চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফর

দক্ষিণ এশীয় নিরাপত্তা বলয়ের কোন জোটে বাংলাদেশ?

চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ওয়েই ফেঙ্গহিকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম। ফাইল ছবি

চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ওয়েই ফেঙ্গহিকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম। ফাইল ছবি

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারতের আধিপত্য বিস্তারের অধ্যায়টা শুরু সেই ১৯৪৭ সালে, উপনিবেশবাদের পতনের পর থেকেই। সাজানো-গোছানো পররাষ্ট্রনীতি আর লক্ষ্য অর্জনে বহুমুখী কৌশলে এগোনো ভারত এতদিনে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতেও দখল করেছে শক্তিশালী স্থান; কিন্তু প্রতিবেশী যেসব দেশ নিয়ে ভারতের নতুন শক্তির আত্মপ্রকাশ, তারাই এখন ঝুঁকছে নতুন বলয় চীনের দিকে। 

ঋণ বা বাণিজ্যিক নানা সুবিধার মোড়কে বাংলাদেশসহ ভারতের অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোতে চীনের এখন অবাধ বিচরণ। এটা কি কেবলই বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রসার? 

বাংলাদেশে গত ২৭ এপ্রিল মাত্র ছয় ঘণ্টার সফর করে গেলেন চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল ওয়েই ফেঙ্গহি। কূটনৈতিক খেরোপাতার ছকে এটা কি নিয়মিত সফর, না-কি বাংলাদেশে আরও পাকাপোক্ত আসন গড়তে দেশটির কৌশলের অংশ এ সফর- এমন ভাবনা বিশ্লেষকদের। 

ওয়েই ফেঙ্গির এই সফরে ছিল রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ। তিনি সেনাপ্রধানের সঙ্গেও বৈঠক করেন। আগের কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি না গেলেও প্রথমবারের মতো তিনি ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে শ্রদ্ধা জানাতে যান। 

ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের আধিপত্য রোধে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের কৌশলগত জোটকে বলা হয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশল (ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি-আইপিএস)। এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ভার্চুয়াল সম্মেলনটিকে বলা হচ্ছে অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা সংলাপ ‘কোয়াড’। যা নিয়েই ঘোর অস্বস্তি চীনের। 

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, রাখ-ঢাক না করে কোয়াড নিয়েই আপত্তি জানিয়েছে চীন। বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীল রাজনৈতিক অবস্থা বা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করতে পারে এমন উদ্যোগ। কাজেই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা ও কোনোরকম ঝগড়া-ফ্যাসাদ না করতে বাংলাদেশের উচিত চীনের সঙ্গে আটঘাট বেঁধে থাকা। তিনি সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকেও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুর বিষয়ে কথা বলেন। এসব আলোচনায় সমর্থন চাইলেও চীনকে আপাতত বাংলাদেশের স্বভাবসুলভ মিষ্টি হাসি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন সাম্প্রতিক দেশকালকে বলেন, ‘কৌশলগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের প্রতি পূর্ব-পশ্চিম নানা বলয়ের আগ্রহ বাড়ছে। অনেক দেশই তাদের উদ্যোগে গঠিত নানা জোটে বাংলাদেশকে পেতে চাইছে। তবে বাংলাদেশের অবস্থান বরাবরই স্বতন্ত্র। বন্ধুত্বপূর্ণ নীতি নিয়ে শান্তি রক্ষার উদ্যোগে বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গে কাজ করতে চায়। সামরিক জোট, নিরাপত্তা উদ্যোগ... এসব বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ নেই। বরং দেশের উন্নয়নে, আঞ্চলিক সমৃদ্ধির জন্য কোনো অর্থনৈতিক পদক্ষেপ থাকলে বাংলাদেশ বিবেচনা করবে।’ 

চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সফরের বিষয়টি উল্লেখ করলে তিনি বলেন, অনেক দেশই আসে, নানারকম প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশ নিজস্ব নীতি নিয়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ সমন্বয় করে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের স্নায়ু যুদ্ধের পরিচিতি বিশ্বব্যাপী। আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারত। ভারতের মাধ্যমে এই অঞ্চলে এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশপথ উন্মুক্ত অনেকটাই। আর ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানও রয়েছে চীনের সঙ্গে শক্ত বাঁধনের সম্পর্কে। এসব জোট-উপজোটের বাইরে এখনও স্বতন্ত্র অবস্থান বাংলাদেশের। আবার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে কৌশলগত শক্ত অবস্থানে বাংলাদেশ। ভৌগোলিক এই অবস্থান বিভিন্ন জোট-উপজোটে টানার ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় সূচক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। তবে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ভারত ও চীনের পাল্টাপাল্টি লড়াই থেকে দূরে থাকাই বাংলাদেশের জন্য ভালো। পাশাপাশি জাতীয় সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রেখে দুই বড় শক্তির দ্বৈরথ যদি বাংলাদেশের জন্য দর-কষাকষির সুযোগ এনে দেয়, তাহলে সেটাকে কাজে লাগানোর বিষয়টি বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। 

নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এমন প্রস্তাব অনাকাক্সিক্ষত কিছু না। তবে অবস্থানটা নিতে হবে বাংলাদেশকেই। সম্প্রতি আঞ্চলিক রাজনীতি বা ভূ-রাজনীতির কৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পরিবর্তনের এই গতিটা আগের চেয়ে দ্রুত। তাই বাংলাদেশের অব্যাহত উন্নয়ন কর্মকা- চালিয়ে যাওয়া কিংবা এই অঞ্চলের উন্নয়নের স্বার্থে শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে প্রাধান্য দিতে এসব জোট থেকে দূরে থাকাই সমীচিন হবে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি কোভিড পরিস্থিতিতে ভারত থেকে বাংলাদেশের প্রত্যাশিত টিকা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই সুযোগটি নিতে চায় চীন। দেশটি বাংলাদেশকে অন্তত তিন কোটি ভ্যাকসিন দিতে চায়। এ ছাড়া গত মাসেই ঢাকায় পাঁচ দিনের সফর করেন ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নরভানে। নানা ইস্যুতেই দেশটির বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ ঘুরে যান। রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সমান তৎপরতা। এপ্রিলের শুরুতেই ঢাকায় আসেন বাইডেন প্রশাসনের জলবায়ুবিষয়ক দূত জন কেরি। এর আগে ঢাকায় আসেন যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বিগানও। দেশ দুটির এমন তৎপরতায় বাদ যেতে চায় না চীনও। আঞ্চলিক বা পারস্পারিক সহযোগিতা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা বাণিজ্যের প্রসার, অর্থনৈতিক সহযোগিতার নানা ইস্যুতে বাংলাদেশে আসেন চীনা কর্মকর্তারাও। 

গত বছর তো চীনের গ্লোবাল টাইমস পত্রিকাকে মুখ ফুটে বলেই ফেললেন ঢাকায় দেশটির রাষ্ট্রদূত লি জিমিং, বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ উদ্যোগ উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এশীয় কোনো দেশকে আশ্রয় করে অন্যান্য দেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ তার। এশিয়ার অন্যান্য দেশ বলতে ওই প্রতিবেদনে ভারতকেই বোঝানো হয়। 

সাবেক পররাষ্ট্র সচিবও বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পর্কের ওপরই গুরুত্ব দিলেন। তার মতে, স্বভাবত নিজেদের কারণেই বিশে^র বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক অব্যাহত রাখতে হবে। পরিবর্তনশীল ভূরাজনীতি আর মহামারির কারণে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা বিবেচনায় কৌশলগত সহযোগিতায় দীর্ঘস্থায়ী সুফলের দিকে তাকাতে হবে। 

দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক নিরাপত্তা জোটে সরাসরি বাংলাদেশকে না পেলেও পারস্পারিক সম্পর্কের দিক থেকে অন্যান্য দেশের চেয়ে খানিকটা এগিয়ে চীন। পরিসংখ্যান বলছে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অধিকতর প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্পর্ক ১৯৭৭ সাল থেকে। সেনাবাহিনীর জন্য কেনা সমরাস্ত্রের বেশিরভাগই চীন থেকে। নৌবাহিনীর প্রথম সাবমেরিনও এসেছে চীন থেকেই। আর অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিয়মিতভাবে আসছে চীন থেকেই।


মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh