রোহিঙ্গা সংকট

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কুটনৈতিক অগ্রগতি নেই

ছবি: এএফপি

ছবি: এএফপি

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতায় ফল পাওয়া যাচ্ছে না। মিয়ানমার তাদের ফিরিয়ে নেবে বলে মুখে মুখে বলছে; কিন্তু বাস্তবে কোনো আন্তরিকতা দেখাচ্ছে না। বরং উল্টো বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সামনে মিথ্যাচার করছে। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৫তম ভার্চুয়াল অধিবেশনে মিয়ানমারের বক্তব্য। বাংলাদেশে মিয়ানমারের সন্ত্রাসীরা আশ্রয় পাচ্ছে বলে অভিযোগের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তারা। মিয়ানমারের এসব মিথ্যাচার দুরভিসন্ধিমূলক। 

বাংলাদেশ পৃথিবীর কোনো দেশের সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেয় না। এক্ষেত্রে, বাংলাদেশের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। বাংলাদেশে মিয়ানমারের সন্ত্রাসীদের আশ্রয় পাওয়ার অভিযোগ অমূলক এবং ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র শামিল। অর্থাৎ রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে এমন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে বাংলাদেশের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মাধ্যমে মিয়ানমার নিজেদের গাফিলতি আড়াল করার দুরভিসন্ধি প্রদর্শন করছে। তারা এ বিষয়ে ‘ব্লেম গেম’ সৃষ্টি করতে চাইছে। 

প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত ছয় লাখ রোহিঙ্গার পরিচয়সহ তালিকা মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছে; কিন্তু সে তালিকার খুব সামান্য অংশ যাচাই করে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে ক্লিয়ার করেছে তারা। কোনো রোহিঙ্গাই এই মুহূর্তে মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী নন। কারণ তারা মনে করছেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এখনো মিয়ানমার গড়ে তোলেনি। বরং বিশ্ববাসীর আহ্বান উপেক্ষা করে রাখাইন রাজ্যে যুদ্ধাবস্থা বজায় রেখেছে তাদের বাহিনী। জাতিসংঘ মহাসচিব আনতোনিও গুতেরেস অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও মিয়ানমার কর্ণপাত করছে না। এখন রাখাইন রাজ্যে রাখাইন সম্প্রদায়ের ওপরও তারা নির্যাতন-নিপীড়ন চালানো হচ্ছে। জাতিসংঘে মিথ্যাচারের আরেকটি লক্ষ্য হলোÑ মিয়ানমার রোহিঙ্গা সংকটকে দ্বিপক্ষীয় সংকট হিসেবে দেখাতে চায়। প্রকৃতপক্ষে, রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে তাদের বিতাড়িত করে সংকটের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মিয়ানমারের মিথ্যাচারের জবাব দিয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘে ‘রাইট টু রিপ্লাই’ রীতিতে কাউকে কিংবা কোনো দেশকে টার্গেট করে দেওয়া বক্তব্যের জবাব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে জবাব দেওয়াই যথেষ্ট নয়। মিয়ানমার যাতে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়, তেমন চাপ সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে, কার্যকর পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক দুটি আদালতে নেওয়া হয়েছে। আইসিজে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ নিস্পত্তি করে। তারা একটি অন্তর্বর্তী রায় দিয়েছেÑ মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এখনো প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে রয়েছে। বাস্তবে সেখানে এখনো নিরাপত্তা নিশ্চিতের পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক আরেকটি আদালত আইসিসি যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করে থাকে। আইসিসি অপরাধী ব্যক্তির বিচার করে। তারা তদন্ত শুরু করেছে। মিয়ানমারের কয়েক সেনা সদস্যের কাছ থেকে বক্তব্য নিয়েছে। ফলে রোহিঙ্গাদের গণহত্যা, বাড়িঘরে আগুন, ধর্ষণ প্রভৃতি অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের ব্যবস্থা হচ্ছে। এ ছাড়া, পশ্চিমা নেতাদের মুখের বুলি ছাড়া কার্যকর কোনো চাপ দেখা যাচ্ছে না। মিয়ানমারের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে চাপ অনেক বেশি হতো; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তেমন চাপ না দিয়ে বিবৃতিতেই সীমিত রাখছে। আঞ্চলিক বড় দেশ ভারত ও চীন তাদের সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক যাতে কিছুতেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের আহ্বান জানাচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। 

বর্তমানে এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। লাদাখে চীন ও ভারতের মধ্যে সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে কৌশলগত কারণে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতো দেশগুলোর গুরুত্ব বেড়ে গেছে। বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের কাছে টানছে কিংবা অন্তত নিরপেক্ষ জায়গায় রাখতে চাইছে। এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও সেনাপ্রধান যৌথভাবে মিয়ানমার সফর করেছেন। তারা অবশ্য মিয়ানমারের নেতৃবৃন্দের কাছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে কথা বলেছেন। তবে মিয়ানমারকে চাপে ফেলার মতো ভূমিকা এই দুই দেশ গ্রহণ করছে না। বাংলাদেশের কূটনৈতিক পর্যায়ে এমন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও ভারত উভয় দেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। নিরাপত্তা পরিষদে চীন স্থায়ী সদস্য এবং ভারত অস্থায়ী সদস্য।

বর্তমানে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে মিয়ানমার। এটি ঠিক যে, মহামারির সঙ্গে মানুষের জীবন-মরণের সংকট জড়িত। তবে এই সময়েও ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে কিছু প্রস্তুতিমূলক কাজ করা যায়। আরেকটা বড় সমস্যা হলোÑ আগামী ৮ নভেম্বর মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন এনএলডি এবং সামরিক বাহিনীর প্রক্সি রাজনৈতিক দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) লড়াইয়ে নেমেছে। ইউএসডিপি কট্টর জাতীয়তাবাদী দল। ইউএসডিপি প্রধান বলেছেন, তার রক্তে দুর্নীতি, মুসলিম, চাইনিজ কারও লেশমাত্র নেই। তার মানে হলো তিনি সাচ্চা দেশপ্রেমিক! মিয়ানমারের এমন তথাকথিত দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ১৯৮২ সালে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে সংকটের বীজ বপণ করেছিল। অবশ্য সু চির দলও রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। আপাত দৃষ্টিতে এনএলডি ভোটে কিছুটা খারাপ করলেও এই দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আবার ক্ষমতায় যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। মিয়ানমারের নতুন সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কী করে এখন সেটিই দেখার অপেক্ষা।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh