করোনার টিকা : একই ডোজ নাকি ‘মিক্স-ম্যাচ’

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এখনো পর্যন্ত ঢাল একমাত্র ভ্যাকসিনই। কোভিডের সুরক্ষায় প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ হিসাবে আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠানের টিকা নিলে তা এই ভাইরাস থেকে সুরক্ষায় বেশি কাজ করে বলে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় পাওয়া গেছে।

কম-কোভ ট্রায়াল নামের এই গবেষণায় দেখা হয়েছে, ফাইজার বা অ্যাস্ট্রাজেনেকার দুইটি করে ডোজে কোভিড-১৯ সুরক্ষায় বেশি কাজ করছে নাকি আলাদা ধরনের দুই টিকার সংমিশ্রণে বেশি উপকার পাওয়া যাচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দুইটি আলাদা প্রতিষ্ঠানের টিকার সংমিশ্রণে মানুষের শরীরে কোভিডের বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরিতে সবচেয়ে বেশি কার্যকারিতা পাওয়া যাচ্ছে।

আর এই তথ্যের ফলে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের টিকার ব্যবহার আরো সহজ হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। 

এদিকে করোনার টিকার মিশ্র ডোজ নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশেও এ নিয়ে গবেষণার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কারণ ভারতের সেরাম ইন্সটিটিউট থেকে টিকার পূর্বনির্ধারিত ডোজ পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে গেলে বিরাট সঙ্কটে পড়ে সরকারের টিকা কার্যক্রম। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রেজেনেকার কোভিশিল্ড টিকার প্রথম ডোজ নিয়ে দ্বিতীয় ডোজের অপেক্ষায় রয়েছে দেশের ১৪ লাখেরও বেশি মানুষ। 

কোভিশিল্ডের টিকার সংকট থাকায় এদের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে তা স্বাস্থ্য অধিদফতর এখনো নিশ্চিত নয়। মিক্স ও ম্যাচ পদ্ধতিতে টিকা অর্থাৎ প্রথম ডোজ এক কোম্পানির ও পরের ডোজ আরেক কোম্পানির দেয়া যাবে কিনা তা নিয়ে সরকারের টিকাবিষয়ক ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল এক্সপার্ট গ্রুপের (নাইটেগ) সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে অধিফতর।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের পরিচালক তাহমীনা শিরীন বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও আইইডিসিআরের পক্ষে টিকার মিশ্র ডোজ ব্যবহারের গবেষণার জন্য একটা প্রোটোকল পত্র তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘একদিকে কোভিশিল্ডের ভ্যাকসিন আসছে না, আবার অন্যান্য জায়গা থেকে আমরা ভ্যাকসিন পাচ্ছি। সেই ক্ষেত্রে আমাদের 'মিক্স এন্ড ম্যাচ' করতেই হবে। কারণ একেক সময় একেক রকম ভ্যাকসিন আসবে। তাই এই গবেষণাটা এখন বাংলাদেশের জন্য জরুরি। সেই গবেষণা আমরা করবো ও তার ফলাফলটা আপনাদের সাথে শেয়ার করবো।’

একই টিকার দুটি ডোজ না দিয়ে বরং দুটি ভিন্ন টিকার দুটি ডোজ দিলে সেটি নিরাপদ ও বেশি কার্যকর কী না, তা নিয়ে বিশ্বের নানা স্থানে গবেষণা চলছে। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল নিজে দুটি ভিন্ন টিকার দুটি ডোজ নিয়েছেন। তাকে প্রথম ডোজ হিসেবে দেয়া হয়েছিল অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা,আর দ্বিতীয় ডোজ মডার্নার।

এদিকে নাইটেগ টিকার মিশ্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। নাইটেগের সদস্য সচিব ডা. বে-নজীর আহমেদ দেশের মধ্যে মিশ্র ডোজের গবেষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন; কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন দিলে আর কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকবে না বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেন, ‘এখানে ২/৩টা বিষয় আছে- প্রথমত এর কার্যকারিতা- দেখা গেল এর কার্যকারিতা ঠিক আছে, তারপর আসে এর ফলে কোন জটিলতা হচ্ছে কী না, তৃতীয়ত- এর স্থায়িত্ব কতটুকু! এই তিনটা প্রশ্নের মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত আপনি যখন সাধারণ জনগণকে কিছু দেবেন সেটা নৈতিকভাবে দিতে পারা যায় না।’

অপরদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের দ্রুত সংক্রমণের মধ্য দিয়ে পুরো দুনিয়া একটি বিপজ্জনক সময় পার করছে। 

সংস্থাটির প্রধান তেদ্রোস আধানোম গেব্রিয়াসুস জানিয়েছেন, করোনার অতি সংক্রামক এই ভ্যারিয়েন্টটি এরইমধ্যে বিশ্বের শ’খানেক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ডেল্টার মতো আরো সংক্রামক ভ্যারিয়েন্টগুলো দ্রুত অনেক দেশে প্রভাবশালী স্ট্রেইন হয়ে উঠছে। আমরা এই মহামারির খুব বিপজ্জনক একটি সময়ে রয়েছি।

নতুন ভ্যারিয়েন্টের করোনার প্রকোপ রোধে শতকরা ৮০ শতাংশ ভ্যাকসিনেশন কভারেজ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

আর দেশে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি কতটা ভয়ংকর তা বোঝা যায় গত কয়েকদিনের রোগী শনাক্তের সংখ্যা এবং মৃত্যু পরিসংখ্যানেই। দেশে গত এক সপ্তাহ ধরে দৈনিক মৃত্যু একশ’র উপরে। 

সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতির অন্যতম কারণ ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। দেশে সংক্রমণের ৮০ শতাংশই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট (ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট) বলে গবেষণায় পাওয়া গেছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানায়, দেশে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বা সামাজিক সংক্রমণ হয়েছে। 

আর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অন্যতম পন্থা টিকা নেয়া। ফেব্রুয়ারি মাসে গণটিকা কার্যক্রম শুরু হয় অক্সফোর্ড ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা উদ্ভাবিত ও ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে তৈরি করা টিকা দিয়ে। সেরামের সাথে তিন কোটি ডোজের চুক্তি থাকলেও সেখান থেকে দেশে এসেছে মাত্র ৭০ লাখ। ভারত টিকা রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় এই টিকা নিয়ে সংকটে পড়েছে দেশ।

এরপর সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে চেষ্টা করে টিকা আনার। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সরকারের হাতে এখন চীনের সিনোফার্ম , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না ও ফাইজারের টিকা রয়েছে। প্রায় দুই মাসের বিরতির পর সরকার আবারো শুরু করেছে গণটিকা কর্মসূচি। কিন্তু যারা অ্যাস্ট্রেজেনেকার টিকার দ্বিতীয় ডোজ পাননি তারা কি একই টিকা পাবেন নাকি অন্য কোনও কোম্পানির টিকা নিতে পারবেন- তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ডা. বে-নজীর আহমেদ মনে করেন, এই মুহূর্তে দুই কোম্পানির দুই ডোজ দেয়া যাবে না। তিনি বলেন, আপাতত আমরা বলবো- যারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন, তাদের দ্বিতীয় ডোজও এ টিকাই নিতে হবে।

ইতিমধ্যেই বিশ্বের অনেক দেশ টিকার মিশ্র ব্যবহার শুরু করেছে। স্পেন আর জার্মানিতে যারা প্রথম ডোজ হিসাবে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা পেয়েছেন, তাদেরকে (বিশেষ করে তরুণদের) দ্বিতীয় ডোজ হিসাবে ফাইজার বা মর্ডানার টিকা গ্রহণের প্রস্তাব দেয়া হচ্ছে। যদিও এজন্য তারা টিকার কার্যকারিতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বিরল রক্ত জমাট বাধার মতো সমস্যা এড়ানোর জন্য। 

২ ডোজে মৃত্যু ৯৮% কম

কোভিড-১৯ থেকে পুরোপুরি সুরক্ষা পেতে এবং শরীরের ভেতর এই ভাইরাস প্রতিরোধী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি, সেটিকে আটকে দেয়া ও ধ্বংস করার মতো টি সেল তৈরির করার জন্য টিকার দুইটি ডোজ গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীকে মৃত্যুর হাত থেকে প্রায় ৯৮ শতাংশ সুরক্ষা দেয় করোনার দুই ডোজ টিকা। সেখানে এক ডোজ সুরক্ষা দেয় প্রায় ৯২ শতাংশ। পাঞ্জাব পুলিশের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণার বরাত দিয়ে ভারত সরকার গতকাল শনিবার (৩ জুলাই) এ তথ্য জানিয়েছে। 

সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনআইটিআই আয়োগের সদস্য (স্বাস্থ্য) সদস্য তথা কেন্দ্রের কোভিড টাস্ক ফোর্সের প্রধান ভি কে পল জানান, পাঞ্জাব সরকারের সহায়তায় চণ্ডীগড়ের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ইন্সটিটিউট অফ মেডিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চের একটি গবেষণায় এই তথ্য সামনে এসেছে। 

গবেষণার ফলাফল উল্লেখ করেই তিনি বলেন, যে ৪ হাজার ৮৬৮ জন পুলিশকর্মী টিকা পাননি তাদের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন ১৫ জন; শতাংশের বিচারে ৩ শতাংশ। টিকার একটি ডোজ পেয়েছেন এমন প্রায় ৩৬ হাজার পুলিশকর্মীর মধ্যে মারা গিয়েছেন মাত্র ৯ জন। শতাংশের হিসেবে যা ০.২৫ শতাংশ। আর যে প্রায় ৪৩ হাজার পুলিশকর্মী টিকার দু'টি ডোজ পেয়েছেন, তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে মাত্র দু'জনের, ০.০৫ শতাংশ। 

ভি কে পল বলেন, পুলিশ সদস্যরা করোনায় আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন। তাদের মধ্যেই এ গবেষণা চালানো হয়েছে। গবেষণা ফলাফলে দেখা গেছে- যারা এক ডোজ টিকা নিয়েছেন, তাদের মধ্যে করোনায় মৃত্যুর আশঙ্কা কমে গেছে ৯২ শতাংশ এবং দুই ডোজ টিকা গ্রহণকারীর মধ্যে আশঙ্কা কমেছে ৯৮ শতাংশ।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh