দূষিত পানিতে সর্বত্র ডায়রিয়া

প্রতি ঘণ্টায় ৫১ জনের বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছে

গরমের শুরুতেই ঢাকায় বেড়েছে ডায়রিয়ার প্রকোপ। মহাখালীর আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্রে (আইসিডিডিআর,বি) ডায়রিয়ার রোগীর সংখ্যাও হু হু করে বাড়ছে।

এ গরমেই মহাখালীর আইসিডিডিআর,বি হাসপাতালে রেকর্ডসংখ্যক ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী এসেছে। আইসিডিডিআর,বি হাসপাতালে গত ৯ দিনে ১১ হাজার ১৬১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে এক হাজার ২৪০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছেন। সে হিসাবে প্রতি ঘণ্টায় এ হাসপাতালে ৫১ জনের বেশি ডায়রিয়ার রোগী ভর্তি হচ্ছেন। গরমের শুরুতে বরাবরই ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা দেয়। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সময়ে পানির চাহিদা বেড়ে যায়, বিপরীতে বিশুদ্ধ পানি সব সময় পাওয়া যায় না বলে পিপাসার্ত মানুষ দূষিত পানি পান করেন। ফলে পানিবাহিত এই রোগে এই সময়ে ডায়রিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয়। তবে এবারের মতো একসাথে এত বেশি রোগী আইসিডিডিআর,বি হাসপাতালে আগে কখনো ভর্তি হতে দেখা যায়নি।

আইসিডিডিআর,বি হাসপাতালে ডায়রিয়ার রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক বেড ভর্তি হয়ে গেলে হাসপাতালের খোলা আঙিনায় তাঁবু টানিয়ে অস্থায়ী জরুরি ওয়ার্ড খুলে চিকিৎসা দিচ্ছে আইসিডিডিআর,বি কর্তৃপক্ষ। ডায়রিয়া যে শুধু ঢাকা মহানগরীতেই হচ্ছে তা নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও দেখা যাচ্ছে। মূলত দূষিত পানি পানই ডায়রিয়ার প্রধান কারণ বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। 

দূষিত পানিতে কয়েক প্রকার ব্যাকটেরিয়া দেখা যায়। আইসিডিডিআর,বি হাসপাতালের প্রধান ডা. বাহারুল আলম বলেন, গরমের সময় সিগেলা, ই-কোলাই, কলেরা (ভিব্রিও কলেরি) এবং শীতকালে রোটাভাইরাসের মাধ্যমে ডায়রিয়া ছড়ায়। পানিবাহিত এসব জীবাণু পানি ছাড়াও পচা-বাসি খাবারেও জন্মায়। শুধু যে দূষিত পানি পান করলেই ডায়রিয়া হচ্ছে, এমন নয়। ডায়রিয়ার জীবাণু আছে, এমন পানি দিয়ে তৈরি করা খাবার খেলেও ডায়রিয়া হতে পারে। তবে এই পানি দিয়ে তৈরি খাবার গরম করে খেলে জীবাণুগুলো মরে যাবে। সে কারণে রাস্তায় তৈরি নানা ধরনের শরবত, চটপটি, ফুঁচকা, আইসক্রিম, কুলফি মালাই, ঝালমুড়ি এবং খোলা অবস্থায় বিক্রি করা সব ধরনের খাবারই পরিহার করা উচিত। এসবে খাবারে সহজেই জীবাণু ঢুকে যেতে পারে, তা যত সুস্বাদু অথবা দেখতে সুন্দরই হোক কেন।

চিকিৎসকরা বলছেন, ডায়রিয়া হয়ে গেলে, তা থেকে তাৎক্ষণিক সুস্থ হওয়া যায় না। পেটে যে জীবাণুগুলো রয়েছে, সেগুলো বের না হওয়া পর্যন্ত অথবা সেগুলো মরে না যাওয়া পর্যন্ত পাতলা পায়খানা হতে থাকে। পাতলা পায়নাখানা হলে শরীর থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় খনিজ লবণ বেরিয়ে যায়। নিয়ম মেনে খাবার স্যালাইন এবং প্রয়োজনীয় খাবার খেলে ডায়রিয়া থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন রোগী। কারও ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা হলে এক প্যাকেট খাবার স্যালাইন ঠিক আধা লিটার পানিতে গুলিয়ে পান করতে হবে। পানির পরিমাণ কম-বেশি হওয়া যাবে না। এখন আধা লিটারের পানির বোতল সর্বত্রই পাওয়া যায়। সে বোতলেই এক প্যাকেট খাবার স্যালাইন গোলানো যায়। ১০ বছরের বেশি বয়সীদের ডায়রিয়া হলে প্রতিবার পায়খানার পর এক গ্লাস করে (২৫০ মিলি) খাবার স্যালাইন খেতে হবে।

শিশুদের ডায়রিয়া হলে, প্রতিবার পায়খানার পর শিশুর যত কেজি ওজন, তত চা-চামচ বা যতটুকু পাতলা পায়খানা হয়েছে আনুমানিক সেই পরিমাণ খাবার স্যালাইন খাওয়াতে পারলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়বে না। ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশু বমি করলে তাকে ধীরে ধীরে স্যালাইন খাওয়াতে হবে। যেমন- ৩ বা ৪ মিনিট পর পর এক চা-চামচ করে পান করাতে হবে। শিশুকে কোনো অবস্থাতেই বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করা যাবে না। কারণ বুকের দুধে শিশুর শরীরের প্রয়োজনীয় খাবার রয়েছে। আবার বুকের দুধে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও রয়েছে। ৬ মাসের বেশি বয়সী শিশুদের খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি সব ধরনের স্বাভাবিক খাবার খাওয়াতে হবে। ৬ মাস থেকে ৫ বছরের শিশুকে প্রতিদিন একটি করে জিংক ট্যাবলেট পানিতে গুলিয়ে ১০ দিন খাওয়াতে হবে।

ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীকে খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি বেশি বেশি তরল খাবার যেমন- ডাব ও চিড়ার পানি, স্যুপ ইত্যাদি খাওয়াতে হবে। তবে পানি হিসেবে কোনোভাবেই কোমল পানীয় খাওয়ানো যাবে না। এরপরও রোগীর অবস্থার উন্নতি না হলে বা বেশি খারাপ হলে, অতি দ্রুত কাছের হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করতে হবে। 

ডায়রিয়া থেকে বেঁচে থাকার জন্য খাবার ও পানি জীবাণুমুক্ত রাখার পরামর্শ দিয়ে আইসিডিডিআর,বির ডা. বাহারুল আলম বলেন, পানি ফুটানোর সময়, বলক উঠার পর আরো পাঁচ মিনিট চুলায় রাখতে হবে। পরে সে পানি ঠান্ডা করে পান করতে হবে। পানি ফুটানোর ব্যবস্থা না থাকলে প্রতি ৩ লিটার পানিতে একটি পানি-বিশুদ্ধকরণ ক্লোরিন ট্যাবলেট দিয়ে পানি নিরাপদ করা যেতে পারে। খাবার খাওয়ার আগে সব সময় কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে খাবার খেতে হবে। তাহলে হাতের মাধ্যমে আসা জীবাণু খাবারের সাথে মুখে চলে যাবে না।

আমাদের দেশে সাধারণত খাবার খাওয়ার পর অনেককে খুব ভাল করে সাবান দিয়ে অনেকক্ষণ কচলে হাত ধুতে দেখা যায়; কিন্তু এই কাজটি খাবার খাওয়ার আগেই করতে হবে। মা যখন শিশুকে খাবার খাওয়াবেন, তখন মায়ের হাতও সাবান দিয়ে ২০ সেকেন্ড পর্যন্ত কচলে ধুয়ে নিতে হবে। ফিডার দিয়ে শিশুকে খাওয়ানোর আগে ফোটানো পানি ও সাবান দিয়ে ভালো করে ফিডারটি ধুয়ে নিতে হবে। ফিডারের নিপলের ছিদ্রটি ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে, যেন সেখানে জীবাণু লেগে না থাকে। শিশুর ফিডার দিয়ে খাবার খাওয়ানোর পর তা ঠান্ডা হয়ে গেলে বোতলে বা নিপলে জীবাণু জন্ম নিতে পারে। বাইরে গেলে খাবার ও পানি সাথে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. বাহারুল আলম। 

আইসিডিডিআর,বি বলছে, এবার ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ কলেরার জীবাণু। এতে সাদা চালধোয়া পানির মতো পাতলা পায়খানা হচ্ছে রোগীদের। অনেক বেশি পানি শরীরে থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কারণে আক্রান্তরা দ্রুত পানিশূন্য হয়ে যাচ্ছেন। ডায়রিয়া সাধারণত নিজে নিজেই সেরে যায়। কেবল পানিশূন্যতা রোধে যথেষ্ট স্যালাইন ও তরল পান করতে হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো ওষুধই লাগে না।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //