নতুনত্বের ঝামেলা

নিজেকে যতটা চালাক ভাবত জাবেদ, কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল সে এর চেয়েও বেশি চতুর! ঈদ এলে সুবিধা যতটুকু আবার অসুবিধাও ততটুকুই। কিন্তু সুবিধা-অসুবিধায় যদি কাটাকাটি হয় ওর কোনো ফায়দা থাকে না! জাবেদ এখন বড় হয়েছে, সে অনুযায়ী সালামির অঙ্কও বড় হওয়ার কথা; কিন্তু সেটা হয় না; উল্টো যেসব কচি-কাঁচাকে সালামি দিতে হয়- তারাই মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে বসে। না দিয়েও পারা যায় না। কিপটুস মামা, কঞ্জুস চাচ্চু- এমন উপাধি চাউর হয়ে গেলে প্রেস্টিজের জন্য ঝামেলা হতে পারে। এমন বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ মিলবে কীভাবে! ভাবতে ভাবতে নিজেই আবিষ্কার করল কার্যকর পন্থা।

বড় জ্যাঠু, ছোট মামা সালামির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ডোনার। তারা শুরু করেছিলেন দুই টাকা দিয়ে, বাড়তে বাড়তে ঠেকেছে পাঁচশ’ টাকায়। কিন্তু সেটা এই দুর্মূল্যের বাজারে কোনো অর্থই বহন করে না। ক্ষেত্র বিশেষে পিচ্চি-পাচ্চাদের এরচেয়ে বেশি সালামি দিতে হয় জাবেদকেই। জ্যাঠুর বাসা দশ কিলোমিটার দূরে। ঈদের আরও পনের দিন বাকি। তিনি জামা-কাপড় কিনে, বাসা ভাড়া দিয়ে অধিকাংশ টাকা খরচ করে ফেলার আগেই সালামিটা হস্তগত করতে হবে। তাহলে অন্তত ভাগে কম পড়বে না। যে কোনোভাবে অঙ্কটাকে হাজারের ঘরে পৌঁছাতে হবে। জ্যাঠু অনাহূত জাবেদকে দেখে ভ্রƒ কুঁচকে ফেললেন। বললেন, ‘তোমার ব্যস্ততা কমেছে তাহলে?’

‘আমার আবার এত ব্যস্ততা কীসের!’

‘গত মাসে তিনবার কল করে একবারও তোমার সাক্ষাৎ পেলাম না। প্রতিবারই তুমি ব্যস্ততম ব্যক্তি। বাধ্য হয়ে অফিস কামাই করে নিজেই গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির বিল দিয়েছি।’

নিঃসন্তান জ্যাঠু ছোটখাটো কাজগুলো জাবেদকে দিয়ে করানোর চেষ্টা করেন; কিন্তু এসব বিল-টিল জমা দিলে কোনো লাভের মুখ দেখা যায় না বলে জাবেদ আগ্রহী হয় না তেমন। এখন তো বাধ্য হয়েই আসতে হলো। থতমত খেয়ে জাবেদ বললেন, ‘তিনবার আপনি কল করেছিলেন, একবার সর্দি, আরেকবার কাশি, শেষবার জ্বরে ভুগেছিলাম। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আসতে পারিনি। ডাক্তারও বলেছেন কমপ্লিট বেড রেস্টে থাকতে।’

‘অন্য কোনো রোগের টেস্ট নেই তো সামনে!’

‘না। সামনে ঈদ। ভাবলাম, যানজট বাড়ার আগেই আপনাকে সালামটা দিয়ে যাই।’

জ্যাঠু যেন কৌশলটা বুঝে ফেললেন। বললেন, ‘সালাম মানেই তো নগদ সালামি বা ঈদি! ঈদের যেহেতু আরও কিছুদিন দেরি আছে তোমাকে এবার অর্ধেক ঈদি দেব।’

পকেট থেকে ভাংতি নোট বের করে থুতু দিয়ে গুনে তিনশ’ টাকা তুলে দিলেন জাবেদের হাতে। বিমর্ষ মুখে টাকাগুলো নিল জাবেদ। টুক করে জ্যাঠুকে সালাম দিয়ে বলল, ‘আমার বিকাশ নম্বরটা দিয়ে যাচ্ছি। সুবিধামতো সময়ে সালামির বাকি টাকাটা পাঠিয়ে দিতে পারবেন।’

‘সালামির আবার বাকি কী! এসব অনলাইন ব্যাংকিং ব্যবসা শুরু করলে কবে থেকে?’

‘ব্যবসা নয়, জ্যাঠু। সব মানুষেরই দায়মুক্ত থাকা উচিত। চিন্তা করলাম, এবার সবাইকে বিকাশ নম্বর দেব। যানজট-জনজট বেড়েছে, সবার সঙ্গে দেখা করাও সম্ভব হবে না।’

‘দেখা করার দরকার কী! মুরগির রোস্ট খেয়ে বেস্ট ফ্রেন্ডের সঙ্গে দূরে কোথাও বেড়াতে চলে যাও। যাদের টার্গেট করেছ, সবাইকে বলবে তোমার নতুন ঠিকানায় পৌঁছে দিতে!’

ছোট মামা এবার উল্টো সালামি নিলেন। জাবেদকে দেখেই বললেন, ‘দোকানে গিয়ে আমার মোবাইল ফোনে ১২৯ টাকার লোড দিয়ে আয় তো।’

এরপর মামা সালামি তো দিলেনই না, ১২৯ টাকা ফেরত দেওয়ার কথাও মনে রইল না। বিকাশ নম্বরও নিলেন না। বললেন, ‘আমি নগদে বিশ্বাসী। হাজারে বিশ টাকা লোকসান দেওয়ার পক্ষপাতী নই!’ 

‘তাহলে নগদে একটা অ্যাকাউন্ট খুলি?’

‘না। বাকিতে খোল!’

মামাও এভাবে ঠকিয়ে দিলেন! বাবা তো সালামি দেওয়া বন্ধ করেছেন তিন বছর আগ থেকেই। জাবেদ সিদ্ধান্ত নিল সেও এবার সালামি দেবে না। সালামি না দেওয়ার জন্য পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে রাখা শুরু করল। খোলে শুধু ঘুমানোর আগে। ছোটরা কাছে এলে বলেÑ ‘খবরদার, পায়ে হাত দিস না। খোসপাঁচড়া হয়েছে। ক্ষতস্থানে মাছি ভনভন করে। তাই হাই স্পিডে ফ্যান ছেড়ে রেখেছি। যেন মশা-মাছি ডিম পাড়তে না পারে।’

ঈদের সপ্তাহখানেক আগে মেজ ফুপু কল করলেন। বললেন, ‘গতকাল টেলিভিশনে বিতর্ক অনুষ্ঠান দেখেছি- সালামির সামাজিক প্রভাব। সেখানে বলা হয়েছে ১৫ বছরের বড় কাউকে সালামি দেওয়া উচিত না। তাই তোকে এবার কাপড় কিনে দিচ্ছি। সেলাই করিয়ে নিস।’ 

‘সেলাইয়ের টাকাটাও দিয়ে দিও সঙ্গে।’

‘তাহলে তো একই কথা হলো- সালামির কুপ্রভাব!’

কাপড়টা দেখে চমকে গেল জাবেদ। পোশাকের উপরে-নিচে কাপড় কেটে লেখা হয়েছে- ঈদের শুভেচ্ছা রাশি রাশি। এই পোশাক পরে সবাইকে চমকে দেওয়া যাবে। নতুনত্ব আছে। কাপড়টা বেশ বড়ই। মাপ জেনে নিয়ে সোহিনীর জন্যও একটা থ্রিপিস বানিয়ে ফেলল। কল করে বলল, ‘ঈদের দিনে আমরা দু’জনই কিন্তু একই পোশাকে ঘুরতে বের হব।’ 

সোহিনী খুশি হয়ে বলল, ‘আচ্ছা। পোশাকের সঙ্গে ম্যাচিং করে দু’জনের জন্য জুতাও কিনবে কিন্তু।’

‘ঠিক আছে। ফুপুকে বলব...।’

‘কী বলবে?’

এবার নিজের ভুলটা বুঝতে পারল জাবেদ। এই খবর ফাঁস হলে নিজের ইজ্জত থাকবে না। তড়িঘড়ি বলে উঠল- ‘না... মানে... আমাদের বিয়ের বিষয়টা!’

‘অত তাড়ার কী আছে? আমার তো সবে উনিশ চলছে।’ 

‘উনিশে বিয়ে, বিশে সন্তান, একুশে আরেকটা নতুন সন্তান!’

‘যাহ!’

এই ‘যাহ’ শব্দটা ‘যা’-তে পরিণত হলো দু’দিন পরই। পোশাকটা হাতে তুলে দেওয়ার পরই সেটা সোহিনী ছুড়ে মারল জাবেদের মুখে। জাবেদ বলে, ‘কী করছ!’

‘তুমি কী করেছ? দেখ!’

প্রেমিকার বিগড়ে যাওয়ার কারণ খুঁজে পেল না। বলল, ‘সব ঠিকই তো আছে। মাপেও ঝামেলা হওয়ার কথা নয়। টপ থার্টিন টেইলার্স থেকে বানানো।’

এবার খাঁজ কাটা ‘ঈদের শুভেচ্ছা রাশি রাশি’ লেখাটা দেখায় সোহিনী। ঝাঁজাল কণ্ঠে বলে, ‘এমন পোশাক পরে রাস্তায় হাঁটব কীভাবে? আমি সিনেমার নায়িকা! নাকি র‌্যাম্প মডেল?’

‘নতুনত্ব আছে, এজন্যই তোমার জন্য পোশাকটা কিনলাম।’

‘এক নতুনত্ব দেখাতে গিয়ে ভাইয়ার কাছ থেকে বিকাশে সালামি চেয়েছ। এখন আমাকে সামাজিকভাবে হেয় করার ষড়যন্ত্র! আমিও তোমাকে দেখাব, নতুনত্ব কাকে বলে।’

জাবেদ মিনমিন করে বলল, ‘সেটাই ভালো। সবারই উচিত নতুন কিছু করা!’

ঈদের দিন দুপুরে সোহিনীর কল পেল জাবেদ- ‘শিগগিরই আমড়াতলায় চলে এসো।’

ফুপুর দেওয়া পোশাক পরেই হাজির হল জাবেদ। সোহিনী এসেছে অন্য পোশাকে; কলাপাতা রঙের পোশাকে পুরোই কলাবতী; কিন্তু সঙ্গের ছেলেটা কে! 

চোখের ভাষা পড়তে পেরেই বোধহয় সোহিনী বলল, ‘বান্ধবী যখন প্রেমিক লইয়া রঙ্গ কইরা হাঁইট্টা যায়... গানটা শুনেছ তো?’

‘না। আমি প্যারোডি গান পছন্দ করি না।’

‘আমিও নকল পছন্দ করি না। নতুনত্বে বিশ্বাসী।’

‘আমার চমৎকার উপহারটা পছন্দ করনি। কলাপাতাই তোমার বেশি পছন্দ। দেখতেই পাচ্ছি নতুন পোশাকটা!’

‘পোশাকের কথা বলিনি। মানুষ চোখে দেখ না! এই সুদর্শন যুবকের নাম সায়েম। আমার নতুন প্রেমিক। তোমার কথাই ঠিক, নতুনত্বের দরকার আছে। নতুনত্ব মানে কখনো কখনো নতুন মানুষও!’

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //