মিয়ানমার কি আরেক সিরিয়া হতে চলেছে?

মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। ছবি: বিবিসি

মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। ছবি: বিবিসি

মিয়ানমার মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকে এখন পর্যন্ত সহিংসতায় প্রায় ৮০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। গোটা দেশের জনগণ অতীতের যে কেনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। বিশেষ করে তরুণরা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।

অন্য দিকে অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। অনেকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের দেশটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, সিরিয়ার পরিণতি বরণ করতে যাচ্ছে মিয়ানমার।

মিয়ানমারে সামরিক শাসন কোনো নতুন ঘটনা নয়। তবে এবারের মতো রক্তপাত স্মরণকালে দেখা যায়নি। তাই দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছেন অনেকে। মিয়ানমার তবে কোন পথে যাচ্ছে? নতুন পথে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ এখনো অজানা। মিয়ানমারে সামরিক কিংবা বেসামরিক সরকার যারাই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠায় তাদের উদাসীনতা লক্ষ্যণীয়। 

বাংলাদেশ সীমান্তে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু মুসলমান, থাইল্যান্ডের সীমান্তে কারেন এবং চীন সীমান্তে কাচিন সম্প্রদায়ের মানুষ অবহেলার শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি অবহেলিত রোহিঙ্গারা। সামরিক সরকার ১৯৮২ সালে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিলে তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়েন। চলমান সংঘাতে শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং গণতন্ত্রপন্থী ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) পার্টির কর্মীরা মুখোমুখি হলেও এটাও সংখ্যাগরিষ্ঠ বামারদের মধ্যে সীমিত। বামার সম্প্রদায় মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি মানুষ। সেনাবাহিনীও তাদের সমর্থনপ্রত্যাশী; এনএলডি তাদের সমর্থন নিয়ে থাকে। এখন বামার সম্প্রদায় কঠিনভাবে বিভক্ত। 

মিয়ানমার ১৯৪৮ সালে স্বাধীন হওয়ার পর থেকে গণতন্ত্র খুব কমই দেখেছে। ১৯৬২ সালের পর থেকে টানা ৫০ বছর সেনা শাসন চলছে। ২০১৫ সালে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথম গণতন্ত্রের দেখা মেলে। যদিও মিয়ানমারে গণতন্ত্র হলো সীমিত গণতন্ত্র। পার্লামেন্টে ২৫ শতাংশ আসন সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। নিরাপত্তা সংক্রান্ত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় সেনাবাহিনীর জন্য বরাদ্দ। ফলে মিয়ানমারে গণতন্ত্র মানে সেনা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র। তবে ২০২০ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের আগে থেকে সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে দেশটির বেসামরিক সরকারের প্রধান অং সান সুচির দূরত্ব সৃষ্টি হয়। সিভিল ও মিলিটারি প্রশাসনের মধ্যে দূরত্বের মধ্যে ১ ফেব্রুয়ারি ভোরে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। জুলাইয়ে সেনাপ্রধান হ্লাইংয়ের অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। সুচি যদিও আন্তর্জাতিক আদালতে হ্লাইংয়ের সাফাই গেয়েছেন; সেটা তিনি করেছেন রাষ্ট্রের প্রধান এজেন্ট হিসেবে নিজের দেশের সেনাপ্রধানের পক্ষ নিয়ে। রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে সেনাপ্রধান হ্লাইংসহ বাকিরা অভিযুক্ত; কিন্তু অবসরে যাওয়ায় পর হ্লাইংয়ের পক্ষে সাফাই নাও গাইতে পারতেন সুচি। তাই ক্ষমতা দখল করে নিজের ভবিষ্যৎ নিজের হাতে তুলে নিলেন হ্লাইং। 

আন্তর্জাতিক মহল থেকে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার ওপর চাপ আছে গণতান্ত্রিক বেসামরিক সরকারের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবার জন্য। জান্তা এসব আহ্বানে কখনোই কর্ণপাত করে না। এর কারণ  এসব চাপ টেকসই নয়। প্রথমে কিছুটা চাপ দেয়, তারপর জান্তা শক্তি নিয়ে বসে পড়লে ধীরে ধীরে চাপ কমে আসে। ফলে বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর করা যায় না। তবে এবার অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ প্রবল। রক্তারক্তি করেও থামাতে পারছে না। তবে মিয়ানমারের জান্তা দেশের ভেতরে ও বাইরের চাপকে উপেক্ষা করে কীভাবে টিকে থাকে? নিশ্চয়ই তার কিছু শক্তি আছে।

প্রথমত, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ঐক্যবদ্ধ। তার মধ্যে কোনো বিভক্তি নেই। চেইন অব কমান্ড সবাই মেনে চলে। সংবিধান মোতাবেক, তাটমান্ডু নামের সামরিক বাহিনীর অধীনে অপরাপর নিরাপত্তা বাহিনী, যেমন বর্ডার গার্ড কিংবা পুলিশ সবাই। কারণ নিরাপত্তা সংক্রান্ত সব মন্ত্রণালয় সেনাবাহিনীর অধীনে। ফলে বেসামরিক সরকারের কাছে জনগণ এবং বেসামরিক প্রশাসন ছাড়া শক্তি প্রয়োগের কিছু নেই। ফলে তুলনা করলে পাকিস্তান কিংবা থাইল্যান্ডে সামরিক বাহিনীর চেয়ে তারা বেশি শক্তিশালী। 

দ্বিতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ পশ্চিমা শক্তিগুলো সেনা শাসনের বিরোধী হলেও চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, রাশিয়াসহ অনেক শক্তি আছে, যারা তাদের সমর্থন দিয়ে থাকে। কূটনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এটা তারা করে। মিয়ানমারের সরকার পরিচালনার জন্য সেনাবাহিনীর বহুমুখী কোম্পানি আছে। এগুলো বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে। চীনসহ বিভিন্ন দেশ তাদের সঙ্গে বাণিজ্যিকভাবে সম্পৃক্ত। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রধানত চীনের সমরাস্ত্রে সমৃদ্ধ হলেও, ইদানিং রাশিয়া থেকে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধবিমান আমদানি করছে।

মিয়ানমারের বৈদেশিক মুদ্রার বেশিরভাগ আসে গ্যাস বিক্রি করে। থাইল্যান্ড ও চীন মিয়ানমারের ক্রেতা। তার বাইরে মিয়ানমারের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদও অফুরন্ত। ফলে সেনাবাহিনীর দেশ পরিচালনায় কোনো অসুবিধা হয় না। সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের বিষয়ে বিশ্বব্যাপী নিন্দার মধ্যে সশস্ত্র বাহিনী দিবসের জাঁকজমকপূর্ণ পার্টিতে চীন, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, লাওস, বাংলাদেশ, ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতরা অংশ নিয়েছেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যেকোনো পদক্ষেপে ভেটো দেয় চীন। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক বিনষ্ট হয়, এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার বিরোধী। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী প্রায়োথ চান ওঁচা বলেছেন, তারা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপে বিশ্বাসী নয়। তবে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে মিয়ানমারের পরিস্থিতি তাদের নজরের মধ্যে থাকবে।

মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধ শুধু রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে। তার বাইরে আর কোনো বিরোধ নেই। ভারত ছাড়া বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমুখী যোগাযোগ যত বৃদ্ধি পাবে; আমরা পূর্বের দেশগুলোর সঙ্গে নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারব। বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশ হিসেবে মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা থাকুক, সেটা প্রত্যাশা করে। 

তবে বিষয়টি রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সেনা শাসক যদি রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়, তাদের সঙ্গেও বাংলাদেশের কাজ করা উচিত। গণতন্ত্র ফেরাতে পশ্চিমা দেশগুলোকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রে জোর দেওয়া উচিত। রোহিঙ্গাদের পাশ কাটিয়ে গণতন্ত্রে ফেরা, আর না ফেরা বাংলাদেশের কাছে সমান অর্থহীন।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh