাতে চান হিন্দু সম্প্রদায় ঝুঁকিতে আছে; আর এর কারণ মুসলিমরা। পশ্চিমবঙ্গে ভোটপ্রচারে এসে মোদি দাঙ্গাবাজদের উৎসাহ দিয়ে মুসলিমদের লক্ষ্য করে বলেন, ‘রামনবমীর শোভাযাত্রা অনুমতি পায় না। কোর্টে যেতে হয়। কিন্তু... শোভাযাত্রায় পাথর ছোড়ার অনুমোদন তৃণমূল সরকার দিয়ে রেখেছে।’ এমন মিথ্যা, সাম্প্রদায়িক প্ররোচনাই মোদি ভক্তদের কাছে ‘অমৃতবচন’।

সন্দেশখালি গণবিক্ষোভে সাম্প্রদায়িক প্রলেপ দিয়ে ভোটপ্রচার শুরু করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। প্রথম দফার প্রচারণা শেষও করেছেন এই সাম্প্রদায়িক সুরে। ২০১৭ সাল থেকে ভারতের অন্যান্য জায়গার মতো পশ্চিমবঙ্গেও রামনবমী ও হনুমান জয়ন্তী উদযাপন ঘিরে মুসলিম-বিদ্বেষ প্রচার করা হয়। এটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে নির্যাতনেরই নামান্তর। বিজেপি, বজরঙ দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) মদদে গজিয়ে ওঠা হরেক রকমের দাঙ্গাবাজের দল এই দিনটিকে বেছে নেয় লাগামছাড়া বিদ্বেষ এবং অস্ত্র হাতে মুসলিম মহল্লায় ঢুকে দাঙ্গার চরম প্ররোচনা দেওয়ার জন্য। ঘৃণ্যভাষায় চূড়ান্ত বিদ্বেষমূলক গান বাজিয়ে দাঙ্গা বাধানোর জন্য রয়েছে তাদের ডিজে। মুসলিম মহল্লায় মসজিদের পাশে তারস্বরে বাজতে থাকে এসব। ন্যূনতম প্রতিবাদ, পুলিশি ঘেরাটোপে লাঠিসোটা, তরবারি, আগ্নেয়াস্ত্রের আস্ফালন, বা আক্রমণের বিরুদ্ধে ন্যূনতম প্রতিরোধ হলে সর্বশক্তি নিয়ে নামবে রাষ্ট্র। সরকারের নির্দেশে সশস্ত্র বাহিনী বুলডোজার নিয়ে ধেয়ে আসবে মহল্লায় মহল্লায়। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে মুসলিম জনপদ, তাদের মাথা গোঁজার শেষ ঠাঁই, আয়-রোজগারের একমাত্র সম্বল। আর গণহারে গ্রেপ্তার করা হবে মুসলিম যুবকদের। এই উন্মত্ত মিছিলকে সংযত করতে, দাঙ্গার আশঙ্কাকে যতদূর সম্ভব প্রতিরোধ করতে আইন-আদালতের দ্বারস্থ হলে নির্বাচনী সভা থেকে ভেসে আসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কটাক্ষ। তার রাজত্বে গুজরাটে মুসলিম গণহত্যার মধ্য দিয়েই বিদ্বেষের নতুন মডেল সামনে আসে।

তবে পশ্চিমবঙ্গে আত্রেয়ী নদীর ধারে রঘুনাথপুরে বহুকাল ধরেই রামনবমী মেলার আয়োজন হয়। তবে রঘুনাথের মেলার বিরুদ্ধে কেউ কোনো আইনি নোটিশ দেয়নি। জাতপাত, ধর্মের হিসাব কষতে বসেননি কেউ। এমন রামনবমী কলকাতা শহরেও পালিত হয়ে আসছে বহুকাল ধরে। উত্তর কলকাতার রামমন্দির, কিংবা হাওড়ার রামরাজাতলার রামমন্দিরে পূজা, অর্চনা ঘিরে কখনো দাঙ্গা বাধেনি। ২০১৭ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ দেখছে রামের নামে, রামনবমীর নামে এক বিজাতীয়, বিকৃত, সশস্ত্র, হিংস্র, মুসলিম-বিদ্বেষী অভিযান। এই হিংস্রযাত্রা থেকে বারবার পশ্চিমবঙ্গে সহিংসতা হয়। আর এতে ভোট বাড়ে দাঙ্গাবাজদের। এটাই তাদের আসল উদ্দেশ্য। তবে রাজ্য সরকার যদি দৃঢ়চেতা হতো; আইন, সংবিধানের প্রতি যদি সরকারের আস্থা অবিচল থাকত; সর্বোপরি বিশ্বাস থাকত বাঙালি সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক চেতনার উপর; তাহলে ধর্মের নামে এই সহিংস অভিযান তারা রুখে দিতে পারত। সে পথে না হেঁটে তাদের মোকাবিলা করতে গিয়ে প্রচ্ছন্নে দাঙ্গাবাজদেরই লেজুড়বৃত্তি করে বসে রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস। ভোট হারানোর ভয়ে, বিশেষ করে অবাঙালি এলাকায় ও শিল্পাঞ্চলে এই ভণ্ডামিতে তারাও অংশ নেয় এবং এর আয়োজক হয়ে ওঠে।

ভারতের ১৪০ বা ১৫ শতাংশ মুসলমানকে দেশ থেকে বের করা সম্ভব নয়; কিন্তু তাদের আতঙ্কের মধ্যে রেখে, ভয় দেখিয়ে হিন্দুদের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চায় বিজেপি। চলছে হিন্দু ভোটের মেরুকরণ। তাদের ফরমুলা খুব সোজা, ৭৪ শতাংশ হিন্দু ভোটের ৭৫ বা ৮০ শতাংশ ঝুলিতে নিতে চায়, ধর্মের ভিত্তিতে সেই মানুষেরা বিজেপিকে সমর্থন করলে ক্ষমতার পাকাপাকি দখল নেবে বিজেপি, তারা হিন্দু রাষ্ট্রের পথে এগোবে, এটাই পরিকল্পনা। হিটলারের কথা মনে পড়বেই। জার্মানিতে সে সময়কার ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের ৮০ শতাংশের সমর্থনে তিনি দেশের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছেন নাস্তিক, কমিউনিস্ট আর ইহুদিদের। তাদের খুন করা হয়। সাধারণ জার্মান নাগরিকদের অনেকেই তখন একে সমর্থন দিয়েছেন। পরে যে কোনো ভিন্নমতই এভাবে দমন করেছেন। 

প্রসঙ্গত, ‘হিন্দু’ ভোট বলে যা চিহ্নিত করা হয়, সেখানে শাক্ত আছে, শৈব আছে, আবার বৈষ্ণবও আছে। আরও আছে প্রকৃতি পূজারি, আদিবাসী, শিখ, নাস্তিক, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের মানুষ। কাজেই এই পুরো জনসংখ্যাকে এক ব্রাকেটে ফেলে ‘হিন্দু’ বলে দিলেও তা সঠিক নয়। অর্থাৎ মোট ভোটের ৩৬-৩৭ শতাংশই যথেষ্ট নিরঙ্কুশ সমর্থনের জন্য। সেটাও যখন নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, তখন জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রীকেই বিষ ছড়ানোর কাজে নেমে পড়তে হয়। তিনি মঞ্চ থেকেই লুঙ্গি-টুপি দেখেই মুসলমান চিহ্নিত করতে পারেন, দাঙ্গার ইন্ধন দিতে পারেন। এতে কোনো নির্বাচনী নীতিমালা লঙ্ঘন হয় না। আর এ থেকে বোঝা যাচ্ছে লোকসভা নির্বাচনের প্রচারের অভিমুখ কোনদিকে হবে। বেকারত্ব দূর করা নয়, বিদ্বেষেই তাদের ভর। 

এগুলো নতুন কিছুই নয়, আরএসএস-বিজেপির যা করার কথা, সেটাই তারা করছে। বিজেপির তীব্র হিন্দুত্ব, আরও তীব্র মুসলমান বিরোধিতা, দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে পুরো কোণঠাসা করা হয়েছে। এতে বিজেপি অনেকটাই সফল। ২০২৪ সালে বিজেপির এটাই গেমপ্ল্যান।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //