দুই মন্ত্রীর বিরোধ এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ও  পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

ফেসবুক স্ট্যাটাসের দৌরাত্ম্যে ঘরের খবর আর পরের জানার বাকী থাকলোই বা কি! রেল লাইন যদিও বহে সমান্তরাল কিন্তু রাজনীতি সেই সরলতার সুযোগ কই! আর কেই বা জানতো, ছাতক থেকে সুনামগঞ্জের রেল লাইনটি এখন টক অব দ্য কান্ট্রি হবে! ঘটনার শুরু সুনামগঞ্জে। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের সাথে জেলার পাঁচ এমপির বিরোধের শুরু আগেই থেকেই। না জেনেই সেখানে ঘি ঢেলেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তবে এ ঘটনায় মঙ্গলবার (২২ জুন) মুখ খুলেছেন দু’জনই। ৫০ বছরের বন্ধুত্বের খাতিরে ফোনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিজ্ঞাসা করতে পারতেন বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী। আর এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ফেসবুকে পাল্টাপাল্টি স্ট্যাটাস
ঘটনার সূত্রপাত সুনামগঞ্জ থেকে ছাতক পর্যন্ত প্রস্তাবিত রেললাইন প্রকল্প নিয়ে ফেসবুকে প্রথম স্ট্যাটাসটি আসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের ফেসবুক পেইজ থেকে। গত ১৪ জুন দেওয়া সেই স্ট্যাটাসে লেখা হয়, ‘মান্নান আমার বন্ধু, মান্নানের সাথে আমার সম্পর্ক ৫০ বছরের অধিক। আমি এবং মান্নান সুখে–দুঃখে সব সময়ই ছিলাম এবং আছি, ভবিষ্যতেও আমৃত্যু থাকব বলেই আশা করি। দুঃখজনক যে সিলেটের একটি স্থানীয় সংবাদপত্রে দেখলাম আমার এবং মান্নানের মধ্যে নাকি দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং এই দ্বন্দ্বের কারণে নাকি সিলেটের অনেক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে! কে বা কারা এই সংবাদটি প্রচার করছেন জানি না, তবে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং বানোয়াট। যে বা যারা এটি প্রচার করছেন, তারা হয়তোবা কোনো বিশেষ বা অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য করছেন। ফেসবুকে এই স্ট্যাটাসটির প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি না, তবে একটি বিশেষ কারণে দিচ্ছি আর তা হলো আমার এবং মান্নানের স্থানীয় অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী রয়েছেন আর তাঁদের মধ্যে যাতে কোনো বিভ্রান্তির সৃষ্টি না হয়।’


এরপর রবিবার (২০ জুন) ‘পরিকল্পনা মন্ত্রীর দপ্তর’ নামক ফেসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে লেখা হয়, ‘এটা সত্য যে ড. মোমেনের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক দীর্ঘ ৫০ বছরের। কিন্তু তিনি সুনামগঞ্জের পাঁচজন সংসদ সদস্যের পাশে রয়েছেন উল্লেখ করে রেলমন্ত্রীর কাছে যে আধা সরকারি পত্র (ডিও) দিয়েছেন, সেটি আমাকে বিস্মিত করেছে। তিনি যে পাঁচজন এমপির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, সেখানে একজন জাতীয় পার্টির এমপিও রয়েছেন। আব্দুল মোমেন ভালো করেই জানেন, আমিও (মান্নান) সুনামগঞ্জের একজন সংসদ সদস্য। সুনামগঞ্জের সঙ্গে ছাতকের রেললাইন নির্মাণ নিয়ে তিনি যেমন অবগত, ঠিক তেমনি বিষয়টি আমিও অবগত। আমি যতটুকু জানি, তাঁর বর্ণিল জীবনে তিনি কখনো সুনামগঞ্জে যাননি। সুনামগঞ্জে কখনো তাঁর পা পর্যন্ত পড়েনি। অথচ তিনি রেললাইন নির্মাণ নিয়ে একটি পক্ষের অবস্থান নিয়েছেন। অন্য কেউ হলে এই পরিস্থিতিতে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইতেন। কিন্তু আমাদের দীর্ঘ ৫০ বছরের বন্ধুত্ব একই সঙ্গে আমরা দুজনেই মন্ত্রিসভার সদস্য অথচ তিনি আমার সঙ্গে এ বিষয়ে এতটুকু যোগাযোগ করেননি। আমার সঙ্গে কথা না বলে অন্য পাঁচজন সংসদ সদস্যের পক্ষ নিয়ে রেলমন্ত্রীকে ডিও লেটার পাঠানো কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’ স্ট্যাটাসের বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী ওয়াকিবহাল। তিনি বলেন, রেললাইন নির্মাণ নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, সেটি সুরাহা হওয়া দরকার। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমার সহকর্মী, তিনি চাইলে আমার সঙ্গে কথা বলতে পারতেন।


পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধ নিয়ে যা বললেন পরিকল্পনামন্ত্রী
এদিকে, মঙ্গলবার (২২ জুন) পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই জানিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, সুনামগঞ্জ থেকে ছাতক পর্যন্ত প্রস্তাবিত রেললাইন নির্মাণ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আচরণ সংগত হয়নি।

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে এ মন্তব্য করেন তিনি।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, সুনামগঞ্জের পাঁচজন সংসদ সদস্যের পক্ষ নিয়ে আব্দুল মোমেন রেলমন্ত্রীকে যে ডিও লেটার (আধাসরকারি পত্র) দিয়েছেন, সেটা উচিত হয়নি। সুনামগঞ্জে ছয়জন এমপি আছেন। কিন্তু তিনি পাঁচজন এমপির পক্ষ নিয়ে রেলমন্ত্রীকে ডিও দিয়েছেন। অথচ উনি আমার সঙ্গে এতটুকু কথা বললেন না। ওনার জায়গায় অন্য কেউ হলে আমাকে ফোন দিতেন। আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, কী ব্যাপার, তোমার এলাকার পাঁচজন এমপি আমার কাছে এলো কেন? যা-ই হোক, মিস ইনফরমেশন হয়ে গেছে।

আমরা দুজনেই ভালো বন্ধু উল্লেখ করে তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাজ বিশ্বব্যাপী। আর আমার কাজ গ্রামমুখী। আমরা দুজনেই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে কাজ করছি। তবে দুজনের মধ্যে বড় কিছু হয়নি। এলাকাভিত্তিক মাঝেমধ্যে টানাপোড়েন হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ
‘‘এখন বুঝতে পেরেছি রেলমন্ত্রীকে চিঠি দেওয়ার আগে পরিকল্পনামন্ত্রীর সাথে কথা বলে নেওয়া উচিত ছিল। কারণ আমি তো সুনামগঞ্জের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি সম্পর্কে জানি না।’’

ফেসবুকে স্ট্যাটাসের বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে মঙ্গলবার (২২ জুন) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার কার্যালয়ে এ কে আব্দুল মোমেন এমন মন্তব্য করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মান্নান আমার বন্ধু, তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক অটুটু রয়েছে। ঘটনাটি হল, আমরা কানেক্টিভিটি চাই। কিন্তু ঢাকা-সিলেট রেলপথ অত্যন্ত পুরোনো- রদ্দি মার্কা। সরকার এটিকে ব্রডগেজ করতে পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু রেলমন্ত্রী বলেছেন এটিতে অনেক খরচ হবে। কারণ সিলেটে শেষপ্রান্ত সেখানে ডিপো করতে হবে।

সুনামগঞ্জে রেললাইন নিয়ে যাওয়া নিয়ে রেলমন্ত্রীকে চাহিদাপত্র বা ডিও লেটার দেওয়ার ব্যাখ্যা দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি ভুল স্বীকার করে বলেন, মান্নানের সঙ্গে দেখা হলে আমার পাশে বসে বলেছে, তাকে তো আমি ফোন করে তাদের আসার কথা বলতে পারতাম। এটি না করেই ডিও লেটার পাঠিয়ে দিলাম। এর মধ্যে আমি যুক্তরাষ্ট্র চলে গেছি। তারপরেই এনিয়ে হইচই শুরু হয়েছে। ওর (মান্নান) সঙ্গে দেখা হলে আমি আলাপ করবো। একইসঙ্গে সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে মান্নানের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

উল্লেখ্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন সিলেট-১ আসন এবং পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সুনামগঞ্জ-৩ আসন থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh