করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ: শঙ্কার আবর্তে পোশাক খাত

রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ব্যাপক বৃদ্ধির সময় শঙ্কায় পড়েছে পোশাক খাত। ইউরোপের দেশগুলোতে বছরের শেষ দিকে বড়দিন উপলক্ষে পোশাকের চাহিদা বৃদ্ধির অপেক্ষায় ছিলেন উদ্যোক্তারা।

তবে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ সেই অপেক্ষা শঙ্কায় পরিণত করেছে। পোশাকের রফতানি ইতিমধ্যে কমেছে। আবার পোশাক তৈরির কাঁচামাল ও মূলধনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিও কমে গেছে। সব মিলিয়ে পোশাক খাতে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

রফতানি খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের রফতানি আয়ের সিংহভাগ আসে পোশাক খাত থেকে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি করেছিল বাংলাদেশ, যা মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ। চলতি বছরের শুরুতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এতে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যও মুখ থুবড়ে পড়ে। মার্চ, এপ্রিল, জুন ও জুলাই পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে পোশাক রফতানির পাশাপাশি মোট রফতানিও রেকর্ড পরিমাণ কমে যায়। 

জুলাইয়ের পর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কিছুটা কমে এলে কয়েকটি দেশে সীমিত আকারে বাণিজ্য শুরু হয়। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে পোশাক রফতানি বাড়ে। এতে কিছুটা আশা জাগালেও অক্টোবরে তা হতাশায় পরিণত হয়।

কারখানা মালিকরা জানান, পণ্যমূল্য কমে যাচ্ছে, উৎপাদন খরচ যাচ্ছে বেড়ে। রফতানির পরিমাণও কমে যাচ্ছে। নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের জন্য নতুন কার্যাদেশ এসেছে আগের বছরের তুলনায় কম। ইউরোপ ও আমেরিকায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের যে দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে, তার প্রভাব বাংলাদেশের পোশাক খাতে পড়তে শুরু করেছে বলে মনে করছেন পোশাক ব্যবসায়ীরা। 

পোশাক শিল্প মালিক ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সভাপতি রুবানা হক বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা উদ্বিগ্ন। বেশ সতর্কতার সাথে এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।’

করোনাভাইরাসের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে রফতানিকারকদের নানাভাবে সহায়তা করেছে সরকার। মাত্র ২ শতাংশ এককালীন সুদ পরিশোধ করে এপ্রিল, মে, জুন ও জুলাই মাসের বেতন দিতে বিশেষ তহবিলের জোগান দেয়। ৪০ হাজার কোটি টাকা, রফতানি উন্নয়ন তহবিল ও প্রিশিপমেন্ট ফান্ডের অন্যতম উপকারভোগী পোশাক শিল্প মালিকরা। সরকারের ঋণ সহায়তা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাহস করে কারখানা চালুসহ আরো কিছু কৌশল নিয়ে বাংলাদেশ অল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল। এখন যেহেতু নতুন চ্যালেঞ্জ আসছে, আগের পদক্ষেপগুলো মূল্যায়ন করে নতুন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত বছরের শেষে চীন থেকে কভিড-১৯ পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার পর এক প্রকার স্থবির হয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। সেই ধাক্কা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে স্পষ্ট হয় মূলত মার্চের শুরুতে। ২০১৯ সালের মার্চে যেখানে ২৮২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছিল, চলতি বছরের মার্চে তা ২২৫ কোটি ৬২ লাখ ডলারে নেমে আসে। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিল মাসজুড়ে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো কার্যত বন্ধ ছিল। এমনকি পণ্য জাহাজীকরণও অনেকটা থমকে ছিল। এই পরিস্থিতিতে এপ্রিলে মাত্র ৩৭ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি সম্ভব হয়, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৫ শতাংশ কম।

তবে ইউরোপের পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি ও দেশের পোশাক কারখানাগুলো খুলতে শুরু করার পর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে এ খাত। মে মাসে ১২৩ কোটি ও জুনে ২২৪ কোটি ডলারের পোশাক রফতানির মধ্য দিয়ে ধাক্কা অনেকটা সামলে ওঠা সম্ভব হয়। জুন মাসে পোশাক রফতানিতে ৬ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হলেও পরের তিন মাসের (জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর) পরিস্থিতি কারখানা মালিকদের মনে সাহস ফিরিয়ে আনে; কিন্তু অক্টোবরের ৭.৭৮ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি আবার নতুন করে শঙ্কা জাগাচ্ছে। 

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরুর আগেই দেশের তৈরি পোশাকের প্রধান রফতানি গন্তব্য ইউরোপের দেশগুলোতে লকডাউন শুরু হয়েছিল। ফলে মার্চের শুরু থেকেই একের পর এক ক্রয়াদেশ বাতিল ও স্থগিত করতে শুরু করেন পশ্চিমা ক্রেতারা। এই পরিস্থিতিতে পোশাক খাতে অস্থিরতা দেখা দেয়। একদিকে চলতে থাকে ছাঁটাই; অন্যদিকে বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় নামেন কর্মীরা। লকডাউনের কারণে কিছু দিনের জন্য কারখানা বন্ধ থাকলেও লোকসান কমাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আবার কাজ শুরু করেন মালিকরা। বিদেশি ক্রেতাদের স্থগিত করা অনেক কাজও আবার ফিরতে শুরু করে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) এক মাঠ জরিপে দেখা যায়, এপ্রিলে পোশাক খাতের পুরুষ কর্মীরা গড়ে মাত্র ৪৩ ঘণ্টা ও নারী কর্মীরা ৪২ ঘণ্টা কাজ করেন। মে মাস থেকে কর্মঘণ্টা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বরে তা আবার ২০১৯ সালের মতো মাসে ২৪৬ ঘণ্টায় ফিরে আসে। কর্মীদের বেতন পরিশোধের জন্য সরকারের দেয়া স্বল্প সুদের ঋণও পোশাক কারখানা মালিকদের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় রসদ জোগায়।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, মহামারির সংকট মোকাবেলায় সরকার যে প্রণোদনামূলক ঋণ দিয়েছে, তার প্রায় অর্ধেকটাই নিয়েছেন পোশাক কারখানার মালিকরা। সংকটে ওই ঋণ বেশ ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। এখন এর প্রকৃত প্রভাব কতটা হয়েছে, তা নিশ্চিত হতে একটি বিশদ পর্যালোচনা প্রয়োজন। কোনো নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান দিয়ে এই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে।

ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯ সালের প্রথম ১০ মাসে যেখানে ২৭.৬৩ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানি হয়েছিল, সেখানে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে হয়েছে ২২.৩৮ বিলিয়ন ডলারের। বছর শেষে এই ব্যবধান আরো কমে আসবে বলেই আশা করছিলেন বাজার বিশ্লেষকরা। আর ব্যবসায়ীরা আশা করছিলেন, ডিসেম্বরে বড়দিনকে ঘিরে ক্রেতা দেশগুলোতে বিক্রি আরো বাড়বে; কিন্তু ইউরোপ ও আমেরিকায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আবারো বেড়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশে নতুন করে বিধিনিষেধও শুরু হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মালিকরাও নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

রুবানা হক বলেন, ‘রফতানির আকার বিবেচনা করলে এই খাত গত ২/৩ মাস ধরে ঘুরে দাঁড়ানোর পর্যায়ে রয়েছে। তবে এই সময়ে পণ্যমূল্য নিয়ে আমাদের বেশ ছাড় দিয়ে এই পরিস্থিতি ধরে রাখতে হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে পোশাকের রফতানি মূল্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ২.১৭ শতাংশ। আর কেবল সেপ্টেম্বরে রফতানি মূল্য কমেছে আগের বছরের এই সময়ের তুলনায় ৫.২৩ শতাংশ।’ 

তিনি আরোা বলেন, ‘এখন আবার পশ্চিমা দেশগুলোতে মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। ফলে রফতানির ভলিউম আবার কমে যেতে পারে। ক্রেতারা তাদের অর্ডার স্থগিত করে দিতে পারেন। এমনটি ঘটলে কারখানাগুলোতে আবারও কর্মহীনতা সৃষ্টি হবে। মহামারির প্রথম ধাক্কায় অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়া আর্থিক সক্ষমতায় নতুন করে কোনো সংকট এলে মোকাবেলা করা কঠিন হবে।’

এদিকে রফতানি আদেশ না থাকায় আমদানি কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আমদানি কমেছে প্রায় ১৪ শতাংশ। এই সময় আমদানি হয়েছে এক হাজার ৩৩৩ কোটি ডলারের পণ্য, আগের বছর যা ছিল এক হাজার ৩৮৪ কোটি ডলার। আলোচ্য সময়ে মেশিনপত্র আমদানি কমেছে ১৬ শতাংশ, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ৩৯ শতাংশ, শিল্পের মধ্যবর্তী কাঁচামাল আমদানি কমেছে ২৪ শতাংশ। কাঁচা সুতা আমদানি কমেছে ১৮ শতাংশ, ইয়ার্ন আমাদানি কমেছে ৬ শতাংশ এবং বস্ত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বস্তু আমদানি কমেছে ১৭ শতাংশ। 

তবে বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্যয় কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের রিজার্ভ বাড়ছে। ইতিমধ্যে রিজার্ভ ৪১ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করছে। করোনাভাইরাসের মধ্যেই প্রতিনিয়ত রেমিট্যান্স বাড়ছে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত প্রবাসী আয় এসেছে ৯৮৯ কোটি ১০ লাখ ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৬৮৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার। সে হিসাবে, গত বছরের একই সময়ের চেয়ে এবার বেশি এসেছে ৪৩.৪২ শতাংশ। পাশাপাশি বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য পাওয়া গেছে, যার ফলে রিজার্ভ বাড়ছে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh