ডেঙ্গুর নতুন ধরনে বাড়ছে মৃত্যু

মশক নিধনে ব্যর্থতার দায় কার?

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

স্কুলে পড়ার সময় আমরা অনেকেই শরৎচন্দ্রের ‘বিলাসী’ গল্পটি পড়েছি। এই গল্পের নায়ক মৃত্যুঞ্জয়। মৃত্যুঞ্জয়ের এক বন্ধুর নাম ন্যাড়া। ছেলেটি পড়ালেখায় ভালো ছিল না। সেই ন্যাড়া একদিন স্থির করল, সে সন্ন্যাসী হবে। সেই অভিপ্রায়ে গিয়ে আশ্রিত হলো এক সন্ন্যাসীর আশ্রমে। সেখানে সে থাকতে পারল না মশার কামড়ে। তাই সে জানাল, ‘মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হইয়া সন্ন্যাসগিরি ছাড়িয়া দিলাম।’ 

আবার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি উপন্যাসে মশা দ্বারা গ্রামের মানুষ কীভাবে আক্রান্ত হতো, তার একটি বিবরণ আছে। তবে আগেকার দিনে লোকজন, বিশেষত যারা গ্রামে থাকত, যাদের গোয়ালে গরু-মহিষ থাকত, তারা সন্ধ্যার আগে গোয়ালে ধোঁয়া দিয়ে রক্ষা করত প্রাণীগুলোকে। আর বাঁশঝাড় কিংবা কোনো জলাশয়ের পাশে যাদের ঘর-বাড়ি ছিল, তারা নিজ গৃহে সন্ধ্যাবাতি জ্বালানোর অনেক আগে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই দিত উৎকর্ষ সন্ধ্যের ধোঁয়া। ফলে তারা রেহাই পেত এডিস অথবা অ্যানোফিলিসের কামড় থেকে।

গ্রামের লোকজন কোনো দিন জানত না এডিস ও অ্যানোফিলিসের নাম। শুধু জানত, মশা কামড়ালে ম্যালেরিয়া হতে পারে। 

মশার কামড় থেকে রক্ষা পেতে যুগে যুগে লোকে নানা ব্যবস্থা নিত এবং এখনো নেয়। আর ডেঙ্গুর কারণে মশা যে আতঙ্কের সৃষ্টি করতে পারে এই বিংশ শতাব্দীতেও, তাতে মশা মারতে কামানের আয়োজন হয়তো নিকট ভবিষ্যতেই মানুষকে করতে হবে।

করোনা প্রতিরোধে আমরা সবাই যখন ব্যস্ত, তখন নীরবে-নিভৃতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত এগারো হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আর প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগী। সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর হার। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে স্বাস্থ্যসেবার বেহাল দশা হয়েছে আগেই। ফলে ভয়েও অনেকের জ্বর হলেও তারা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন না এখন। সম্ভবত এ জন্য এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সঠিক চিত্র প্রতিফলিত হচ্ছে না বলে মনে হয়। ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি রোধে আমাদের আরও আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার দরকার ছিল। ডেঙ্গু পরিস্থিতি কয়েক বছর থেকে ভয়াবহ আকার ধারণ করছে ঢাকায়। এ বছর মশার পরিমাণ কম হলেও, কয়েক সপ্তাহ ধরে মশার আনাগোনা টের পাওয়া যাচ্ছিল। 

ঢাকা সিটির উত্তর ও দক্ষিণ মিলে আমাদের দু’জন মেয়র। তারা মশা কমাতে এবং এর বিস্তার প্রতিরোধে যে বক্তব্য দিয়েছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে, তাতে মনে হয়েছিল, প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় ফগার মেশিনের শব্দ শুনতে পাওয়া যাবে; কিন্তু তা আজকাল অনেক কম শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। বলতে গেলে পাওয়াই যায় না। 

সম্প্রতি বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ একটি গবেষণা করেছে। তারা জানিয়েছে, বাংলাদেশের রোগীদের মধ্যে এ বছর ডেঙ্গুর নতুন সেরোটাইপ বা একটি ধরন শনাক্ত করা হয়েছে। ডেঙ্গু ভাইরাসের নতুন এই ধরনের নাম ‘ডেনভি-৩’। এই বছর এই নতুন ধরনে মানুষ আক্রান্ত হওয়ার পাশাপাশি মৃত্যুও বেশি হচ্ছে। বিসিএসআইআর জানিয়েছে, তাদের গবেষণাগারে ২০ ডেঙ্গু রোগীর নমুনা থেকে ভাইরাসের জিন বিন্যাস বিশ্লেষণ করেছে তারা। 

এতে দেখা গেছে, এই রোগীদের সবাই ভাইরাসটির ডেনভি-৩ ধরনে আক্রান্ত ছিলেন। অর্থাৎ এই সেরোটাইপ-৩-এর মাধ্যমে এ বছর রোগীরা বেশি আক্রান্ত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। আর যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, দ্রুত তাদের প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে। 

দেশে গত ১০ বছরে ডেনভি-১ ও ২ সেরোটাইপে মানুষ বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। তবে এবার ডেনভি-৩ ধরনই বেশি। ২০১৭ সালে দেশে এই ধরন প্রথম শনাক্ত হয়। যারা আগে ডেনভি-১, ২-এ আক্রান্ত হয়েছেন, তারা নতুন করে ডেনভি-৩-এ আক্রান্ত হলে সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়ছেন। 

গত কয়েক মাস ধরে ডেঙ্গু নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। তখন অনেকেই বলেছেন, করোনা মহামারির সঙ্গে এবার বর্ষা মৌসুমে ঢাকায় ফের মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ডেঙ্গু। দায়সাড়া গোছের বক্তব্য ছাড়া দায়িত্বশীলরা তেমন কিছুই করতে পারেননি। ফলে রোগটি আরও ভয়াবহ আকারে বিস্তার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এখনই ডেঙ্গু প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে করোনার মতো ডেঙ্গুও প্রাণঘাতী হয়ে উঠবে। আর সিটি করপোরেশনের এই কাজের সঙ্গে স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শুধু কথার কথা বলে দায়িত্ব শেষ মনে করলে হবে না।

গত বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ তেমন ছিল না; কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো, ২০১৯ সালের পরিস্থিতির সঙ্গে এ বছরের ডেঙ্গু সংক্রমণের হারের মিল লক্ষ করা যাচ্ছে। ২০১৯ সালের মে মাসে দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৯৩ জন। পরের মাসেই রোগীর সংখ্যা বেড়ে গিয়ে এক হাজার ৮৮৪ জনে দাঁড়িয়েছিল। এরপর জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ১৬ হাজার ২৫৩ হয়েছিল। সে বছর মোট এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যা এক বছরে সর্বোচ্চ সংক্রমণ। চলতি বছরের মে মাসে ৪৩ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন; কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, জুনে এই সংখ্যা বেড়ে ২২৫ জনে দাঁড়িয়েছিল। এখন পর্যন্ত এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১১ হাজারের বেশি। 

আমরা অভিজ্ঞতা থেকে জানি, এডিস মশা সবচেয়ে বেশি সৃষ্টি হয় নির্মাণাধীন ভবনে। দেশে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা আছে। আর এ আইনে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও বলা আছে। নকশা পাসের সময় রাজউকেরও নির্দেশনা থাকা উচিত কোনো সাইটে যেন এডিস মশা জন্মাতে না পারে। রাজউক থেকে এটি তদারকের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। সেটির বাস্তবায়ন তারা নিশ্চিত করবে। রাজউকের তদারক কর্মকর্তা কোনো সাইটে এডিস মশা পেলে শাস্তি ও জরিমানার ব্যবস্থা করবেন। শাস্তির ব্যবস্থা না থাকলে আইনের বাস্তবায়ন এদেশে কখনোই হবে না।

এখন সবাই জানে, আমাদের দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ঢাকাতেই বেশি। এডিস মশা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবার। সেটা কেন? কীটতত্ত্ববিদরা ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মশক নিয়ন্ত্রণ কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, এডিস মশা নিধনে সঠিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না। মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে। ফগিং ও লার্বিসাইডিং করে মশা দ্রুত মেরে ফেলা দরকার ছিল এখন; কিন্তু তা করা হচ্ছে না। ফলে গবেষণা না করেই বলে দেওয়া যায়, ঢাকায় ডেঙ্গু রোগী বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ব্যর্থতা। যখন যে কাজ করা দরকার, দুই সিটি করপোরেশন সেই কাজ করে না। মূল কাজের চেয়ে লোক দেখানো কাজ বেশি হয়। ফলে কাজের কাজ কিছু হয় না। এর মাঝে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রতি বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করলেও, সে অনুযায়ী সেবা মিলছে না বলে অভিযোগ আছে। 

২০২০-২১ অর্থবছরে মশক নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা হয়েছে ৯৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এত টাকা খরচ করেও ডেঙ্গুর মৌসুমে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এডিস মশা। এর মানে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি।

এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আনতে এখনই সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে। আর সেটি করোনা মহামারির কারণে এরই মধ্যে বিপর্যস্ত হওয়া স্বাস্থ্য খাতকে আরও চাপের মুখে ঠেলে দেবে। তাতে অবস্থা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। অবশ্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন বলছে, দুই ধরনের পরিকল্পনা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মাঠে নেমেছে তারা। প্রথমত বছরব্যাপী, দ্বিতীয়ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। 

প্রতিদিন সকাল-বিকেল চার ঘণ্টা করে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। পাশাপাশি বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান বা চিরুনি অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে মনে হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম। সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু মানুষের উদাসীনতা ও দুর্নীতির কারণে মশার ওষুধ ঠিকমতো না দেওয়া এবং সময়মতো প্রতিরোধমূলক কাজ না করায় ২০১৯ সালে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল; আমরা চাই না, এরকম এবারও হোক।

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2021 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //