পরীক্ষা ছাড়াই উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছেন রোগীরা

করোনা আক্রান্ত রুগীকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে

করোনা আক্রান্ত রুগীকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে

করোনা পরীক্ষা কিন্তু উপসর্গ নিয়ে ভুগছেন অনেকে। মৃত্যুও হচ্ছে অনেক মানুষের; কিন্তু পরীক্ষা হচ্ছে না বলে এই মৃত্যুটা স্বাভাবিক হিসাবে ধরে নেওয়া হচ্ছে। করোনা হিসাবে মৃত্যুর তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। 

সর্বত্রই বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা; কিন্তু বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের প্রায় দেড় বছর চলে গেলেও, এখনো সর্বত্র পরীক্ষাগার করতে পারেনি সরকার। যথেষ্ট পরীক্ষাগার নেই, পরীক্ষার সুযোগ নেই বলে মানুষ জ্বর নিয়েই ঘুরে বেড়াচ্ছেন, আবার একইসঙ্গে স্বাভাবিক কাজও করছেন। মিশছেন সামাজিকভাবে। জ্বর হলে অথবা নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা দিলে করোনা হতে পারে এটা এখন সবাই জানেন। এমতাবস্থায়ও গ্রামাঞ্চলে মানুষ একে অপরের সঙ্গে মিশছেন। এভাবেই গ্রামাঞ্চলে খুব সহজে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা। 

এটা যে শুধু গ্রামে হচ্ছে, তাও নয়। শহরাঞ্চলেও একই অবস্থা। গ্রামের চেয়ে শহরাঞ্চলের মানুষ একটু বেশি সচেতন। তা সত্ত্বেও শহরের অনেক মানুষও পরীক্ষা করাতে যান না। পরীক্ষা কেন্দ্রে দীর্ঘ লাইন। লম্বা লাইনে কষ্ট করে সারাদিন অপেক্ষা করার পর দেখা গেল শেষ বেলায় ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, ‘আজ আর পরীক্ষা করা হবে না। প্রয়োজনীয় কিট নেই, যারা পরীক্ষা করবেন তারা নেই’ ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেকে শহরে বাস করেও পরীক্ষা করাতে পারছেন না। 

সরকার ইতিমধ্যে আরটি পিসিআর মেশিনের চেয়ে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন পরীক্ষাগার স্থাপনে মনোযোগী হয়েছে। করোনা পরীক্ষার জন্য সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট ১৩০টি আরটি পিসিআর মেশিন থাকলেও সরকার ইতিমধ্যে ৪৫৭টি র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন গবেষণাগার স্থাপন করেছে। অ্যান্টিজেন টেস্টে দ্রুত পরীক্ষার ফল পাওয়া যায় এবং একদিনে অনেককে পরীক্ষা করানো যায়। অ্যান্টিজেন পরীক্ষাগার স্থাপনের কারণেই গত ২৬ জুলাই প্রথমবারের মতো দেশে ৫০ হাজার ৯৫২টি নমুনা পরীক্ষা করতে পেরেছে এবং এটাই এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি নমুনা পরীক্ষার রেকর্ড। ২৬ জুলাই বেশি নমুনা পরীক্ষা করাতে পেরেছে বলেই সে দিনই দেশে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ১৫২ জন করোনা শনাক্ত হয়েছে। সে দিন নমুনা পরীক্ষার সাপেক্ষে করোনা শনাক্তের হার ছিল ২৯.৮২ শতাংশ। সারাদেশে প্রতিটি ইউনিয়ন পর্যন্ত র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন গবেষণাগার স্থাপন করা সম্ভব এবং এটা করতে পারলে আরও অনেক পরীক্ষা একসঙ্গে এবং দ্রুততার মধ্যে ফলাফল প্রদান করা সম্ভব। 

আবার গ্রামে দেখা যায়, মানুষের গায়ে জ্বর, মুখে স্বাদ ও গন্ধ নেই; তবু তারা করোনা পরীক্ষায় আগ্রহী হচ্ছেন না। পরীক্ষা করতে গেলেই টাকার প্রয়োজন। যেতে হচ্ছে অনেক দূর। এই মুহূর্তে গণপরিবহণও নেই। পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে হচ্ছে অনেক কষ্টে, বাড়তি অর্থ খরচ করে। এই কষ্টটাও অনেকে সহ্য করতে পারছেন না বলে পরীক্ষা করাতেও যান না। যদিও সরকার জুলাই মাসে বিনামূল্যে করোনা পরীক্ষার ঘোষণা দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও গ্রামের মানুষ করোনা পরীক্ষায় আগ্রহী হচ্ছে না, অসুখ নিয়েই বাড়িতে কাটিয়ে দিচ্ছেন। লক্ষণ-উপসর্গ থাকলেও পরীক্ষা করছেন না নানা ধরনের বাধা-বিপত্তির কারণে।

অন্যদিকে করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট পেতেও দেরি হচ্ছে। ‘একদিনের মধ্যে পরীক্ষার ফলাফল পাওয়া যায় না’ এই অভিযোগটা সর্বত্র। করোনার সমস্ত লক্ষ্মণ ও উপসর্গ থাকার পরও পরীক্ষার ফলাফল না পাওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যায় না। সেটা করোনার বা অন্য রোগের হোক। অন্য রোগের বেলায়ও করোনা পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। ফলে উপসর্গ নিয়েই বাসায় অথবা বাড়িতে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। এর মধ্যেই কিন্তু পরিবারের কিংবা সমাজের আরও অন্যদের মধ্যে করোনা ছড়িয়ে পড়ছে। সেদিকে যেমন আক্রান্তদের কোনো নজর নেই, আবার সরকারেরও এ দিকে নজর দেওয়ার কোনো ফুরসত নেই বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। 

অভিযোগ রয়েছে, করোনা পরীক্ষা করাতে আসলে সবার পরীক্ষা করাও হচ্ছে না। পরীক্ষা করার আগে মেডিকেল টেকনিশিয়ানরা পরীক্ষায় আগ্রহীদের শরীরের নানা কিছু জিজ্ঞাসা করে নিচ্ছেন। শরীরে করোনার মতো লক্ষণ অথবা উপসর্গ না থাকলে তার পরীক্ষা করা হচ্ছে না এমন অভিযোগও রয়েছে। 

এখন করোনা হলে অনেকের মুখের স্বাদ অথবা নাকের গন্ধ চলে যাচ্ছে। স্বাদ অথবা গন্ধ চলে গেলেও গায়ে কোনো জ্বর নেই, নেই কাশি অথবা কফ। এসব লক্ষণ নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে গেলে পরীক্ষাও করাতে চায় না টেকনিশিয়ানরা। আবার করোনা হয়েছে এমন কথা পরিবারের অন্যদের টেকনিশিয়ানরা বললেও ‘করোনা হয়নি এমন পরামর্শ দিয়ে থাকেন অনেকেই। তারা যুক্তি দেখান সর্দি হলেও এমন হতে পারে। গায়ে যেহেতু জ্বর নেই বা করোনার অন্য কোনো লক্ষণ নেই। সে কারণে অপেক্ষা করা উচিত।’ চিকিৎসকেরাও পরামর্শ দিয়ে থাকেন, ‘এমন হতে পারে, কোনো সমস্যা নেই। করোনার নির্দিষ্ট লক্ষ্মণ ছাড়া হাসপাতালে ভর্তি হবারতো প্রয়োজনও নেই আবার পরীক্ষা করারও প্রয়োজন নেই।’ 

এমন একজন ভুক্তভোগী আব্দুল হাকিম (২৭) জানিয়েছেন, তার এ রকম উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। ঢাকা শহরে থেকেও কোনো চিকিৎসা পাচ্ছিলেন না। তিনি হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেননি চেষ্টা করেও, পরীক্ষাও করাতে পারেননি। সবাই বলেছেন, ‘এটা করোনা নয়। তুমি স্বাভাবিক থাক। কাজ কর গিয়ে।’ কিন্তু এমন হওয়ার ১৫ দিন পরই হঠাৎ বুকে সামান্য কফ জমে যায়, কাশি হয়েছে। জ্বর বেশি না হলেও শরীরে প্রচ- অস্বস্তি। পাজরের হাড়গুলোতে প্রচ- ব্যথা শুরু হয়ে যায়। তবে স্বস্তি ছিল যে, ‘বয়সটা কম হওয়ায় এর চেয়ে বেশি সমস্যা হয়নি। কোনো ওষুধও লাগেনি।’ বাসায় থেকে শুধু ভিটামিন সি জাতীয় ফল ও গরম পানি পান করেছেন। এর ৭ দিন পর আব্দুল হাকিম হঠাৎ একদিন সকালে অনুভব করলেন, তার ভেতরে যে অস্বস্তি ভাব ছিল তা চলে গেছে। আগের চেয়ে স্বাভাবিক লাগছে। 

বিএসএমএমইউর মেডিসিনের সহকারী অধ্যাপক মাসুদুল হাসান জানিয়েছেন, বয়স কম হলে করোনা সংক্রমণ ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রে কোনো ওষুধপত্র ছাড়াই এমনিতেই আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হয়ে যায়। কোনো কিছুই প্রয়োজন পড়ে না। ভিটামিন সি জাতীয় ফল খাওয়া ভালো। তবে অতিরিক্ত ভালো নয়। ভিটামিন সি জাতীয় ফল শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। গরম পানি পান করলে এ সময় ভালো অনুভব করতে পারেন আক্রান্ত ব্যক্তি; কিন্তু কেবল গরম পানিতে করোনাকে কাবু করা যায় না। আজকাল অনেকেই গরম পানির ভাপ নিয়ে থাকেন। এটা করোনা সংক্রমণে কোনো কাজ করে না বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। কারণ করোনাভাইরাস শরীরের কোষে আক্রমণ করে, গরম পানি সেখানে যেতে পারে না।’

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //