তিনটি অর্থহীন রূপকথা

ইউসুফ আল কায়িদ (১৯৪৪) একজন বিশিষ্ট মিশরীয় ঔপন্যাসিক। ‘ওয়ার ইন দি ল্যান্ড অব ইজিপ্ট’ নামের উপন্যাসটি তাকে পশ্চিমা সাহিত্যজগতে বিপুল পরিচিতি এনে দেয়। মিশরের এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করা এই লেখক মিশরেই পড়ালেখা করেন। তার প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা এগারোটি এবং গল্পগ্রন্থের সংখ্যা চারটি। কায়িদের রচনায় অসাধারণ সব ব্যঙ্গবিদ্রুপ সমাজের অসংগতি উঠে এসেছে অত্যন্ত নিপুণভাবে। তার বর্তমান গল্পটি বিশিষ্ট অনুবাদক ডেনিস জনসন-ডেভিস সম্পাদিত ‘দি এঙ্কর বুক অব এরাবিক ফিকশন’ নামক বই থেকে নেওয়া হয়েছে।

বৃথা পারাপার

ধনবান একজন মানুষ বিশাল নদীর তীরে এসে পৌঁছান। তখন নদীর পানি উত্তাল। তিনি শুনতে পেলেন কেউ একজন তাকে লক্ষ্য করে বলে, ‘স্যার, আপনি এখন কি কিছু খুঁজছেন? তিনি জবাবে বলেন, ‘একজন মানুষ খুঁজছি যে আমাকে তার পিঠে তুলে নদীর এ তীর থেকে অপর তীরে পৌঁছে দেবে।’ সঙ্গে সঙ্গে একজন দয়ালু বলবান মানব তার সামনে এসে হাজির। ধনবান মানুষটি লাফ দিয়ে বলবান মানুষটির পিঠে চড়ে বসে এবং চিৎকার করে বলে, ‘সাঁতার কেটে আমাকে নদীর ওপারে নিয়ে যাও।’

বলবান মানুষটি নদীতে সাঁতার কাটতে আরম্ভ করে। নদীর দূরবর্তী ওপারে পৌঁছতে পৌঁছতে বলবান মানুষটা অবসন্ন হতে থাকে এবং প্রায় মারা যায় যায় অবস্থা। ধনবান মানুষটা তীব্রস্বরে তাকে বলেন, ‘আমাকে নিরাপদে নদীর ওপারে পৌঁছানোর আগে মরিও না।’ বলবান মানুষটা প্রতি জবাবে বলে, ‘আপনার ইচ্ছাই আমার আদেশ।’

ধনবান মানুষটাকে সে নদীর ওপারে শুকনা ভূমিতে পৌঁছে দেয় সত্য তবে বলবান মানুষটা সঙ্গে সঙ্গে ওখানেই মারা যায়। মরে যাবার পর সে ধনবান মানুষটার সামনে একটি হাত উপরে উঠিয়ে বিনীতভাবে অনুরোধের সুরে বলে, ‘আমার মজুরিটা দেন দাফনের খরচটা যেন মেটাতে পারি।’ এই কথা শোনার পর ধনবান মানুষটা এমন জোরেশোরে এক লাতি মারেন মৃত মানুষটার হাতটি বিচ্ছিন্ন হয়ে আকাশে উঠে যায়। আর একটি হাত নিয়েই শবদেহটি মাটিতে পড়ে থাকে। শবদেহটি লক্ষ্য করে ধনবান মানুষটা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলেন, “কীসের মজুরি? যদি আমি তোমার পিঠে চড়ে না বসতাম তুমি তো নদীই পার হতে পারতে না। সময় বড়ই কঠিন। তুমি সারা পথে যা করেছ তা অলৌকিক ব্যাপার। আমাকে ছাড়া তুমি তো এটা করতেই পারতে না। তারপরও তুমি মজুরি চাও!” ধনবান মানুষটা রাগান্বিতভাবে নিজ পথে চলে যান। আর নিজের সঙ্গে নিজে বলেন, ‘দুনিয়াতে কী যে হলো? কেন যে গরিব মানুষ ধনবান হতে চায়? এর বিরুদ্ধে কি কোনো আইন নেই?’ 

কে জাহাজ ডুবাল

জাহাজটি মহাসাগর পাড়ি দিচ্ছে। যাত্রীদের কেউ জানেন না জাহাজটি কোথায় থেকে যাত্রা শুরু করেছে অথবা গন্তব্য কোথায়। জাহাজটি কেবল চলছিলই। জাহাজটিতে যাত্রী ছিল শুধু দুই ধরনের : অতি ধনী এবং অতি গরিব। ধনী যাত্রীরা ছিল জাহাজের উপরের কামরাসমূহে এবং গরিব যাত্রীরা ছিল নিচের কেবিনসমূহে। প্রথমদিন ধনী যাত্রীদের একজন মারা যান। ময়নাতদন্ত শেষে ডাক্তার সাহেব ঘোষণা দিলেন, ‘অতিভোজনে তার মৃত্যু হয়েছে।’ ডাক্তার সাহেবের এমন ঘোষণা শুনে গরিব যাত্রীরা বিস্মিত হয়েছেন। তাদের বিবেচনায় এই হলো বর্তমান সময়ের আশ্চর্য ঘটনার একটি। পরের দিন গরিব যাত্রীদের একজন মারা যান। ডাক্তার সাহেব শবদেহ পরীক্ষা-নিরাীক্ষা শেষে জানালেন, ‘অনাহারে লোকটি মারা গেছেন।’ 

ডাক্তার সাহেবের এমন কথা শুনে ধনী যাত্রীরা বিস্মিত হলেন এবং তাদের বিবেচনায় এই মৃত্যু বর্তমান সময়ের আশ্চর্য ঘটনাসমূহের একটি। কিছুদিন পর জাহাজে আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটে এবং জাহাজের উপরের দিকের কামরাসমূহে জীবন একেবারে অসহনীয় হয়ে ওঠে। জাহাজের কাপ্তান, যাত্রীদের আসন পরিবর্তনের একটা তাৎক্ষণিক আদেশ জারি করেন। ধনী যাত্রীরা জাহাজের নিচের কেবিনসমূহে আর গরিব যাত্রীরা জাহাজের উপরের কামরাসমূহে চলে আসেন। জাহাজের এমন অদ্ভুত ঘটনায় ধনী ও গরিব যাত্রীদের সবাই বিস্মিত। তারপর হঠাৎ এক সময় জাহাজের খাবার পানি সরবরাহ ফুরিয়ে যায়। প্রশ্ন দেখা দেয় কীভাবে সুপের পানি সংগ্রহ করা যাবে। জাহাজের গরিব যাত্রীরা বলেন, ‘ত্রাণ না পৌঁছা পর্যন্ত সবার ধৈর্য ধারণ করতে হবে।’ 

এমন সময় জাহাজের ধনী যাত্রীরা হট্টগোল শুরু করেন। জাহাজের কাপ্তান দুটো আদেশ জারি করেন। প্রথম আদেশ হলো যাত্রীদের পুনরায় আসন পরিবর্তন করতে হবে। তাই ধনী যাত্রীরা জাহাজের উপরের কামরাসমূহে উঠে যান। আর গরিব যাত্রীরা নিচের কেবিনসমূহে নেমে আসেন। জাহাজের ধনী যাত্রীরা মন্তব্য করেন এটা হলো চতুর্থ বিস্ময়। ধনী যাত্রীরা তাদের আসন গ্রহণের পর জাহাজের কাপ্তান সাহেব তার দ্বিতীয় আদেশ কার্যকর করতে শুরু করেন। জাহাজের নিচের পাটাতন তুরপুন দিয়ে ফুটা করে যাতে গরিব যাত্রীরা কিছুটা পরিমাণে পানি পায়। তারপর জাহাজটি ধীরে ধীরে ডুবতে শুরু করে এবং গরিব যাত্রীরা কেউ কেউ পানিতে ডুবে মারা যান। এমন ঘটনা ধনী যাত্রীরা কেউ বিশ্বাসই করতে চান না। জাহাজটি ডুবতেই থাকে। জাহাজের নিচের তলা থেকে বুদবুদ করে ওঠা পানি ধনী যাত্রীরা একটু একটু করে গিলতে থাকেন এবং ...। 

ক্ষুধার কল্পকথা

একই বছর দেশের হালচাল পাল্টে গেছে এবং লোকজনের আশা জীবনমান উন্নত হবে। পরিবারের সার্বিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। অবস্থা এতই খারাপ, এমনকি খাবারও মিলছে না। মা তার স্তনযুগল অনাবৃত করেছে। সে গৃহকর্তাকে অবস্থার উন্নতি না ঘটা অবধি ঘুমিয়ে থাকতে বলেছে। তারা এমনভাবে চলবে যেন পরিবারে কোনো লোকজনই নেই। মহিলাটি যাত্রা শুরু করেছে এবং কোনো উদ্দেশ্যহীনভাবে এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করছে। গৃহকর্তা চার বছর ধরে ঘুমিয়ে আছে। সাইরেনের তীব্র আওয়াজ ও দেশপ্রেমিক জাতীয় সংগীতে সে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। সে তার ছেলেমেয়েদের জিজ্ঞাসা করে, ‘তোমরা কি খাবার কিছু পেয়েছ?’ ছেলেমেয়েরা তাকে জানায় সে ঘুমাতে যাওয়ার সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত তারা উপোস করছে। এমনকি তারা সকালের নাশতাও খেতে পায়নি। মা এখনো তার ঐতিহাসিক সফরে আছে। দেশ শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। তারা আশা করছে যুদ্ধ শেষে তারা হয়তো কিছু খাবার পাবে। 

বাবা আবার ঘুমাতে যায়। রাস্তায় রাস্তায় প্রচণ্ড হৈচৈয়ের শব্দে পাঁচ বছর পর সে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। ঘুম থেকে উঠে সে জানতে পারে তার ছেলেদের একজন নিখোঁজ। অন্য ছেলেরা এখনো কোনো খাবার খেতে পায়নি। মা তার ভ্রমণ এখনো অব্যাহত রেখেছে। সমগ্র দেশ ডিম খাওয়ার আগে ভাঙার সবচেয়ে সঠিক উপায় নিয়ে রোমাঞ্চকর বিতর্কে লিপ্ত। তাদের কেউ কেউ বলেন ডানদিকে ভাঙাই ভালো। অন্যরা বলেন, বামদিকে থেকে ভাঙতে হবে। একদল মধ্যপন্থি বলেন, ঠিক মাঝখানেই ভাঙতে হবে। বাবা তাদের যুক্তিতর্ক উপলব্ধি করার চেষ্টা করে তবে তার মন ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে আসে এবং সে আবারও ঘুমাতে যায়। সে ছেলেদের বলে কোনো খাবার পেলেই যেন তাকে ঘুম থেকে ডেকে ওঠায়। তবে কেউ যেন তাকে ঘুমের সময় বিরক্ত না করে। 

আবার ছয় বছর পর সাইরেনের হাহাকার ও রণসংগীত শুনে সে ঘুম থেকে জেগে ওঠে। সে চোখ খুলে দেখে তার আর একটা ছেলে অদৃশ্য হয়েছে। সে জানতে পারে দেশের দূরবর্তী স্থানে শুরু হওয়া যুদ্ধে ছেলেটা শহীদ হয়েছে। দেশের অবস্থা যাচ্ছেতাই। মা তার আবিষ্কারের অভিযানে বাড়ির বাইরে এবং ছেলেমেয়েরা অভুক্ত। শত্রুরা দেশের সীমান্তে পৌঁছেছে এবং যুদ্ধ করতেই হবে। একটা মনমরা নীরবতা ছেলেমেয়েদের ওপর চেপে বসে। বাবা কোনো ধরনের টুঁ শব্দ না করেই বিষয়টা উপলব্ধি করে। সে আবার ঘুমিয়ে যায়। আপাতভাবে তার বায়ুতন্ত্র এই সময়ে আগের একই সংখ্যক বছরের ঘুমের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। তারপর ঘুম থেকে উঠে সে দেখে তার আরও একজন ছেলে নিখোঁজ এবং দেশটা শেষ যুদ্ধে নিমজ্জিত। তাদের জানানো হয়েছে মা ফিরে আসছে। সত্য যে তারা এখনো ক্ষুধার্ত তবে খাদ্য, আশা এবং নতুন জীবনের একটা সম্ভাবনা আছে। অবশ্য তাদের আর একটি বছর মাত্র অপেক্ষা করতে হবে। বাবা আবার তিন বছরের জন্য ঘুমাতে যায়। চারপাশের শব্দে তার ঘুম ভাঙে। সে চোখ খুলে দেখে তার জীবিত ছেলেমেয়েরা একে অপরকে খাচ্ছে। তারা যখন জানতে পারল বাবা জেগেছে তখন মুখ খুলে হাঁ করে তাকায়। বাবা ভয়ে লাফ দিয়ে ওঠে এবং নগরের প্রধান সড়কের দিকে দৌড়ে পালায়। এই অ্যাভিনিউতে শোভযাত্রা ও সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সেখানে সে তার স্ত্রীকে সম্পূর্ণরূপে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখতে পায়। সে আরও দেখতে পায় কতিপয় আগন্তুক তার স্ত্রীর শরীরের বিভিন্ন অংশে খোঁচাখুঁচি করছে। আর তার স্ত্রী এমনভাবে ইন্দ্রিয়বিলাসী হাসি দিচ্ছে যা সে আগে কখনো দেখেনি। তাকে খেতে একাধিক ব্যক্তি এগিয়ে আসে। তাকে রক্ষার জন্য নিজ স্ত্রীকে অনুরোধ করে। 

এই কথা শুনে স্ত্রী চিৎকার করে তাকে বলে, ‘প্রত্যেকে প্রত্যেককে খাচ্ছে এবং তোমাকে খাওয়ার আমার অগ্রাধিকার আছে।’ একমাত্র পুরুষই র্ছিল সে যার শরীরে এখনো পুরো মাংস ও হাড় আছে। সারা অ্যাভিনিউতে লোকজন অন্য লোকজনকে খাচ্ছে এবং কেউ কেউ নিজেরা খাচ্ছে নিজেদের। গৃহকর্তা যা দেখেছে তাতে সে বিতৃষ্ণ। সে চারদিকে ঘুরেফিরে দেখে ঘুমানোর কোনো জায়গা হয় কিনা। চারদিকের অনেক হাত তাকে ঘিরে ধরে এবং অতিলোভী বাসনায় তাকে খোঁচাতে শুরু করে। সেসব হাতে নিজেকে সমর্পণ করা ছাড়া তার আর কোনো বিকল্প নেই। সে তাদেরই উপর শুয়ে পড়ে। লোকজন তাকে উঁচুতে তুলে ধরে এবং প্রধান সড়কে বহন করে নিয়ে যায় ঠিক যেন বিশাল এক শবযাত্রা।


ভাষান্তর : সাদাত উল্লাহ খান

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //