চারুশিল্পী রবীন্দ্রনাথ

বিস্ময়কর রবীন্দ্রপ্রতিভার একটি দিক হলো চারুশিল্পে কবির নিবিষ্ট চর্চা ও অবদান। ছেলেবেলায় ছবি আঁকবার বিষয়ে কোনো শিক্ষালাভ হয়নি তাঁর। কৈশোরে ‘মালতী পুঁথি’তে অপটু হাতে কিছু ছবি এঁকেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেটা ১৮৭৪ থেকে ৮২ সাল পর্বের ঘটনা। 

এই পর্বের আগে ও পরে কখনো কখনো তিনি ছবি আঁকায় মনোনিবেশ করেন। এই তথ্য উদঘাটিত হয় কবির লেখা ‘জীবনস্মৃতি’ এবং ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীর ‘রবীন্দ্র স্মৃতি ও অন্যান্য’ গ্রন্থের সূত্রে। বিজ্ঞানী বন্ধু জগদীশচন্দ্র বসুকে কবি রবীন্দ্রনাথ এক পত্রে লেখেন, “শুনে আশ্চর্য হবেন, একখানা স্কেচ বুক নিয়ে বসে বসে ছবি আঁকছি... কুৎসিত ছেলের প্রতি মার যেমন অপূর্ব স্নেহ জন্মে, তেমনি যে বিদ্যেটা ভালো আসে না, সেইটের উপর অন্তরের টান থাকে।’

এই স্কেচবুকটির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। আমরা জানতে পারছি, ১৯০৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘খেয়া’র পাণ্ডুলিপি তৈরির পর্বে নতুন এক ধরনের প্রয়াসে নিবিষ্ট হলেন কবি। একখানা রুলটানা এক্সারসাইজ বুকে লেখা হচ্ছিল ‘খেয়া’র কনটেন্ট। কবি বর্জিত বাক্যাংশগুলো কাটাকুটি করে একপ্রকারের নকশার রূপ দান করেন। প্রশান্ত পাল ‘রবিজীবনী’তে লিখেছেন : সবাই জানেন পরবর্তীকালে পাণ্ডুলিপির কাটাকুটির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ চিত্রকলার জগতে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু তার সূত্রপাত খেয়ার পাণ্ডুলিপিতে। বিভিন্ন ছত্রের কেটে দেওয়া শব্দগুলিকে রেখার সাহায্যে জুড়ে দিয়ে ফুল-লতা-পাতার নকশা রচনা করা এখানেই আরম্ভ হয়। অবশ্য পরবর্তীকালের নকশার তুলনায় এগুলি সরলতর।’

কবি যখন বার্ধক্যে উপনীত, তখন চারুশিল্পের দিকে ঝুঁকেছেন বেশি। দিয়েছেন অগ্রাধিকার। পরিহাসচ্ছলে এই আঁকাআঁকিকে তিনি অভিহিত করেছেন ‘খেলাচ্ছলে বেলা কাটাবার সঙ্গিনী’ হিসেবে। জীবনের শেষ প্রান্তে মাত্র এক দশকের কিছু সময় পরিধিতে এঁকে ফেললেন প্রায় দু-হাজার ছবি (কমবেশি)। এই সময়টা হলো ১৯২৮ থেকে ১৯৪০ সাল। রবীন্দ্র শিল্পমানসের আত্মপ্রকাশের বর্ণোজ্জ্বল এক অধ্যায় সেটি। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন শহরে প্রদর্শিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের শিল্পকর্ম। ১৯৩০ সালের মে থেকে ডিসেম্বর- এই আট মাসব্যাপী ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন বড় শহরে রবীন্দ্র চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হয় তাঁর কতিপয় শুভানুধ্যায়ীর উদ্যোগে। সর্বপ্রথম অনুষ্ঠিত হলো ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। তারপর ক্রমান্বয়ে ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম, জার্মানির ড্রেসডেন ও বার্লিন, ডেনমার্কের কোপেনহেগেন, সুইজারল্যান্ডের জেনেভা, রাশিয়ার মস্কোতে। শেষ পর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন এবং নিউইয়র্কে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে এতকাল পাশ্চাত্যের সুধীসমাজ জেনে এসেছে একজন কবি ও দার্শনিক হিসেবে, প্রাচ্যভাবধারার এক ধীমান প্রতিনিধিরূপে। এবার তিনি স্বতন্ত্র পরিচয়ে আবির্ভূত হলেন। সে এক বিস্ময়, সন্দেহ নেই চমকও।

জানা যাচ্ছে, রবীন্দ্র চিত্রমালা সমাদৃত হয়েছে প্রায় সবখানে, বিশেষত জার্মানি ও রাশিয়ায়। এমনকি ফ্রান্সেও। সেকথা কবি বলেছেন প্রতিমা দেবীকে। আঁন্দ্রে জিদের মতো লেখক, যিনি গীতাঞ্জলির অনুবাদ করেছেন ফরাসি ভাষায়, এবং কবি পল ভালেরি তাঁর চিত্রকর্ম দেখে বলেছিলেন, “ডা. টেগোর,আমরা এখন সবেমাত্র যা ভাবতে শুরু করেছি, আমাদের দেশের এই সব বিচিত্র আর্ট-আন্দোলনের তলায় তলায় যে নতুনকে পাবার চেষ্টা লুকোনো রয়েছে, আপনি কী করে এত সহজে সেই জিনিসকে চোখের সামনে এনে ধরলেন? আপনার এই অত্যাশ্চর্য কীর্তি যে কত বড়ো, তা হয়তো এখন সাধারণ মানুষের বোধগম্য হবে না- সংস্কৃতির উৎকর্ষের সঙ্গে মানুষের চিন্তাশক্তি যতই বিকশিত হবে, এই চিত্রগুলির কথা ততই তারা বুঝতে পারবে।’ পাশ্চাত্য সমাজের এই স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন রবীন্দ্রনাথকে অতি অবশ্যই তাঁর নিজের ছবি সম্পর্কে আরো বেশিমাত্রায় প্রত্যয়ী করে তুলল।

স্বদেশে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্মের প্রথম প্রদর্শনী হলো ১৯৩১ সালে। চারুশিল্পী হিসেবে বৈদেশিক স্বীকৃতি অর্জনের পর দেশে ফেরার পরের কথা। ১৯৩১ সালের ডিসেম্বর কবি দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে রাজি হলেন। সে বছর কলকাতার টাউন হলে কবিকে সপ্ততিতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিল চিত্র প্রদর্শনীটিও। ঠিক তার পরের বছর স্বদেশে অনুষ্ঠিত হলো দ্বিতীয় প্রদর্শনী। স্থান গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুল। উদ্যোক্তা ছিলেন অধ্যক্ষ মুকুল দে। দর্শক প্রতিক্রিয়া হলো মিশ্র। এক পক্ষ খুশি হলো না। অন্য পক্ষ আনন্দিত। রবি বাবুর ছবি সম্পর্কে শিল্পী যামিনী রায় একটি প্রবন্ধ লিখলেন বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায়। সপ্রশংস প্রবন্ধ সেটি। পাঠান্তে রবীন্দ্রনাথ শিল্পী যামিনী রায়কে নিজের কথা জানালেন। সেই অনুভূতি ছিল এরকম :

“তোমার লেখাটি পড়ে বড়ো আনন্দ পেয়েছি। আমার আনন্দের বিশেষ কারণ এই যে আমার ছবি আঁকা সম্বন্ধে আমি কিছুমাত্র নিঃসংশয় নই। আজীবনকাল ভাষার সাধনা করে এসেছি, সেই ভাষার ব্যবহারে আমার অধিকার জন্মেছে আমার মন জানে এবং এই নিয়ে আমি কখনো কোনো দ্বিধা করি নে। কিন্তু আমার ছবির তুলি আমাকে কথায় কথায় ফাঁকি দিয়েছে কিনা আমি নিজে তা জানি নে। সেইজন্য তোমাদের মত গুণীর সাক্ষ্য আমার পক্ষে পরম আশ্বাসের বিষয়। যখন প্যারিসের আর্টিস্টরা আমাকে অভিনন্দন করেছিলেন, তখন আমি বিস্মিত হয়েছিলুম এবং কোনখানে আমার কৃতিত্ব তা আমি বুঝতে পারিনি। বোধ করি শেষ পর্যন্তই তুলির সৃষ্টি সম্পর্কে আমার মনের দ্বিধা দূর হবে না। আমার স্বদেশের লোকেরা আমার শিল্পকে যে ক্ষীণভাবে প্রশংসার আভাস দিয়ে থাকেন আমি সেজন্য তাঁদের দোষ দিই নে। আমি জানি চিত্রদর্শনের যে অভিজ্ঞতা থাকলে নিজের দৃষ্টির বিচার শক্তিকে কর্তৃত্বের সঙ্গে প্রচার করা যায়, আমাদের দেশে তার কোনো ভূমিকাই হয়নি। 

সুতরাং চিত্রসৃষ্টির গূঢ় তাৎপর্য বুঝতে পারে না বলেই মুরুব্বিয়ানা করে সমালোচকের আসন বিনা বিতর্কে অধিকার করে বসে। সেজন্য এদেশে আমাদের রচনা অনেক দিন পর্যন্ত অপরিচিত থাকবে। আমাদের পরিচয় জনতার বাইরে, তোমাদের নিভৃত অন্তরের মধ্যে। আমার সৌভাগ্য বিদায় নেবার পূর্বেই নানা সংশয় ও অবজ্ঞার ভিতরে আমি সেই স্বীকৃতি লাভ করে যেতে পারলুম। এর চেয়ে পুরস্কার এই আবৃতদৃষ্টির দেশে আর কিছু হতে পারে না, এই জন্য তোমাকে অন্তরের সঙ্গে আশীর্বাদ করি এবং কামনা করি তোমার কীর্তির পথ জয়যুক্ত হোক।’

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //