তুরস্কের বাণিজ্য স্থগিতের প্রভাব পড়ছে ইসরায়েলে

ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য স্থগিত করেছে তুরস্ক। কারণ হিসেবে দেশটি জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলার কারণে গাজায় ‘ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়’ ঘটেছে। সেখানে যুদ্ধবিরতি ও পর্যাপ্ত ত্রাণ সরবরাহের সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত বাণিজ্য স্থগিতের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মদদে ইসরায়েলি অর্থনীতি শক্তিশালী হলেও দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তা অর্থনীতিকে মারাত্মক আঘাত করতে পারে।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কে সাম্প্রতিক টানাপড়েন শুরু হয় ৯ এপ্রিল। গাজায় পর্যাপ্ত ত্রাণ সরবরাহের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগে ওই সময় ইসরায়েলে ৫৪ ধরনের পণ্য রপ্তানি বন্ধ করে দেয় তুরস্ক। বাণিজ্য বন্ধের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ চাপে ছিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান। প্রতিদিনই দেশজুড়ে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ চলছে।

২ মে রাতে তুরস্কের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বাণিজ্য স্থগিতের আওতায় সব ধরনের পণ্য পড়বে। গাজায় নিরবচ্ছিন্ন ও পর্যাপ্ত ত্রাণ সরবরাহের সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত তুরস্ক কঠোর ও সন্দেহাতীতভাবে বাণিজ্য স্থগিতের এ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করবে।’

তুরস্কের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কার্টজ বলেন, ‘এরদোগান স্বৈরশাসকের মতো আচরণ করছেন। তিনি তুরস্কের জনগণ ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থকে অসম্মান করছেন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তিকেও উপেক্ষা করছেন তিনি।’

তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে ২০২৩ সালের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে ৫.৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে তুরস্ক, যা তাদের মোট রপ্তানির ২.১ শতাংশ। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তুরস্ক-ইসরায়েলের মধ্যে বাণিজ্য প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। ইসরায়েলের আমদানিকৃত পণ্যের পঞ্চম বৃহত্তম সরবরাহকারী হয়ে ওঠে তুরস্ক। তুরস্কের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ইসরায়েল দেশটির দশম বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। তুরস্কের রপ্তানি করা পণ্যের মধ্যে লোহা ও ইস্পাত অন্যতম।

এই বাণিজ্য স্থগিতের ফলে ইসরায়েলে অনেক অবৈধ বসতির নির্মাণ কাজও বন্ধ হয়ে পড়েছে; অথবা কাজের গতি কমে এসেছে। এপ্রিলে ইসরায়েলের ঠিকাদারদের সমিতি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচকে চিঠি লিখে বলেছিল, তারা অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েল বিল্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এসিবি) আরবান রিনিউয়াল কমিটির চেয়ারম্যান আমিট গটলিব বলেছেন, ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের ওপর ইসরায়েলের নিষেধাজ্ঞার ফলে শ্রমিক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে ইসরায়েলের নির্মাণ শিল্প ‘মারাত্মক চাপে’ রয়েছে। জার্মানি, ব্রিটেন, চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরি এবং গ্রিস থেকে নির্মাণ সামগ্রীর বিকল্প আমদানি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিশ্চিত করা দরকার।

তবে এই বিকল্প আমদানি ব্যবস্থা অচিরেই সম্ভব হচ্ছে না। লোহা, ইস্পাত এবং নির্মাণ সামগ্রীর জন্য ইসরায়েল অনেকাংশে তুরস্কের ওপর নির্ভরশীল। ইসরায়েলের মোট সিমেন্ট আমদানির ২৯ শতাংশ সরবরাহ করত তুরস্ক। ইসরায়েলের বৃহত্তম তেল শোধনাগার বেজান জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা অপরিশোধিত তেল আমদানিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ইসরায়েলের বার্ষিক তেল ব্যবহারের ৪০ শতাংশ তুর্কি তেল হাব সিহান বন্দর থেকে আনা হয়। বৈদ্যুতিক পণ্য শিল্পের প্রতিনিধিরা সতর্ক করেছেন, নিষেধাজ্ঞার ফলে দাম ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। ইসরায়েলের বেশিরভাগ বৈদ্যুতিক পণ্য তুরস্কে তৈরি হয়। নতুন এই বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আমদানিকারকদের লোহিত সাগরের অপর পারে আমদানি করতে বাধ্য করতে পারে। সেখানে ইয়েমেনের ক্ষমতাসীন হুতিদের হামলায় পরিবহন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

প্রসঙ্গত প্রথম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে ১৯৪৯ সালে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় তুরস্ক। বাণিজ্য সম্পর্ক প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পেলেও রাজনৈতিক-কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক দশকগুলোয় ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক ছিল অম্ল-মধুর। ২০১০ সালে ফিলিস্তিনপন্থি ১০ তুর্কি কর্মী ইসরায়েলি কমান্ডোদের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হলে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে তুরস্ক। গাজা ভূখণ্ডে তুরস্কের একটি জাহাজ ইসরায়েলের সামুদ্রিক অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করলে ওই সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে। এর ছয় বছর পর ২০১৬ সালে অবশ্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করে। কিন্তু ২০১৮ সালে গাজা-ইসরায়েল সীমান্তে ফিলিস্তিনিদের হত্যার কারণে উভয় দেশ একে অন্যের শীর্ষ কূটনীতিকদের বহিষ্কার করে। 

এর মধ্যে গত ৭ অক্টোবর গাজায় নতুন করে আগ্রাসন শুরু হলে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বাকযুদ্ধ শুরু হয় এরদোগানের। গত জানুয়ারিতে তিনি বলেন, ‘হামাসের হামলার জবাবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী যে সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন তা হিটলারের চেয়ে কম নয়।’ জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, ‘এরদোগান কুর্দিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটিত করেছেন এবং তার শাসনের বিরোধিতা করায় সাংবাদিক বন্দির ক্ষেত্রে রেকর্ড গড়েছেন।’

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //