কমানোর নেই কার্যকর পদক্ষেপ

বজ্রপাতে প্রাণহানি

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

মা-বাবার স্বপ্ন ছিল, ছেলে অনেক বড় হবে। একটি বজ্রপাত সে স্বপ্ন শেষ করে দিল। দিনাজপুর সদর উপজেলায় গত ২৩ আগস্ট বজ্রপাতে নিহত চার কিশোরের স্বজনদের চোখে এখনো কান্না আর আহাজারি।

ফুটবল নিয়ে মাঠে দৌড়ানো, পুকুরের পানিতে লাফঝাঁপ আর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া যাদের নৈমিত্তিক কাজ, সেই কিশোররা আজ না ফেরার দেশে চলে গেছে। চার কিশোরের এমন মৃত্যুতে গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। গত ৩ আগস্ট হঠাৎ বজ্রপাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৭ বরযাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। এভাবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও বজ্রপাতে ঝরছে প্রাণ। চলতি বছরে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে বজ্রপাতে ৪০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। 

বছর বছর প্রাণহানি : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের এই এক দশকে দেশে বজ্রপাতে মোট মৃতের সংখ্যা- ২ হাজার ৪১৩ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে ২০১৮ সালে। ওই বছর বজ্রপাতে মারা গেছে ৩৫৯ জন। এর আগের বছর মারা যায় ৩০১ জন, যা গত এক দশকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০১৯ সালে মৃতের সংখ্যা ২৩০ এবং ২০২০ সালে ৩০০ জন। ২০১৬ সালে বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা ছিল ২০৫ জন। এ ছাড়া ২০১৫ সালে ১৬০, ২০১৪ সালে ১৭০, ২০১৩ সালে ১৮৫, ২০১২ সালে ২০১, ২০১১ সালে ১৭৯ ও ২০১০ সালে ১২৩ জনের মৃত্যু ঘটে বজ্রপাতে।

বজ্রপাতের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশ : বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে ভেনিজুয়েলা ও ব্রাজিলে। উন্নত দেশগুলোতেও একসময় বজ্রপাতে বহু মানুষের মৃত্যু হতো; কিন্তু তারা বজ্রনিরোধক খুঁটি বা পোল স্থাপন করে, মানুষকে সচেতন করার মধ্য দিয়ে ক্ষয়-ক্ষতি কমিয়ে এনেছে। বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাভিত্তিক সচেতনতা সৃষ্টি করেছে উন্নত দেশগুলো। এতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের দেশগুলোসহ পূর্ব এশিয়ায় বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যা বহুলাংশে কমেছে। অথচ বাংলাদেশে প্রতি বছর বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা বাড়লেও নেই কার্যকর উদ্যোগ। সরকার ২০১৬ সালে একে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা দিলেও, তেমন কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। 

বজ্রপাত বৃদ্ধির কারণ : বজ্রপাতের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে একক কোনো কারণ বলছেন না বিশেষজ্ঞরা। তবে তারা বলছেন, প্রকৃতিকে বৈরী করে তোলার পাশাপাশি মুঠোফোনের ব্যবহারসহ জীবনযাত্রার পরিবর্তন এর জন্য দায়ী। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, নদী শুকিয়ে যাওয়া, জলাভূমি ভরাট হওয়া আর বড় গাছ ধ্বংস হওয়ায় দেশে অভ্যন্তুরীণ তাপমাত্রা এক থেকে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। বিশেষ করে বর্ষা আসার আগের মে মাসে তাপমাত্রা বেশি হারে বাড়ছে। এতে এ সময়ে বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থেকে ভেসে আসা আর্দ্র বায়ু এবং উত্তরে হিমালয় থেকে আসা শুষ্ক বায়ুর মিলনে বজ্রঝড় সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া একসময় দেশের বেশির ভাগ এলাকায় বড় গাছ থাকত। তাল, নারিকেল, বটসহ নানা ধরনের বড় গাছ বজ্রপাতের আঘাত নিজের শরীরে নিয়ে নিত। ফলে মানুষের আঘাত পাওয়ার আশঙ্কা কমত।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, বজ্রপাত প্রথমেই খোঁজে উঁচু গাছ। সেটি না পাওয়ায় মাঠ, হাওর বা খোলা জায়গায় যদি কোনো মানুষ থাকে, তাহলে সে-ই থাকে সবচেয়ে উঁচুতে। তাই তাদের ওপরই বজ্রপাত পড়ে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে। ফলে আগের চেয়ে বজ্রপাতের সংখ্যা বেড়েছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. তৌহিদা রশীদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বজ্রপাতের সংখ্যা বাড়ছে। অনেক দেশই এমনকি ভারতের কিছু জায়গায়ও বজ্রপাতের ৩০ মিনিট আগে সাইরেন বাজাচ্ছে; কিন্তু এটা খুব ব্যয়বহুল। তবে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ছাড়া অনেক দেশ প্রচুর তালগাছ লাগিয়ে বজ্রপাত নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। 

বজ্রপাত নিরোধক বৃক্ষ রোপণে অগ্রগতি কত দূর : সরকারের নীতিনির্ধারকরা ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে এর প্রতিকারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছিলেন। তখন এক কোটি তালগাছ লাগানো এবং বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বজ্রনিরোধক যন্ত্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল; কিন্তু চার বছর পর এসে দেখা গেল, কাজির গুরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই। দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তালগাছ লাগানো হয়নি, কয়েক লাখ তালের আঁটি রোপণ করে দায়িত্ব সারা হয়েছে। 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে কর্মকর্তারা জানান, বিপুলসংখ্যক গাছ পেতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। এরই মধ্যে ২৮ লাখ বীজ লাগানো হয়েছে। তবে তালগাছ বড় হতে কিছুটা সময় লাগে। ফলে অধিদপ্তর বলছে, গাছ লাগানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেই প্রক্রিয়া শুরু হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।

অবশ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে এর আগে বজ্রপাত প্রতিরোধে সারা দেশে প্রায় ১৩ লাখ তালগাছ রোপণের উদ্যোগ নিয়েছিল। সেই তালগাছগুলোর কয়টি টিকে আছে, সেগুলো কী ভূমিকা রেখেছে জানতে চাইলে মহাপরিচালক আতিকুল হক বলেন, বিষয়টির কোনো পর্যালোচনা করা হয়নি। তবে করতে হবে। বেশির ভাগ গাছ রাস্তার দুই পাশে রোপণ করা হয়েছিল। বজ্রপাতে মৃত্যু বেশি হয় খোলা মাঠে।

মহাপরিচালক আতিকুল হকে তথ্যের সূত্র ধরে আমরা খোঁজ নিয়েছিলাম রংপুরে। রংপুরের আট উপজেলার ছয়টিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে তালগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৭৬৭টি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দেশব্যাপী গ্রামীণ রাস্তার দুই পাশে তালগাছের চারা রোপণের জন্য ২০১৭ সালে নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্দেশনা অনুযায়ী ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এই উদ্যোগ নেয়। তবে এতসংখ্যক তালের চারা রোপণ করার কথা বলা হলেও, বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। অযত্ন-অবহেলায় এসব গাছ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

রংপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবু তাহের মো. আখতারুজ্জামান বলেন, অনেক জায়গায় রোপণ করা গাছগুলো নষ্ট হয়েছে এটা ঠিক। এগুলো রক্ষায় আমাদের অফিসার, স্থানীয় চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের আরও যত্নশীল হতে হবে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু রংপুর জেলায় নয়, বিভাগের বাকি আট জেলারও একই অবস্থা। গাছ বা বীজ রোপণ করেই দায়িত্ব শেষ হয়েছে, রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। ফলে অস্তিত্ব নেই এসব তালগাছের। কী পরিমাণ চারা গাছ দৃশ্যমান রয়েছে এর সঠিক তথ্য দিতে পারেননি বিভিন্ন জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তারা।

দুর্যোগ নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠন ডিজাস্টার ফোরামের সদস্য সচিব গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, বজ্রপাতের প্রকোপ কমাতে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে মুঠোফোনের টাওয়ারে লাইটেনিং এরস্টোর লাগিয়ে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানো যায়। মুঠোফোন কোম্পানিগুলো তাদের করপোরেট দায়িত্বের অংশ হিসেবে কাজটি করতে পারে। মুঠোফোনের টাওয়ারে লাইটেনিং এরস্টোর লাগানোর বিষয়টি সরকারও বিবেচনা করেছিল বলে জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান।

তিনি বলেন, বজ্রপাতের আগাম সংকেত জানতে দেশের আট স্থানে বসানো হয়েছে লাইটেনিং ডিটেকটিভ সেন্সর। আটটি সেন্সরে উঠে আসবে পুরো দেশের চিত্র। প্রতিটি সেন্সর থেকে এক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত তদারকি করা যাবে। এক মৌসুমে (এপ্রিল থেকে জুন) দেশে কতবার বিদ্যুৎ চমকায় এবং বজ্রপাত হয় সেটিও সংরক্ষণ করা হবে। গেল কয়েক বছর ধরেই সেগুলো পরীক্ষামূলকভাবে চলছে। লাইটেনিং এরস্টোর একটি যন্ত্রের দাম ৭ লাখ টাকা। এটা ব্যয় সাপেক্ষ। এখন কৃষকদের সচেতন করা এবং এলাকায় বড় গাছ সংরক্ষণ করাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তালগাছ নষ্ট হওয়া কিংবা এ নিয়ে কোনো অনিয়ম হলে তিনি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।

এ দিকে মন্ত্রীর তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের আটটি স্থানে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ২০ কোটি টাকা খরচ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আটটি লাইটেনিং ডিটেকটিভ সেন্সরের যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। ঢাকায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় ছাড়াও ময়মনসিংহ, সিলেট, পঞ্চগড়, নওগাঁ, খুলনা, পটুয়াখালী ও চট্টগ্রামে এই সেন্সর বসানো হয়েছে। ২০১৯ সালে স্থাপিত লাইটেনিং ডিটেকটিভ সেন্সর এখন অচল হয়ে পড়েছে। 

কানাডার সাসকাচুয়ান ইউনিভার্সিটির আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক বাংলাদেশি পিএইচডি গবেষক মোস্তফা কামাল বলেন, চারদিকে এত বড় বড় প্রকল্প আর নানা অপচয়ের খবরের ভিড়ে মানুষ বাঁচানোর কাজে যখন অর্থের সংকটের দোহাই দেওয়া হয়, তখন তা খুবই হাস্যকর হয়ে দাঁড়ায়।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //