গাড়ির বাজার যাচ্ছে চীনের দখলে

অর্থনৈতিকভাবে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হলেও গাড়ির বাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে চীনা নির্মাতাদের। ২০৩০ সালের মধ্যে তারা বৈশ্বিক গাড়ির বাজারে এক-তৃতীয়াংশ নিজেদের দখলে নিতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি গাড়ি বিক্রি করেছে চীনা নির্মাতারা। চীনা ব্র্যান্ডের নেতৃত্বে ছিল শেনজেনভিত্তিক বিওয়াইডি। গত বছর চীনের কোম্পানিগুলো ১ কোটি ৩৪ লাখ ৩০ হাজার নতুন গাড়ি বিক্রি করেছে। অন্যদিকে মার্কিন কোম্পানিগুলো বিক্রি করেছে ১ কোটি ১৯ লাখ ৩০ হাজার ইউনিট। তবে শীর্ষ অবস্থানে ছিল জাপান। দেশটির নির্মাতারা বিক্রি করেছেন ২ কোটি ৩৫ লাখ ৯০ হাজার গাড়ি।

পরামর্শক সংস্থা অ্যালিক্স পার্টনার্সের নতুন এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাড়ির বাজারে চীনের উত্থানের মূলে রয়েছে সাশ্রয়ী মূল্যের বিদ্যুৎচালিত গাড়ি (ইভি)। চলতি বছরে গাড়ির বাজারে চীনের অংশীদারত্ব ২১ শতাংশে পৌঁছবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এ বছর আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা কোম্পানিগুলো ৩০ লাখ গাড়ি বিক্রি করার পূর্বাভাস দিয়েছে, যা ২০৩০ সালে ৯০ লাখে উন্নীত হবে। বর্তমানে বিদেশে চীনা গাড়ির অংশীদারত্ব ৩ শতাংশ। এ দশকের শেষ নাগাদ তা ১৩ শতাংশে দাঁড়াতে পারে। জেএটিওর জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক ফেলিপ মুনোজ জানান, মার্কিন গাড়ির মূল্য ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এ কারণে ভোক্তারা আরও সাশ্রয়ী চীনা গাড়ির দিকে আকৃষ্ট হয়েছেন। চীনা ব্র্যান্ডগুলো মূল্য বৃদ্ধির এ প্রবণতাকে পুঁজি করে বাজার দ্রুত বিস্তৃত করছে।

চীনা গাড়ির অংশীদারত্ব বেশি বেড়েছে লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, ইউরেশিয়া ও আফ্রিকায়। তবে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডেও তাদের ভালো অবস্থান রয়েছে। বিশ্বব্যাপী চীনা গাড়ি ব্র্যান্ডের দ্রুত সম্প্রসারণ অনেক গাড়ি কোম্পানি ও রাজনীতিবিদদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশই আশঙ্কা করছে যে কম খরচে চীনে তৈরি যানবাহন তাদের বাজার দখল করে নেবে। এতে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত অল-ইলেকট্রিক ধাঁচের গাড়িগুলো সংকটে পড়বে।

বৈশ্বিক সব বাজারে চীনা ব্র্যান্ডের প্রবেশ বাড়লেও কিছু অঞ্চলে শ্লথগতি দেখা যাবে। যেমন যানবাহনের সুরক্ষা মানে কঠোরতা ও আমদানি করা চীনা ইভির ওপর অতিরিক্ত শুল্ক ঘোষণা করায় যুক্তরাষ্ট্রসহ জাপান ও উত্তর আমেরিকায় বিক্রি বৃদ্ধির হার কম হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে অন্যান্য অঞ্চলে চীনা গাড়ির উপস্থিতি দ্রুত বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। এ অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা। সেই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারে চীনা ব্র্যান্ডগুলোর উপস্থিতি ৫৯ থেকে ৭২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। সাশ্রয়ী দেশী ব্র্যান্ডের কারণে বিদেশি গাড়ির প্রতি ক্রেতাদের অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে।

করোনাকালে বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় ধীর প্রবৃদ্ধি চলছে চীনে। অভ্যন্তরীণ ভোক্তা চাহিদা পতনের কারণে জোর দেওয়া হয়েছে বৈশ্বিক বাজারের দিকে। সহজ প্রবেশাধিকার নীতি, নিম্ন বাণিজ্য বাধা ও ভোক্তাদের মধ্যে উচ্চ মূল্য সংবেদনশীলতার কারণে চীনা ব্র্যান্ডগুলো এরই মধ্যে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে সফলভাবে গাড়ির বাজার সম্প্রসারণ করেছে। ২০২৩ সালে উদীয়মান অর্থনীতিতে ১ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি নতুন চীনা গাড়ি বিক্রি হয়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে মোট বিক্রির চেয়ে বেশি। সম্প্রতি চীনা ইভির ওপর ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর আগে দেশটির ইভিতে চার গুণ শুল্ক বাড়িয়ে শতভাগ করে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া চীন থেকে আমদানিকৃত যানবাহনের ওপর ৪০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক ঘোষণা করেছে তুরস্ক।

চীন রাষ্ট্রীয়ভাবে ইভি খাত গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেয়, যার ফল এখন সবার সামনে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) জানিয়েছে, গত দেড় দশক ধরে ইভি শিল্পের বিকাশে কাজ করছে চীন সরকার। এ খাতটি গড়ে তুলতে ২৩ হাজার ৮০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে বেইজিং। সিএসআইএসের চাইনিজ বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ট্রাস্টি চেয়ার স্কট কেনেডি জানান, ২০০৯-২৩ সাল পর্যন্ত যে পরিমাণ ইভি বিক্রি হয়েছে তার ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ সরকারি সাহায্য পেয়েছে। ইভি বিক্রিতে এ ধরনের ব্যয়ের অনুপাত ২০১৭ সালের আগে ছিল ৪০ শতাংশের বেশি। তবে তা পরে কমে আসে, ২০২৩ সালে ছিল ১১ শতাংশের ওপরে। ইভির জন্য বেইজিংয়ের নীতিগুলো দেশীয় নির্মাতাদের পক্ষে ছিল। নিজস্ব শিল্প বিকাশের জন্য চীনের মতো এমন আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //