কবে আসবে ভ্যাকসিন

করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে ভ্যাকসিনই একমাত্র ভরসা; কিন্তু জানুয়ারিতে কি আমরা ভ্যাকসিন পাচ্ছি? 

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক হাম-রুবেলার টিকা উদ্বোধন করতে গিয়ে বলেছেন, জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে আমরা ভ্যাকসিন পেতে যাচ্ছি। কীভাবে আমরা পাচ্ছি, সে ব্যাখ্যা স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বা সরকারের কোনো পর্যায় থেকে দেয়া হয়নি। তবে বাস্তবতা কি বলে? 

ভ্যাকসিন সংগ্রহে বাংলাদেশের সাথে এ পর্যন্ত দৃশ্যমান যোগাযোগ হয়েছে কেবল ইন্ডিয়ান সিরাম ইনস্টিটিউটের। তাও সরকারিভাবে নয়, বেসরকারি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস সিরাম ইনস্টিটিউটের সাথে তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন কেনার চুক্তি করেছে। বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস থেকে বাংলাদেশ সরকার ভ্যাকসিন কিনে নেবে বলে ঘোষণা করেছে।

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সিরাম ইনস্টিটিউট ছাড়া আর কোনো দেশ বা সংস্থার সাথে বাংলাদেশের দৃশ্যমান কোনো চুক্তি হয়েছে এমন ঘোষণা আসেনি। 

বাংলাদেশ ভ্যাকসিন ট্রেন ধরতে পারছে না

ভ্যাকসিন সংগ্রহে যে ট্রেনে উঠতে হবে সে ট্রেনটিতেই বাংলাদেশ উঠতে পারেনি। ট্রেনে ওঠার জন্য যে টিকিট কাটার প্রয়োজন পড়ে, সেটিও বাংলাদেশ কাটতে পারেনি পাশের দেশের একটি বেসরকারি ভ্যাকসিন তৈরির প্রতিষ্ঠান ছাড়া।

চীনা ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিনোভ্যাকের ভ্যাকসিন বাংলাদেশে ট্রায়াল হওয়ার কথা থাকলেও নানা কারণে তা হয়নি। ভ্যাকসিনটি ট্রায়াল নিয়ে একে অপরকে দোষারোপই করেছে ‘ট্রায়ালজিনত খরচ কে পরিশোধ করবে’ এই নিয়ে। বাংলাদেশ বলেছে, যেহেতু সিনোভ্যাক এখানে ট্রায়াল করবে ফলে তাদেরই খরচ বহন করতে হবে। আর সিনোভ্যাক বলেছে, তাদের ট্রায়ালের জন্য সংরক্ষিত অর্থ শেষ। সে কারণে বাংলাদেশে ট্রায়াল হলে তারা অর্থ খরচ করতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত সিনোভ্যাকের ভ্যাকসিন বাংলাদেশে ট্রায়াল হলো না। 

সিনোভ্যাক ছাড়াও অন্য কোনো ভ্যাকসিন তৈরির প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ট্রায়াল দেয়ার জন্য কোনো আগ্রহও প্রকাশ করেনি। কিংবা এখানে ট্রায়াল করতে বাংলাদেশও কাউকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। এমনকি অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন ও বাংলাদেশে ট্রায়াল করানোর চেষ্টা হয়নি।

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন চূড়ান্ত হয়নি

সিরাম ইনস্টিটিউটের সাথে তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন পেতে বাংলাদেশে বেক্সিমকোর চুক্তি হলেও এই অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সিরাম নিজেরা কোনো ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা করেনি। অ্যাক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন চূড়ান্ত হলেই কেবল সিরাম ইনস্টিটিউট ভ্যাকসিন তৈরির অনুমতি পাবে। 

অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন ট্রায়ালে দেখা গেছে, ভ্যাকসিনটি ৬২ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর। তৃতীয় দফা ট্রায়ালে ৯০ শতাংশ কার্যকর যে সব মানুষের ওপর পাওয়া গেছে, তাদের সংখ্যা একেবারে কম। ওই পরীক্ষার যে ডাটা পাওয়া গেছে, তা রেগুলেটরি বডি যথেষ্ট মনে করছে না। আরও ডাটার জন্য পরীক্ষাটি আবার করতে হচ্ছে। ফলে ট্রায়ালের নতুন রেজাল্ট না পাওয়া পর্যন্ত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন তৈরি হচ্ছে না। তার মানে সিরাম ইনস্টিটিউট ভ্যাকসিন তৈরি করতে পারছে না জানুয়ারির মধ্যে। বাংলাদেশও জানুয়ারির মধ্যে ভ্যাকসিন পাচ্ছে না। 

ফাইজার অথবা মডার্নার ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে না

ফাইজার ও মডার্না- যুক্তরাষ্ট্রের এই দুই কোম্পানির ভ্যাকসিন বাংলাদেশ পাচ্ছে না। কারণ একটি জটিল প্রক্রিয়ায় এটি সংরক্ষণ করতে হয়। সংরক্ষণের এই রকম ব্যবস্থা বাংলাদেশের নেই। আরো সহজ করে বলতে গেলে- মডার্না অথবা ফাইজারের ভ্যাকসিন সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারার সক্ষমতা বাংলাদেশের নেই। ফাইজার জার্মানির বায়োএনটেকের সহায়তায় যে ভ্যাকসিন তৈরি করেছে তা ৯৪.৫ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর। অপরদিকে মডার্নার ভ্যাকসিন কার্যকর ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত।

এই দুই ভ্যাকসিনই বৃদ্ধদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারছে। তার মানে ভ্যাকসিনটি নিলে সকলেই সুফল পাবেন; কিন্তু তা খুব নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। ফাইজারের ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করতে হবে মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়  মডার্নারটি সংরক্ষণ করতে হবে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। আবার বিশেষ বিমানে করে এই ভ্যাকসিন আনতে হবে ও বিশেষ ধরনের ট্রাকের মাধ্যমে পরিবহন করে উল্লিখিত তাপমাত্রায় সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে স্বল্প সময়ের (ছয়দিন) মধ্যেই প্রয়োগ করতে হবে। 

ফাইজার ও মডার্না- এই দুটি কোম্পানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হওয়ায় আগে মার্কিনিদের দিতে হবে। পরে অন্য কোথাও বিক্রি করতে পারবে। ব্রিটেন আগে থেকে চুক্তি করেছিল বলে গত ৮ ডিসেম্বর বিশ্বে প্রথম দেশ হিসেবে ফাইজারের ভ্যাকসিন কিনে তাদের জনগণকে দিতে পেরেছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ওষুধ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ ফাইজার ও মডার্নার ভ্যাকসিনকে অনুমোদন দেবে বলে ঠিক হয়েছে। ফলে ধনী এই দুটি দেশের মানুষ এই ডিসেম্বরেই ভ্যাকসিন পাচ্ছে। সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করতে পারলেও উচ্চ মূল্যের কারণে বাংলাদেশের মতো দেশ ফাইজার ও মডার্নার ভ্যাকসিন পাচ্ছে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। 

ভ্যাকসিন কি ভারত থেকেই আসছে?

সিনোভ্যাকের ভ্যাকসিন বাংলাদেশে ট্রায়াল করতে পারেনি চুক্তি থাকার পরও। দৃশ্যমান বাধা থাকলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে অদৃশ্যমান বাধাটিই বেশি ছিল। কেউ কেউ বলছেন, ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলার ভ্যাকসিন কূটনীতিই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে জয়ী হয়েছে। সিনোভ্যাকের ভ্যাকসিনের তৃতীয় দফার ট্রায়াল বাংলাদেশে হলো না।

এরপরই দেখা গেল সিরাম ইনস্টিটিউটের সাথে বাংলাদেশের বেক্সিমকোর চুক্তি হয়েছে- সিরাম বেক্সিমকোকে তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন দেবে। তবে এই প্রক্রিয়াটিও দেরি হবে সঙ্গত কারণে। এছাড়া ভারতের নিজস্ব চারটি কোম্পানির ভ্যাকসিনের তৃতীয় দফার ট্রায়াল চলছে দেশটিতে। 

ভারতের ভ্যাকসিন ট্রায়াল সফল হলে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ হয়তো ভারতের নিজস্ব ভ্যাকসিনও আনতে পারে। তবে সবকিছুই হবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনের পর।


মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh