সূর্যবন্দনার আখ্যান ও তার ইতিবৃত্ত

The Sun is not God, though His noblest image. 

সূর্য ঈশ্বর নয়, যদিও সে তার মহত্তম প্রতিকৃতি । 

-রবার্ট ডড্সলেই (১৭০৩-১৭৬৪) 

এক

সূর্য আমাদের সৌরজগতের কেন্দ্র এবং পৃথিবীতে জীবজগতের বেঁচে থাকার প্রধান উপায় ও উপকরণ। যাদের বিজ্ঞান বিষয়ে সামান্যতম জ্ঞান আছে তারা জানেন যে, সূর্য যে তাপ বিকিরণ করে আদিতে তার সামান্যতম হেরফের যদি হতো, তা হলে আমাদের পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব বিকাশ লাভ করত না। কিংবা এখনো সূর্য পৃথিবীতে যে তাপ প্রদান করে তার সামান্যতম এদিক-সেদিক হলে, পৃথিবীতে আমাদের জীবজগতের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। আমাদের সমস্ত খাদ্যের উৎসও এই সূর্য। সূর্যের আলো থেকে ক্লোরোফিলের মাধ্যমে গাছপালা শক্তি সংগ্রহ করে খাদ্য তৈরি করে। আর এই সতেজ উদ্ভিদ জগৎ বা গাছপালার উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কিংবা উভয়ভাবে নির্ভরশীল পৃথিবীর সমস্ত প্রাণিকুল। 

মানবজাতির চিন্তা ও মননশীলতার ইতিহাস প্রাচীন। ফলে প্রাচীনকালে বিভিন্ন সভ্যতার ঊষালগ্নেই কিংবা তারও আগে প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা মানবজাতি তাদের সামগ্রিক জীবনে সূর্যের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছিল। সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে অনেকে এটিও বুঝতে পেরেছিলেন যে, সূর্য এই সৌরমণ্ডলের কেন্দ্র। আর কৃষিভিত্তিক সভ্যতাগুলো ছিল পুরোপুরি সূর্যের বদান্যতার উপর নির্ভরশীল। আজও বিশ্বে শস্য চাষাবাদে সূর্যালোকের কোনো বিকল্প নেই। সেকালে মানুষের ভক্তির বহির্প্রকাশ ঘটত কোনো উপকারী প্রাকৃতিক শক্তি বা তার উৎসকে দেব বা দেবী রূপে কল্পনা করে-তার পূজা-অর্চনাতে, আরতিতে এবং তাকে নৈবেদ্য দানে। আবার প্রাকৃতিক শক্তির অশুভ বহির্প্রকাশ যেমন-ঝড়-ঝঞ্ঝা, অনাবৃষ্টি, খরা ইত্যাদিকে অপদেবতা জ্ঞান করে তাদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষার জন্যও প্রার্থনা এবং পূজা-অর্চনা চলত। বলাবাহুল্য সূর্যকে সর্বত্র শুভশক্তির আধারই মনে করা হয়েছে এবং সূর্যের ক্ষেত্রে মানুষের বন্দনা অন্য কোনো প্রাকতিক শক্তি বা তার উৎসের চেয়ে কম তো নয়ই বরং বেশিই জুটেছিল। পৃথিবীতে এমন কোনো মানবজাতি নেই, যেখানে কোনো না কোনো সময় সূর্যের আরাধনা বা বন্দনার সূত্রপাত হয়নি। আবার আজও পৃথিবীতে কোনো না কোনোভাবে টিকে আছে সূর্যপূজা। কোনো কোনো ধর্মে তা আছে প্রবলভাবেই। এর কারণ সূর্য আমাদের সমগ্র প্রকৃতিকে পরিপোষণ করে। যে কারণে বেদে সূর্যের আরেক নাম পূষা বা পূষণ। ধর্ম ও দেব-দেবীদের অধিষ্ঠান এবং বিবর্তন যে রাজনীতি ও অর্থনীতির বাইরে নয়, তারও স্বাক্ষর এই সূর্যদেবের বন্দনা-গাথাতে এবং তার বিবর্তনেও সুস্পষ্ট। আজও আমরা কোনো কীর্তিমান বীরকে সূর্যের সঙ্গে তুলনা করি। বাংলাদেশ, নেপাল, রুয়ান্ডাসহ বহু দেশের পতাকাতে দীপ্তিমান আছে সূর্য। উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনাসহ দুই আমেরিকা মহাদেশের বেশ কিছু দেশের পতাকাতে তো এখনো ইনকা সূর্যদেব ‘ইন্টি’ স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। সূর্র্যবন্দনার একাল-সেকাল নিয়েই আমাদের আজকের এই প্রবন্ধের পর্যালোচনা।

দুই

সূর্য পূজার ইতিহাস মানবজাতির পূজা-অর্চনা-বন্দনার গোড়ার সঙ্গেই সম্পর্কিত। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি যে, বেশ কয়েকটি প্রাচীন ধর্মমত গড়ে উঠেছিল সূর্যপূজাকে কেন্দ্র করে। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ১৪শ বছর আগে মিশরে যে সূর্যকেন্দ্রিক ধর্মের উৎপত্তি হয়, তার নাম পশ্চিমারা দিয়েছেন আটেনবাদ (Atenism)। এই ধর্মের ইতিহাস মূলত প্রাচীন ফারাও সম্রাট আখেনআটেনকে (রাজত্বকাল ১৩৫৩-১৩৩৬ খ্রি.পূ./১৩৫১-১৩৩৪ খ্রি.পূ.) কেন্দ্র করে, যার প্রকৃত নাম ছিল আমেনহোটেপ চতুর্থ। তিনি ছিলেন ফারাও সম্রাটদের আঠারোতম বংশের দশম সম্রাট। আর তাকে সম্মান করা হতো সূর্যদেবতা ‘রা’-এর অবতার হিসেবে। অবশ্য ধর্মের ইতিহাসে এটি নতুন নয়। যে রাজা বা রানী বা যে ধর্মবেত্তা যে দেব বা দেবীর পূজা করেন বা অধিষ্ঠান বা প্রবর্তন করেন, তাকে দেখা হয় সেই দেব বা দেবীর অবতার হিসেবে। যে কারণে ভারতবর্ষে বাবা লোকনাথ ব্রহ্মচারী মান্যতা পেয়েছেন শিবের অবতার হিসেবে, আর রামকৃষ্ণ পরমহংস মান্যতা পেয়েছেন দেবী কালীর প্রকাশ হিসেবে। আখেনআটেন সূর্যকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার রাজত্বে একমাত্র উপাস্য হিসেবে (Rosalie: 1998: 124)। ফলে জানা মতে এটিই বিশ্বের প্রথম একেশ্বরবাদী ধর্ম (Monotheism)। তারা সূর্যকে একটি চাকতি বা ডিস্কের ন্যায় চিন্তা করতেন এবং তাদের স্থানীয় ভাষায় এই চাকতি আকৃতির সূযর্কে তারা ‘আটেন’ নামে অভিহিত করেছিলেন। তবে আটেনবাদ মিশরে দীর্ঘ দিন টেকেনি। এটি মাত্র ২০ বছর স্থায়ী হয়েছিল। আমেনহোটেপ চতুর্থ এই চাকতি আকৃতির সূযর্কে কার্যকর করেছিলেন বলে তাকে আখেনআটেন বলা হতো; কারণ আখেনআটেন মানে আক্ষরিক অর্থেই আটেনের জন্য কার্যকরী। অবশ্য অনেক মিশর বিশারদ (Egyptologist) আখেনআটেনকে আটেনের আত্মা অনুবাদও করেছেন, কেউ অনুবাদ করেছেন আটেনের প্রতি আনুগত্য। তখন তার বয়স ছিল মাত্র পনেরো বছর (রহমান : ২০০৪: ৩৭)। প্রাচীন মিশরে আমারনা শহর ছিল সম্রাট আখেনআটেনের রাজধানী, যার পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে নীল নদ। এটি বর্তমান মিশরের মিনইয়া প্রদেশে পড়েছে। আমারনা শহরে এই ধর্মের প্রবর্তন হয়েছিল বলে একে আমারনা ধর্ম বা আমারনা বৈধর্ম্য নামেও ডাকা হয়। নীল নদের উভয় পারেই সেকালে গড়ে উঠেছিল কৃষিভিত্তিক সমাজ। ফলে সূর্যস্তবের দীর্ঘ ইতিহাস গড়ে ওঠে এসব অঞ্চলে। এই আমারনা শহরেই দেব ‘রা’-এর উপাসনা ও বন্দনা চলত। সেকালে মিশরে দেবতা আমুনের প্রভাব ছিল তীব্র । তিনি হেরমোপলিটান অঞ্চলে অর্থাৎ ঊর্ধ্ব ও নিম্ন মিশরের মধ্যবর্তী সীমান্ত অঞ্চলের অভিভাবক দেবতা (patron deity) ছিলেন। অবশ্য আমুন মিশরে কখনোই একমাত্র দেবতা ছিলেন না। তবে মিশরের হেনোথিয়েস্টিক ও মনোলেট্রি ধারায় দীর্ঘ সময় তিনি মিশরের প্রধান দেবতা ছিলেন। এখানে বলে রাখা ভালো যে, হেনোথিয়েস্টিক ধারা হচ্ছে সেই ধারা, যেখানে অনেক দেব-দেবী থাকলেও একজনকে প্রধান ধরা হয়। আর মনোলেট্রি হচ্ছে সেই ধারা, যেখানে অনেক দেব-দেবী থাকলেও একজনকে পূজা করা হয়। তবে বাকিদের অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয় না। যা-ই হোক আমুনকে হটিয়ে ‘রা’কে প্রতিষ্ঠা করা আখেনআটেনের পক্ষে সহজ ছিল না। তাকে আমুনভক্ত রাজন্যবর্গ এবং প্রভাবশালী পুরোহিতবর্গের সঙ্গে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয়েছে। গোড়া থেকেই আমুনের পুরোহিতদের সঙ্গে তার বিরোধ ছিল। অনেকে বলেন যে, সেই সময় আমুনই ছিলেন সূর্যদেবতা (রহমান : ২০০৪: ৩৭)। দুই সূর্যদেবের লড়াই তো আর আকাশে হয়নি। কৃষিভিত্তিক সমাজে দুই সূর্যের প্রতীক নিয়ে লড়াই করেছে দুই গোত্র। আখেনআটেন তার রাজত্বের সপ্তমবর্ষে রাজধানী থিবেস থেকে আখেটাটেন শহরে স্থানান্তর করেন, যে নামের অর্থ হচ্ছে ‘আটেনের দিগন্ত’। এই শহরেরই নামকরণ পরে করা হয়েছে আমারনা। অনেকে মনে করেন যে, আটেনের পূজা নিশ্চিত করতেই তিনি এ কাজ করেছিলেন। অবশ্য অনেকের অভিমত আখেনআটেনের পিতার আমলেই আটেনের পূজা থিবেসে চালু হয়। যে মন্দিরের পুরোহিত ছিলেন ‘আই’ নামক একজন তরুণ। আখেনআটেনের মৃত্যুর পরেও ‘রা’-এর উপাসনা বহু দিন টিকে ছিল; কিন্তু প্রভাবশালী দেবতা আমুনের আবার উত্থান ঘটে। আবার ‘রা’কেও সরানো সহজ ছিল না। ফলে এই সময় নতুন এক প্রভাবশালী মিশ্র দেবতার উত্থান ঘটে, যার নাম হয় আমুন-রা। ফলে দুই কুলের স্বার্থই রক্ষা করা সম্ভব হয়। এই নতুন দেবতার উপর দুই দেবতার বৈশিষ্ট্যই আরোপ করা হয়। অবশ্য আমুন-রা আরও শক্তিশালী ছিলেন। তিনি সৃষ্টি, সূর্য এবং উর্বরতার দেবতা ছিলেন। অর্থাৎ সৃষ্টি ও উর্বরতার দেবতা মিনকেও আমুনের সঙ্গে সংমিশ্রিত করা হয়েছিল। ফলে আমুন-মিন নামেও তিনি মাঝে কিছুকাল পূজিত হয়েছিলেন। কোনো কোনো মতে, বায়ুর নিয়ন্ত্রণও তার অধিকারে ছিল। নুবিয়ান (Nubian) সূর্যদেবতার ন্যায় তারও মুখ ছিল ভেড়াসদৃশ। কোনো কোনো জায়গায় তার দেহ ও মুখাবয়ব মানুষের ন্যায়। যদিও তার মাথায় ভেড়ার ন্যায় কুণ্ডলাকারের শিং রয়েছে। আবার কোনো কোনো জায়গায় এই আমুনের বিগ্রহের উপর একটি ভেড়ার বিগ্রহও দেখা যায়। যেই বিগ্রহগুলোকে আমুনের পূজারিরা পূজা করতেন; যেমনটি মিশরের কারনাক মন্দিরে আমরা দেখি। সেকালে নুবিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের নানা অঞ্চলে ভেড়া ছিল উর্বরতার প্রতীক। আমুনকে অনেকে মিশরে বিদেশি দেবতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আবার তিনি মিশর থেকেই নুবিয়ান অঞ্চলে গিয়েছেন বলেও অনেকে অনুমান করেন। আমুন মিনের সঙ্গে একাকার হয়ে মিনের মতো মনুষ্য শরীর ও বাজপাখির মুণ্ডু নিয়েও কিছুদিন অবস্থান করেছেন। এই একটা সময়ে প্রায় সব মিশরীয় দেবতা কিছুকাল পক্ষিমস্তক ধারণ করেছিলেন (রহমান : ২০০৪: ৩৬)। বোঝা যায় কোনো কারণে সে সময় পাখির টোটেম মিশরে বেশ সাড়া ফেলেছিল। মিশরের ইতিহাসে অন্তত নয় জন সূর্যদেবতা আমরা পাই। এত বেশি সূর্যদেবতা ভারত ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না। ‘রা’-কেও অনেকে বিদেশি দেবতা মনে করেন। তিনি সিরিয়া কিংবা পশ্চিম লিবিয়া থেকে মিশরে এসেছিলেন বলে অনেকের অভিমত (রহমান : ২০০৪: ৩৩-৩৪)।

তিন

ধর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন সূর্য আরাধনা টিকিয়ে রেখেছেন যারা তাদের মধ্যে অন্যতম সনাতন বা হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। সূর্য বন্দনা বাংলাদেশ, ভারতসহ সারা পৃথিবীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আজ পর্যন্ত ভালোমতো টিকে আছে। ভারতীয় সভ্যতাগুলোও গড়ে উঠেছে নদীবিধৌত প্লাবন সমভূমির উপর, যেখানে জীবিকার মূলপ্রবাহ কৃষিভিত্তিক ছিল। ফলে সূর্যোপসনার দীর্ঘ ইতিহাস থাকা এখানে স্বাভাবিক। বেদ, পুরাণ ও উপনিষদে সূর্যদেব ও তার ইতিবৃত্ত এবং সূর্য আরাধনা নিয়ে অনেক বর্ণনা রয়েছে। আমরা এখানে কয়েকটির আলোচনা করব। যেমন-ঋকবেদের তৃতীয় মণ্ডলে গায়ত্রীমন্ত্রে আমরা ‘সবিতা’ বন্দনার নজির পাই। বলা বাহুল্য যে, সবিতা সূর্যদেবের আরেক নাম। 

‘যিনি আমাদের ধীশক্তি প্রেরণ করেন, আমরা সে সবিতাদেবের সে বরণীয় তেজ ধ্যান করি। আমরা অন্নভিলাষী হয়ে স্তুতি করে সবিতাদেবের ও ভগবেদের ধন যাজ্ঞা করছি। কর্মকর্তা মেধাবী ও অধ্বর্যুগণ বুদ্ধি দ্বারা প্রেরিত হয়ে যজ্ঞ ও সুন্দর স্তোত্র দ্বারা সবিতা দেবতাকে পূজা করেন।’ (ঋকবেদ : ২০১৫ : তৃতীয়মণ্ডল : ৬২: ১০-১২ : ৪৬৫-৪৬৬)

তবে ঋকবেদে সূর্যকে নিয়ে যে সমস্যা হয়, তার কারণ আরও কয়েকটি সূর্যকেন্দ্রিক দেব-দেবী থাকার কারণে; যেমন-মিত্র, পূষণ বা পূষা, ঊষা, আদিত্যগণ ইত্যাদি। এ ছাড়াও সূর্যকে মিত্র, অর্ক, ভানু, রবি, মার্তণ্ড, ভাস্কর, প্রভাকর, কাথিরাভান (তামিলনাড়ু) ইত্যাদি নামেও পূজা করা হয়। অনেক ধর্মতাত্ত্বিক মনে করেন যে, এই সূর্যদেবগণ ছিলেন ভারতের বিভিন্ন স্থানের স্থানীয় সূর্যদেব বা দেবী। পরে এদেরকে একাকার করা হয়েছে। যেমন-মিত্রদেব। মিত্র মানে বন্ধু। কারণ মিত্র দেবের আবির্ভাব বন্ধুত্বের অবিভাবক দেবতা হিসেবে। আর পৃথিবীর জন্যও তো সূর্যের চেয়ে বড় বন্ধু আর নেই। সংস্কৃতে অবশ্য সূর্যের সবচেয়ে পরিচিত নাম হচ্ছে ‘সূরিয়া’। এই নাম থেকেই বাংলাতে সূর্য শব্দের আবির্ভাব। যা-ই হোক ঋকবেদে ঊষা মূলত ভোরের দেবী। ঊষা শব্দের আক্ষরিক মানেই ভোরবেলা। ঊষা সূরিয়া অর্থাৎ বৈদিক সূর্যদেবের কখনো স্ত্রী, কখনোবা কন্যা। তিনি অপরূপা সুন্দরী এবং সূর্য উদয়ের প্রাক্কালে সুবর্ণ রথে (কখনো শত রথে) চড়ে আকাশ পরিক্রমায় বের হন, আর পথ তৈরি করে দেন সূর্যদেবের। তিনি আলোকরশ্মি ছড়াতে ছড়াতে যান, আর তাকে অনুসরণ করেন সূর্যদেব (Kinsley : 1988 : 7)। তার রথ টানে সুবর্ণ-রক্তিম বর্ণের ঘোড়া কিংবা গরু (Jones, Ryan: 2006 : 472)। আর সূর্যদেবের রথের সারথি অরুণ (ভবিষ্যপুরাণম : ২০১৩: ১৩৬)। সূর্যদেবের গমনাগমন সম্পর্কে ঋকবেদে আছে, ‘দেব সবিতা ঊর্ধ্বগামী ও অধোগামী পথ দিয়ে গমন করেন; সেই অর্চনাভাজন দেব দুটি শ্বেত অশ্ব দ্বারা গমন করেন; তিনি সব পাপ বিনাশ করতে করতে দূর দেশ হতে আসছেন। যজনীয় ও বিচিত্ররশ্মি সবিতা জগৎসমূহের অন্ধকার বিনাশার্থে তেজ ধারণ করে নিকটস্থ সুবর্ণ বিচিত্রিত, সুবর্ণ শঙ্কুযুক্ত বৃহৎ রথে আরোহণ করলেন। শ্যাব নামক শ্বেত পদযুক্ত অশ্বগণ সুবর্ণযুগ বিশিষ্ট রথ বহন করে জনসমূহের নিকট আলোক প্রকাশ করছেন; দেব সবিতার সমীপে জনসমূহ ও জগৎসমূহ উপস্থিত আছে।’ (ঋকবেদ : ২০১৫: প্রথমমণ্ডল: ৩৫: ৩-৫: ১২৬)

ঋকবেদে গায়ত্রী মন্ত্রে ঊষাদেবীর বহু উল্লেখ আছে। ‘প্রিয় ঊষা এর পূর্বে দেখা দেননি, ঐ তিনি আকাশ হতে অন্ধকার দূর করছেন।’ (ঋকবেদ : ২০১৫ : প্রথম মণ্ডল : ৪৬ : ১: ১৪০)

তার প্রতি প্রার্থনা ও বন্দনারও বহু উল্লেখ ঋকবেদে পাওয়া যায়। 

‘হে দেবদুহিতা ঊষা! আমাদের ধন দান করে প্রভাত কর; হে বিভাবরী! প্রভূত অন্ন দান করে প্রভাত কর, হে দেবী! দানশীলা হয়ে ধন দান করে প্রভাত কর। ঊষা অশ্বযুক্তা, গোসম্পন্না এবং সবার ধনপ্রদাত্রী; প্রজাদের নিবাসের জন্য তাঁর অনেক সম্পত্তি আছে; হে ঊষা! আমাকে সুনৃত বাক্য, বল ও ধনবানদের ধন দাও। ঊষা পুরাকালে প্রভাত করতেন, অদ্যও প্রভাত করেছেন; ধনলুব্ধ লোক যে রূপ সমুদ্রে নৌকা প্রেরণ করে, ঊষার আগমনে যে রথসমূহ সজ্জিত হয়, ঊষা তা সে রূপে প্রেরণ করেন।’ (ঋকবেদ : ২০১৫ : প্রথমমণ্ডল : ৪৮ : ১-৩: ১৪৩)

অন্যদিকে পূষা বা পূষণ আদিত্য দেবগণের একজন। তিনি ঋকবেদের এক মহান দেবতা এবং মূলত মিলনের দেবতা। তিনি একাধারে বিবাহ, ভ্রমণ, রাস্তাঘাট ও গবাদিপশু পরিচর্যারও দেবতা। তার সঙ্গে বিবাহ হয়েছে সূরিয়ার। এ জায়গায় সূরিয়া সূর্যদেবের কন্যা (Dalal: 2014)। পূষা অতীব মহান দেবতা, যার কাছে মানুষ সাহায্য যাচ্ঞা করে। 

‘হে পূষা পথ পার করিয়ে দাও, পাপ বিনাশ কর; হে মেঘপুত্র দেব! আমাদের অগ্রে যাও। হে পূষা! আঘাতকারী, অপহরণকারী ও দুষ্টাচারী যে কেউ আমাদের (বিপরীত পথ) দেখিয়ে দেয়। তাকে পথ হতে দূর করে দাও।’ (ঋকবেদ : ২০১৫ : প্রথমমণ্ডল : ৪২ : ১-২ : ১৩৫)

গায়ত্রীমন্ত্রে আমরা অভূতপূর্ব পূষা বন্দনার নজির দেখি।

‘হে দীপ্তিমান পূষা! এ নতুন স্তুতি তোমারই জন্য। এ স্তুতি আমরা তোমার জন্য উচ্চারণ করছি। হে পূষা! আমার এ স্তুতি গ্রহণ কর। স্ত্রী প্রিয় ব্যক্তি যে রূপ স্ত্রীর অভিমুখে আসে, সে রূপ তুমি হর্ষকারিণী এ স্তুতির অভিমুখে এসো।’ (ঋকবেদ : ২০১৫ : তৃতীয়মণ্ডল : ৬২ : ১০-১২: ৪৬৫)

ভবিষ্যপুরাণে শ্রীকৃষ্ণপুত্র সাম্ব কর্তৃক সূর্য পূজার প্রতিষ্ঠার উল্লেখ আছে। তিনি পাঞ্জাবে সূর্যমন্দির প্রতিষ্ঠা করতে শাকদ্বীপ থেকে মগস শ্রেণির ব্রাহ্মণ নিয়ে আসেন। এই শাকদ্বীপ ছিল শক জাতির বাসস্থান (ভবিষ্যপুরাণম্ : ২০১৩) । অন্যদিকে সূর্যদেব মিত্র ইরান থেকে ভারতে এসেছিলেন, না-কি ভারত থেকে ইরানে গিয়েছিলেন এ নিয়ে বিতর্ক আছে। 

চার 

ইরানে হেনোথিয়েস্টিক ধারায় সূর্যদেবতা মিত্র একদা প্রধান দেবতা ছিলেন। তার আরেক নাম পাওয়া যায় মিহির। অবশ্য মিহির ছিলেন আর্মেনীয় সূর্যদেবতা। সম্ভবত আর্মেনিয়া পারস্য সাম্রাজ্যের অধীনস্থ হওয়ার পর কিংবা দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে সন্ধি হওয়ার পর তিনি মিত্রদেবের আরেক প্রকাশ হিসেবে আবির্ভূত হন। ইরানে তখনো জরথুস্ত্রের ধর্ম শিকড় গেড়ে বসেনি। মিহির ছিলেন স্বর্গীয় আলোকের ও সূর্যের দেবতা। তারপরও তিনি আর্মেনিয়াতে বিশেষ প্রসিদ্ধ ছিলেন না। পারস্যে তিনি মিত্রের নবপ্রকাশ হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। মিত্র ছিলেন চুক্তি, সন্ধি ও প্রতিজ্ঞার দেবতা। কারও কারও মতে, তিনি ন্যায়বিচারের দেবতাও ছিলেন (Palombo : 2012 : 151-152)। মিহিরের সঙ্গে মিশেই বোধকরি তিনি আলোক ও সূর্যের দেবতাতেও রূপান্তর হন। পরে তিনি একদা রোমক সাম্রাজ্যেরও বিশিষ্ট দেবতা হয়ে ওঠেন; সম্ভবত রোম ও পারস্যের মধ্যে কোনো সামরিক চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর। আর্মেনিয়াতে এখনো মিহিরের পূজার জন্য সৃষ্ট মেহিয়ান মন্দিরের অবশেষ আছে, যেগুলোকে বলা হয় মেহেকান। মিত্রকে অনেকে রোমান ও গ্রিক দেবতাদের সঙ্গে ইরানি দেবতার সংকরও মনে করে থাকেন। ফলে বলা চলে চুক্তির দেবতা একাধারে ধর্মীয় প্রাঙ্গণে গ্রেকো-রোমানদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিরই ফল। তিনি গ্রিক সর্বদেব মন্দিরের অ্যাপোলো, ফিবাস ও হেলিয়সের সঙ্গে ইরানের তৎকালীন সূর্যদেব বা আর্মেনিয়া থেকে আগত মিহিরের সংমিশ্রণ বলে অনেকে মনে করেন। তবে আমার সঙ্গে আরও অনেকেই এক মত হবেন যে, এই তিন দেবতাও হয়তো একদা তিন জন ভিন্ন ভিন্ন দেবতা ছিলেন প্রাচীন গ্রিক জামানার গোত্র-বিভক্ত সমাজে। পরে তাদের মধ্যে মৈত্রী হওয়ার পর তাদের সূর্যদেবগণও একাকার হয়ে যান। তবে মিত্রদেবকে কেন্দ্র করে যে মিত্রবাদ প্রথম থেকে চতুর্থ শতাব্দীব্যাপী সারা দুনিয়ায় ছড়ায়, তাতে মিত্র দেবতা আরও শক্তিমান হয়ে ওঠেন। আর তা প্রচার ও বিকাশের ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠে রোম। সে সময় মিত্রবাদ দক্ষিণে রোমান আফ্রিকা ও নিউমিডিয়া পর্যন্ত যেমন বিস্তৃত হয়েছিল, তেমনি উত্তরে রোমান ব্রিটেন পর্যন্ত এবং পুবে রোমান সিরিয়া পর্যন্ত ছড়িয়েছিল; কিন্তু রোমান সাম্রাজ্যবাদ মিত্রবাদকে কখনো গ্রহণ করেনি। বরং খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী রোমান সম্রাটরা মিত্রবাদী বা মিত্রপন্থিদের হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠেন; কিন্তু তাতে মিত্রবাদকে দমানো যায়নি। বরং মিত্রকে তার ভক্তরা দেখতে থাকেন মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা এবং তার প্রভু ও পালনকর্তা হিসেবে। কোনো মতাদর্শকে নিশ্চিহ্ন করতে গেলে, তা আরও শক্তিশালী হয়। যিশু ও খ্রিষ্টধর্মকে রোমানরা ধ্বংস করতে গিয়ে তারা খ্রিষ্ট ও খ্রিষ্ট ধর্মকে শক্তিশালীই করেছে। পরে তারা নিজেরাই খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেছে। খ্রিষ্ট পরিত্রাতা থেকে হয়ে উঠেছেন ঈশ্বর; কিন্ত পরবর্তীকালে খ্রিষ্টান রোমানরা একই ভুল করেছিল মিত্রবাদীদের বিরুদ্ধে। মিত্রকে তারা নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে। আর মিত্র তার ফলে সন্ধির দেবতা থেকে সৃষ্টিকর্তা ও ঈশ্বরে রূপান্তর হয়েছেন। অনেকে বলবেন মিত্র তো কাল্পনিক। সে জায়গায় বলতে হয়, অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যিশুও কাল্পনিক চরিত্র। আদতে সূর্যদেবতা মিত্র বা অ্যাপোলোই হয়তো খ্রিষ্টের আদলে Son of God হয়েছেন, যা আদতে Sun of God। যার ১২ জন শিষ্য আদতে তার ঘূর্ণাবর্তে সৃষ্ট ১২টি মাস। আর দেবতা মিত্রও তো এক অর্থে ঈশ্বরেরই সন্তান। রোমানদের বদৌলতে তাদের সূর্যদেব যে লাতিনে Sol Invictus অর্থাৎ অজেয় সূর্য, মিত্র তাই হয়ে উঠলেন। মিত্রের মন্দিরে আমরা তাকে এক মহাজাগতিক ষাঁড়কে হত্যা করতে দেখি। অনেকে মনে করেন যে, এই ষাঁড়ের মধ্য দিয়ে পরিস্ফুটিত করা হয়েছে মিত্রের কাছে রোমানদের পরাজয়কে। এখানে মিত্রের রূপ মানুষের মতোই। তার সঙ্গে আছে একটি বৃশ্চিক, সাপ ও কুকুর। কোনো কোনো জায়গায় তিনি বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতারের মতো সিংহমস্তকধারী, সঙ্গে একটি সাপ। এই প্রাণীগুলো মিত্রকে ষাঁড় হত্যায় সাহায্য করছে। কারণ তারা শুভ-অশুভের দ্বন্দ্বে শুভের সহায়ক ((Palombo: 2012 : 151-152) ।

পাঁচ

গ্রিক সর্বদেব মন্দিরে সূর্যদেব অ্যাপোলো (Apollo) অতি গুরুত্বপূর্ণ এক দেবতা। তিনি দেবরাজ জিউস ও তার পত্নী লেটোর সন্তান। তার অপর নাম ফিবাস (Phoebus)। আর হেলিয়স (Helios) নাম নিয়ে তিনি সূর্যদেব, আবার কখনো টাইটানদের মধ্যে বিরাজিত। তার একজন যমজ বোন আছে, যার নাম আর্তেমিস। এই বনচর শিকারি দেবীই রোমে ডায়না নামে পরিচিত। অ্যাপোলো ১২ জন প্রধান দেবতা, যারা অলিম্পাস পর্বতে বাস করেন (Olympian deities) তাদের একজন। তিনি গ্রিক জাতির জাতীয় দেবতাও বটে। সূর্য ও আলো ছাড়াও তার অধীনে আছে-ধনুর্বিদ্যা, সুর, নৃত্য, সততা, ভবিষ্যদ্বাণী, রোগের চিকিৎসা ও কবিতার দপ্তর। অ্যাপোলোর উত্থান ঘটে নাটকীয়ভাবে। ডেলফিতে অ্যাপোলোর জন্য জায়গা সুনির্ধারিত। কারণ তিনি ভবিষ্যদ্বাণীরও দেবতা। পৃথিবীর দেবী গায়া (Gaia) পাইথন নামক এক মহাসর্প বা ড্রাগনকে পুনরুজ্জীবিত করলে তা সবার বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যে জায়গায় সে সাপটিকে পুনরুজ্জীবিত করা হয় তার নাম পাইথো থাকাতে ড্রাগনের নাম হয়ে যায় পাইথন। এই পাইথনকে অ্যাপোলো বধ করেন এবং পাইথোর নাম পরে ডেলফি করা হয়। ড্রাগন বধের পর রাতারাতি দেবসমাজে ও মর্ত্যলোকে নায়ক বনে যান তিনি। অবশ্য কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে, অ্যাপোলো এশীয় কোনো দেশ বা গ্রিসের উত্তরস্থ কোনো দেশ থেকে গ্রিসে এসেছিলেন। গ্রিসে অ্যাপোলোর আরেক উপাধি নমিয়স (Nomios), যার অর্থ Herdsman বা পশুপালক। তার মানে আদিতে তার জন্ম কোনো চারণভূমিতে। তিনি দেবরাজ জিউসের সশস্ত্র দানব সাইক্লপদের হাত থেকে ফেরায়ের রাজা আডমেটুসের পশু ও ঘোড়ার পালকে রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তার আরেক নাম লাইসিয়াস, যিনি নেকড়েদের (গ্রিকে lykoi) হাত থেকে পশুর পাল রক্ষা করতেন। ফলে অনুমান করা যায় যে, তিনি একজন দক্ষ পশুপালক ছিলেন। যার উপর পরে দেবত্ব আরোপ করা হয়েছে। 

অ্যাপোলো যখন হেলিয়স রূপ নিয়েছেন, তখন তার মাথায় শোভা পায় একটি বিভাময় মুকুট। হোমারের মহাকাব্য, বিশেষত ওডেসি তাকে অমর করে তুলেছে। অবশ্য কোনো কোনো গ্রিক সাহিত্যে আমরা তাকে টাইটান হাইপেরিয়ন (Hyperion) ও থেয়ার (Theia) সন্তান হিসেবে পাই। প্লেটোর ডায়ালোগে মহামতি সক্রেটিস হেরমোজেনেসকে হেলিয়স দেবের নামের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, ডোরিক গ্রিক থেকে আগত হেলিয়স- মানে হচ্ছে সেই ব্যক্তি যিনি জাগ্রত হলে পৃথিবীর চারিদিকে প্রদক্ষিণ করেন। তার মানে তার জামানায় গ্রিসে লোকেরা ভাবত সূর্যই পৃথিবীর চারিদিকে প্রদক্ষিণ করে। আর হিলিয়ম নামে যে পদার্থটি আমরা চিনি, সেটির নামও হয়েছে এই হেলিয়সের নাম থেকে। সূর্য তার অভ্যন্তরে এই ধাতুটি পুড়িয়েই তার তাপ উৎপন্ন ও উদ্গিরণ করে থাকে।

ছয়

শামাশ ছিলেন মেসোপটেমিয়ার সূর্যদেবতা। যেহেতু সূর্যের গুরুত্ব সমস্ত কৃষিভিত্তিক সমাজে প্রবল। ফলে সূর্যদেবতার কোনো সভ্যতাতে থাকার সম্ভাবনা সবকালেই প্রশস্ত রয়েছে। এই শামাশ থেকেই আরবি শামস শব্দের আবির্ভাব কিংবা তার বিপরীত। তবে আরবে শামস ছিলেন সূর্যের দেবী। তিনি হিমিয়ারাইত রাজত্বের অভিভাবক দেবী ছিলেন। আর কৃষিভিত্তিক সমাজে সূর্যদেব বা দেবীর পক্ষেই অভিভাবক দেব বা দেবী হওয়া সহজ। কারণ এ সব সভ্যতায় সূর্যালোকের গুরুত্ব অসীম। শামস ছিলেন দক্ষিণ আরবের সূর্যদেবী। উত্তর আরবে তার সমকক্ষ ছিলেন সূর্যদেবী নুহা। যা-ই হোক মেসোপটেমীয় শামাশের আগের নাম ছিল উটু। তিনি ন্যায়, নৈতিকতা ও সততার দেবতাও বটেন। গ্রিক সূর্যদেব অ্যাপোলোর মতো তারও একজন যমজ বোন আছেন, যার নাম ইনানা, যিনি ব্যাবিলনীয় পুরাণ অনুযায়ী, স্বর্গের রানী। আসেরীয়-ব্যাবিলনীয় ভাষাতে ইনানাকে ডাকা হয় ইশতার নামে। সেকালে সুমেরে উটু বন্দনা বেশি হতো। যিশুর জন্মের ৩৫০০ বছর আগেও যে উটুর পূজা হতো তার নথিপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, উটু যে প্রাসাদে থাকতেন, তার নাম ‘ই-বাব্বার’, যার অর্থ হলো সাদা-বাড়ি বা White House। উটুর নাম প্রাচীন ব্যাবিলনীয় ‘গিলগামেশের’ মহাকাব্যে পাওয়া যায়। পরে অবশ্য ব্যাবিলনে আত্তিস নামক আরেক সূর্যদেবতার আবির্ভাব হয়। ভারত ও ইরানের অতি ক্ষমতাবান মিত্র দেবও কিছুকাল ব্যাবিলনের সূর্যদেবতার পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন । আর্যদের এক শাখা কাসিটরা (The Kassites) ব্যাবিলনে যে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেটি খ্রিষ্টপূর্ব ১৫৯৫ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ১১৫৫ স্থায়ী হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকগণ অনুমান করেন। তাদের সূর্যদেবতা ছিলেন এক বৈদিক সূর্যদেবতা, নাম সূরিয়াশ (রহমান : ২০০৪: ৫১-৫২)। 

সাত

প্রাচীন মধ্য, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাতে মায়া, আজটেক ও ইঙ্কাদের মধ্যে সূর্যপূজার চল ছিল প্রবলভাবে। মায়া সমাজে দেবতা ‘হুনাব কু’ শুধু সূর্যদেবই ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাদের একমাত্র দেবতা। হুনাব কু মানেই এক ঈশ্বর। অর্থাৎ সেকালে মায়ারা ছিল একেশ্বরবাদী। তবে মায়াদের একজন সূর্যদেব পাওয়া যায়, যার নাম কিনিচ আহাও। একেশ্বরবাদের যুগে তিনি হয়তো হুনাব কু-এর সঙ্গে মিশে গিয়েছেন। সূর্য মন্দিরের পুরোহিতরা বংশানুক্রমে সম্মান পেতেন। তাদের সম্ভ্রমে ডাকা হতো ‘আহ কিন’ নামে; যার অর্থ সূর্যের তিনি (He of the Sun)। অন্যদিকে ইঙ্কা সমাজের প্রধান দেবতা ছিলেন ইন্টি, আর তিনিই ছিলেন সূর্যদেব। তিনি কৃষিকাজের দেবতাও ছিলেন। ইঙ্কারা মনে করতেন যে, তার অনুগ্রহেই ফসল পাকে, আন্দিস পর্বতমালা ও তার চারপাশের ভূমিও তার কারণে উচ্চতাপ্রাপ্ত হয়েছে। বলা বাহুল্য যে, তিনি ছিলেন ইঙ্কাদের অভিভাবক দেবতা। একটি বৃত্ত বা চাকতিতে তার মুখ শোভা পাচ্ছে। সেই চেহারা আমরা আজও আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর ও উরুগুয়ের পতাকাতে দেখি। স্পেনিয়ার্ডদের গণহত্যা ও লুটতরাজের পরও আজও কিছু ইঙ্কা সূর্য মন্দিরের অবশেষ টিকে আছে। তার মধ্যে অন্যতম পেরুর কুজকো মন্দির (Cusco temple), যার পরিধি বারোশ ফুটের বেশি ছিল (রহমান : ২০০৪ : ৩১)। আজটেকদের সূর্যদেব বহুবার পরিবর্তিত হলেও সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সূর্যদেব ছিলেন হুইটজলোপচ্টলি (Huitzilopochtli)।

আট

বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও সেই সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সূর্যপূজার ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। ঢাকার জাতীয় জাদুঘরে সূর্যদেবের যে চারটি মূর্তি পাওয়া গেছে, সেগুলো দশম ও একাদশ শতাব্দীর। সম্ভবত শ্রীচৈতন্য দেবের বৈষ্ণব আন্দোলনের প্রাবল্যে সূর্যদেব কিছুটা নিমীলিত হয়েছেন। তারপরও সূর্যপূজার চল এ দেশে ছিল। এই সেদিন পর্যন্ত অনেক হিন্দু নারী মাঘমণ্ডল ব্রত নামক একটি ব্রত উদযাপন করতেন। এতে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে সূর্যপূজা করতে হয়। গবেষক আতোয়ার রহমান দেখিয়েছেন যে, আধুনিক বাংলাদেশেও এক নতুন সূর্যবাদ বা সূর্য ধর্মের আবির্ভাব ঘটেছিল, যার প্রবক্তা ছিলেন কুমিল্লার জনৈক ঈমানউদ্দিন ক্বারী। জানা যায় তিনি হজও সুসম্পন্ন করেছিলেন। তার বয়ান পড়লে মনে হয়, তিনি আল্লাহকেই সূর্য হিসেবে বিবেচনা করতেন। আর তিনি ঊর্ধ্বাকাশে এই সত্য অনুধাবন করেছিলেন। ‘ঈমান ফকিরের জীবনীতে আমরা পাই, 

[...] মাটি থেকে উপরে করিলেন গমন,

গুরুর স্বরে বলেন সঙ্গে থাকি যেন!

সঙ্গে সঙ্গে সদায় চরণ তলে রাখেন,

দয়াল গুরু সূর্য বিনে নাই এখন!

করুণার স্বরে সূর্য আমাকে ডাকেন,

শ্রীযুক্ত ফানাফিল্লা মম নাম রাখেন! [...]’ (রহমান : ২০০৪ : ৭০) 

আর মূসা নবী যে খোদার সন্ধানে পর্বত শিখরে উঠেছিলেন, ঈমান ফকির বলেন, সেখানে মূসা আলোকোজ্জ্বল যে বিভাময় পরম করুণাময়কে পেয়েছিলেন, তিনি আদতে সূর্যই ছিলেন (রহমান : ২০০৪: ৭২) । 


লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও অনুবাদক

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //