মোদির বাংলাদেশ সফর

বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মোড়কে চ্যালেঞ্জের পেরেক

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে গেল ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ‘সুখের’ সময় এখন পার করছে বাংলাদেশ। ভৌগোলিক বিশ্ব মানচিত্রের বড়-ছোট ৬৫টি দেশ ও সংস্থা আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা জানিয়েছে বাংলাদেশকে; আর স্বশরীরে ঘুরে গেছেন দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। 

উপলক্ষ স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এই তালিকায় রয়েছে একাত্তরে বাংলাদেশের চরম প্রতিপক্ষ পাকিস্তানও। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আলোচনার শীর্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি বা বিদ্যমান সমস্যার সমাধান গুরুত্ব পেলেও মূলত বাংলাদেশের উৎসবে মোদির উপস্থিতিতেই আপাত সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। 

আগামী দিনে কানেক্টিভিটি, তথ্যপ্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক নানা ক্ষেত্রে সরাসরি যৌথ সহযোগিতা বিস্তৃত করার বিষয়ে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও ভারত। মোদির সঙ্গে বৈঠকে   তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করা ও সীমান্ত হত্যা বন্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে প্রতিবেশীদের মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার বিষয়টি আবারো জোর দিয়েছেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এছাড়া আটটি নতুন প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে। 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘দু’দেশের মধ্যে যেসব অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে, তার সবই দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। সেই সঙ্গে এ অঞ্চলের উন্নয়নে দু’দেশ একসঙ্গে কাজ করতেও অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছে।’ 

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রীংলার মন্তব্য, ঐতিহাসিক এই সময়ে মোদির বাংলাদেশ সফর দু’দেশের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব ও আস্থার প্রতিফলন। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক আরও উচ্চতায় পৌঁছেছে। তবে দিন শেষে বিশ্লেষকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়ে যাচ্ছে গোপালগঞ্জ ও সাতক্ষীরায় দুটি মন্দির ভ্রমণের ঘটনায়। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মভূমি গোপালগঞ্জ জেলা মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হরিচাঁদ ঠাকুরেরও জন্মস্থান। ১৮৬০ সালে প্রবর্তিত এই সম্প্রদায়ের জনসংখ্যার প্রায় তিন কোটি ভোটার এখন পশ্চিমবঙ্গে। এই অঙ্গরাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে মুসলিম ভোটব্যাংকের বিপরীতে হাতিয়ার হতে পারে মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটশক্তি। মোদি যার খানিকটা নিশ্চিত করলেন ওড়াকান্দি দর্শনের মাধ্যমে, মতুয়া সম্প্রদায়ের ভোটারদের মন আকর্ষণের চেষ্টায়। যার রেশ দেখা যায় ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে। সেবার বনগাঁ আসনে বিজেপি প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত হয় বলা চলে মতুয়াদের ভোটে ভর করেই। কাজেই এ সফরে প্রতিবেশীকে ‘তুষ্ট’ রাখার পাশাপাশি নিজের রাজনৈতিক পাল্লার দিকেও নজর ছিল মোদির। 

পশ্চিমবঙ্গের গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রতিম বসু মনে করেন, ‘এবারের বাংলাদেশ সফরসূচিতে দুটি মন্দিরের অন্তর্ভুক্তি ভারতজুড়ে বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। বিশেষত, একটি যখন ‘সিডিউল কাস্ট’ মতুয়া জনগোষ্ঠীর তীর্থক্ষেত্র। বাংলাদেশ সফরে এসে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দুটি বিশেষ মন্দির দর্শন নিশ্চিতভাবেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণার পালে হাওয়া দেবে; কিন্তু সরাসরি ব্যালট বাক্সে এর খুব বেশি প্রভাব নাও থাকতে পারে। এর সরাসরি ফল দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আরো কিছু দিন।’

তবে মোদির গোপালগঞ্জ সফরকে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমশের মোবিন চৌধুরী। তার মতে, ‘যে যাই বলুক না কেন, নরেন্দ্র মোদির সফর বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্কের সঙ্গেই যুক্ত। স্বাধীনতা দিবসে সম্মানিত অতিথি তার সফর মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানের কারণেই সম্ভব হয়েছে।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘মোদি জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানিয়েছেন। কোনো দেশের শীর্ষ নেতা হিসেবেও গোপালগঞ্জে এটা তার প্রথম সফর। সে দিক থেকে তার সফর বাংলাদেশের জন্য সম্মানের।’

সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ মার্চ বিকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথমে কিছু সময় একান্তে বৈঠক করেন। পরে তাদের নেতৃত্বে শুরু হয় দু’দেশের প্রতিনিধি দলের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক। এ সময় বাণিজ্য, কানেকটিভিটি, কভিড মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিষয়ে সহযোগিতা ও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন দুই সরকারপ্রধান। এছাড়া বৈঠকে সীমান্ত হত্যা বন্ধ, তিস্তাসহ দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও খেলাধুলাসহ নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর দুই নেতা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পাঁচটি প্রকল্প উদ্বোধন ও দুটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন।

বাংলাদেশের বিশ্লেষকরা অবশ্য মোদির সফরকে দেখছেন প্রতিবেশীর রাগ-অনুরাগ শেষে নির্ভরতার সম্পর্ক হিসেবেই। তাদের মতে, বিপদ-আপদে সবার আগে যারা ছুটে আসে ও যা করণীয়- তা সাধ্যমতো করার চেষ্টা করে; তারাই হলো প্রতিবেশী। নিকটতম প্রতিবেশী হিসাবে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরই মধ্যে দুই দেশের মধ্যকার স্থল সীমান্ত ও জলসীমা বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি হয়েছে, যা গোটা বিশ্বের কাছে একটি দৃষ্টান্ত। ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট প্রশ্নে ভারতের প্রত্যাশা পূরণে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ। এরপরও দেশ দুটির মধ্যে স্থায়ী বন্ধুত্ব সম্পর্কে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জও উঠে আসছে। 

এ বিষয়ে খোলামেলা কথা হয় সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘তিস্তা চুক্তি সম্পাদন ও সীমান্ত হত্যা বন্ধ ইস্যুতে বাংলাদেশের দাবিতে বরাবরে মতো প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে ভারত। কূটনৈতিক আলোচনার বাইরে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করাই এখন চ্যালেঞ্জ।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘এ সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অমীমাংসিত বিষয়ে বড় ধরনের কোনো অগ্রগতি হবে- এমন প্রত্যাশা আমাদের ছিল না। কারণ অমীমাংসিত ইস্যুতে বড় ধরনের সাফল্য আনতে হলে দুই দেশের কূটনীতিকদের মধ্যে আরো প্রস্তুতির দরকার ছিল। শুধু ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর বাংলাদেশে এসে ঘুরে গেছেন। সবকিছু মিলিয়ে বলা যেতে পারে বাংলাদেশের উৎসবকে ঘিরেই মোদির সফরটি অনুষ্ঠিত হয়েছে।’

তবে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের স্বার্থরক্ষায় অত্যন্ত সচেতন হলেও বাংলাদেশকে অসন্তুষ্ট করতে চায় না ভারত। তাই কানেকটিভিটি, উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূল ছাড়াও বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটি। এসব ইস্যুতে সমাধানে দৃশ্যমান আন্তরিক দেখা গেলেও রয়ে যাচ্ছে বাস্তবসম্মত চ্যালেঞ্জ। তবে রাজনীতির নানা বাঁক পেরিয়ে বিশ্বায়নের যুগে তাল মেলাতে তাই বন্ধুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গুরুত্বই উঠে আসে বিশ্লেষকদের কাছে। 

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh