রাজনীতিতে দৈন্য

মাঠ প্রশাসনে বাড়ছে নিরাপত্তা ঝুঁকি

সম্প্রতি ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার পর উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ফাইল ছবি

সম্প্রতি ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার পর উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ফাইল ছবি

রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি ও বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিস্তৃত হয়েছে। আবার দেশে শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক দল না থাকায় ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে উঠেছে। 

অন্যদিকে মন্ত্রী-এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের চাপে ডিসি-এসপি-ইউএনওসহ মাঠ প্রশাসনে কর্মরত কর্মকর্তারা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়মবহির্ভূত সুবিধা না দিলেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হচ্ছেন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। গত কয়েক বছরে এমন অসংখ্য অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। 

সম্প্রতি ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার পর উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে অতীতের কোনো ঘটনারই দৃষ্টান্তমূলক প্রতিকার বা বিচার হয়নি। তাই এ ক্ষেত্রে আশাবাদী হতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের আমলে মাঠ প্রশাসনে কর্মরত ডিসি, ইউএনও ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মকর্তাদের ওপর অসংখ্য হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মামলা হলেও তার বিচার হয়নি কখনো। আবার মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানালেও তার কোনো সমাধান হতো না। সরকারি কর্মকর্তারা চাকরি রক্ষা করতে অনেক সময় সমঝোতা করতে বাধ্য হন। 

তবে এবার স্থানীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার ওপর এ জাতীয় হামলার ঘটনায় অন্য সবার মধ্যে সঙ্গত কারণেই যে নিরাপত্তাহীনতা ও আস্থাহীনতার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করতে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বিশিষ্টজনরা।

চলতি মাসের ১ তারিখ মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. জাকির হোসেন বাচ্চু, শিবচর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রফিকুল ইসলাম, পাঁচ্চর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা ইউসুফ হোসেন, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এলএ শাখার সার্ভেয়ার মো. রাসেল হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন সরকারি দলের নেতা ও দুই ঠিকাদার। 

এর আগে গত ১১ মে সিলেট জেলা ছাগল উন্নয়ন খামার থেকে খাওয়ার জন্য ছাগল না পেয়ে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। সিলেট বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের উপপরিচালক আমিনুল ইসলামের ওপর এ হামলা চালানো হয়। গত ৫ ফেব্রুয়ারি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে যুবলীগের এক নেতার নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। এ সময় মৎস্য কর্মকর্তা খালেদ মোশাররফ ও তার অফিস সহকারী গুরুতর আহত হন। এভাবে প্রতিনিয়তই মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে। এতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা।

বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন-অর-রশীদ হাওলাদার বলেন, ‘সংবিধানের ১১, ৫৯ এবং ১৫২(১) অনুচ্ছেদের নির্দেশনা বাস্তবায়নে উপজেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ প্রতিষ্ঠার পর ইউএনও সেটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা। এর বাইরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, পাবলিক পরীক্ষা ও প্রটোকল অফিসার; কিন্তু নির্বাচিত প্রশাসনিক স্তরে টিমওয়ার্কের অভাব ও আইন অমান্যের কারণে সমন্বয়হীনতা দেখা দিচ্ছে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক বছরে বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত যেসব নেতাকর্মীর নাম এসেছে, তাদের বেশিরভাগই সরকারি দলের নেতাকর্মী। স্থানীয় রাজনীতিতে বিবাদমান একাধিক পক্ষের চক্ষুশূল ছিলেন ইউএনও ওয়াহিদা খানম। স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, যুবলীগ নেতাসহ অনেকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তাদেরই কোনো পক্ষ ওয়াহিদার ওপর হামলার নেপথ্যে থাকতে পারে।

তবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘অপরাধী যেই হোক, ছাড় দেয়া হবে না। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাকে বিচারের আওতায় আসতেই হবে।’

বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএএসএ) মহাসচিব ও জনপ্রশাসন সচিব শেখ ইউসুফ হারুন বলেন, ‘উপজেলায় বিভিন্ন পেশা ও সংগঠনের লোকজন থাকে। মানুষের চাহিদা অফুরন্ত হয়ে গেছে। সে চাহিদার মধ্যে কোনোটা আইনি, কোনোটা বেআইনি- এটা কিন্তু তারা অনেক সময় বাছবিচার করে না। দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে ইউএনওরা কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে থাকেন। মোবাইল কোর্ট থেকে শুরু করে আইনের প্রতিটি বিষয় দেখভাল করে থাকেন তারা। কোথাও আইনের ব্যত্যয় করে কিছু আবদার করে না পেলে অনেকে ইউএনওর ওপর বিরাগভাজন হন।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি ও বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এজন্য মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অনেক স্পর্শকাতর ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন যেমন আলোর মুখ দেখেনি, তেমনি জড়িত প্রকৃত অপরাধীরাও নানামুখী পরিচয়ের আড়ালে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।’ 

স্থানীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার ওপর হামলার পর অন্য সবার মধ্যে সঙ্গত কারণেই যে নিরাপত্তাহীনতা ও আস্থাহীনতার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করতে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে বলেও জানান তিনি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এই ধরনের ঘটনা খুবই দুঃখজনক। এজন্য সরকারও কম দায়ী নয়। কারণ জনপ্রতিনিধি হতে এখন তো নির্বাচন লাগে না। সরকারি সিদ্ধান্তে হয়। এখানে ভালো মানুষ বাদ দিয়ে খারাপ মানুষকে সিলেকশন করা হয়।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। সবাই দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য তদবির করে। তারা জানে, দলীয় মনোনয়ন পেলেই এমপি, মেয়র ও চেয়ারম্যান হওয়া যাবে। আর এভাবে জনপ্রতিনিধি হলে তো জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা থাকে না।’

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh