মাসরুর আরেফিনের কথাসাহিত্য

বেদনার ছায়ায় আগস্ট আবছায়া

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে নির্মম হত্যাকাণ্ডকে উপজীব্য করে কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক মাসরুর আরেফিন প্রণীত উপন্যাস ‘আগস্ট আবছায়া’। উপন্যাসটিতে বিশদভাবে ধরা পড়েছে ১৫ আগস্টের কালো রাতের কাহিনি। গ্রন্থটি প্রকাশের পর এখন অব্দি সমানভাবে পঠিত ও আলোচিত হয়ে আসছে। গ্রন্থটি নিয়ে লিখেছেন- হেনা সুলতানা।

“পনেরোই আগস্ট হত্যাকাণ্ডের কথা- আগামীকালের রাতই সেই রাত- ভাবলাম আমি। একগাদা স্মৃতির ওপরে ভর করে লেখা ইতিহাস, শোনা কথা, একগাদা সাক্ষাৎকার যা সাক্ষাৎকার দাতারা দিয়েছেন তাঁদের স্মৃতিগুলো অবলম্বন করেই- এই যে ঐতিহাসিক ডকুমেন্টেশনের ঘাটতির ওপরে দাঁড়ানো পনেরোই আগস্ট ১৯৭৫ এবং স্মৃতিভিত্তিক লেখা সাক্ষাৎকার বইয়ের ওপরে দাঁড়ানো পনেরোই আগস্ট ১৯৭৫ তা কোথায় নিয়ে ফেলেছে আমাদের? সত্য কোথায়, সে রাতের আগের পরের ও রাতটুকুর ঘটনাগুলোর মধ্যকার সত্য ও মিথ্যা বয়ানের মাঝখানের দাগটা অন্তত মোটামুটি হলেও কোথায়? আমি জানতে পারবো যে, কে আসলে গুলি চালিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর শরীরে? ঠিক কার গুলিতে মারা গিয়েছিলেন শেখ কামাল? সত্যি কি গ্রেনেড ফেলা হয়েছিল দোতলার ওই বেডরুমে, যেখানে জড়ো হয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী, দুই ছেলে কিংবা তিন ছেলে এবং ছেলের বউ? এমন কি হতে পারে না যে একসঙ্গে এক রুমে নয়; বরং বাড়ি জুড়ে খুঁজে খুঁজে আলাদা আলাদা করে খুন করা হয়েছিল ওই পরিবারের মানুষগুলোকে? 

এমন কি হতে পারে না যে বঙ্গবন্ধুর শেষ কথাগুলো ছিল একদম, একদমই অন্যকিছু, বইতে যা যা লেখা আছে, তার কোনোটাই নয়? এমন কি হতে পারে না যে বাড়ির ভেতর থেকে অনেকক্ষণ যুদ্ধ করেছিল পরিবারের লোকজন তাদের নিরাপত্তার জন্য রাখা অস্ত্রগুলো নিয়ে, অতএব সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ যেমন সফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফ, শাফায়াত জামিল, জিয়াউর রহমান, রক্ষীবাহিনীর দায়িত্বে থাকা তোফায়েল আহমেদ, গোয়েন্দা সংস্থার আবদুর রউফ এঁরা সবাই, আমরা যতটুকু জানি, তার চাইতে অনেক অনেক বেশি সময় পেয়েছিলেন ভোরের ফাঁকা রাস্তা ধরে সোজা সাঁজোয়া যান ও সৈন্য ভরতি অসংখ্য গাড়ি নিয়ে নিমেষে ধানমন্ডিতে পৌঁছে বঙ্গবন্ধুকে খুনিদের হাত থেকে, মাত্র কয়েকশ আনাড়ি, অপ্রশিক্ষিত, ভীরু সৈনিকদের দলের হাত থেকে সহজে বাঁচানোর?” এভাবেই ‘আগস্ট আবছায়া’ আমাদের ভেতরে মরুভূমির হাহাকার তোলা এক কাহিনি। 

আমাদের এই ছোট্ট জীবনে কত যে হিংসা, ক্ষোভ, ষড়যন্ত্র, কুষ্ঠিলতা মনুষ্য-সৃষ্ট ভাইরাস জনিত রোগ এক ১৫ আগস্টের সুতো ধরে মাকড়সার নিপুণ জালের মতো বিস্তৃত হয়েছে এতটাই দূর যেখানে পাঠক মাত্রই উদ্বিগ্ন হন, বেদনায় সিক্ত হন, অজানা ভাবনায় অস্থির হন। এটাই হচ্ছে ‘আগস্ট আবছায়া’র গল্পকে এগিয়ে নেওয়ার শক্ত খুঁটি। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সাল বাঙালি জাতির ইতিহাসের একটি গভীরতম বেদনার দিন। এই ইতিহাস নিয়ে বহু লেখা তৈরি হয়েছে কিন্তু এ পর্যন্ত বেশিরভাগ লেখার ভিতরে সেই মর্মবেদনার সুর আমাদের অনুভবে তেমনভাবে ছুঁয়ে যেতে পারেনি। খুব জানা গল্প, বহুল চর্চিত ইতিহাসকে উপস্থাপনার অভিনবত্বে ব্যতিক্রম এক উপন্যাস আগস্ট আবছায়া। এটি লেখক মাসরুর আরেফিনের প্রথম উপন্যাস।

উত্তর পুরুষে লেখা বইটি পড়তে পড়তে অনুভবে নাড়া দেয় এর ভাষাভঙ্গি, বিষয় বৈচিত্র্যে বিশেষ চমৎকারিত্ব। গল্প কথক বাংলাদেশের একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক। দর্শন তার মজ্জায় মিশে আছে। অকৃতদার এই মানুষটি সে জন্যেই বোধ হয় সারাক্ষণ যুক্তি কিংবা যুক্তির ফেলাসি নিয়ে খেলতে পছন্দ করেন। তিনি আলাভোলা অথচ বিচক্ষণ। অনুবাদ করছেন কাফকার গল্প। অন্যদিকে প্রকৃতি তাকে প্রচণ্ড টানে। বরেণ্য দার্শনিকদের রচনার সুবিশাল প্রান্তরসহ বিশ্বসাহিত্য চষে বেড়ানো এই অধ্যাপকের দুই প্রেমিকা। একজন তার ছাত্রী মেহেরজান ঢাকার মেয়ে, অন্যজন সুরভি নেপালি ছাত্রী। নেপালের সমাজে যার বিশেষ এলিট অবস্থান রয়েছে। দুজনারই প্রচুর পড়াশোনা। অধ্যাপকের হিসেবে সুরভি অনেক গভীর ও স্থির; মেহেরজান যতটা টগবগে সে ততটা জড় ও শান্ত।

অধ্যাপকের নানা রকম সমস্যা আছে। সেসব ধর্তব্যের মধ্যে না আনলেও যে সমস্যাটি প্রকট হয়ে ধরা পড়ে- প্রতি বছর আগস্ট মাস আসলে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন অতিমাত্রায় যে ঘটনাটি নিয়ে সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ঘটনা। সেই রক্তাক্ত, মর্মান্তিক ঘটনা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে, যারা এই ঘটনার জন্য দায়ী তাদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জেদ চেপে বসে তার মধ্যে। শেষ পর্যন্ত এই জেদ তার এক ধরনের অসুখে পরিণত হয়। এই অবসেশন তার সব সিদ্ধান্তের উপরও প্রভাব ফেলে। কোনো এক ১৫ আগস্টে তার মধ্যে পরাবাস্তববাদী রূপান্তর ঘটে। উনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না এই হত্যাকাণ্ড। সুতরাং এই হত্যাকাণ্ডের হোতাদের মনস্তত্ত্ব এবং প্রেক্ষাপট নিয়েই তার ভাবনা। সে সময়ের- ....রাজনৈতিক পরিস্থিতিগুলো নিয়েও তিনি প্রচুর ভাবছেন। ‘ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে মানুষের ভালোবাসার ক্ষমতা সীমিত, অন্যদিকে তার নৃশংস ও পাশবিক হওয়ার শক্তি সীমাহীন। ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে উপন্যাসের নায়ক এক মাথা- ঘোরানো সফরে নামেন মানব ইতিহাসে বর্বরতার যত অলিগলি রয়েছে তার অনেকগুলো ধরে। তিনি বুঝতে চান কী সম্পর্ক আছে ৭৫-এর ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দূর ইতিহাসের নিয়ানডারথাল মানুষদের ঝাড়ে-বংশে নির্মূল হওয়ার? রাশিয়ান দুই মহান কবির মর্মান্তিক মৃত্যু কী সূত্রে গাঁথা শেখ কামালের খুনের সঙ্গেও আর ‘সময়’ ও ‘স্মৃতি’ নিয়ে এত পড়াশোনা করেও কেন তিনি বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে তাঁর প্রবল তলাটা খুঁজে পেতে? কেন এ পৃথিবীকে এ রকম হতেই হলো, যেখানে সহিংসতাই সভ্যতার নিগূঢ়ার্থ? কে বানালো এই গর্বোদ্ধত মহিষ-নিয়ন্ত্রিত পাষাণ পৃথিবী, যেখানে মানুষের বিশ্বাসগুলোর মধ্যে আছে শুধু কাব্যিকতা, লড়াইগুলোয় হাস্যরস, আর সব লড়াইয়ের উপসংহারে দুর্বিষহ এক মৃত্যুময়তা?

এক পর্যায়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের হত্যাকাণ্ডের একটা পরিষ্কার ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেখানে বিদ্রোহী সৈনিক থেকে শুরু করে ফারুক, রশিদ, ডালিম, নূরের মনস্তত্ত্বে সুনিপুণ একটা ছবি দেখা যায়। ইতিহাস দর্শন রাজনীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ‘আগস্ট আবছায়া’ বইটি পাঠককে কিছু কিছু বিষয়ে নতুন করে ভাবতে, নতুন করে বুঝতে উৎসাহিত করে। লেখকের ভাষায় যুগ যুগ ধরে মানুষের ক্রূরতা হিংস্রতাই একটা সিস্টেম দাঁড় করায়।...অসভ্য এই পৃথিবী থেকে মুখ ফিরিয়ে বেঁচে থাকতে সাহিত্যে, সংগীতে, পাখিতে, গাছের কাছে বারবার ফিরে এসে লুকিয়ে বাঁচার চেষ্টা। জানালার ওপাশে বেদনাহত কুয়াশার মতো বইটির প্রচ্ছদ বুকের ভিতর কেমন যেন এক শূন্যতা জাগায়। প্রচ্ছদের সঙ্গে ‘আগস্ট আবছায়া’ গেঁথে যায় বিরহের এক নরম সুরে। ভাষা, ভঙ্গি ও বিষয়ের দিক থেকে বাংলা উপন্যাস সাহিত্যে- আগস্ট আবছায়া- এক মাইলস্টোন।

বাঙালি জাতির একমাত্র ট্র্যাজেডির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বীরের মতো তাঁর মৃত্যু। তাঁকে হত্যা করা গেলেও বিনাশ করা যায়নি তাঁর আদর্শ, দেশাত্মবোধ, আত্মমর্যাদা, বাঙালি সত্তার পূর্ণতা। বাঙালির প্রাণের মানুষ বঙ্গবন্ধু জীবন দিয়ে তা প্রমাণ করে গেছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুসহ ৭৫-এর ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডে শহীদ সকলকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //