ল্যাংস্টন হিউজ

শরতের সন্ধ্যায়

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

বিল যখন প্রায় কিশোর, তখন থেকেই ওদের মধ্যে ভাব-ভালোবাসা ছিল। রাত্রির বহু নির্জনতা ওরা দু’জনে একসঙ্গে হেঁটে, গল্প করে কাটিয়েছে। তরপর দু’জনের মধ্যে অত্যন্ত সাধারণভাবেই ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। মেয়েটা বিয়ে করেছে এমন একজনকে, যাকে মনে করেছিল বুঝি ভালোবাসে। মেয়েদের সম্পর্কে একটা তিক্ত ধারণা নিয়েই বিল নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল।

গতকাল, ওয়াশিংটন স্কয়ার ধরে হেঁটে যাবার সময়, বহু বছর পর মেয়েটিই প্রথম ছেলেটিকে দেখতে পেল।

‘আরে, বিল ওয়াকার না!’ স্তব্ধ বিস্ময়ে মেয়েটি বলে উঠল।

বিল থমকে দাঁড়াল। প্রথমে সে মেয়েটিকে চিনতেই পারেনি, মনে হলো কেমন যেন বুড়িয়ে গেছে।

‘এ কি, মেরি, তুমি! কোত্থেকে আসছো?’

অনবধানেই মেরি মুখটাকে এমনভাবে তুলল যেন চুমু চাইছে। বিল কিন্তু হাতটা বাড়িয়ে দিল। মেয়েটি তার হাতটা চেপে ধরল নিজের মুঠোর মধ্যে, তারপর বলল, ‘আমি তো এখন নিউইয়র্কেই থাকি।’

‘ওহঃ!’ শোভন ভঙ্গিতে বিল হাসল। পরক্ষণেই তার দু-ভ্রু’র মঝে ফুটে উঠল অস্পষ্ট একটা ভ্রুকুটি।

‘তুমি কোথায় আছ, কি করছ? এসব ভাবলে সত্যিই আমার খুব অবাক লাগে, বিল।’

‘আমি এখন ওকালতি করি। ডাউনটাউনে একটা অফিস খুলেছি।’

‘বিয়ে করেছ?’

‘হ্যাঁ, দুটি বাচ্চাও আছে।’

‘ওমা, তাই নাকি!’

পার্কের মধ্যে ওদের পাশ দিয়ে বহু লোক যাওয়া-আসা করছে। ওরা কাউকেই চেনে না। তখন প্রায় গোধূলি। বেলাশেষের সূর্যটা সবে ডুবছে। হিম হিম একটা ভাব জড়িয়ে রয়েছে।

‘আর তোমাদের খবর কি?’ হালকাভাবেই বিল জিজ্ঞেস করল।

‘আমাদের তিনটে বাচ্চা। আমি কলম্বিয়ায় বারসারের অফিসে কাজ করি।’

‘তোমাকে কিন্তু ভীষণ... (বিল বলতে চাইল- বুড়ো দেখাচ্ছে) যাকগে, তারপর?’

মেরির বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না। ওয়াশিংটন স্কয়ারে এই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ওর মনে হলো, ও যেন সেই অতীত দিনগুলোতে ফিরে গেছে। বিল যখন ওহিওতে ছিল, ও তার চাইতে অনেক অনেক বুড়িয়ে গেছে। এখন, ও আর আদৌ তরুণী নয়। অথচ বিল সেই আগেরই মতো তরুণ রয়েছে।

‘আমরা সেন্ট্রাল পার্ক পশ্চিমে থাকি,’ মেরি বলল। ‘যে কোনো একদিন এসে দেখে যেও নাহ।’

‘নিশ্চয়ই। তোমরাও এসে একদিন আমাদের বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া কর। যে কোনো দিন রাত্তিরে। তোমরা এলে লুসিলি আর আমি সত্যিই খুব খুশি হব।’

পার্কের মধ্যে গাছের পাতাগুলো আলতো খসে পড়ছে। বাতাস ছাড়াই খসে পড়ছে। ঘনিয়ে উঠছে শরতের সন্ধ্যা। সব কিছুই মেরির কেমন যেন বিষণ্ণ মনে হচ্ছে।

‘আমাদেরও খুব ভালো লাগবে, বিল।’ হঠাৎ সমস্ত পঞ্চম সরণি ধরে আলো জ্বলে উঠল, যেন নীলিম হাওয়ায় কুহেলিঘেরা উজ্জ্বলতার দু-সারি মালা।

মেরি বলল, ‘আমার বাস এসে পড়ছে।’

বিল তার হাতটা বাড়িয়ে দিল, ‘বিদায়, মেরি।’

‘তুমি কিন্তু...’ মেরি কিছু বলতে চাইল, বাসটা কিন্তু ততক্ষণে গড়াতে শুরু করেছে। রাস্তার বাতিগুলোর আড়াল পড়ছে, পরক্ষণেই আবার ঝলমল করছে, আবার আড়াল পড়ছে। বাসে উঠে কথা বলতে ও ঠিক ভরসা পেল না, ভয় হল পাছে যদি কোন শব্দ উচ্চারণ করতে না পারে।

হঠাৎ বেশ জোরেই ও চেঁচিয়ে উঠল, ‘বিদায়, বিল!’ কিন্তু বাসের দরজা ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে।

বাসটা ছেড়ে দিয়েছে। বাইরে, ওদের দু’জনের মাঝে লোকজন যাওয়া-আসা করছে, রাস্তা পেরুচ্ছে, যাদের ওরা কেউই চেনে না। লোকজন আর নির্জনতা। বিলকেও আর দেখতে পেল না মেয়েটি। তখনই মনে পড়ল বিলকে নিজের ঠিকানাটা দিতে ভুলে গেছে, বিলের ঠিকানাটাও জিজ্ঞেস করা হয়নি, এমন কি তাকে বলাও হয়নি যে, ওর বড় ছেলেটারও নাম বিল।

ভাষান্তর : কাজী দিদার

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //