পরিণতি

এমন কেউ ছিল না তখন, এই বিষয় তাদের অজানা ছিল। তবুও পাড়ার দুই এক ঘর, যারা জানত না তেমন কিছুই, অথবা আগ্রহ নিয়েও বলত না যে- ‘ছিঃ ছিঃ এ কেমন কথা! ঘেন্নায় মরি’।

তখন অমন ব্যক্তকারীকে যদি সত্যিই আমি পেতাম, তাহলে বলতাম ওরা নিতান্তই ভদ্র লোক ছিলেন, নয়তো বা খুব অসামাজিক। কারণ, রইসদার রাসলীলার কথা বাতাসের মতোই ছড়িয়ে ছিল পুরো পাড়ার আনাচে আর কানাচে। শুধু শব্দের ভিন্নতা ছিল এই যা। কোথাও ঘরের দাওয়ায়, কোথাও পুকুর ঘাটে। কখনো কখনো হাটে বাজারে প্রবীণদের মুখে দারুণ আহাজারি শোনা যেত- ‘আহা রে, অমুন ছেলেটার মাথাটা কোন রাক্ষুসী খেলো রে?’ শোনা যেত আবার তাদের পাশ থেকে কিছু নবীণের দল আওয়াজ করে বলতে- ‘রাক্ষুসীর কী দোষ নিজ মাথা সমর্পণ দিলে!’

এই দোষ অদোষের ধার ধারত না সে। এ যেন ছিল আরাধ্যের আরতি ওই বাড়িটিকে মন্দির করে কোনো এক দেবীর পূজোয় রইসদার অহর্নিশি। যেন এর বাইরে আর কোনো পৃথিবী এবং মৃত্যু নেই। এখানেই সব। শরীরকে কেন্দ্র করে অমৃত জীবন। যে জীবন তাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে অন্য জীবনে। সেই নারী দেবী না কি রাক্ষুসী ছিল তা আমার জানা নেই। তবে দেখতে যে সে একেবারে প্রতিমা স্বরূপ ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ হয় না। কী নাক! কী চোখ! পাকা গায়ের রং! মিষ্টি করে হাসে! দেখে বোঝাই যায় না সে কারও জননী এবং সেই সন্তান তার কাঁধ ছুঁই ছুঁই করে বেড়ে উঠছে শিগগিরই।

সেবার ফুপু আম্মার, মানে রইসদার মায়ের হাসপাতাল ঘুরে আসার পর তার সঙ্গে দেখা হলো আমার। ভদ্র মহিলা স্বামী সন্তান সঙ্গে নিয়ে দেখতে এসেছিল ফুপু আম্মাকে। আমাকে দেখা মাত্রই খুব আদবের সঙ্গে সালাম দিলেন এবং বিনয় করে জানতে চাইলেন আমি কেমন আছি। তার সালাম দেখে তার ছেলে মেয়ে দুটিও সালাম দিয়ে বসল। এবং তাদের পেছন দিয়ে তার স্বামীটিও। আমি ওয়ালাইকুম সালাম বলে ভদ্র লোক সেই মুহূর্তেই তার স্ত্রীর কাছে জানতে চাইল আমি কে? স্ত্রী বলল, ‘উনি রইস ভাইয়ের মামাতো ভাই। কেন উনার কথা মনে নেই আপনার? রইস ভাই কিন্তু উনার কথাই বলে।’ ভদ্র লোক হাসি সমেত চেয়ে আমায় বলল, ‘ভালো আছেন?’ তার মুখের ভাবভঙ্গী এমন যে, জীবনের এই প্রথম আমায় দেখল। যেন এর আগে আর কোনো দিন দেখা হয়নি আমাদের। অথচ তার সঙ্গে প্রায় দিনই টং চায়ের দোকানে অল্প বিস্তর আলাপ হতো আমার।

রইসদা’র সঙ্গেই কী এক কাজ করত সে। তাই তাকে চিনতে তেমন অসুবিধে হয়নি। তার নামও মনে আছে, মঞ্জুর। আমি খুব আনন্দ নিয়ে বললাম, ‘জ্বি, ভালো আছি মঞ্জুর ভাই। আপনিও নিশ্চয় ভালো?’

সে খুব সুখী ভাবে বলল, ‘জ্বি, জ্বি, ভালো আছি’

আমি বললাম-‘দাঁড়িয়ে আছেন যে! আসুন! বসুন না এখানে!’ মঞ্জুর সাহেব হাস্যোজ্জ্বল মুখ নিয়ে আমার পাশে বসে স্ত্রীর সঙ্গে চোখ চাওয়া-চাওয়ি করল। তাদের উভয়ের চোখে কাজল পরা। জীবনের ওই প্রথম কোনো পুরুষকে কাজল পরতে দেখেছি। তাঁর স্ত্রীর মতো তাঁরও ফর্সা মুখে চোখ দুটি কালো ফুলের মতো ফুটে উঠেছিল। কী পরিপাটি স্ত্রীর সঙ্গে সেও সেজেছে। এমনিতেও লোকটি পরিপাটি। সে নতুন একটি পাঞ্জাবি পরে এসেছে। পাঞ্জাবিটিতে বেশ মানিয়েছিল তাকে। নতুন জামাই দেখতে যেমনটা, কিছুটা ঐরকম ঠেকছিল। 

আমি কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তাকিয়ে থাকতে বেশ ভালো লাগছিল। একটা সরলপনা মনে হয় খুঁজে পাচ্ছিলাম তাদের ভেতর।

ভদ্র লোক স্ত্রী সন্তানদের সঙ্গে আলাপে ব্যস্ত। মাঝে মধ্যে আমার দিকে খেয়াল করে আবার আলাপে ঢুকে পড়ে। আলাপ খুব বেশি নয়, হালকা পাতলা কথাবার্তা। কথার ভেতর বার কয়েক মঞ্জুর স্ত্রীকে অনুরোধের সুরে বলে, ‘পুষ্পা খাতুন ভাইয়ের বাড়ি এসে এভাবে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে? তোমার ভাইয়ের বাড়ি তুমি না বসলে আমরা বসি কী করে!’

ওইবারের মতোই পুরুষ চোখের কাজল দেখার মতো প্রথম জানলাম এবং বুঝলাম এই সেই নারী, যার নাম পুষ্পা। আর এ-ই সেই, যে নাকি রইসদার ধর্ম বোন।

আমি ধর্ম বোনের যুক্তিটা তখন বুঝতাম না। অবশ্য এখনো বুঝি না। সে অন্য প্রসঙ্গ। 

যা হোক, পুষ্পা ছাড়াও রইসদার ঘরে নিজ মায়ের পেটের একটি বোন ছিল। রুনু তাঁর নাম। 

রুনুর সঙ্গে এতক্ষণে কোনো কথা হয়নি আমার। রুনু ফুপু আম্মার খাটের কোণায় চুপচাপ পা ঝুলিয়ে বসে আছেন, ভীষণ মন মরা ভাব নিয়ে।

আমি এখান থেকে উঠে গিয়ে ফুপুর কাছে এসে ওঁকে বললাম, ‘কীরে প্যাঁচার মতো অমন করে বসে আছিস কেন?’

ওর এক জোড়া চোখ আলতো করে আমার দিকে উঠিয়ে আবার অমন করেই নামিয়ে নিল। আমি ফুপু আম্মার কাছে জানতে চাইলাম, ‘কী হয়েছে ওঁর?’

ফুপু আম্মা কর্কশ গলায় উত্তর দিলেন, ‘ঢং হয়েছে’।

কিন্তু ঢংয়ের কারণটি আমার কাছে বোধগম্য হয়নি, আর আমিও তা আগ বাড়িয়ে জানতে চাইনি। তবে যতটুকু সময় ছিলাম অতটুকু সময় কারও সঙ্গে কথা বলতে দেখিনি রুনুকে। শুধু চলে আসার সময় একবার বলেছিল, ‘খেয়ে যাও!’

ফুপু আম্মাও বলেছিল, ‘থাক না! খেয়ে যা। তোর ভাই আজ অনেক বাজার করছে’, কথাটায় তাঁর মুখে শুনে সুখ পাওয়া যাচ্ছিল না। কেমন যেন ছাড়া ছাড়া লাগছিল। এরপর তাদের খোঁজখবর বেশ কিছুদিন আমার কাছে ছিল না। যদিও ফুপুরা আমাদের পাড়াতেই থাকতেন, তবুও কেন যেন ফুপু আম্মার খবর নেওয়া হয়নি। আর রুনুও অনেক দিন আসেনি এ দিকটায়। ভাবতে না ভাবতেই সেই দিন ফুপু ভর দুপুরে হাজির হলো বাড়িতে। তার শরীর সুস্থ নয়। রুনু ফুপুর সঙ্গে এসেছে। রুনু মেয়েটা খুব বুদ্ধিমতি। আমরা ওঁকে বুড়ি ডাকতাম; কিন্তু ওঁর স্বভাবের কোথাও বুড়ি ছিল না। খুবই শান্ত প্রকৃতির ছিল। কথায় কথায় মিষ্টি করে হাসত। আমি রুনুকে দেখে কিছু বলার আগেই ফুপু আম্মা বলতে শুরু করলেন, ‘হারামি শয়তান কী পেলো- অ্যাঁ! আজকে মাস খানেক হয়ে যায় একটি টাকাও দেয় না ঘরে। কে খেলো, কে না খেলো তার কোনো খোঁজ খবর নেই। আরো ঘর থেকে লুটে নিয়ে যায় বান্ধবদের বিলানোর জন্য।’ আব্বা কৌতূহলী চোখে বোনকে বলল, ‘কী হয়েছে? কার কথা বলছেন?’ ফুপু আম্মা বললেন, ‘কার কথা আবার! আমার পেটে দানবীর হাতেম তাঈ জন্মেছে নাহ, তার কথা বলি। টাকা পেলেই তো সে মুঠভর্তি করে এদিক পথ দেয়। তারপর আর হদিসই নেই।

কেন, এদিকে তোর কোন মধু রাখা? কোন নাড়ি গেঁড়েছে এখানে? এইত মাত্রও পকেটভর্তি কতগুলো টাকা নিয়ে দৌড় দিলো এদিকে।’ আব্বা সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করে বলল, ‘আপনি কী বুঝাইতে চান?’ ফুপু দ্রুত করে বললেন, ‘কিছুই বুঝাতে চাচ্ছি না। যেখানে পেটের সন্তানই বুঝে না, সেই জায়গায় অন্যে কী বুঝবে!’ বলেই- ফুপু আম্মা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। রুনু মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেলো তাঁর পিছু পিছু। আব্বা তখন বোনের  কথায় ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলেন। কারণ ওই সময়টা আমাদের জন্য ভালো ছিল না। একটু আর্থিক অনটনে যাচ্ছিল তাই অর্থ নিয়ে অনর্থক দোষারোপ, মানে সন্দেহের বসে বলাটা অসম্মানেরই ছিল। এর দু’দিন পর এক সন্ধ্যায় আব্বা রুনুকে ডাকিয়ে এনে বললেন, ‘কী হয়েছে তোদের সংসারে?’

রুনু একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘কই, কিছু হয়নি মামা।’আব্বা বলল, ‘কিছু না হওয়াটাই ভালো। তবে কিছু হওয়ার মতো অনেক কিছুই হচ্ছে রুনু। তোর মায়ের মতো মানুষের চোখ তো বন্ধ নয়। মানুষ অনেক কিছুই দেখে এবং বলে। তোদের চোখ তো কেবল আমার ওপর। শোন একটা কথা বলি- আমার অভাব আছে বলেই শুধু আমার ওপর চোখ রাখিস না! কপাল পোড়ার আগে তোর মাকে বল চোখটা ঘুরাতে!

রইস ওই বাড়িতেই আছে। খোঁজখবর নিয়ে দ্যাখ, সে নিয়মিত ওখানে যাতায়াত করে। ওঁকে এইমাত্র দেখে এলাম বাজার দিয়ে সেই সুন্দরী মহিলাকে রিকশায় নিয়ে ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে।’

রুনু জানতে চাইল- ‘কোন মহিলা?’

আব্বা বলল, ‘সেদিন যে বেড়াতে এসেছিল তোদের ঘরে তার কথা বলছি।’ রুনু কোনো রা করল না। আব্বাও কথা বাড়ালো না আর, তারপর রুনু যাওয়ার জন্য উদ্যোগী হয়ে উঠে দাঁড়ালে আব্বা বলল, ‘মহিলা তোদের কী হয়?’

রুনু একটু চুপ করে থেকে আসতে করে বললেন- ‘জানি না মামা।’ পরদিন সকালে রইসদার দেখা মিলল গিয়ে পুষ্পার বাড়িতে। তখনো বাড়ির কেউ ঘুম ভেঙে ওঠেনি। একটা আসবাবপত্র শূন্য প্রায় ঘরে বড় করে বিছানা পাতা। ও বিছানায় সারিবদ্ধ হয়ে শুয়ে আছে সবাই। প্রথমে পুষ্পা। তারপর তাঁর স্বামী মঞ্জুর। তারপর মেয়ে। তারপর ছেলে এবং রইসদা।

ফুপু আম্মার গলা তুলে ডাকতে হলো না। দরোজার সামনে ছেলের জুতো জোড়া দেখে শুধু বলল, ‘ঘর থেকে বেরিয়ে আয় রইস!’ এবং এ কথাটি আর দ্বিতীয় বার বলতে হলো না তাঁর। রইসদা লক্ষ্মীমন্ত ছেলের মতো বেরিয়ে এলো। যেন সারারাত ঘুমায়নি সে, সজাগই ছিলেন। 

দরোজার ফাঁক দিয়ে পুষ্পার পা জোড়া দেখা গেল। কী উজ্জ্বল হয়ে ফুটে আছে। খুব সহজেই বোঝা গেলো পা জোড়া পুষ্পা ছাড়া অন্য কারও না। এ দৃশ্য ফুপু আম্মার চোখে এক ঝলক খেলে গেলো।

সেই মুহূর্তেই রইসদাকে ফুপু বলল, ‘এই বাড়িতে তোর কী?’

রইসদা কিছু বলল না। 

‘শিগগিরই বাড়ি চল’ বললেন ফুপু।

রইসদা মাথা নিচু করে আসতে করে বলল, ‘তুমি যাও, আসছি।’

ফুপু আম্মা চড়া গলায় বলল, ‘না এক্ষুণি যাবি!’

রইসদা ওই শান্ত গলায়ই বলল, ‘তুমি যাও আমি আসছি।’ সে ওইবেলা আর বাড়ি ফেরেনি। সোজা ডিউটিতে চলে যায়। টাকা পয়সা ফুরিয়েছে হাতের। তার যে এক চাকরি ছিল তখন কী এক পরিবহনে, সেখানে যাওয়া হয়নি বেশ ক’দিন। বেশ অনিয়ম করছিল। চাকরিটা ভালোই ছিল। সকালে ফিটফাট হয়ে যেতেন আর ফিরতেন দুপুরে। দুপুরটা খাওয়া-দাওয়ার পর আরাম করে আবার যেতেন বিকেলে। তারপর ফিরতেন রাতে। প্রতিবারই ফেরার পর মায়ের হাতে টাকা দিত রইসদা। এসব ছিল বাড়তি কামাই। ফুপু আম্মা জানতে চাইলে বলতেন, ‘এমনটা নাকি হয় এসব কাজে। এগুলো হলো উপরি পয়সা।’ আরও বলতেন, ‘তুমি চিন্তা করে কী করবে? তুমি শুধু খাও আর শখ মেটাও।’

ছেলের কথায় চোখ গড়িয়ে কয়েক ফোঁটা পানি পড়ত মাটিতে। ভাবত, এই আমার সে ছেলে! পোড়ামুখো আত্মীয়রা কেমন অকর্ম বলে অবহেলা করেছে। বলেছে, ‘এ বাপের মতোই কুলাঙ্গার আর অপদার্থ শ্রেণির হবে।’ ‘আসলে কী তাই হয়েছে? মিছেমিছি আমিও কত সায় দিয়েছি ওদের কথায়।’ ফুপুআম্মা চোখ মুছে টাকার গোছাটা হাতে নিয়ে কাছে দাঁড়িয়ে থাকা রুনুর হাতে দিতেন। রুনু তা মায়ের বাক্সতে নিয়ে রাখত।

এই বাক্সটি পরবর্তী সময়ে রইসদার কাছে হয়ে উঠেছিল অফুরন্ত রত্ন ভাণ্ডার। এমনটাই ভাবত রইসদা। যেন হাত দিতেই গুপ্তধন উপচে আছে। আর রুনুর জন্য হয়ে উঠেছিল এ ভাণ্ডার বিতর্কের বস্তু।

ফুপু আম্মা আরো অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। ইতোপূর্বে আমরা অনেকেই জেনেছিলাম তার শরীরে ক্যান্সারের বাস। এবং এই ব্যাধি ভীষণ জোরালো ভাবেই এগিয়ে গেছে। খবরটি রইসদার অজানা ছিল না। জানত রুনুও; কিন্তু তা মাকে বুঝতে দিতো না। প্রতি সকালে রুনু মায়ের কপালে হাত রেখে বলত, ‘মা কালকের চেয়ে আজ তুমি ভালো আছ। জ্বরটা কমে এসেছে। এরপর চট করে বলত- ‘আমি তোমায় কী বানিয়ে দিই?’

ফুপু আম্মা হেসে বলত, ‘তুই যা রান্না করবি তাই খাবো’

-‘সত্যি বলছো তো?’

-‘হ্যাঁ, সত্যি।’

ফুপু আম্মা জানতো মেয়ে তাঁর জন্য কী রান্না করে আনবে। মেয়ের সাধ্য বা কী! দুটো লাল আটার রুটি আর অল্প একটু খানি ভাজি- ওইটুকুর জন্যই ফুপু আম্মা প্রস্তুতি নিতো। খাবার কাছে এলে এক দুই বার মুখে দিয়ে বলত, ‘রেখে দে মা! আবার পরে খাবো। ভালো লাগে না এখন।’ রুনু সামান্য রাগ জড়িত গলায় খাবার তুলে নিতে নিতে বলত, ‘তোমার আর খেতেই হবে না। একবার নিজের দিকে তাকিয়ে দেখেছ? কেমন হাড্ডি সার হচ্ছো দিন দিন।’

ফুপু আম্মা কথা পাশ কাটিয়ে গিয়ে বলতেন, ‘রইস কী কাজে গেছে আজ?’

-‘আমি তাঁর কী জানি! তোমার ছেলে তো রাতে বাড়িই ফেরেনি।’

-‘আজও ফেরেনি!’

রইসদা যে বাড়ির পথ ভুলতে বসেছে তা ফুপু আম্মার চেয়ে ভালো আর কে জানে। মায়ের মন সব বলে দেয়; কিন্তু অনিয়মের কারণে যে ততদিনে ছেলের চাকরি খোয়া গেছে সেটি তারা কেউই জানত না। যত দিন না সে টাকার প্রয়োজনে বাড়িতে এসে হাঙ্গামা শুরু করল।

সেই সময় রইসদা মায়ের কোনো নিষেধ শুনত না। টাকা পয়সা হাতে নিয়ে তারপর আবার ছুটে যেত পুষ্পার কাছে। তারপর তারা ঘুরে বেড়াত, সিনেমা দেখত, গল্প করত এবং আরও কত কী। তারা এক দিন আমার চোখেও পড়ল। রিকশায় চেপে ভেসে যাচ্ছে দুজন। কী হাসির ফোয়ারা ছিল তাদের মুখে। আর ওই মহিলাকে লাগছিল যে কোনো তরুণীর চেয়ে উত্তম। ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, আগের মতোই চোখে কাজল আঁকা এবং চুলে গোঁজা ছিল রক্তজবার ফুল। দিনের আলোতেও পুরো পথ কেমন জ্বল জ্বল করে যাচ্ছিল। ওদিকে ফুপু আম্মা বিছানা নিয়েছে। রুনুর স্কুলে যাওয়া বন্ধ। তা মায়ের অসুখের কারণেই হোক আর ভাইয়ের জন্য লোক নিন্দার কারণেই হোক, যাওয়া আর হয় না।

বিভিন্ন মানুষ দেখতে আসত ফুপু আম্মাকে। যেহেতু তাঁকে সকলে ভালো জানতেন। তাঁর প্রতি সকলেরই একটা সহানুভূতি কাজ করত। বলত- ‘আহারে তাঁর কপালে আর সুখ হলো না। বিয়ে হয়েছিল এক অমানুষের সঙ্গে, কতগুলো সন্তান জন্ম দিয়ে অন্য জায়গায় বিয়ে করে বসল লোকটি। আশা করেছিলাম ছেলেটি বুঝি মানুষ হলো। অথচ হয়েছে বাপের দ্বিগুণ বদমাশ। এমন মৃত্যু পথযাত্রী মায়ের কোনো খোঁজই নেই তাঁর। সে অন্যের স্ত্রীকে নিয়ে কী দারুণ সুখ বিলাসে আছে। এটা তো ঠিক নয়, ভারি অন্যায়ের কথা!

এবার এর একটা বিহিত প্রয়োজন।’ আর হলোও তাই। পাড়ার সকলের সম্মতিক্রমে পুষ্পার মহল্লা ছাড়বার সিদ্ধান্ত দেয়া হলো। এবং রইসদাকে বাধ্য করা হলো সে যেনো ওমুখো না হয়। তেমন করেই চলল সব; কিন্তু পুষ্পার এলাকা ছাড়বার দিন দুয়েক আগে ঘটে গেলো অন্য ঘটনা। এক মেঘলা বিকেলের শেষ ভাগে রইসদা তাঁর নিজ বাড়িতে এসে দাঁড়াল। সঙ্গে দাঁড়াল শ্যামবর্ণের ছিমছাম একটি মেয়ে। মেয়েটিকে রুনুর চিনতে কষ্ট হলো না। ও পুষ্পার মেয়ে। 

রুনুকে দেখে রইসদা হাসি মুখে বলল, ‘রুনু আমরা বিয়ে করেছি। ও তোর ভাবি। মাকে বল বরণ করে নিতে!’ রুনু রইসদা’র কথায় হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর এক ছুটে ঢুকে এলো ঘরের ভেতর। রুনুকে দেখে ফুপু আম্মা ভাঙা ভাঙা গলায় বলল, ‘দরোজাটায় খিল দে রুনু!’ রুনু মায়ের চোখের দিকে তাকালে সে শরীরের শক্তি দিয়ে বললেন- ‘যা বলছি তাই কর! আর ওঁকে বলে দে, মৃত্যুর পরেও যেনো আমার মুখ না দেখে! আমার সব দাবি থেকে ওঁকে মুক্তি দান করলাম।’ রুনু খিল দেওয়ার পরও দরোজার ওপারে সব কথা ভেসে গিয়েছিল। এর কিছু দিন পরেই ফুপু আম্মা মারা যান। তাঁর মৃত্যু সংবাদ আমরা কেউই রইসদা’র কাছে পৌঁছুতে পারিনি। কারণ, বিয়ের রাতেই সে নব বিবাহিত বউসহ রইসদা পুষ্পাদের অঞ্চলে চলে যান; কিন্তু যখন রইসদা মায়ের মৃত্যু সংবাদ পান তখন কয়েক মাস পেরিয়ে গেছে। তবুও সে সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এসেছিল। ফুপু আম্মার শূন্য খাটটির ওপর উপুড় হয়ে পড়ে ‘মাগো! মাগো! বলে বিলাপ করেছিল। রুনু সামনে যায়নি। পাথরের মতো দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। 

এরপর যে ক’দিন রুনু এ বাড়িতে ছিল ভাইয়ের দিকে একবারও তাকায়নি ভুল করে। এবং বিয়ের পরও এমুখো হয়নি। মূলত, তখন থেকেই রইসদার একা থাকার শুরু হয়। শ্বশুর বাড়ি, মানে পুষ্পাদের বাড়ি ছেড়ে দিয়ে এসেছিল তখনি। সেই সময় মানুষ আরেক আলোচনা পায়। রইস, পুষ্পা, ও তাঁর মেয়েকে নিয়ে যত রকমের অকথ্য কথা আছে সবটাই বলত তারা। অবশ্য এ সমালোচনা রইসদার অপ্রাপ্য ছিল না। হয়তো প্রাপ্যটুকুই বলত তারা; কিন্তু কেন যেন তখন কিছু কথা রইসদার গায়ে এসে লাগত। যা আগে লাগেনি। সেই সময় রইসদা শুধু ঝিমাতো। কারও সঙ্গে তেমন কথা বলত না। কাজের জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু বলত। খুব কষ্টে ছোট একটি কাজ জুগিয়েছিল সে। রোজভিত্তিক কাজ। যেদিন কাজে যেত টাকা পেত, যেদিন যেত না সেদিন পেত না। মানে খাওয়া বন্ধ। খাওয়া দাওয়ায় বেশ কষ্ট করত। সে কষ্ট তাঁর শরীরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। কষ্ট দেখে তাঁর ঘনিষ্ট পরিচিত অনেকেই বলত- ‘অনেক করেছিস জীবনে। এবার একটা বিয়ে করে নে। কোন আশায় বসে আছিস?’ সে আশা পরে সত্য হয়েছিল।

কয়েক বছর পর একদিন হঠাৎ করে পুষ্পার স্বামী মঞ্জুর হাজির হলো সঙ্গে করে তাঁর মেয়েকে নিয়ে। এ মেয়ে তাঁর সেদিনের সেই ছিপছিপে কিশোরী মেয়ে নয়। যে তখন এসেছিল সে এক যুবতী স্ত্রী লোক। মানে রইসদার সেই নাবালিকা বউ মনে হচ্ছিল এক ঝলকে বড় হয়ে এসেছে। দেখে ভীষণ আশ্চর্য হয়েছিল রইসদা। এবং একখানা চকচকে চাঁদ মুখের হাসিতে সেও হেসেছিল। তবে হাসিটা খুব বেশি দিনের জন্য স্থায়ী হয়নি। বছর খানেকের ভেতর সে হাসি ম্লান হয়ে যায়। যখন সেই চাঁদ মুখো বউ পরিচিতদের কাছে তাঁর পুরুষত্বহীনতার প্রশ্ন তুলে চলে যেতে চায়, তখন আর যা-ই হোক সংসার টেকে না। এবং সে কথা বাতাসের বেগে ছেয়ে যায় সমস্ত মহল্লাতে। রইসদা লজ্জায়, দুঃখে তেমন বেরুত না। সেই ছোট্ট কাজটিতে যেত, যেত না। খেতে পেত, আবার পেত না। মানুষ জন হাটে, মাঠে, ঘাটে ঠাট্টা মশকারা টিটকারি দিত। বিদ্রুপ করত সবাই।

আর রাত গভীর হলে মাঝে মাধ্যে শোনা যেত মেয়েদের মতো করে চাপা স্বরে মা! মা! বলে আহাজারি করতে মায়ের ওই খাটটির ওপর।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //