ভারী বৃষ্টি, পাহাড় ধসের শঙ্কা

ভারী বৃষ্টির ফলে পাহাড় ধসের শঙ্কাও বাড়ছে

ভারী বৃষ্টির ফলে পাহাড় ধসের শঙ্কাও বাড়ছে

ঢাকাসহ দেশের বেশিরভাগ জায়গায় ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। আগামীকাল শনিবার পর্যন্ত এই ভারী বৃষ্টি থাকতে পারে। এরপর কিছুটা কমলেও বৃষ্টি হবে মাসজুড়েই। তবে থেমে থেমে। কোথাও হালকা আর কোথাও মাঝারি ধরনের। আর এই ভারী বৃষ্টির ফলে পাহাড় ধসের শঙ্কাও বাড়ছে। প্রতি বছর বর্ষা এলেই পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রাণহানি বাড়তে থাকে। 

২০০৭ সালের ১১ জুন স্মরণকালের ভয়াবহ পাহাড়ধসে চট্টগ্রামে ১২৭ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। পরিসংখ্যান বলছে, পাহাড়ধসের ঘটনায় গত ১৫ বছরে কেবল চট্টগ্রামেই প্রাণহানি ঘটেছে ৩ শতাধিক। তিন পার্বত্য অঞ্চলে মৃত্যুর এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

২০১৭ সালের জুনে তিন পার্বত্য অঞ্চলে ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১৫৬ জনেরও বেশি মানুষ মারা যায়। ওই ঘটনায় উদ্ধার তৎপরতায় নিয়োজিত চার সেনাসদস্যও প্রাণ হারান। কিন্তু এসব দুর্ঘটনার পরও কর্তৃপক্ষের যেন টনক নড়েনি। কেবল প্রতি বছর বর্ষা এলেই কিছু দায়সারা অভিযান আর তৎপরতার বাইরে কার্যত পাহাড়ধসের কারণ কিংবা পাহাড়ের পাদদেশে অবৈধ বসতি গড়ে ওঠা বন্ধে কোনো ব্যবস্থাই নিতে দেখা যায় না।

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্যমতে, চট্টগ্রামে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় রয়েছে ২৫টি। এসব পাহাড়ে কম ও বেশি ঝুঁকিতে বসবাসকারী লোকজনের সংখ্যা লাখের ওপরে, যাদের বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের। এর মধ্যে ১৮টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের তালিকা করেছে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। বাকি পাহাড়গুলোর তালিকা এখনো শেষ হয়নি। 

পরিবেশ আন্দোলন কর্মীদের অভিযোগ, প্রশাসনের উদাসীনতা, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের লেজুড়বৃত্তি, পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না করাসহ সমন্বিত উদ্যোগ না থাকায় পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারী বাড়ছে।

যদিও স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পাহাড় মালিকদের উদাসীনতা, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও রাজনৈতিক চাপের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরিয়ে নেয়া ও পুনর্বাসনে সফলতা আসছে না। উল্টো আবাসনগত সব সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কারণে পাহাড়ে বসতি বাড়ছে। এর ফলে পাহাড়ধসের ঘটনায় উদ্বিগ্ন বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন। 

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)-এর চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘পাহাড়ের পাদদেশে যারা ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করে তাদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করতে হবে। প্রয়োজনে তাদের জন্য মাসিক কিস্তির ভিত্তিতে স্বল্পমূল্যে আবাসনের ব্যবস্থা করা যেতে। কিন্তু সেটা না করে বর্ষা এলেই পরিবারগুলোকে নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করে প্রশাসন।’

কেবল প্রাণহানিই নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পাহাড় কাটা এবং পাহাড়ের গাছ কাটা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করার কথা জানান তিনি। একই সাথে যারা এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান আবু নাসের খান। 

এদিকে বর্ষায় পাহাড়ধস ও প্রাণহানির শঙ্কায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন গত ৬ জুন ১৮টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী শতাধিক পরিবারকে সরিয়ে নিয়েছে। ধসের আশঙ্কায় নগরীর আকবর শাহ, শাপলা আবাসিক এলাকা, বিশ্বকলোনি, টাইগার পাস, লালখান বাজার মতিঝর্ণা, বাটালি হিল, বায়েজিদসহ বিভিন্ন পাহাড়ের নিচে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরে যেতে মাইকিং করেছে জেলা প্রশাসন।

চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক নুরুল্লাহ নূরী ফিরোজ শাহ বলেন, মতিঝর্ণা পাহাড়ে ১০ হাজার লোকের বসবাস। এছাড়া ২৫টি পাহাড়ে লাখের ওপর মানুষ ঝুঁকিতে। কিন্তু তাদের সরানো যাচ্ছে না। সরাতে গেলে আন্দোলন শুরু করে। জোর করে সরানো হলে কিছুদিন পর আবার বসতি গড়ে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কামাল হোসেন বলেন, ‘বর্ষা এলেই পাহাড়ের বাসিন্দাদের সরানোর তোড়জোড় শুরু হয়। কিন্তু এই পদ্ধতি কার্যকর নয়। বর্ষায় কেন সরাতে হবে? দরকার স্থায়ীভাবে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। নয়তো পাহাড় রক্ষা সম্ভব নয়।’


জানা গেছে, প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় পাহাড়ের পাদদেশে খুপরি ঘর ভাড়া দেয় এলাকার কিছু চিহ্নিত লোক। যারা পাহাড় বিক্রি করে হয়েছেন অঢেল সম্পদের মালিক। চট্টগ্রামে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার ৭টি পাহাড় অবৈধভাবে দখল করে আছে প্রভাবশালীরা। 

তারা বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার ছাড়াও পাহাড়ে কাঁচা, সেমিপাকা ও বহুতল পাকা ভবন এবং বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা গড়ে তুলেছে। এসব স্থাপনার বেশিরভাগই মাটি কেটে কয়েক ধাপে ওপরে-নিচে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। এসব ঘর-বাড়ি কম টাকায় ভাড়া দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সংযোগ থাকায় নগরীর স্বল্প আয়ের মানুষ সেখানে বসবাস করেন। 

অন্যদিকে পাহাড় কেটে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বায়েজিদ-ফৌজদারহাট লিংক করায় ওই সড়কটিকে ঘিরে নতুন করে ওই এলাকার পাহাড়ে বসতি বেড়েছে। গত দুই বছরে সড়কের দুই পাশে উঁচু উঁচু পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসতি গড়ে তুলেছেন কয়েক হাজার পরিবার।

এছাড়া কক্সবাজারের উত্তর ও দক্ষিণ বন বিভাগ সূত্র বলছে, তাদের আওতায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর বনভূমি রয়েছে। এসব বনের বেশিরভাগই পাহাড়শ্রেণির। গত ১০ বছর আগেও কক্সবাজারে অনেক উঁচু পাহাড় ছিল। কিন্তু পাহাড়খেকোদের কবলে পড়ে তা এখন স্বপ্নে পরিণত হয়েছে। 

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদফতরের উপপরিচালক নেজাম  উদ্দিন বলেন, ‘পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান আছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি অভিযান চালানো হয়েছে। পাহাড় কাটার বিষয়ে মামলাও হয়েছে।’

পরিবেশবাদী সংগঠন এবং স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের লোকজনকে ম্যানেজ করেই পাহাড়ে চলে এসব অবৈধভাবে গাছ ও মাটিকাটার পাশাপাশি অবৈধ বসতি গড়ে তোলার কর্মকাণ্ড। তাই এসব অভিযান লোক দেখানো ছাড়া কিছুই নয়। প্রশাসন আন্তরিক হলে পাহাড়কে ঘিরে অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করা কোনো কঠিন বিষয় নয় বলে মনে করেন তারা।

এদিকে আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান বলেন, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় বৃষ্টি হবে মাসজুড়েই। গত দুই দিনের মতো আজও দেশের অধিকাংশ এলাকায় ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। আগামীকাল পর্যন্ত এই ভারী বৃষ্টি থাকতে পারে। এরপর কমে আসবে কিছুটা। তবে একেবারে বন্ধ হবে না। মাসজুড়েই বৃষ্টি থাকবে। তবে সব সময় ভারী বৃষ্টি হবে না।

এক সতর্ক বার্তায় বলা হয়, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টি অর্থাৎ ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার,  আবার কোথাও কোথাও অতিভারী বৃষ্টি অর্থাৎ ৮৯ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হতে পারে। এদিকে এই ভারী বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের শঙ্কা প্রকাশ করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে কুমিল্লায় ২০৪  মিলিমিটার।  এছাড়া বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে ঢাকায় ২১, ময়মনসিংহে ২, চট্টগ্রামে ১৮২, সিলেটে ১৩৪, রাজশাহীতে ৯২, রংপুরে ৫, খুলনায় ৯৬ এবং বরিশালে ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।

এদিকে নদী বন্দরগুলোর জন্য এক সতর্কবার্তায় বলা হয়,  রংপুর,  রাজশাহী,  দিনাজপুর,  বগুড়া, পাবনা, ঢাকা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, মাদারীপুর,  যশোর,  কুষ্টিয়া,  খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী,  নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ময়মনসিংহ ও সিলেট অঞ্চলগুলোর উপর দিকে দক্ষিণ-দক্ষিণ পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে অস্থায়ী দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এজন্য এসব এলাকার বন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়, মৌসুমি বায়ু অক্ষের বর্ধিতাংশ উত্তর প্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল হয়ে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উপর সক্রিয় ও উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় আছে। এসবের প্রভাবে ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, সিলেট,  রাজশাহী,  ঢাকা ও  বরিশাল বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং রংপুর ও খুলনা বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেইসাথে দেশের কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //