গ্রামেগঞ্জে ‘ডেল্টা’

আতঙ্কের প্রহর গোনা শুরু

করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দিচ্ছেন এক ব্যক্তি

করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দিচ্ছেন এক ব্যক্তি

কিছুদিন আগেও গ্রামের মানুষের মুখে মুখে একটাই কথা ছিলো যে, ‘আমাদের গ্রামে করোনা নেই; আমাদের করোনাভাইরাস হবে না’। এজন্য তারা মুখে মাস্ক পরা বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কাই করতেন না। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে পরিস্থিতি ততই ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। দেশের ৮০ ভাগ মানুষ গ্রামেই বসবাস করেন। অধিকাংশ গ্রামে সর্দি-কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত রোগী বেড়েছে। অনেকের গলায় ব্যথা রয়েছে। মৌসুমি জ্বর-জারি বলে এড়িয়ে যাচ্ছেন অনেকেই। বেশিরভাগ লোক ডাক্তার দেখাতে অনীহা প্রকাশ করছেন। অনেকে সামাজিক বয়কটের শিকার হওয়ার শঙ্কায় বিষয়টি চেপে যাচ্ছেন। সচেতনতার অভাবে অধিকাংশ মানুষ করোনার উপসর্গ দেখা দেয়ার পরও টেস্ট করাচ্ছে না। শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষের মধ্যে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও মাস্ক ব্যবহারে উদাসীনতা দেখা গেছে।   

খুলনা জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সবশেষ তথ্য মতে, জুন মাসের প্রথম ১৬ দিনে খুলনা নগর ও জেলা মিলিয়ে করোনা পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৮১৮ জনের। এর মধ্যে নগরে শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৩৪৬ জনের আর ৯টি উপজেলায় শনাক্ত হয়েছে ৪৭২ জনের। এই হিসাবে জুনের ১৬ দিনে জেলার মোট শনাক্তের প্রায় ৭৪ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ নগরে এবং ২৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ উপজেলার রোগী। এই সময়ে জেলায় করোনায় সংক্রমিত হয়ে মারা যাওয়া ২৩ জনের মধ্যে নগরের ১১ জন এবং উপজেলার ১২ জন রয়েছেন। 

খুলনার কয়রা উপজেলার খড়িয়া গ্রামের ইছাহাক আলী (৫৫) পেশায় কাঠমিস্ত্রি। তিনি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিন দিন ধরে বাড়িতে আছেন। ওষুধ খাচ্ছেন গ্রাম্য ডাক্তারের পরামর্শে। কিন্তু নমুনা পরীক্ষা করাননি। তার দাবি, ‘এটা সিজনাল জ্বর। এ সময় একটু জ্বর-জারি হয়েই থাকে। আবার সেরেও যায়।’

ফুলতলার বরণপাড়া এলাকার দোকানি মাজাহারুল ইসলামের চার দিন ধরে জ্বর-কাশি। ফার্মেসি থেকে নাপা ও কাশির সিরাপ এনে খাচ্ছেন। নমুনা পরীক্ষা না করানো বিষয়ে বলেন, ‘পরীক্ষা করালে যদি পজিটিভ আসে, তাহলে ঝামেলা বাড়বে, সে জন্য করাইনি।’ 

শুধু তারাই নন, তাদের মতো খুলনা বিভাগের দশ জেলার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই আরো অনেকে জ্বর-কাশিতে ভুগছেন। কিন্তু ‘ঝামেলা’ এড়াতে তারা কেউই করোনা পরীক্ষা করাচ্ছেন না। খুলনা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ ডা. মেহেদী নেওয়াজ বলেন, যাদের উপসর্গ আছে, তারা সবাই নমুনা পরীক্ষা করালে শনাক্ত আরো বাড়বে। পরীক্ষা না করানোর বিষয়টি খুবই উদ্বেগের।

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, দামুড়হুদা উপজেলায় সংক্রমণ বাড়ছে। এসব এলাকায় অনেকে আক্রান্ত হওয়ার পরও হাটে-বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এ ছাড়া উপজেলার ফার্মেসিগুলোতে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে ঠান্ডা, সর্দি, কাশি ও জ্বরের ওষুধ। 

সীমান্তবর্তী জেলা সাতক্ষীরায় গ্রামের পরিস্থিতি আরো খারাপ। কলারোয়া উপজেলার তুলশীডাঙ্গা গ্রামের মোসলেমউদ্দীন, মকবুল হোসেন, আশরাফ হোসেন, নেদু মোড়ল ও আনিছুর রহমান করোনার উপসর্গ নিয়ে বাড়িতে আছেন। টেস্ট কেন করেননি জানতে চাইলে তাদের উত্তর, আমরা করোনা টেস্ট করব না। গ্রাম্য ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিচ্ছি। যদি করোনা হয়, তাহলে আমাদের বাড়ি লকডাউন করে দেবে, তখন অনেক সমস্যা হবে। তালা উপজেলার মানিকহার গ্রামের শামিম হোসেন, আবুল কালামও একই ধরনের কথা বলেন।

এ বিষয়ে কলারোয়া স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমান বলেন, সচেতনতার অভাবে অধিকাংশ মানুষ করোনার উপসর্গ দেখা দেয়ার পরও টেস্ট করাচ্ছে না। তাদের বারবার বলেও কাজ হচ্ছে না।

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. কুদরত-ই-খোদা জানান, এ হাসপাতালে এখন পর্যন্ত যারা করোনায় মারা গেছেন, তাদের অধিকাংশেরই বাড়ি গ্রামে। সচেতনতার অভাবে তারা আক্রান্ত হওয়ার পর প্রথমদিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে আসছেন, যে কারণে মৃত্যু বাড়ছে।

জেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আনিসুর রহিম বলেন, বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা পরীক্ষা করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। স্বাস্থ্য বিভাগকে এ ব্যাপারে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। 

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে (রামেক) ভর্তি করোনায় আক্রান্ত রোগীর ৪০ শতাংশই গ্রামাঞ্চলের। আর করোনায় মৃতদের মধ্যে অধিকাংশই ভারতের ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত ছিলেন, বলছেন চিকিৎসকরা।

চিকিৎসকরা বলছেন, হঠাৎ করেই করোনা আক্রান্ত রোগীর অবস্থা বেশিমাত্রায় খারাপ হয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালে আসা রোগীদের অক্সিজেন স্যাচুরেশন কম থাকছে। শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা হঠাৎ করে বাড়ছে। শারীরিক অবস্থার নানান ধরনগুলো দ্রুতই পরিবর্তন হচ্ছে।  অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা করার সময়ও দিচ্ছে না এই ধরনগুলো। শহরে যেমনভাবে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানা হচ্ছে গ্রামে তা হচ্ছে না। ফলে গ্রামাঞ্চল থেকে এখন বেশি রোগী আসছে। একজন করোনা রোগী সারা গ্রাম মাস্ক ছাড়াই ঘুরছেন। এভাবে অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন,  ডেল্টা ভাইরাসকে ভ্যাকসিন দিয়েও মারা যায় না। ভাইরাসের মধ্যেই জিন পরিবর্তনের ক্ষমতা থাকে এবং সেই মিউটেশন হতে পারে চোখের নিমিষে। সাধারণ করোনাভাইরাস রোগীর শরীরে বেশিদিন বেঁচে থাকে না। কিন্তু সাত থেকে চৌদ্দ দিনের মধ্যেই ভাইরাস যখন কোষের মধ্যে বংশবৃদ্ধি করে, তখনই মিউটেশন হয়। অর্থাৎ, ভাইরাস যত নতুন নতুন মানুষের শরীরে ঢুকবে, ততই নতুন মিউটেশন হওয়ার আশঙ্কা!

মানুষ কয়েক দফায় ঢাকা থেকে গ্রামে গিয়ে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে অবাধ চলাফেরা করে ভাইরাসটি সেখানে রেখে এসেছেন। তা থেকেই অসচেতন গ্রামবাসীর মধ্যে করোনা নীরবে সংক্রমণ ঘটিয়ে চলেছে বলে মন্তব্য করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সংক্রমণ শুরুর পর লকডাউন দেয়ায় কয়েক দফায় মানুষ দলে দলে গ্রামে ফিরেছেন। মহামারির মধ্যে ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের বাড়ি যাওয়া উৎসবে পরিণত হয়েছিল। বাড়ি ফেরাদের অনেকেই সুপ্ত অবস্থায় করোনা ভাইরাস শরীরে বহন করে নিয়ে গেছেন। সেখানে হাট-বাজার, আত্মীয়ের বাড়িতে ঘুরেছেন অবাধে। এসব স্থানে হাঁচি-কাশি, কথা বলার মাধ্যমে সুপ্ত ভাইরাসটি রেখে এসেছেন। এছাড়া সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপক হারে। সেখান থেকে সারাদেশের গ্রামে ছড়িয়েছে সংক্রমণ। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, করোনা সংক্রমণ কতটা বিস্তৃত হবে, সেটি নির্ভর করবে কিছু কন্ডিশনের ওপর। যে এলাকাগুলো আক্রান্ত হয়েছে, সেখানে যদি কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া না যায়, তা হলে ব্যাপক সংক্রমণ হতে পারে। আমরা আগে বলতাম- গ্রামের লোকজন আক্রান্ত হয় না, এবার দেখা যাচ্ছে গ্রামের লোকজন আক্রান্ত হচ্ছে। এই ভ্যারিয়েন্টটি হচ্ছে ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। এই ভ্যারিয়েন্টে অনেক বেশি সংক্রমণ ছড়ায়। সুতরাং স্থানীয়ভাবে এর প্রভাব পড়বে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের ম্যানেজমেন্টও এতো ভালো হবে না, ঢাকার মতো হবে না। অনেক জেলা আমরা জানি ছোট, যেখানে ভ্যান্টিলেটর সাপোর্টই নেই, সেক্ষেত্রে মানুষ চিকিৎসা নিয়েও সমস্যায় পড়বে। 

বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশন (বিএমএ) ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) করোনা সংক্রমণ নিয়ে মাসে দুই থেকে তিন দিন বৈঠকে বসে। তারা করোনা পরিস্থিতি ও চিকিৎসা সেবা নিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখেছে, বরিশাল ও রাজশাহী এই দুই বিভাগে করোনা চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থাপনা খারাপ। এছাড়া অনেক জেলায় করোনা চিকিৎসা সেবার সক্ষমতা নেই। এখানে করোনা চিকিৎসার সক্ষমতা বলতে বোঝানো হয়েছে হাইফ্লো নেজাল ক্যানোলা ও সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সব ডাক্তারই করোনা চিকিৎসার প্রটোকল জানেন। তবে সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা না থাকলে হাইফ্লো নেজাল ক্যানোলা চালু করা যায় না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, খুলনা, রাজশাহী, যশোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের প্রভাবে দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ক্রমান্বয়ে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সব সীমান্ত এলাকার হাসপাতালে শয্যার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে জরুরি ছাড়া কোনো রোগী যেন ভর্তি না করা হয়- এমন নির্দেশ দেয়া হয়েছে। দরকার হলে সম্পূর্ণ হাসপাতাল করোনা বিশেষায়িত হাসপাতাল করে দেয়া হবে। প্রান্তিক অন্য এলাকাগুলোতে তা-ই বলা হয়েছে।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, আরটি-পিসিআরের মাধ্যমে নমুনা পরীক্ষা করে কো-অর্ডিনেশন করা মুশকিল, যদি অ্যান্টিজেন টেস্ট করা হয়, তা হলে একটা সুরাহা হবে। তাতে দ্রুত রোগী শনাক্ত হবে, আর রোগী শনাক্ত হলে তাদের আইসোলেশন করা, রোগীর সংস্পর্শে আসাদের কোয়ারেন্টিন করতে সুবিধা হবে। আর যেসব এলাকায় আরটি-পিসিআরের মাধ্যমে পরীক্ষার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেখানে অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করা হলে রোগী শনাক্তের হার আরো বাড়বে, আর তখন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতেও সুবিধা হবে। 

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //