বিস্ময়কর প্রতিবেদন

খাদ্য ঘাটতি বাড়লেও ক্ষুধার্ত মানুষ কমার দাবি

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে স্বাস্থ্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতিতে দিশেহারা মানুষ। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে। কাজ হারিয়ে তাদের রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে তীব্র সংকটে তাদের জীবনযাপন। ন্যূনতম খাবারের জন্য সরকারি ত্রাণ ও অন্যদের সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন অনেকে। 

এই পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্ব ক্ষুধা সূচক প্রকাশ করেছে ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট। তাদের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, বাংলাদেশ ১০৭টি দেশের মধ্যে ৭৫তম স্থানে উঠে এসেছে। গত বছর ৮৮তম অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। 

তবে এই সংস্থার প্রতিবেদনে ক্ষুধা কমার বিষয়টি উঠে এলেও আন্তর্জাতিক আরেকটি সংস্থা অ্যাকশন এইড বলছে করোনাকালে বাংলাদেশেও ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপের ফলাফলের সঙ্গে বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচককে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সরকারি-বেসরকারি সব সংস্থাই বলছে, দারিদ্র্য বাড়ছে, অথচ এই সময়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা কমেছে বলে প্রচার করা হচ্ছে।

‘বিশ্ব ক্ষুধা সূচক’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বিশ্বের ১০৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ উঠে এসেছে ৭৫তম অবস্থানে। গত বছর এই সূচকে ১১৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৮৮তম। তার আগের তিন বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল যথাক্রমে ৮৬, ৮৮ ও ৯০ নম্বরে।

ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যে চার মাপকাঠিতে বিচার করে গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স (জিএইচআই) করা হয়, তার সবগুলোতেই গতবারের তুলনায় বাংলাদেশ এগিয়েছে। অপুষ্টির হার, পাঁচ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে উচ্চতার তুলনায় কম ওজনের শিশুর হার, পাঁচ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে কম উচ্চতার শিশুর হার, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর হার- এই চারটি মাপকাঠিতে প্রতিটি দেশের পরিস্থিতি বিচার করে তৈরি হয় জিএইচআই।

  • ক্ষুধা সূচকে ৭৫তম বাংলাদেশ

    খাদ্য ঘাটতিতে ৬৫ শতাংশ নারী কৃষক

প্রতিটি দেশের স্কোর হিসাব করা হয়েছে ১০০ পয়েন্টের ভিত্তিতে। সূচকে সবচেয়ে ভালো স্কোর হলো শূন্য। স্কোর বাড়লে বুঝতে হবে, ক্ষুধার রাজ্যে সেই দেশের পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর স্কোর কমা মানে, সেই দেশের খাদ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। গত এক বছরে বাংলাদেশ স্কোরের দিক দিয়েও এক ধাক্কায় অনেকটা উন্নতি করতে পেরেছে। মোট স্কোর গত বারের ২৫.৮ থেকে কমে হয়েছে ২০.৪। আর এর ফলেই সার্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এক লাফে ১৩ ধাপ এগিয়ে এসেছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার নির্ধারিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি শিশুর প্রতিদিনের গ্রহণ করা খাদ্যের পুষ্টিমান গড়ে ১৮০০ কিলোক্যালরির কম হলে বিষয়টিকে ক্ষুধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ অপুষ্টির শিকার; পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ৯.৮ শতাংশের উচ্চতার তুলনায় ওজন কম; ওই বয়সী শিশুদের ২৮ শতাংশ শিশুর উচ্চতা বয়সের অনুপাতে কম এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার ৩ শতাংশ। গত বছর এই চার ক্ষেত্রে হার ছিল যথাক্রমে ১৪.৭ শতাংশ, ১৪.৪ শতাংশ, ৩৬.২ শতাংশ এবং ৩.২ শতাংশ। এই সূচকে প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে আছে গত কয়েক বছর ধরেই। তবে নেপাল ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে পিছিয়ে আছ এখনো।

ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ক্ষুধা মুক্তির লড়াইয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো গত এক বছরে বেশ খানিকটা উন্নতি দেখাতে পারলেও সাত দেশই রয়েছে সূচকের সেই ৪০ দেশের কাতারে, যেখানে ক্ষুধা এখনো ‘মারাত্মক’ একটি সমস্যা। তবে এই সূচক তৈরি করা হয়েছে সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে। এখানে নজিরবিহীন করোনাভাইরাস সংকটের প্রভাবকে আমলে নেয়া হয়নি।

কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের সহকারী কান্ট্রি ডিরেক্টর হাসিনা রহমান বলেন, ‘কভিড-১৯ মহামারির মধ্যে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার এ বছর দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। তা ছাড়া চলতি বছর স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক আর জলবায়ু বিপদ একসাথে আসায় বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টিও যথেষ্ট ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। কাজেই জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্তি চাইলে কঠিন এই পরিস্থিতিতে সবাই মিলে ন্যায্যতার ভিত্তিতে স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে পুরো খাদ্য ব্যবস্থাকে পাল্টে দিতে হবে।’

গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে শহরাঞ্চলে কর্মজীবী মানুষের আয় কমেছে ৮০ শতাংশ। গ্রামে এটি ৭৯ শতাংশ। আর নতুন সৃষ্ট দরিদ্র শ্রেণির ৭১ শতাংশ আয় কমে গেছে। আয় কমে যাওয়ায় তারা খাবার নিয়ে সংকটে পড়েছেন। কিছু মানুষ সঞ্চয় ভেঙেছেন। কেউ সরকারের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন; কিন্তু সব মানুষ প্রয়োজনীয় খাবার গ্রহণ করতে পারেননি।’

এদিকে আরেক বৈশ্বিক সংস্থা অ্যাকশন এইডের এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা ক্ষুধার্ত থাকছেন, তাদের শিশুরা যাতে নিয়মিত খেতে পারে তার জন্য নিজেরা কম খেয়ে থাকছেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৪টি দেশের নারী কৃষকদের ওপর গবেষণা করে সংস্থাটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। 

আফ্রিকা ও এশিয়া মহাদেশের দেশগুলোর জরিপে দেখা গেছে, বাজার বন্ধ, যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা ও খাদ্যের দাম বাড়ায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং তা পরবর্তী ফসল মৌসুমের চাষাবাদকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। 

অ্যাকশন এইডের জলবায়ু সহনশীল স্থায়িত্বশীল জীবন-জীবিকা বিভাগের প্রধান ক্যাথরিন গুতুন্ডু বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে কভিড-১৯ নারী কৃষকদের ঋণী ও অভাবগ্রস্ত করে দিয়েছে। তাদের অনেকেই এখন পরের মৌসুমে চাষাবাদ করার সামর্থ্য হারিয়েছেন। সরকার যদি জরুরি ভিত্তিতে এই পারিবারিক কৃষকদের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে না দেয়, তাহলে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক হতে পারে।’

গত সেপ্টেম্বরে নারী কৃষক ও স্থানীয় নেতাদের ওপর জরিপ চালিয়ে প্রস্তুত করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, কভিড-১৯ মহামারিতে বাজার বন্ধ থাকার পাশাপাশি লকডাউনের জন্য মানুষের উপার্জন ও খাদ্য সুরক্ষায় মারাত্মকভাবে প্রভাব পড়েছে। ৮৩ শতাংশ নারী কৃষক মহামারি চলাকালে তাদের জীবিকা ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ বলেছেন, তারা খাদ্য ঘাটতিতে ভুগছেন। প্রায় ৫৫ শতাংশ নারী মাহামারি চলাকালীন তাদের অবৈতনিক ও গৃহস্থালির কাজের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন। 

নারীরা তাদের শিশুর চাহিদাকে নিজের প্রয়োজনের চেয়ে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাদের অনেকেই কোনো কোনো বেলার খাবার না খেয়ে বা কম খেয়ে থাকছেন, যাতে পরিবারের অন্য সদস্যদের খাবারে কম না পড়ে। ৫৮ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, লকডাউনের সময় তাদের পরিবারের সদস্যরা অনেকদিনই খাবার খেতে পারেননি।

বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার ক্ষুদ্র নারী কৃষক লাইলা বেগমের উদ্ধৃতিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আমার স্বামী ও আমি আমাদের সন্তানদের খাওয়ানোর জন্য নিজেরা কম খাচ্ছি। ক্ষুধা শিশুদের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। খালি পেটে তারা পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে পারে না। যে কারণে আমি ও আমার স্বামী দু’বেলা খাবার খাচ্ছি। এমনকি কখনো কখনো একবেলা খেয়েও দিন অতিবাহিত করছি।’

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সেপ্টেম্বর মাসে করা এক জরিপে দেখা গেছে, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে দেশে পরিবার প্রতি গড়ে চার হাজার টাকা করে আয় কমে গেছে। মহামারির এই সময়ে আয় কমে যাওয়ায় খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমে গেছে ৫২ শতাংশের মতো পরিবারের। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হলেও আগের পর্যায়ে যেতে পারেননি অনেকে। 

সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) হিসাবে করোনাভাইরাসের কারণে নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ। বিশ্ব ব্যাংক তাদের বৈশ্বিক জরিপে দেখিয়েছে সারাবিশ্বে সাত থেকে ১০ কোটি মানুষ গরিব শ্রেণিতে নেমে আসবে। 

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) তাদের নিজস্ব জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, করোনাভাইরাসের কারণে দেশে দরিদ্রতার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ শতাংশ। পিপিআরসি ও বিআইজিডির জুন মাসের এক যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, দারিদ্র্য বেড়ে ৪৩ শতাংশ হয়েছে। দরিদ্র হওয়ার অর্থই তারা খাবার কেনার মতো অর্থ আয় করতে পারছেন না। জীবন ধারণের মতো পর্যাপ্ত উপার্জনের সক্ষমতা হারিয়ে অনেকে দরিদ্র শ্রেণিভুক্ত হয়ে পড়ছেন।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh