ভাষার ক্ষেত্রে গোঁড়ামি বা ছুঁৎমার্গের কোনও স্থান নেই

আমাদের মনে রাখতে হবে ভাষার ক্ষেত্রে গোঁড়ামি বা ছুঁৎমার্গের কোনও স্থান নেই।...ঘৃণা ঘৃণাকে জন্ম দেয়। গোঁড়ামি গোঁড়ামিকে জন্ম দেয়। একদল যেমন বাংলাকে সংস্কৃত- ঘেঁষা করতে চেয়েছে, তেমনি আর একদল বাংলাকে আরবী-পারসী ঘেঁষা করতে উদ্যত হয়েছে। 

একদল চাচ্ছে খাঁটি বাংলাকে ‘বলি’ দিতে, আর একদল চাচ্ছে ‘জবেহ’ করতে। একদিকে কামারের খাঁড়া, আর একদিকে কসাইয়ের ছুরি।

নদীর গতিপথ যেমন নির্দেশ করে দেয়া যায় না, ভাষারও তেমনি। একমাত্র কালই ভাষার গতি নির্দিষ্ট করে। ভাষার রীতি (স্টাইল) ও গতি কোনো নির্দিষ্ট ধরা-বাঁধা নিয়মের অধীন হ’তে পারে না।...অর্থাৎ মানুষে মানুষে যেমন তফাৎ, প্রত্যেক লোকের রচনাতেও তেমনি তফাৎ থাকা স্বাভাবিক। এই পার্থক্য নির্ভর করে লেখকের শিক্ষাদীক্ষা, বংশ এবং পরিবেষ্টনীর উপর। মোট কথা, ভাষা চাই সহজ, সরল এবং ভাষার রীতি (স্টাইল) হওয়া চাই স্বতঃস্ফূর্ত, সুন্দর ও মধুর। ...কিন্তু আমাদের দু’টি কথা স্মরণ রাখা উচিত- ভাষা ভাব প্রকাশের জন্য, ভাব গোপনের জন্য নয়, আর সাহিত্যের প্রাণ সৌন্দর্য, গোঁড়ামি নয়।

[১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির ভাষণ থেকে উদ্ধৃত]

দুই.

১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় যে সাহিত্য সম্মিলনীর অধিবেশন হয়েছিল, তাতে বড় আশাতেই বুক বেঁধে আমি বুঝেছিলাম স্বাধীনতার (?) নতুন নেশা আমাদের মতিচ্ছন্ন করে দিয়েছে। আরবী হরফে বাংলা লেখা, বাংলা ভাষায় অপ্রচলিত আরবী-পারসী শব্দের অবাধ আমদানী, প্রচলিত বাংলা ভাষাকে গঙ্গাতীরের ভাষা বলে তার পরিবর্তে পদ্শাতীরের ভাষা প্রচলনের খেয়াল প্রভৃতি বাতুলতা আমাদের একদল সাহিত্যিককে পেয়ে বসল। 

তারা এইসব মাতলামিতে এমন মেতে গেলেন যে, প্রকৃত সাহিত্য সেবা যাতে দেশের ও দশের মঙ্গল হতে পারে, তারা পথে আবর্জনার স্তূপ দিয়ে সাহিত্যের উন্নতির পথ কেবল রুদ্ধ করেই খুশিতে ভূষিত হলেন না, বরং খাঁটি সাহিত্যসেবীদিগকে নানা প্রকারে বিড়ম্বিত ও বিপদগ্রস্ত করতে আদাজল খেয়ে কোমর বেঁধে লেগে গেলেন। তাতে কতক উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারীরা উস্কানি দিতে কসুর করলেন না।

ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চা, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র এবং অন্যান্য পশ্চিমবঙ্গের কবি ও সাহিত্যিকগণের কাব্য গ্রন্থ আলোচনা, এমনকি বাঙ্গালী নামটি পর্যন্ত যেন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে কেউ কেউ মনে করতে লাগলেন। কেউ বা এতে মিলিত বঙ্গের (?) ভূতের ভয়ে আতংকগ্রস্ত হয়ে আবোল তাবোল শুরু করে দিলেন এবং বেজায় হাত-পা ছুড়তে লাগলেন। 

করাচীর তাবেদারগত লীগ গভর্নমেন্ট বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতির জন্য কিছু করা দূরে থাক বাঙ্গালী বালকের কচি মাথায় উর্দুর বোঝা চাপিয়ে দিলেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের আরবী হরফে বাংলা ভাষা লেখার এবং উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অপচেষ্টায় সহযোগিতা করলেন। এইরূপ বিষাক্ত আবহাওয়ায় ১৯৪৮ সালে পরে আর কোনও সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন (১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের জয়লাভ পর্যন্ত) সম্ভবপর হয়নি। ...যারা জবরদস্তিক্রমে সমস্ত পাকিস্তানের ওপর কোনো একটি ভাষা (উর্দু) চাপিয়ে দিতে চায়, তারা পাকিস্তানের দুশমন, তারাই পাকিস্তান ধ্বংস করবে।”

[১৯৫৪ সালের ২৩ এপ্রিল কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সম্মেলনে উদ্বোধনী ভাষণ থেকে উদ্ধৃত]


মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh