কার্টুনিস্ট, যারা মানুষের জন্য আঁকেন

কার্টুন এঁকে সারা বিশ্বে অনেক শিল্পী আছেন যারা বিশেষভাবে জনপ্রিয় এবং পরিচিত। এঁরা নিজেদের সৃষ্ট কার্টুনের মাধ্যমে সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছেন প্রতিনিয়ত। পৃথিবীজুড়ে এমন শিল্পী বা কার্টুনিস্টের সংখ্যাও একবারে কম নয়। ই-দুনিয়ার বদৌলতে এ লেখায় দশ কার্টুনিস্টকে নিয়ে লিখেছেন- শোয়াইব।

রোনাল্ড শার্লে : কার্টুনিস্টদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে আলোচিত। শার্লে বেশি পরিচিত ‘এসটি ট্রিনিয়ানস’র স্রষ্টা হিসেবে। ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ শহরে ১৯২০ সালের ৩ মার্চ জন্ম নেওয়া এ শিল্পী ৫ বছর বয়স থেকে আঁকা শুরু করেন। স্কুল ছাড়েন ১৫ বছরে। বিখ্যাত ‘লিলিপুট’ ম্যাগাজিনে ১৯৪২ সালে ‘এসটি ট্রিনিয়ানস’ কার্টুনটি প্রথম ছাপা হয়। তিনি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় আমেরিকায়। ২০০৫ সালে বিবিসি তার জীবন এবং কাজ নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিল। ২০১০ সালে তিনি জার্মানির ‘ভিলহেম বুশ মিউজিয়াম হানোভার’ জাদুঘরকে তার ২২০০টি কাজ প্রদান করেন।

সউল স্টেইনবার্গ : রোমানিয়ায় ১৯১৪ সালের ১৫ জুন জন্ম নেওয়া আমেরিকান এ কার্টুনিস্ট চিত্রশিল্পের জনপ্রিয় ও ফাইন আর্টস দু-শাখাতেই কাজ করেছেন। তিনি সর্বাধিক পরিচিত তার ‘দি নিউ ইয়র্কার’ কাজের জন্য। ইউনিভার্সিটি অব বুখারেস্ট এক বছর দর্শনশাস্ত্রে পড়ালেখা করলেও ১৯৪০ সালে তিনি আর্কিটেকচারে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন। মিলানে থাকার সময়ে ব্যঙ্গাত্মক ম্যাগাজিন ‘বার্টোল্ড’র সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। 

ওয়াল্ট ডিজনি : যদিও ডিজনি চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে পরিচিত, তবুও তিনি এ সময়ের কার্টুনিস্টদের ওপর অনেক নামি শিল্পীদের থেকেও বেশি প্রভাব বিস্তার করছেন। কারিগরি জ্ঞানে তিনি সেরা কার্টুনিস্ট নন; কিন্তু তিনি এটি জানেন কোন চরিত্রটি মানুষের কাজে আসবে। তাই তিনি চিন্তা করেন বিভিন্ন চরিত্র নির্মাণের। তার চিন্তাকে বাস্তবে দেখার জন্য আনেন কার্টুনিস্ট ভাড়া করে। বিশ শতকে ‘মিকি মাউস’-এর মতো অনেক জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র তার দল নির্মাণ করেছে। আমেরিকায় ১৯০১ সালের ৫ ডিসেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মারা যান ১৯৬৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর।

ম্যাক্স বিয়ারবম : লন্ডনে জন্ম নেওয়া বিয়ারবম একজন প্রাবন্ধিক ও ব্যঙ্গচিত্রকর। বিচিত্র ধরনের মানুষের মুখ আঁকায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। ভিক্টোরিয়ান ও অ্যাডওয়ার্ডিন রাজনীতিকে ব্যঙ্গ করে আঁকা ও লেখা তার কাজগুলো বিশাল আকারে ছাপা হতো ‘দি স্ট্যান্ড’-এর মতো নামি ম্যাগাজিনে। 

অনর দুমিয়ে : ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া অনর দুমিয়ে একাধারে পেইন্টার, ভাস্কর, ব্যঙ্গচিত্রকর এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গ লেখক হিসেবে জনপ্রিয়। তার আঁকায় বিষাদের প্রতিফলন ফুটে ওঠে, তবে দেখতে খুব সাধারণ মনে হয়। তিনি বিশেষভাবে বিখ্যাত ছিলেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ব্যঙ্গচিত্র আঁকার জন্য। ছবির মাধ্যমে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতেন মানুষের দুর্বলতা এবং ব্যর্থতা। তিনি আত্মদম্ভীদের দুর্বলতা দিয়ে ব্যঙ্গ করতে পছন্দ করতেন। তিনি তার পেইন্টিংয়ের মাধ্যমেও বিভিন্ন কর্তৃপক্ষকে হাস্যাস্পদ করেছেন। তিনি কিং লুই ফিলিপকে নাশপাতি গাছের মতো করে আঁকার জন্যও বিখ্যাত। 

পাবলো পিকাসো : পিকাসো সারা বিশ্বে চিত্রশিল্পী হিসেবেই সম্মানিত। যদিও তার অনেক কাজে কার্টুনের উপাদান পাওয়া যায়, উদাহরণ হিসেবে ১৯০১ সালে তার আঁকা ‘সেলফ পোর্ট্রেট ইন এ টপ হ্যাট’-এর কথা বলা যায়; কিন্তু তিনি সুস্পষ্ট কার্টুনিস্ট না। তিনি সবসময় নিজের ছবিকে একইভাবে উপস্থাপন করতে চাননি। চিত্রসমালোচকরা মনে করেন, পিকাসো যখন একই ধারার কাজে বিরক্ত হয়ে যেতেন তখন তিনি অতিরঞ্জিত যা দেখতেন তা ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে সত্যিকারভাবে প্রকাশ করতেন। অন্যান্য নামি কার্টুনিস্টদের চিত্রে যা পাওয়া যায় না এ শিল্পীর অনেক ছবিতে তাও পাওয়া যায়। 

জর্জ গ্রজ : জর্জ নামের মেধাবী জার্মান শিল্পীকে তার নিষ্ঠুর কার্টুন স্ক্রিপ্ট এবং নির্মম নাৎসিবিরোধী কার্টুনের জন্য সবাই জানেন। তার কাজের জন্য জার্মান সেনারা ২০ বছর বয়সেই তাকে অভিযুক্ত করে এবং তার অনেক কাজ ধ্বংস করে ফেলে। যদিও তিনি কোনো সময়ই সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন না। তবে তিনি মানুষকে প্রতিবাদী করেছেন তার কার্টুনের মাধ্যমে। ‘এট ডাস্ক’ তার অন্যতম কাজ। জীবনের সবচেয়ে ভালো কাজগুলো তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ই করেছিলেন।

উইলিয়াম হোগার্থ : ভাস্কর্যে তার আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। তিনি সেই মহান শিল্পী যিনি ব্রিটিশ সমাজকে ব্যঙ্গচিত্র এবং পেইন্টিংয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি তখন দুঃসাহসিকভাবে ব্রিটিশ রাজপরিবার ও প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সমালোচনা করেছেন তার কাজের মাধ্যমে। তার নানা চিত্রে ব্যঙ্গভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন মানুষের অহেতুক দম্ভ। এ শিল্পী সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পরিচিত ১৯৩৫ সালে আঁকা ‘এ রাকি’স প্রোগ্রেজ’-এর জন্য। এ সময়ে যারা কার্টুন সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন বা আঁকেন তাদের অনেকেই তাদের অজান্তে হোগার্থ দ্বারা প্রভাবিত। 

আদ্রেঁ ফ্রাঁসোয়া : হাঙ্গেরিয়ান শিল্পী আদ্রেঁ ‘পাঞ্চ’সহ বিভিন্ন ব্যঙ্গ ম্যাগাজিনের সঙ্গে কাজ করেছেন। এঁকেছেন ‘পাঞ্চ’ ম্যাগাজিনের অনেক প্রচ্ছদ। তিনি আঁকতেন খুব সরল পদ্ধতিতে আর এটিই তাকে স্বতন্ত্র করেছে। সে সময়ের অনেক শিল্পী তার আঁকায় অসমাপ্ততা খুঁজে পেতেন; কিন্তু তার এ ব্যতিক্রমী পদ্ধতির কাজই তাকে বিখ্যাত শিল্পীতে রূপান্তর করেছে। 

আল হার্শফেল্ড : হলিউডের সোনালি সময়ের তারকাদের ব্যঙ্গ পোর্ট্রটের জন্য বিখ্যাত মেধাবী কার্টুনিস্ট হার্শফেল্ড। তিনি রিটা হেওয়ার্থ থেকে শুরু করে ফ্রেড অ্যাস্টেয়ার ও বারবারা স্ট্রেইস্যান্ড সবার পোর্ট্রেট এঁকেছেন সাদা কালো রঙে। মেধাবী এ শিল্পী মাত্র কয়েকটি আঁচড়েই তুলে আনতেন তারকাদের ব্যঙ্গ রূপ।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //