হতাশা কাটছে না গণপরিবহন শ্রমিকদের

চলমান কঠোর লকডাউনের মধ্যে মঙ্গলবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের রাজধানীর শনির আখড়া এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে যানজট। -স্টার মেইল

চলমান কঠোর লকডাউনের মধ্যে মঙ্গলবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের রাজধানীর শনির আখড়া এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে যানজট। -স্টার মেইল

করোনার সংক্রমণ রোধে সরকার ঘোষিত চলমান বিধিনিষেধ বুধবার শেষ হচ্ছে। ১৫ জুলাই থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত শিথিল হওয়া বিধিনিষেধ পরিপালনে নতুন কিছু নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বিধিনিষেধ শি‌থিল হওয়ায় বৃহস্পতিবার থেকে সারা‌ দেশেই স্বাভাবিক হবে বাস, লঞ্চ ও ট্রেন চলাচল। সেই লক্ষ্যে বেশ প্রস্তুতি দেখা গেছে বাসশ্রমিক‌ ও ওয়ার্কশপে কর্মরত‌দের মধ্যে। কেউ রং করছেন, কেউবা আবার অনেক দিন অচল থাকা বাসের ই‌ঞ্জিন চালু করে রেখেছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যাতে চলতি পথে কোনো সমস্যা না হয়।

ঈদের জন্য বিধিনিষেধ শিথিল করে গণপরিবহন চলাচলের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। তবে খুলে দেয়া হলেও করোনাভাইরাস সংক্রমণের এই পরিস্থিতিতে হতাশা কাটছে না পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের।

বুধবার (১৪ জুলাই) রাজধানীর মহাখালী, গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সাথে কথা বলে এমন হতাশার চিত্র পাওয়া গেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ধাপে ধাপে বিধিনিষেধে প্রায় চলাচল বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন। তাই অনেকটাই সংকটের মুখে সড়ক পরিবহনখাত। করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। এছাড়া মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভালো নয়।

যাত্রী পরিবহন করতে হবে ধারণক্ষমতার অর্ধেক। এ অবস্থায় ঈদে মানুষ কতটা গ্রামমুখী হবে, সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের। দূরপাল্লার গাড়ি চালিয়ে লাভের মুখ দেখা আদৌ সম্ভব হবে কি-না, সেটা নিয়ে ভাবছেন তারা।

পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে গণপরিবহন চলাচল, দোকান-শপিংমল খুলে দেয়াসহ কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে সব কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিয়ে চলমান বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। ১৪ জুলাই মধ্যরাত থেকে ২৩ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত বিধিনিষেধ শিথিল করে গতকাল মঙ্গলবার (১৩ জুলাই) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

একইসঙ্গে ২৩ জুলাই সকাল ৬টা থেকে ৫ আগস্ট রাত ১২টা পর্যন্ত ফের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আগামী ২১ জুলাই বুধবার দেশে মুসলমানদের দ্বিতীয় বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে।

রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, টিকিট কাউন্টার খুলে অনেকে টিকিট বিক্রি করছেন। এছাড়া, চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ। 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেছেন, ‘বুধবার রাত থেকেই ঢাকা থেকে ছেড়ে যাবে দূরপাল্লার বাস। আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে চলবে সিটি সার্ভিস থেকে শুরু করে সব ধরনের গণপরিবহন।’

সাকুরা পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার মোহাম্মদ হাবিব বলেন, ‘আজ রাত থেকেই বাস ছাড়া হবে। তবে কতোজন যাত্রী নিয়ে বাস ছাড়বে সেটা এখনো ঠিক হয়নি। মালিক পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আজ বিকেলে নির্দেশনা আসবে।’

তিনি বলেন, ‘ঈদের সময় অর্ধেক যাত্রী নিয়ে বাস ছাড়লে ক্ষতি হয়। কারণ যাত্রী নিয়ে ঢাকা ছাড়লেও আসতে হয় খালি। একটা গাড়ি রাস্তায় নামলে বা ঢাকা থেকে বরিশাল গেলে খরচ হয় ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা। কিন্তু অর্ধেক যাত্রী নিয়ে গেলে আসে ১৬ হাজার টাকা।’

সায়েদাবাদে দূরপাল্লার বিভিন্ন বাসের টিকিট বিক্রি করেন মো. আলী হোসেন। তিনি বলেন, ‘পরিবহন লাইনের সবার অবস্থা খুবই খারাপ। অনেক দিন পর গাড়ি চলবে, মালিক-শ্রমিকরাও প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ খাতের মূল দুটি সিজন দুই ঈদ। কিন্তু সব কিছু মিলে মনে হচ্ছে না আহামরি কিছু হবে। কারণ পকেটে টাকা থাকলে বাড়ি যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা থাকে মানুষের। সবারই অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। ঈদ এলেও পরিস্থিতি তো স্বাভাবিক নয়। মানুষের মনেও তো ভয় আছে করোনা নিয়ে। খুব জরুরি না হলে কেউ স্থান ত্যাগ করবে না। তাই আমগো ভাগ্যের উন্নতি হবে বলে তো মনে হয় না।’

একটি বাসের চালক মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘এভাবে গাড়ি বন্ধ থাকলে আমরা ক্যামনে চলমু। আমাগো চলার তো রাস্তা নাই। এতদিন বন্ধের পর এক সপ্তাহ টাইম দিছে, তাও দুই সিটে একজন। কী অইব বলেন? আমগো সারা মাস গাড়ি চালাইতে দেন, আমরা একজন কইরাই যাত্রী টানমু। এটাই আমগো দাবি। আমগো আর কান্দাইয়েন না। আমরা দুই ছেলে, স্ত্রী আছে। বলতে গেলে এতদিন ভিক্ষা করে সংসার চালাইছি।’

বাসের মালিক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘একটা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হইতেও তো কিছুটা সময় লাগে। এর মধ্যে মাত্র আটদিন খোলা। আবার দুই সিটে যাবে একজন, কিন্তু দুই সিটের ভাড়া তো পাওয়া যাবে না। যতটা পারছি বসাইয়া বসাইয়া শ্রমিকদের বেতন দিছি, যা পরিস্থিতি তাতে খুলে দিলেও খরচ ওঠানো যাইব কিনা কে জানে।’

কুমিল্লা রুটে চলাচলকারী একটি গাড়ির চালক হোসেন মিয়া বলেন, ‘ঈদে বাড়ি গেলেও ঈদের পরদিনই আপনাকে আবার ছুটতে হবে। এরপর আবার ১৪ দিনের লকডাউন। মানুষ তো বেকায়দায় না পড়লে কোনো জায়গায় যাবে না।’

বাসের সুপারভাইজার মো. নবী হোসেন বলেন, ‘গত বছর লকডাউনের সময় ১০ হাজার টাকা কিস্তি উঠাইয়া ঘর ভাড়া দিছি। সেই কিস্তি এখনও শোধ করতে পারি নাই। এর মধ্যে কাজকাম বন্ধ। লকডাউনে আমগো মরা ছাড়া উপায় নেই। এখন খুলছে প্রতিদিন ৫০০-৭০০ টাকা ইনকাম হইব। একদিন ইনকাম হইব দুদিন খাইতে অইব। আটদিনে কী কদ্দুন কী অইব?’

ঢাকা কেন্দুয়া রুটের একটি বাসের চালক মফিজুল ইসলাম রনির তিন মেয়ে, এক ছেলে। থাকেন নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর এলাকায়। বৃহস্পতিবার থেকে গাড়ি চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘লকডাউনের মধ্যে আমরা পুরাই বসা। এতদিন ঋণ করে কষ্ট করে চলেছি। গাড়ি খুলে দিয়েছে ভালো সিদ্ধান্ত। এতদিন গাড়ি বন্ধ কোনো সহযোগিতা পাই নাই আমি। সরকার বলছে সহযোগিতা করব, আমরা তো কিছুই পাইলাম না, কোনো সংগঠন থেকেও কিছু পাইনি।’

ঢাকা থেকে কক্সবাজার রুটের রিল্যাক্স পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার মালেক হোসেন বলেন, ‘আমাদের বাস আজ রাত থেকেই ছেড়ে যাবে। আপাতত অর্ধেক যাত্রী নিয়েই বাস ছাড়বে। মালিকপক্ষ থেকে পরবর্তী নির্দেশনা আসলে আমরা সেই অনুযায়ী বাস ছাড়বো।’

মহাখালীতে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা কিশোরগঞ্জ রুটে অনন্যা পরিবহনসহ উত্তরবঙ্গে রুটে একতা, এনা ও সাদিকা পরিবহনের বাসগুলোতে স্বাস্থ্যবিধির সব শর্ত নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //