করোনার দ্বিতীয় ঢেউ: বাড়ছে হাসপাতাল বিমুখতা

শীত মৌসুমে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ বা 'সেকেন্ড ওয়েভের' আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছেনা। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ মোকাবিলায় এরইমধ্যে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। কোনো কোনো দেশ পূর্ব প্রস্তুতি হিসাবে কারফিউ জারি করেছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।

মহামারী করোনার এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্ব বেড়ে গেছে অনেকখানি। করোনার চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে বেশ কিছু হাসপাতাল। কিন্তু বিপত্তিটা বাঁধছে অন্য জায়গায়। নির্ধারিত এসব হাসপাতালগুলোতে যেতে নারাজ সাধারণ মানুষ।

হাসপাতালগুলোতে রোগীদের বিমুখতা নিয়ে অবশ্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক গত শনিবার এক আলোচনা সভায় ব্যাখ্যা দিয়েছেন- ‘মানুষ এখন বাসায় বসেই চিকিৎসা পায় তাই তাদের হাসপাতালে আসতে হয় না, এ জন্য হাসপাতালে রোগী কম।’

এদিকে, সরেজমিনে চিত্র ভিন্ন। ভুক্তভোগীরা বলছেন ভিন্ন কথা। এ বিষয়ে সাম্প্রতিক দেশকালের কথা হয়েছিলো করোনাভাইরাস থেকে সুস্থ হওয়া কয়েকটি পরিবারের সাথে।

ঢাকার কাঁঠালবাগানে বসবাসরত গৃহিনী সাদিয়া আহম্মেদ। কিছুদিন আগে কভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ ১৬দিন ছিলেন আইসোলেশনে। নিজ বাসায় আইসোলেশনের পর সুস্থ হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরেন সাদিয়া।

করোনাভাইরাস আক্রান্ত দিনগুলোর অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সাদিয়া। তিনি বলেন, একই বাড়িতে থাকার পরেও দুধের শিশুকে দীর্ঘদিন ছুঁতে না পারার কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মা-সন্তানের এমন বিচ্ছেদ যেন আর কখনো না হয়।

হাসপাতালে না গিয়ে বাসায় চিকিৎসা নেয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেন, হাসপাতালে গিয়ে আরো রোগ নিয়ে আসার কোনো ইচ্ছা ছিলো না, সে কারণেই বাসায় থাকা। হাসপাতালের পরিবেশ এখনো অনেক নোংরা। করোনা রোগীরা ওই পরিবেশে থাকলে সুস্থ হয়ার পরিবর্তে আরো অসুস্থ হয়ে ফিরতে হবে। এছাড়া সরকারি হাসপাতালে সিট পাওয়া নিয়ে ঝামেলা থেকেই যায়। আর বেসরকারি হাসপাতালের খরচ বহন করা যেকোনো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কষ্টসাধ্য।

পুরান ঢাকার ওয়ারী এলাকার বাসিন্দা আবু সালেহ মানিক। কিছুদিন আগে সপরিবারে করোনা আক্রান্ত হয়ে বাসায় থেকেই চিকিৎসা নেন তিনি। মানিক বলেন, পরামর্শ অনুযায়ী বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিয়েছে। বাসায় যে যতœসহকারে চিকিৎসা নেয়া সম্ভব, ততটা হাসপাতালের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। হাসপাতালে চিকিৎসকদের তৎপরতার অনেকটাই অভাব রয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রথমবার করোনা পজিটিভ আসার পর আইসিডিডিআর কিছুদিন পর পর খোঁজ-খবর রাখতেন। তবে, দ্বিতীয়বার করোনা পজিটিভ আসার পর পূর্বের মতো আইসিডিডিআর আর খোঁজ খবর রাখেনি। এক্ষেত্রে শুরুর দিকে যতটা উদগ্রীব ছিলেন, পরবর্তীতে ততটা নয়।

এদিকে,  গণমাধ্যম কর্মী বিএফইউজের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক আব্দুল মজিদ, করোনা আক্রান্ত হয়ে নিজ বাসায় আইসোলেশনে থেকে সুস্থ এখন। সাম্প্রতিক দেশকালকে তিনি বলেন, করোনা আক্রান্ত হলেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে এমন নয়। হাসপাতালের চেয়ে নিয়ম মেনে বাসায় চিকিৎসা নেয়াটাই বেশি ফলপ্রসূ। একমাত্র অক্সিজেন লেভেল নিচে নেমে গেলেই হাসপাতালে ভর্তি হয়া উচিত। তা না হলে বাসায় থেকে নিয়মমাফিত পথ্য নেয়াই ভালো।

কেবল সাদিয়া, মানিক কিংবা আব্দুল মজিদ নয়। এধরনের অভিজ্ঞতা বর্তমানে দেশে করেনা আক্রান্ত প্রায় সব মানুষেরই। রোগীদের অভিযোগ হাসপাতালগুলোতে যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়া, আবার কেউ কেউ বলছেন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন তারা। আর বেসরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে ব্যয়বহুলতা চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

তবে, চিকিৎসকরা এসব অভিযোগে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। তারা বলছেন, হাসপাতালে করোনা ইউনিটে সিটের স্বল্পতা রয়েছে। কিন্তু সিট খালি থাকা পর্যন্ত রোগী ভর্তি করানো হচ্ছে। আর ভর্তিকৃতদের চিকিৎসা নিয়ে কোনো গাফিলতির সুযোগ নেই বলেও দাবি চিকিৎসকদের।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপাচার্য কনক কান্তি বরুন এ বিষয়ে সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেন, আমাদের হাসপাতালে করোনা ইউনিটের জন্য বরাদ্ধ সকল সিটেই রোগী রয়েছে। তবে, ভ্যান্টিলেশন বিভাগে সিট ফাঁকা রয়েছে বলেও জানান তিনি। এর কারণ কোনো পক্ষপাতিত্ব নয়, সকল করোনা আক্রান্ত রোগীর অক্সিজেন প্রয়োজন নেই বলেই এ পরিস্থিতি। এছাড়া রোগীদের যথাযথ যতœ না নেয়ার বিষয়টিও অস্বীকার করেন তিনি। কনক কান্তি বলেন, বাসার চাইতে হাসপাতালের পরিবেশ কিছুটা ভিন্ন সেটা অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু আমাদের চিকিৎসাকর্মীরা রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার বিষয়ে যথাসাধ্য বিনয়ী।

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে এরইমধ্যে সর্তক করেছে সরকার প্রধান। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহামারি নিয়ন্ত্রণে এখনো আমাদের প্রত্যেকের বিশেষ ভূমিকা রাখার প্রয়োজন রয়েছে। সামাজিক দূরত্ব এবং হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে যাদের সঙ্গে বসবাস বা ঘনিষ্ঠতা নেই, তাদের থেকে দূরে থাকাই ভালো।   


মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh