মার্কিন কবি

জনাথন ওয়েলসের কবিতা

১৯৫৪ সালে কবি জনাথন ওয়েলস নিউইয়র্ক সিটিতে জন্মগ্রহণ করেন। ব্যাচেলর অব আর্টস ডিগ্রি অর্জন করেই শুরু করেন প্রকাশনা কোম্পানিতে। দীর্ঘদিন তিনি বিভিন্ন প্রকাশনা কোম্পানির পাণ্ডুলিপি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

কম বয়সে কবিতা লিখতে শুরু করলেও এক সময় মনে হয় কবিতা লেখার যোগ্যতা তার নেই, তাই কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়ে পুরোদস্তুর সংসারী মানুষ হয়ে যান; কিন্তু কবিতা তাকে ঠিকই আবার তার কাছে টেনে আনে। দীর্ঘ ২৪ বছর বিরতির পর তিনি আবার কবিতা লিখতে শুরু করেন। একুশ সালে তার তৃতীয় কবিতার বই ‘ডেব্রিজ’ প্রকাশ করে ফোর ওয়ে বুকস। একই প্রকাশক ২০১১ সালে বের করে তার ‘ট্রেন ড্যান্স’ এবং ২০১৫ সালে ‘দ্য ম্যান উইথ মেনি পেনস’। নিউ ইয়র্কারসহ আমেরিকার বিভিন্ন বিখ্যাত পত্রিকা ও জার্নালে জনাথনের কবিতা ছাপা হয়েছে। সম্প্রতি তার কিছু কবিতা পড়ে তাকে আমার কাছে একজন গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন কবি মনে হয়েছে। তাই সিদ্ধান্ত নিই তার একটি সাক্ষাৎকার নেব এবং কিছু কবিতা বাংলা ভাষার পাঠকদের জন্য অনুবাদ করব। নিচে সাক্ষাৎকারটি এবং জনাথন ওয়েলসের পাঁচটি কবিতার অনুবাদ উপস্থাপন করা হলো- কাজী জহিরুল ইসলাম।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এজরা পাউন্ড মুসোলিনির পক্ষে কাজ করে বিতর্কিত হয়েছেন, বলা যায় তিনি একজন যুদ্ধাপরাধী, ভুল করে নয়, জেনে-বুঝে তিনি হিটলার-মুসোলিনির পক্ষে কাজ করেছেন। আমেরিকা যাতে জার্মানি-ইতালির বিরুদ্ধে অ্যাকশনে না যায়, সেজন্য তদ্বিরও করেছেন। এই অপরাধের জন্য তাকে শাস্তি পেতে হয়েছে; কিন্তু আমেরিকার কবিতাপ্রেমী মানুষ তার কবিতাকে প্রত্যাখ্যান করেনি। এই বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন? 

আমার বিবেচনায় এজরা পাউন্ডের অপরাধ এবং এর প্রতিক্রিয়া চিত্রিত হয়েছে তার এবং আমাদের সময়কাল দিয়ে। কাজের জন্য তার সময়ে বিচার হয়েছে এবং তাকে কারাবন্দি করা হয়েছে; কিন্তু তার কবিতাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়নি, তিনি যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তার কবিতাকেও রেহাই দেওয়া হতো না। যদি অন্যভাবে বলি, তাহলে বলব, আজকের দিনে ব্যক্তি এবং তার কাজকে আলাদা করে বিবেচনা করা হয় না, যা করা হতো আজ থেকে ৭৫ বছর আগে। 

আপনি কি মনে করেন একজন কবির রাজনীতি-সচেতন হওয়া খুব দরকার? কবির রাজনীতি বিমুখ অবস্থান কীভাবে দেখেন? 

আমি এটা মনেই করি না যে, একজন কবির রাজনীতি সচেতন হওয়ার কোনো প্রয়োজন আছে। কেউ কেউ আছেন তারা রাজনীতির খোঁজ-খবর রাখেন, আবার কেউ রাখেন না। আজকের দিনে একজন মানুষ রাজনীতি-সচেতন না হলে সমাজ তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় কিন্তু আমি মনে করি না কবিতা লেখার কাজটি রাজনীতির জন্য বা রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত হওয়া উচিত। প্রকৃতপক্ষে এর উল্টোটাই হওয়া উচিত। কবিতা খুব ব্যক্তিগত এবং এর নিজস্ব একটা রাজনীতি আছে। হয়তো একজন কবি কোনো রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে লিখতে পারেন এবং তা অবশ্যই কবির দৃষ্টিকোণ থেকে, কোনো দলের রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৬০ সালের ডেট্রয়েট রায়টের ওপর লেখা ফিলিপ লেভিনের কবিতা ‘দে ফিড দে লায়ন’। দেখুন, এই কবিতাটি একটি রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত হলেও এটি ছিল একজন কবির ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়।

আপনি কি মনে করেন সামাজিক অসঙ্গতিগুলোর বিরুদ্ধে একজন কবির সোচ্চার হওয়া উচিত? সামাজিক অসঙ্গতির বিরুদ্ধে আপনার ব্যক্তিগত ভূমিকা কি, বিশেষ করে, ধর্ম, রঙ এবং জাতিগত বৈষম্য, অভিবাসী ইস্যু, জেন্ডার এবং সমকাম ইস্যু, এসব ক্ষেত্রে আপনি কী ধরনের ভূমিকা পালন করেছেন? 

সামাজিক ইস্যুগুলোতে একজন কবির দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমালোচনা তখনই হয় যখন তার প্রজ্ঞার অপূর্ণতা থাকে। এটা তো কেউ খেয়ালই করবে না যে এইসব ইস্যুতে, যেগুলোর কথা আপনি উল্লেখ করলেন, আমার কী ভূমিকা, যদি না আমি ন্যায্য দাবির বিরুদ্ধে অবস্থান নেই। স্বাভাবিকভাবেই কোনো কবি ন্যায়সঙ্গত দাবির বিপক্ষে অবস্থান নেয় না। এমন দৃষ্টান্ত নেই বলেই চলে যে একজন কবি, আপনি যে ইস্যুগুলোর কথা বললেন, এসব ক্ষেত্রে স্রোতের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে, এমন কি রবার্ট ফ্রস্ট, ওয়ালেস স্টিভেন্সের মতো রিপাবলিকান কবি না। 

শিল্পের জন্য শিল্প- এই মতবাদের পক্ষে/বিপক্ষে আপনার অবস্থান ব্যাখ্যা করুন।

আমি যখন লিখি, তখন আমি শুধু কবিতার কথাই ভাবি। আমি একদমই এটা মাথায় নিই না যে এই কবিতা মানুষ গ্রহণ করবে কি বর্জন করবে, পাঠক আমার কবিতাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে, এই চিন্তাকে লেখার সময় কাছেই ঘেঁষতে দিই না। আসলে পাঠক নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমি শুধু চেষ্টা করি যে আমি যেন একটি ভালো কবিতা লিখতে পারি, আমার ভালো। যেটুকু ভালো আমার পক্ষে করা সম্ভব। অন্য সব ভাবনা লেখাটি শেষ হওয়ার পরে। শিল্পের জন্য শিল্প- এই চিন্তাটি যেমন, বাস্তবধর্মীতাও ঠিক তেমনি, আমার কাছে অর্থহীন, যখন আমি লিখি। যখন আমি কবিতা লিখি তখন আমার একমাত্র পৃথিবী হচ্ছে কবিতার পৃথিবী, আর কিছু নয়। 

আপনার বিবেচনায়, চিন্তায় উত্তরাধুনিক কবিতা কী? একেবারেই আপনার নিজস্ব চিন্তাটি জানতে চাই। 

যেহেতু অন্য কবিদের মতো আমি ফাইন আর্টসে মাস্টার্স বা পিএইচডি করিনি, কাব্যপাঠ সীমিত আমার পছন্দের কবিতার মধ্যেই। আমি সাধারণত সেইসব কবিতার কবিতার প্রতি আকৃষ্ট হই যেগুলোর ভাষা, আবেগ এবং কল্যাণ-চিন্তা আকৃষ্ট করে। বেশিরভাগ উত্তরাধুনিক কবিতার মধ্যে এই বিষয়গুলো অনুপস্থিত, সুতরাং সেইসব কবিতা আমাকে বেশ কষ্ট মেনেই পড়তে এবং বুঝতে হয়। মাঝে মাঝে দুয়েকটি বেশ ভালো লেগে যায়, বেশিরভাগই ভালো লাগে না।

২০১৬ সালে আমেরিকান গীতিকার ও সংগীত ব্যক্তিত্ব বব ডিলান সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। লেখক-সমালোচকদের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ আছে, অনেকের মতে ওই বছর জন অ্যাশবেরি অনেক বেটার ক্যান্ডিডেট ছিল। আপনি কী মনে করেন? 

ডিলান/অ্যাশবেরি বিতর্ক কোনো সমাধানে পৌঁছাবে না। আমি নিজেও অ্যাশবেরিকে যতটা গুরুত্বপূর্ণ কবি মনে করি তার কবিতা কিন্তু আমাকে কখনোই ততটা নাড়া দেয়নি; কিন্তু ডিলান আমাকে সব সময় প্রভাবিত করেছে। তাহা মোহাম্মদ আলীর টুইগ কবিতার উদ্ধৃতি দিচ্ছি, ‘শিল্প মূল্যহীন/যদি না তা/মানুষের হৃদয়ে তেমন কিছু রোপণ করে’। 

নোবেল পুরস্কার রাজনীতির রঙে রঞ্জিত- এই অভিযোগ আমরা আজকাল খুব শুনি। আপনি নিজে কি তা বিশ্বাস করেন? 

আমি মনে করি সব পুরস্কার/স্বীকৃতিই রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করা, অর্থাৎ রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত। প্রায়শই শিল্পগুণের বিবেচনাকে পেছনে ফেলে অন্যকিছু মুখ্য হয়ে ওঠে নোবেলের মনোনয়ন বিবেচনায়। হয়তো কখনো এটা ভালো, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভালো হয় না। তবে বিতর্ক পুরস্কারের জন্য ভালোই তো, এতে একটি দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি হয়।

আপনি কেন কবিতা লেখেন? কবি না হলে আর কী হতেন?

আমি চব্বিশ বছর কবিতা লিখিনি। কবিতা থেকে দূরে থাকি তা আমি চাইনি কিন্তু আমি ভেবে দেখেছি এই কাজের জন্য আমি যোগ্য নই। আমার মনে হয়েছে আমার কিছুই বলার নেই এবং আমি তা জানিও না কীভাবে তা বলতে হয়। ঠিক সেই সময়টাতে আমি লেখা এবং পড়ার বাইরের জগতে বিচরণ করছিলাম। আমি বাবা হই। আমি অনেক ভেবেছি আবার একদিন লিখতে বসে যাব কিন্তু তেমন কোনো আলোর স্ফুরণ দেখিনি কোথাও যা আমাকে কবিতায় টেনে আনতে পারত। আমি আসলে অন্য জগতটা ভালো উপভোগ করছিলাম কিন্তু কবিতা আমাকে ঠিকই আবার ডাক দিল এবং আমি তার কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।

কাজী জহিরুল ইসলাম

আপনি কি কবিতা লেখার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন বিষয় বা ফর্মে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন নাকি সম্পূর্ণ মুক্ত?

আমি অনানুষ্ঠানিক আয়োজনটাই বেশি পছন্দ করি এবং উপভোগ করি। আমি যা বলতে চাই তা খুব ভালোভাবে বলতে পারি যখন আমি সকল বন্ধন থেকে মুক্ত। তার মানে এই না যে আমি শিল্পের অনুশাসন একেবারেই উপেক্ষা করেছি তবে আমি নিয়ম মানি আমার নিয়মে, আর কারও বেঁধে দেওয়া নিয়মে নয়।

পুরস্কার/স্বীকৃতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ? একজন বড় কবিকে কি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি বা পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে তার গুরুত্ব প্রমাণ করতে হয়? মানে এটা কি খুব জরুরি? 

কবিতা ভালো কি মন্দ তা প্রায়শই বিবেচিত হয় প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার/স্বীকৃতির মাপকাঠিতে। আমি যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিই তা হচ্ছে যারা কখনোই কবিতা লেখেননি কিংবা কবিতার বোদ্ধা পাঠকও নন তাদের কানে কবিতার শব্দ কী দ্যোতনা তৈরি করে। তাদেরকেই আমার কাছে কবিতার প্রকৃত শ্রোতা মনে হয়, কারণ তারা কবিতাকে এর প্রচলিত দাঁড়িপাল্লায় রেখে ওজন করেন না। অন্যদের মত তারাও কবিতার ভালো-মন্দ বিচার করতে পারেন বলে আমার সব সময়ই মনে হয়। বুঝতেই পারছেন প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার বা স্বীকৃতি আমার কাছে কতটা মূল্যহীন। 

যদিও আপনি কিছুটা আলোকপাত করেছেন, কেন দীর্ঘদিন কবিতা থেকে দূরে সরে ছিলেন। এই বিষয়ে যদি আরও কিছু বলেন, এই ফিরে আসাটা নিয়ে। 

কবিতার টানেই ফিরে আসা কিন্তু আমি যেহেতু অপ্রচলিত ধারার কবি আমার ভিজিবিলিটি কম। সেইরকম কবিতা এখন আর তেমন দেখি না, যেসব কবিতা লিখেছেন পল ভেলেরি, জর্জ অপেন কিংবা আর্থার রিম্বড। এখন কবিরা হয়ে গেছে পেশাজীবী। তারা ডিগ্রি নেয়, বই প্রকাশের পেছনে দৌড়ায়, কে কত বড় কাগজে কবিতা ছাপবে সেই ধান্দা করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়, কবিতা নিয়ে পাণ্ডিত্য করে। আজকের কবিরা কবিতাকে একটি একাডেমিক ছাঁচে বন্দি করে ফেলেছে। কবিতার ভালো-মন্দ তারা একাডেমিক মাপকাঠিতে নির্ধারণ করে। নানান কারণে আমি তা করিনি বা করতে পারিওনি। আমার সেই সুযোগও ছিল না। একাডেমিক কবিরা কবি হিসেবে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক নিরাপত্তা উপভোগ করে, বলতে পারেন আমি তাদের সেই নিরাপত্তাকে কিছুটা ঈর্ষাই করি।

কবি হিসেবে আপনার উল্লেখযোগ্য অতৃপ্তিটা কী?

অন্য অনেক কবির মতো আমিও মনে করি কবিতা আগে অনেক বেশি জীবন ঘনিষ্ঠ ছিল, গণমানুষের কাছাকাছি ছিল, এখন তা অনেক বেশি বিশেষায়িত এবং অল্প কিছু শিল্পবোদ্ধা মানুষের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। জীবনের অভিজ্ঞতাকে আলিঙ্গন করার আগেই হাইস্কুলে বা কলেজে জোর করে দুর্বোধ্য কবিতা পড়ানো হয়। সেই কবিতার অর্থ তারা বোঝে না। মানুষের জীবন থেকে উৎসারিত পূর্ণাঙ্গ শিল্পবোধ হচ্ছে কবিতার উপযুক্ত জায়গা। ভাষার সর্বোচ্চ শক্তিকেই কবিতায় নিষিক্ত করা হয় যেমন চিত্রকর তার রঙের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার করেন ছবিতে; কিন্তু এটি খুব লজ্জার বিষয় যে আজকের কবিতায় যে শিল্পবোধ সেখানে জীবন খুব কমই খুঁজে পাওয়া যায়। সাকুল্যে একালের কবিতা নিয়ে এটিই আমার অতৃপ্তি। 

জনাথন ওয়েলসের পাঁচটি কবিতা

কবির ভাগ্যরেখা

আজ সকালে এমনভাবে তুমি জেগে উঠবে 
যেন স্নানঘরের উষ্ণ বাষ্পের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা 
এক নারীর শরীর এইমাত্র নেমে গেল তোমার গা থেকে,
যেন ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে একটি পূর্ণ-যৌবনা ক্রেব-আপেল গাছ,
জলকনা-পূর্ণ প্রতিটি পুষ্প 
জ্বলজ্বল করছে অসংখ্য উজ্জ্বল বাতির মতো।

একটি গোল্ডেন রিট্রিভার কুকুর তোমাকে প্রাত্যহিক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে
পথ দেখাবে এমন এক বাগানে 
যেখানে আর কখনোই তোমার পা পড়েনি,
অথচ তুমি শুনেছ, 
ওখানে ফুলেরা দাঁড়িয়ে আছে ফুলের ওপর ভর দিয়ে,
লতাগুল্মের সবুজ সন্ত্রাস, উঁচু উঁচু ফুটে আছে পাথরের কপাল, 
পেঁচার ডানা প্রশ্নবোধক মূর্ছনায় বেজে ওঠে। 
তুমি সেখানে গিয়ে দাঁড়াবে এক অনাবিল প্রশান্তি নিয়ে, 
চাঁদের আলো এসে তোমার পা ধুয়ে দেবে।

খুব ছোট এক ঘটনা আজ রাতে 
তোমার ঘুমের ভেতর পা মাড়াবে, 
বনবেড়ালের চোখ, দেহহীন, ক্রমাগত প্রতিফলিত হবে, 
চায়ের পাতাগুলো উষ্ণ কাপের ভেতর 
প্রাণ পাবে, মেলে দেবে পাতার বিস্তার।

এমন একটি দিন আজ, 
যে কথাগুলো সারারাত তোমাকে কাঁদিয়েছে 
এবং এখনো বেঁচে আছে, 
যারা চোখের ওপর ঝুলেছিল দুঃসহ বাদুড়ের মতো, 
বাধ্য করেছে তোমাকে বাতি জ্বালাতে 
এবং টেনে নিয়ে গেছে জলের গ্লাসের কাছে,
মস্তিষ্ককে গিলে খেয়েছে 
জলাবদ্ধ উঠোনে ক্রমাগত বৃষ্টিপাতের মতো,
এবং শব্দগুলো তোমার কানের ভেতর 
প্রতিধ্বনিত হয়েছে যতক্ষণ না ওদের অর্থ বদলে গেছে,
সেই শব্দগুচ্ছের প্রতিটির জন্য তোমাকে এখন 
দেওয়া হবে কাড়ি কাড়ি ডলার।

তুমি ওদের পাহারা দেবে,
যেভাবে তুমি কুঁজো হয়ে ডেস্কে গিয়ে বসো, কবি,
পাতলা কাগজ এবং অক্ষর ও রেখায় পূর্ণ কাগজ,
দেয়াল হাতড়ে রঙ খসে পড়া জলের পাইপগুলো ঢাকার চেষ্টা,
অথচ খসে পড়া পলেস্তরা ছাড়া আর কোনো রঙই অবশিষ্ট নেই।

পরের জন্মে তুমি জলাধার ও বাঁধের নির্মাণ-শ্রমিক হবে 
এবং ঘুমাবে তোমার ভেজা লাঠি নিয়ে। 
পরের জন্মে তুমি রঙমিস্ত্রি হবে এবং খুব লম্বা।

পরের জন্মে তুমি থোড়াই শব্দের কোনো মূল্য দেবে।

পরচুলার দোকান 

আকাশ ছিল নিচে। লোকটির মাথা দুঃখদের ফুলদানি, 
সে পূর্ণ করতে চেয়েছিল পুষ্পগুচ্ছে।
সে তখন এক পরচুলার দোকানে ঢুকে পড়ে।
দোকানি মেয়েটি বলে, ‘এটা পরে নিন, এর নাম অগ্নিমন, 
ও ছাইকে গনগনে আগুন বানিয়ে দেয়। 
প্রমিথিউস তখন এটাই পরতেন, 
লোকে বলে, দেবতারা ওকে সহানুভূতির জন্য শাস্তি দিয়েছিল এবং 
ও খুব সামান্যই টের পেয়েছিল ওর নগ্ন পেটে 
নেমে আসা ঈগলের নখ।’

‘এটা বসন্তের একটি শিক্ষামূলক গল্প ছিল লোকেদের কাছে,
এবং তা সুখশ্রাব্য ছন্দ ও বহুল উপস্থাপিত বলে সবাই জেনে ফেলেছিল।
কচি ঘাস ও হলুদ ফোর্সিথিয়া ফুলেরা তোমাকে 
ক্রমশ গ্রীষ্মের কাছে পৌঁছে দেবে, 
তোমার অমন তন্বী এবং মেদহীন দেহ; 
তোমার প্রবল ক্ষুধা পুরোটাই গিলেছিল ডেইজি ফুলেরা।’

‘আমি পরে আছি প্রেমের মুকুট’ মেয়েটি তখন বলে, 
‘কেননা প্রেম কখনো শেলফে সাজিয়ে রাখার পুতুল নয়। 
ওকে অঙ্গে ধারণ করতে হয়, এবং অন্যকে পরাতেও হয়। 
এবং প্রেম শুধু ধারণ করলেই হয় না, ওকে গ্রহণও করতে হয়, 
বিশেষ করে যখন হাতে সময় খুব কম এবং দাহকাল চলে। 
ধরো’ মেয়েটি পুনরায় বলে, 
‘এটা মাথায় পরো এবং আলোর নিচে দাঁড়াও।’

আমার ঠোঁটে 

সে যখন ঘুমুবার আগে আমার ঠোঁটে চুমু খায়
আমি ভাবি চুমুগুলো সে দেয়নি;
অনাগত শিশু, শূন্য খাতা,
অপার সম্ভাবনার রাস্তা।

জন্ম না হওয়া চুমুগুলো একটি কবিতা।
ওদের ঠিকানা আর কোথায় বলো
যদি না তা আমার তৃষ্ণার্ত ঠোঁটে।

প্রেমের দেহ

প্রেম তার সব শর্ত মেলে ধরে
যেন এটা এক শান্তিচুক্তি। 
প্রেম হচ্ছে এটা কিন্তু ওটা নয়,
ওটা কিন্তু এটা নয়।
প্রেম তো এটাই, যা চিরকাল ছিল।

কিন্তু বিভক্ত পাহাড়ে কোনো শান্তি নেই,
যেখানে ফল-বাদুরেরা আলোর রেখায় বিচ্ছুরিত। 
ফাটলের ভেতরে কোনো শান্তি নেই
যখন তাপের দাহ চেপে ধরে রাতের নীল মোমবাতি।

সৈকতে বাদামি পত্রালীর প্রান্তরেখাই
বাতাশের দেহ।

সূর্যের আলোতে একটি কাক কা কা করে,
যেন ওর চিৎকারই ভোর।
আমাকে প্রতিটা নোট ভালো করে শুনতে দাও।
আমি কীভাবে ভোরের ঐশ্বর্য ভালোবেসেছিলাম?

এপ্রিলের সকাল

তুমি সে-জীবনযাপন করছ, যা চেয়েছ তুমি, 
কিন্তু আসলে কী জানো প্রকৃতপক্ষে তুমি তা পাওনি।
যে স্পর্শের অনুভূতি তুমি ছুঁতে চেয়েছ সর্বদা,
এমন কী তোমার চিন্তার তীরগুলো তাকে
মোটেও ঘায়েল করতে পারেনি,
তোমার হাতেরা তা কিছুতেই বলতে পারেনি,
কেমন ছিল তার অবয়ব।

এই রোববারে বৃষ্টিরা আবারও 
শীতল এবং ভীষণ অনড়,
কিন্তু জানালাটা আজও বেশ খানিকটা ফাঁক করা
এবং কোথাও কাছাকাছি দালানগুলোর ফাঁকে বিমূর্ত পাখির ডাক
কেননা পঞ্জিকা ঠিক ঠিক ঘোষণা করেছে নতুন বসন্ত,
এবং গৃহের যে জায়গাটিতে বসে তুমি বই পড়ছ
তা এখনো সেই শূন্যতায় পূর্ণ, যা তোমাকে ভালোবাসত,
এবং আজ সেই দিন, যখন তোমার জন্ম হয়েছিল।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //