কায়কোবাদ এবং তার আশ্চর্য সৃষ্টিকুশলতা

বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র মহাকবি কায়কোবাদ (পারিবারিক নাম মোহাম্মদ কাজেম আল কোরেশী) ছিলেন ঢাকার জেলা-জজ আদালতের উকিল শাহামতউল্লাহ আল কোরেশীর চার সন্তানের মধ্যে বড়। জন্ম ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে।

ঊনবিংশ শতাব্দীর এমন এক সময় তিনি জন্মগ্রহণ করেন, যখন মুসলিম সমাজে ইংরেজি শিক্ষা একার্থে হারামই ছিল। ফলে তার পড়াশোনার শুরুটা হয় বাড়িতে। আরবি ও ফারসি শিখতে শুরু করেন ঘরেই। সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হওয়ার পরও তাকে ভর্তি করানো হয় ঢাকার সদরঘাটের পগোজ স্কুল ও সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে। প্রকৃত শিক্ষা শুরু হয় মূলত সেখান থেকেই। তবে স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর বছর খানেকের মাথায় মারা যান তার বাবা। ফলে তাকে আবার গ্রামে ফিরে আসতে হয়। ভর্তি হতে হয় মাদ্রাসায়। জ্ঞানচর্চার বিষয়টি তিনি পেয়েছিলেন পারিবারিক ঐতিহ্যসূত্রেই। তার ভেতরে কবিমন ছিল। ফলে মাদ্রাসার পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য তথা কবিতা পাঠে বেশি মনোযোগী হন। গ্রামীণ নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং এই কাব্যপাঠ তাকে কবি করে গড়ে উঠতে সহায়তাও করে। কবিতা লেখা অল্প বয়সেই নেশায় পরিণত হয়, যা আমৃত্যু তার অব্যাহত ছিল।

কবিখ্যাতি লাভ করেন শিক্ষাজীবনেই। ‘বিরহ বিলাপ’ প্রকাশের পর দুটি ঘটনা ঘটে। প্রথম, তখনকার কাশিম বাজারের মহারানি কবিতাগ্রন্থ পাঠ করে দশ টাকা এবং কাশীর ভুবনমোহনী চতুর্ধারিণী পাঁচ টাকা উপহার পাঠিয়ে কিশোর কবিকে অভিনন্দন জানান। ফলে কবির লেখনীস্পৃহা বেড়ে যায় বহুগুণে। দ্বিতীয়টি, গিরিবালা দেবীর ভক্ত বনে যাওয়া। তেরো বছর বয়সী কাব্যরসিক গিরিবালা দেবী ছিলেন জমিদার-কন্যা। কবির বয়স তখন ষোলো। ‘বিরহ বিলাপ’ পাঠ করে তিনি কবির বিশেষ অনুরক্ত হয়ে পরিচিত হওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। পরিচয়ের পর গিরিবালা দেবী প্রতিদিন বাড়ির বালক ভৃত্য ঈশ্বর ভাণ্ডারীর মাধ্যমে কবির জন্য ফুল পাঠিয়ে দিতেন। উৎসাহ দিতেন কাব্য রচনায়। নব উদ্যমে কবিও কবিতা রচনায় নিমগ্ন হন ভক্তের উৎসাহে।

কবি পরে ঢাকায় চলে এলেও মন পড়ে থাকে গ্রামে। বিরহ যাতনা শুরু হয় উভয়ের মধ্যেই। গিরিবালা গ্রাম ছেড়ে একসময় চলে আসেন ঢাকার খিলগাঁওয়ে। প্রেমানলে দগ্ধ কবি পরে গিরিবালার নামের আদ্যক্ষর দিয়ে রচনা করেন ‘ভুল’ নামে কবিতা, যা ‘অশ্রুমালা’ কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কবিতাটি হলো- ‘গি-য়াছিনু প্রিয়তমে প্রেমের নিকুঞ্জ বনে,/রি-ক্ত করে ফিরে এনু না পাইনু ফুল!/বা-তাসে গিয়াছে ঝ’রে, নাই আর বৃন্ত পরে,/লা-বণ্য মাটির সনে হ’য়ে গেছে ধূল।/দে-খিনু সুগন্ধ তার সমীর নিয়াছে ধার/বি-ষাদে হৃদয় মোর মরু সমতুল!’ কবিতাটি রচনা প্রসঙ্গে কবির নিজের বয়ানে বলেছেন- ‘এ কবিতাতে আপনারা গিরিবালা দেবী নাম্নী একটি বালিকার নাম পাইবেন। ইহার বয়স যখন ত্রয়োদশ বৎসর, সেই সময় এই বালিকাটি আমার প্রথম কাব্য ‘বিরহ-বিলাস’ পাঠ করে নিতান্ত মুগ্ধ হয়েছিল। এবং সম্পর্কিত একটি ভ্রাতার দ্বারা তাহাদের বাসায় ডেকে নিয়েছিল। তাহার বাসার নিকটেই আমাদের বাসা ছিল। সেই তাহার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়। সেই অবধি সে প্রত্যেক দিন তাদের ‘ঈশ্বর ভাণ্ডারী’ নাম ধেয় একটি বালক ভৃত্যের দ্বারা আমাকে কিছু কিছু ফুল পাঠাইয়া দিত। সে একজন কুলীন ব্রাহ্মণ জমিদারের কন্যা। ইহা দেখিয়া আমার বন্ধু-বান্ধব এবং আত্মীয়-স্বজন অনেকেই মনে করিতেন, সে আমাকে ভালোবাসে এবং শ্রদ্ধা-ভক্তি করে।

তাঁহার সেই ভালোবাসাতে কোনো কলঙ্ক ছিল না, উহা ছিল নির্মল, নিষ্কাম ও পবিত্র। তার সেই শ্রদ্ধা-ভক্তি ও ভালোবাসা দর্শনে আমার হৃদয়েও একটু স্নেহের সঞ্চার হয়েছিল। তাহাতেই আমার এই কবিত্ব শক্তির উন্মেষ এবং উপরের লিখিত ঐ কবিতাটির জন্ম (মাসিক মোহাম্মদী, মঈনুদ্দীন, মহাকবি কায়কোবাদ সম্পর্কে দু’টি কথা)।

প্রকৃতপক্ষে কায়কোবাদ ছিলেন প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ ও আধ্যাত্মিকতার কবি। তার গীতিকবিতার অধিকাংশই প্রেমনির্ভর। তবে এ প্রেম-ভালোবাসা ছিল নিষ্কলঙ্ক এবং পবিত্র এবং তা রক্ষা করবেন বলে ছিলেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধও- ‘আমাদের ভালোবাসা বিশুদ্ধ বিমল/কলুষের লেশমাত্র লাগিতে না দিব,/পবিত্র পৃথিবী মুখ করিবে উজ্জ্বল/হৃদয় মন্দিরে সদা লুকায়ে রাখিব।’

প্রকৃতি-মনস্ক কায়কোবাদের সৌন্দর্যমগ্নতা ছিল অবর্ণনীয়। প্রেয়সীকে প্রকৃতিবন্ধনে আবিষ্ট করেছেন নানা উপমায়; উপলব্ধিতে তা ফুটে উঠেছে দারুণভাবে- ‘মান ক’রনা প্রাণ প্রেয়সী,-মান ক’রনা প্রাণ আমার/আজকে তোমায় পরিয়ে দেব জুঁই চামেলী ফুলের হার!/এ’স এ’স প্রাণ প্রেয়সী, এ’স আমার হৃদয় মাঝে,/প্রাণ ভরি যে দেখ্ব তোমায়, সাজিয়ে আজ্ ফুলের সাঝে!’ (মান ভঞ্জনের একটি চুম্বন)

সত্যিকার অর্থে কায়কোবাদ ছিলেন খাঁটি বাঙালি মুসলমান। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি। বাঙালি মুসলিম কবিদের মধ্যে প্রথম সনেট রচয়িতাও তিনি। তার কাব্যসাধনার মূলে ছিল পিছিয়ে থাকা মুসলমান জাতিগোষ্ঠীকে তার অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করা এবং তা পুনরুদ্ধারে উদ্বুদ্ধ করা। 

‘কে ঐ শোনাল মোরে আযানের ধ্বনি।/মর্মে মর্মে সেই সুর, বাজিল কি সুমধুর/আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী।/কি মধুর আযানের ধ্বনি!/আমি তো পাগল হয়ে সে মধুর তানে,/কি যে এক আকর্ষণে, ছুটে যাই মুগ্ধমনে/কি নিশীথে, কি দিবসে মসজিদের পানে।/হৃদয়ের তারে তারে, প্রাণের শোণিত-ধারে,/কি যে এক ঢেউ উঠে ভক্তির তুফানে-/কত সুধা আছে সেই মধুর আযানে।’ (আযান)

আজানের সুমধুর ধ্বনি এতটাই সর্বজনীন, যে কাউকে, যে কোনো ধর্মের মানুষকে খুব সহজেই মোহিত করে, মনের ভেতর অন্যরকম আবেশ ছড়িয়ে দেয়। 

কায়কোবাদ মহাকবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও নবীনচন্দ্র সেনের ধারায় মহাকাব্য রচনা করেন। তবে নবীনচন্দ্র সেন ছিলেন তার আদর্শ। তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ অবলম্বনে রচনা করেন ‘মহাশ্মশান’ নামে মহাকাব্য। এ মহাকাব্যে জয়-পরাজয় অপেক্ষা ধ্বংসের ভয়াবহতা প্রকট হওয়ায় নামকরণ করেন ‘মহাশ্মশান’। এটি তার শ্রেষ্ঠ রচনা। এর মাধ্যমেই তিনি অর্জন করেন মহাকবি খ্যাতি।

কায়কোবাদের বারো বছর বয়সে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বিরহ বিলাপ’। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কুসুম কানন’ প্রকাশিত হয় পনেরো বছরে। ‘অশ্রুমালা’ প্রকাশের পর মনোযোগ দেন মহাকাব্য রচনায় এবং ১৯০৪ সালে প্রকাশিত হয় মহাকাব্য ‘মহাশ্মশান’। এরপর রচনা করেন ‘শিব মন্দির’। প্রকাশিত হয় ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে। ‘অমিয় ধারা’ ও ‘শ্মশান-ভস্ম’ কাব্য গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি রচনা করেন বিশাল আয়তনের কাহিনিকাব্য ‘মহররম শরীফ’।

কবির মৃত্যুর বহুদিন পর প্রকাশিত হয় আরও কিছু কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমের ফুল’, ‘প্রেমের বাণী’, ‘প্রেম-পারিজাত’, ‘মন্দাকিনী-ধারা’, ও ‘গওছ পাকের প্রেমের কুঞ্জ’। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিষয় নিয়ে তিনি অসংখ্য কাব্য রচনা করেছেন। তিনি তার কাব্যে প্রচুর আরবি, ফারসি শব্দের কুশলতা দেখিয়েছেন। সবকিছু মিলিয়ে চেতনাগত দিক থেকে কায়কোবাদ ছিলেন সাম্যবাদী মনোভাবাপন্ন এক সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক মানুষ।

১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের মূল অধিবেশনে তিনি সভাপতিত্ব করেন। বাংলা কাব্যসাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য ভূষিত হন নিখিল ভারত সাহিত্য সংঘের মাধ্যমে ‘কাব্যভূষণ’, ‘বিদ্যাভূষণ ও ‘সাহিত্যরত্ন’ (১৯২৫)। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দের ২১ জুলাই তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //