সোশ্যাল মিডিয়াই ফ্রান্স-রাশিয়ার রণক্ষেত্র

ছবি: দ্য আফ্রিকা রিপোর্ট

ছবি: দ্য আফ্রিকা রিপোর্ট

গত ১৫ ডিসেম্বর সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক ঘোষণা দেয় যে, তারা বেশকিছু অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে, যেগুলোর রুশ ও ফরাসি সরকারি গোয়েন্দা বিভাগ ও সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। 

অভিযোগে বলা হয়, এসব অ্যাকাউন্ট থেকে ভুয়া আইডির মাধ্যমে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। 

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, প্রথমবারের মতো ফেসবুক কোনো পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশের সামরিক বাহিনীর সাথে যোগাযোগ থাকা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলো। রুশ যে গ্রুপের বিরুদ্ধে ফেসবুক ব্যবস্থা নিয়েছে, তারা ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জড়িত ছিল বলে সন্দেহ করা হয়েছিল। 

ফেসবুক জানায়, মোট ২৭৪টি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়েছে; সেইসাথে এদের দ্বারা চালিত বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজ ছাড়াও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টও রয়েছে। ইনস্টাগ্রাম হলো ছবি শেয়ারিং ওয়েবসাইট, যা ফেসবুক ২০১২ সালে এক বিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়। এক সংবাদ সম্মেলনে ফেসবুকের কর্মকর্তারা জানান, এই অ্যাকাউন্টগুলো সবচেয়ে বেশি টার্গেট করেছে পশ্চিম আফ্রিকার মালি ও সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিককে। এছাড়াও বুরকিনা ফাসো, নাইজার, আলজেরিয়া, আইভোরি কোস্ট ও শাদ কমবেশি আক্রান্ত হয়েছে। 

নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ গ্রুপ গ্রাফিকা জানায়, ফেসবুকের এহেন ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো তৃতীয় কোনো রাষ্ট্রে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতার চিত্র ফুটে উঠলো। আফ্রিকার দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তারের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুধু ফেসবুকই নয়; টুইটার, ইউটিউব ও বিভিন্ন আর্টিকেলের মাঝেও দেখা যাচ্ছে। গ্রাফিকার চিফ ইনোভেশন অফিসার ক্যামিল ফ্রাসোয়াঁ বলেন, ‘যখন গণতান্ত্রিক সরকারগুলো মিথ্যা-বানোয়াট খবর প্রচারে মনোনিবেশ করে, তখন তাদের জন্যে নিজেদের দেশে অন্য কারও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টাকে নিন্দা করাটা কঠিন হয়ে যায়।’

বন্ধ করা ফরাসি অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে ৮৪টি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, ১৪টি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ও কতগুলো ফেসবুক গ্রুপ ও পেজ। এগুলোর প্রায় হাজার পাঁচেক ফলোয়ার ছিল। ফরাসিরা আফ্রিকান মানুষের ভুয়া বেশ ধরে ফরাসি ও আরবি ভাষায় আফ্রিকায় ফ্রান্সের নীতি, সেখানকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আফ্রিকার নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা ইত্যাদি বিষয় ছাড়াও আফ্রিকার সাবেক ফরাসি উপনিবেশগুলোতে ফরাসি সামরিক বাহিনীর কর্মকাণ্ডের পক্ষে পোস্ট দিচ্ছিল। 

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির জনগণকে টার্গেট করা একটি ফেসবুক পোস্টে বলা হয়, ‘মালির জন্যে রুশ সাম্রাজ্যবাদীরা হলো গ্যাংগ্রিনের মতো, জারিস্ট ব্রেইনওয়াশ থেকে সাবধান থাকুন!’ ফেসবুক জানায়, যদিও এই অ্যাকাউন্টগুলো নিজেদের পরিচয় ও সমন্বয় গোপন করতে চাইছিল; তবে তাদের তদন্তে পাওয়া যায়, এই ব্যক্তিদের সাথে ফরাসি সামরিক বাহিনীর যোগসাজশ রয়েছে। ফেসবুকের ব্যবস্থা নেয়ার পরদিন ফরাসি সরকার এই ঘটনায় তাদের নিজেদের জড়িত থাকার ব্যাপারে কোনকিছু না বলে শুধু জানায়, আফ্রিকায় মিথ্যা-বানোয়াট খবর মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ফরাসি সরকার এই প্রতিবেদন খতিয়ে দেখছে। এই মুহূর্তে তারা কাউকে দায়ী করতে পারছেন না; বরং তারা বলছেন, যেহেতু অনেক পক্ষই এখানে জড়িত, তাই কাউকে নির্দিষ্ট করা কঠিন। তাদের অংশীদারদের সাথে ফ্রান্স আফ্রিকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ করে যাচ্ছে বলেও দাবি করা হয়।

অপরদিকে, রুশদের মূল লক্ষ্য ছিল সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে ২৭ ডিসেম্বরের আসন্ন নির্বাচন। একটি রুশ পোস্টে ওই দেশের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফস্টিন আরশাঞ্জ তুয়াদেরার পক্ষ নিয়ে বলা হয়, শান্তির পক্ষে প্রেসিডেন্ট তুয়াদেরা যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, তার কারণে পরবর্তী প্রজন্ম ভালো জীবন পাবে। রুশ নেটওয়ার্ক থেকে রাশিয়ার ডেভেলপ করা করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিনের পক্ষেও পোস্ট দেয়া হয়। বন্ধ করা রুশ অ্যাকাউন্টগুলোর প্রায় ৬০ লাখ ফলোয়ার ছিল। রুশরা লিবিয়ার রাজনৈতিক আলোচনাকে টার্গেট করে অপারেশন চালাচ্ছিল। লিবিয়ার এই ফেসবুক পেজগুলোতে ১৩ লাখ ফলোয়ার ছিল। এছাড়াও পশ্চিম আফ্রিকার গিনি উপকূলের দেশ ইক্যুয়েটোরিয়াল গিনিতে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা চলছে বলেও তথ্য ছড়ায় রুশরা। তারা অবশ্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে অন্য কোনো দেশে প্রভাব বিস্তার চেষ্টার ব্যাপারটি সরাসরিই অস্বীকার করেছে। 

রুশ ও ফরাসি নেটওয়ার্কগুলো একে অপরের পোস্টে কমেন্ট করছিল ও একে অপরের ফ্রেন্ডলিস্টে ঢোকার চেষ্টা করছিল। তারা একে অপরকে ভুয়া অ্যাকাউন্ট বলে অভিযোগ করছিল। ফেসবুক জানায়, ২০১৭ সাল থেকে ফেসবুক ১০০ নিষেধাজ্ঞার ব্যবস্থা নিয়েছে, যার মাঝে মাত্র একটিতে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ একে অপরের সাথে যোগাযোগ করছিল। 

ফরাসি পত্রিকা লে অপিনিয়নের এক লেখায় ফরাসি সাংবাদিক জ্যঁ ডমিনিক মারশে ফরাসি সামরিক বাহিনীর এই ‘সমন্বিত ভুয়া কর্মকাণ্ডের’ সমালোচনা করেন। তিনি জানান, এ ধরনের কর্মকাণ্ড এতদিন রাশিয়ার কাছ থেকে আসতো; এখন ফরাসি সেনাবাহিনী এতে জড়িয়েছে। ফরাসি পত্রিকায় সে দেশের সরকারের আফ্রিকা নীতি নিয়ে সমালোচনা করা হলেও এগুলো মূলত ফ্রান্সের দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় নীতিরই ফলাফল। পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে নিয়মিত সামরিক হস্তক্ষেপ করায় এমনিতেই ফরাসিরা ইমেজ সংকটে রয়েছে। তার ওপর ফ্রান্সের সামরিক হস্তক্ষেপের পর থেকে পশ্চিম আফ্রিকার মালি ও আশপাশের নিজের, বুরকিনা ফাসো, আইভোরি কোস্টে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার কারণে আফ্রিকায় ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক নীতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। 

আফ্রিকায় ফ্রান্সের এই দুর্বল অবস্থানের সুযোগ নিয়ে অন্যান্য প্রভাবশালী রাষ্ট্র নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করতে চাইছে; ফেসবুকে এই দ্বন্দ্ব সেই ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ। পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব যে বাড়ছে, তা শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সুনির্দিষ্ট অপারেশনই বলে দিচ্ছে। ফেসবুকের ব্যবস্থা গ্রহণে রুশ অপারেশন বেশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে ঠিকই, তবে একইসাথে সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে দুর্বল হওয়া ফ্রান্সের অনৈতিক অবস্থানও জনসম্মুখে এসে গেল। 

এতে শুধু ফ্রান্সই ইমেজ সংকটে পড়েনি, গণতন্ত্রের ঝান্ডাবাহী পশ্চিমা লিবারাল চিন্তার দেশগুলো আফ্রিকার সাবেক উপনিবেশগুলোকে স্বাধীনভাবে চলতে দেয়ার বেলায় কতটা লিবারাল, তা আরো একবার প্রকাশ পেল।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh