উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে জাতপাত আর বর্ণের সমীকরণ

ভারতের উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে ইতিমধ্যে লড়াইয়ের দামামা বেজে উঠেছে। গত নির্বাচনে বিজেপির একচেটিয়া সমর্থন থাকলেও, এবারের লড়াইয়ের ময়দানে বেশ কয়েকটি পক্ষ নিজ নিজ অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিজেপির বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-এমএলএ দল ছেড়েছেন। রাজনৈতিক উত্তাপ তাই বেশ খানিকটা বেড়েছে। 

জনমত জরিপে দেখা যায়, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখলেও, আগের মতো তিন শতাধিক আসন থাকছে না বিজেপির। তবে জাতপাত আর বর্ণের নতুন সমীকরণ সব হিসাব উল্টে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। 

৪০৩ আসনের উত্তর প্রদেশ বিধানসভা ভোটের লড়াইয়ে ম্যাজিক ফিগার ২০২। টাইমস নাওয়ের জনমত জরিপ অনুযায়ী, বিজেপি পেতে পারে ২২৭ থেকে ২৫৪টি আসন। সমাজবাদী পার্টির (এসপি) জোট পেতে পারে ১৩৬ থেকে ১৫১টি আসন। এ দিকে উত্তর প্রদেশের মসনদে চারবার মুখ্যমন্ত্রী থাকা বহুজন সমাজবাদী পার্টির (বিএসপি) মায়াবতী এবার ভোটের হাওয়ায় অনেকটা পিছিয়ে রয়েছেন। 

ওই জরিপ অনুযায়ী, বিএসপি পেতে পারে ৮ থেকে ১৪টি আসন। অন্যদিকে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন উত্তর প্রদেশের কংগ্রেস ৬ থেকে ১১টি আসন পেতে পারে।

হাইভোল্টেজ এই বিধানসভা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ঘিরেও হয়েছে সমীক্ষা। সমীক্ষা অনুযায়ী, যোগী আদিত্যনাথ সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় নেতা হিসেবে উঠে এসেছেন টাইমস নাউয়ের সমীক্ষায়। তাঁর পক্ষে ভোট পড়েছে ৫৩.৪ শতাংশ। সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাইছেন ৩১.৫ শতাংশ মানুষ। কংগ্রেসের প্রার্থীকে মুখ্যমন্ত্রী দেখতে চাইছেন ২.৫ শতাংশ, যেখানে ফের একবার মায়াবতীকে মসনদে দেখতে চাইছেন ১১.৫ শতাংশ মানুষ। 

এ দিকে এবিপি সি-ভোটারের জরিপ বলছে, ৪০৩ আসনের মধ্যে যোগী শিবির দখলে রাখতে পারবে ২২৩ থেকে ২৩৫টি আসন। তবে অখিলেশদের ভোটব্যাংক বাড়লে মসনদের দেখা পেতে অনেক দূর। এসপির পক্ষে ১৪৫ থেকে ১৫৭টি আসন যেতে পারে। মায়াবতীর বিএসপি ৮ থেকে ১৬টি আসন পেতে পারে। কংগ্রেসের তিনটি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তাদের হাত রিক্তও থাকতে পারে। অন্যরা ৪ থেকে ৮টি আসন পেতে পারে।

ভোটব্যাংকের হিসাব : উত্তর প্রদেশে উচ্চবর্ণের ভোট ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ। সাধারণ জাতিভুক্ত সেই ভোটারদের মধ্যে ১০ শতাংশ ব্রাহ্মণ ও ৭ শতাংশ ঠাকুর। উত্তর প্রদেশে সব থেকে বেশি ৩৯-৪০ শতাংশ ওবিসি (অন্য অনগ্রসর) শ্রেণিভুক্ত ভোট। ব্রাহ্মণ ও ওবিসি বাদ দিয়ে বাকি ভোটারদের মধ্যে ৭-৯ শতাংশ যাদব এবং ৪ শতাংশ নিষাদ গোষ্ঠীর ভোট রয়েছে উত্তর প্রদেশে। এ ছাড়া প্রায় ২০ শতাংশ তফশিলি জাতি ও উপজাতি, তার মধ্যে ১০ শতাংশ অন্য জাতবও রয়েছেন। বাকি ১৬ থেকে ১৯ শতাংশ মুসলিম ভোটার।

উত্তর প্রদেশের ভোটে পাঁচটি প্রধান ভোটগোষ্ঠীর দিকেই নজর থাকে রাজনৈতিক দলগুলোর। উচ্চবর্ণ, মুসলিম, অ-যাদব ওবিসি, যাদব এবং জাতব- এই পাঁচ গোষ্ঠীর মধ্যে দুটির বেশি প্রধান গোষ্ঠীর ভোট ব্যাংকে থাবা বসাতে পারলেই সাফল্য আসবে। আর তা বিগত নির্বাচনে করে দেখিয়েছে বিজেপি। দুটি পূর্ণ গোষ্ঠীর ভোট এবং অ-যাদব ওবিসিদের ভোটে থাবা বসিয়ে ২০১২ সালে এসপি জয়ী হয়েছিল। আর মুসলিম-যাদব সমন্বয় ঘটিয়ে বিএসপি ২০০৭ সালে তা করে দেখিয়েছিল। আর বিজেপি সাড়ে তিনটি গোষ্ঠীর ভোটে আধিপত্য বিস্তার করে সাফল্য এনেছিল।

বিজেপি ২০১৭ সালে উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে অ-যাদব ওবিসি এবং অ-জাতব দলিতকে একত্রিত করে সাফল্য পেয়েছিল। যাদব, জাতব ও মুসলিমদের বাদ দিয়ে অ-যাদব ওবিসিরা বিজেপির দিকে ঘুরে গিয়েছিল। উচ্চবর্ণের অর্থাৎ ব্রাহ্মণ ও ঠাকুরদের ভোট বিজেপির পক্ষে ছিল। যাদবদের পরে মৌর্যদের ৬-৭ শতাংশ এবং কুর্মিদের ৫ শতাংশ উত্তর প্রদেশ সব থেকে বড় অ-যাদব ওবিসি ভোট ব্যাংকেও থাবা বসায় বিজেপি।

২০১৭ সালে উত্তর প্রদেশে ক্ষমতায় এসেছিল বিজেপি ৪০ শতাংশের বেশি ভোট নিয়ে। এসপি-কংগ্রেস-বিএসপি জোটকে পর্যুদস্ত করে ৩১২টি আসন তারা দখল করেছিল এ প্রদেশে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো দল এমন সাফল্য অর্জন করতে পারেনি ভারতের বৃহত্তম এ রাজ্যে। অথচ বিরাট সাফল্য নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরও এবার উত্তর প্রদেশে জয় নিয়ে প্রশ্নের মুখে বিজেপি। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে এসপি-বিএসপি ৩৮ শতাংশ ভোট পেলেও বিজেপির ভোট পৌঁছে গিয়েছিল ৫০ শতাংশে। এবার বিরোধী দলগুলো পৃথকভাবে ভোটে লড়ছে। তারপরও সমাজবাদী পার্টি একাই সরকার গঠন করবে বলে দাবি সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবের।

এসপির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচন এখন দ্বিমুখী, বিএসপি ও কংগ্রেস সাইডলাইনে চলে গেছে। উত্তর প্রদেশের মানুষের বিজেপিবিরোধী ভোট, বিশেষ করে মুসলিম ভোট কোনো বিভাজন ছাড়াই এসপিতে আসতে পারে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যে দলই এবার ৩৫ শতাংশ ভোট পাবে, তারাই সরকার গঠন করতে পারবে। বিজেপি অবশ্য দাবি করছে, নরেন্দ্র মোদী ও যোগী আদিত্যনাথ অত্যন্ত জনপ্রিয়। ফলে বিজেপি ৪০ শতাংশ ভোটের নিচে নামবে না এবং তারা পুনরায় নতুন মেয়াদে সরকার গঠন করবে খুব সহজেই।

অঙ্কে পরিবর্তনের ইঙ্গিত : গত বছরখানেকের মধ্যে উত্তর প্রদেশের ভোটের অঙ্কে অনেক পরিবর্তন এসেছে। যেখানে গত চার বছরে ভারতে সাধারণ মানুষের গড় আয় বেড়েছে দ্বিগুণ, সেখানে উত্তরপ্রদেশে তা বেড়েছে মাত্র ০.৪৩ শতাংশ। এ সময়ে বেকারত্ব বেড়েছে পাঁচ গুণ। ভারতের মোট অভুক্ত, অপুষ্টির শিকার শিশুদের ৪৩ শতাংশই উত্তর প্রদেশের। মব লিঞ্চিং বা গোরক্ষকদের হাতে হত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং যৌতুকের দাবিতে হত্যায় উত্তর প্রদেশ রয়েছে এক নম্বরে। এ সবই ভোটে নতুন অঙ্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এসপি বলছে, ২০২১ সালে পরিস্থিতি বদলে গেছে। কারণ বিজেপি ‘ঠাকুর’ সম্প্রদায়ের যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করেছে। এই সিদ্ধান্ত ব্রাহ্মণদের পাশাপাশি অ-যাদব ওবিসিদের ক্ষুব্ধ করেছে। ফলে বিজেপির সেই জাত-ব্যাংক ভেঙে গেছে। তারা এখন এসপির দিকে ঝুঁকেছে। ফলে বিজেপির থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ওই সম্প্রদায়ের নেতারা। ইতিমধ্যে তিনজন ওবিসি মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তারা সমাজবাদী পার্টির দিকে ঝুঁকেছেন।

হিন্দুত্বের সঙ্গে সব জাতকে মেশাতে যে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা সামাজিক মেলবন্ধন মোদি-অমিত শাহ জুটি ২০১৭ সাল থেকে সফলভাবে করে এসেছেন, তাতে ঘা মারতে অখিলেশ এবার অনেক আগে থেকে নিজেকে তৈরি করেছেন। কৃষক আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি আঁচ করে জোটে টেনেছেন পশ্চিম-উত্তর প্রদেশের জোটভিত্তিক দল রাষ্ট্রীয় লোকদলের নেতা জয়ন্ত চৌধুরীকে। বিজেপি ছেড়ে আগেই বেরিয়ে আসা পূর্বাঞ্চলীয় অনগ্রসর নেতা সুহেল দেব ভারতীয় সমাজ পার্টির নেতা ওমপ্রকাশ রাজভরের সঙ্গেও হাত মিলিয়েছেন।

অখিলেশের জোট হয়ে দাঁড়াচ্ছে ‘যাদব+মুসলমান+ জাট+ওবিসি+এমবিসি’। জাতভিত্তিক আরও ছোট ছোট দল, যাদের বিজেপি কাছে টেনেছিল, তাদের কেউ অখিলেশের গড়া ‘রংধনু জোটে’ যুক্ত হওয়া আশ্চর্যের হবে না। বিজেপির ‘কমন্ডুল’ রাজনীতির বিপরীতে তাই ‘মণ্ডল’ রাজনীতির বিকাশ দ্রুতগতিতে ঘটছে। এমনটা ঘটলে উত্তর প্রদেশের সব হিসাব-নিকাশ উল্টে যেতে পারে। আর উত্তর প্রদেশ হাতছাড়া হলে জাতীয় রাজনীতিতেও যে বিজেপি-মোদির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি হুমকির মুখে পড়বে, তা বলাই বাহুল্য।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //