একজন সফল সরকারি কর্মকর্তা ও অর্থমন্ত্রীর কথা

আবুল মাল আব্দুল মুহিত। বাংলাদেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী। এই সাবেক মন্ত্রীর পরিচয় কেবল মন্ত্রিত্ব পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় সফল সরকারি কর্মকর্তা, অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক, লেখক ও একজন গবেষক হিসেবে তার নাম লেখা থাকবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাসে আবুল মাল আব্দুল মুহিত একজন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় যাবত অর্থমন্ত্রী ছিলেন তিনি। মুহিত এরশাদ সরকারের আমলে দুই বছর ও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত টানা ১০ বছর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের সবচেয়ে বেশি বাজেট উপস্থাপিত হয়েছে তার হাত ধরেই।

আবুল মাল আব্দুল মুহিত বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের যবনিকা টেনে আজ শুক্রবার (২০ এপ্রিল) রাত ১২টা ৫৬মিনিটে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে মারা গেছেন।

তিনি নিজের বর্ণাঢ্য জীবনে অনেক কিছু অর্জন করেছেন। এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেটি তিনি চেষ্টা করছেন কিন্তু সফল হননি। দেশের অর্থমন্ত্রীর চেয়েও তার বেশি অর্থবহ আরেকটি পরিচয় হলো- তিনি দেশের সবচেয়ে সফল সফল একজন সরকারি কর্মকর্তা।

শিক্ষা ও পেশাজীবন:

১৯৩৪ সালের ২৫শে জানুয়ারি বর্তমান সিলেট শহরের ধোপা দিঘির পাড় এলাকায় জন্ম নেওয়া আবুল মাল আব্দুল মুহিত স্কুল ও কলেজ জীবন থেকেই নিজের কৃতিত্বের সাক্ষর রেখেছিলেন।

তিনি ১৯৪৯ সালে সিলেট গভর্মেন্ট পাইলট স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন।

এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ইংরেজি বিভাগে। সেখানেও তিনি অনার্সে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। চাকরির সময় তিনি অক্সফোর্ড এবং হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়াশুনা করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে তিনি ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসে কূটনীতিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

যুদ্ধ শুরু হলে আবুল মাল আব্দুল মুহিত পাকিস্তান সরকারের পক্ষ ত্যাগ করেন এবং সেখানে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সরকারের চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যান আবুল মাল আব্দুল মুহিত।

অর্থমন্ত্রী হিসেবে আবুল মাল আব্দুল মুহিত:

১৯৮২-৮৩ সালে তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল এইচএম এরশাদ সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন তিনি।

পেশাগত জীবনে তিনি কাজ করেছেন বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে।

১৯৯০-এর দশকে শুরুর দিকে ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গণফোরাম গঠন করলে সেখানে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন আবুল মাল আব্দুল মুহিত। তবে তখন তাকে খুব একটা সক্রিয় দেখা যায়নি।

রাজনীতিতে আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সক্রিয় পাদচারণা শুরু হয় ২০০১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে।

তখন তিনি সিলেট ১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন। কিন্তু সে নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী এম. সাইফুর রহমানের কাছে পরাজিত হন আবুল মাল আব্দুল মুহিত।

তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে আবারো আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সিলেট ১ আসন থেকে নির্বাচন করে বিএনপির এম সাইফুর রহমানের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন।

২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের ইশতেহার প্রণয়নের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন আবুল মাল আব্দুল মুহিত।

২০১৮ সালের ৭ জুন জাতীয় সংসদে ২০১৮-১৯ বাজেট অধিবেশনে বাজেট পেস করতে অধিবেশনে প্রবেশ করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। ছবি: বাসস

নির্বাচনে জয়লাভের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তিনি অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এরপর তিনি টানা ১০ বছর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

বাংলাদেশে গত ৩০ বছর যাবত অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি এবং বাজেট পর্যালোচনা নিয়ে কাজ করছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আবুল মাল আব্দুল মুহিত যতদিন অর্থমন্ত্রী ছিলেন, ততদিন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা মোটামুটি ভালো ছিল। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথে সাথে প্রবৃদ্ধির মাত্রাও মোটামুটি ভালো ছিল এবং তা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে।

তিনি অর্থমন্ত্রী থাকার সময় কৃষি ও শিল্পে বড় ধরনের কোনো সংকট লক্ষ্য করা যায়নি বলে উল্লেখ করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও দেশের ভেতরে সে সময়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আবুল মাল আব্দুল মুহিত অর্থমন্ত্রী থাকার সময় শেয়ার বাজারে ব্যাপক ধস নামে। এছাড়া ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলার অভিযোগও গুরুতর আকার ধারণ করে।

একটা সময় তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের আর নতুন কোনো বেসরকারি ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। কিন্তু তারপরেও ব্যাংকের অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির ধারা টেকসই করার জন্য যেসব কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন ছিল সেগুলো আবুল মাল আব্দুল মুহিতের সময়ে হয়নি।

তিনি আরো বলেন, সুষম উন্নয়নের জন্য ওনার আকাঙ্ক্ষার অভাব ছিল এটা আমি বলছি না। কিন্তু সে আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করার জন্য যে ধরনের উদ্যোগ, প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাঁড় করানো এবং পেশাজীবীদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলা দরকার ছিল - সেটা ওনার ক্ষেত্রে সম্ভবপর হয়ে উঠেনি।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ১২ বার বাজেট উপস্থাপন করেছেন আবুল মাল আব্দুল মুহিত। ছবি: সংগৃহীত

লেখক ও গবেষক হিসেবে আবুল মাল আব্দুল মুহিত:

আমলা, মন্ত্রী এবং রাজনীতিবিদের বাইরে আবুল মাল আব্দুল মুহিতের আরেকটি জোরালো পরিচয় তিনি একাধারে একজন লেখক ও গবেষক। তার লেখা বিভিন্ন বই অ্যাকাডেমিক মহলে বেশ সমাদৃত হয়েছে।

বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তার পাঁচটি বই প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)।

ইউপিএল-এর বর্তমান কর্ণধার মাহরুখ মহিউদ্দিন লেন, ইতিহাসের উপরে আবুল মাল আব্দুল মুহিতের গবেষণা কাজ করার আগ্রহ ছিল। অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি গবেষণার কাজ করতেন।

কোনো পাণ্ডুলিপি নিয়ে সম্পাদকের কোনো পরামর্শ থাকলে তিনি সেটিকে সাদরে গ্রহণ করতেন।

সাংস্কৃতিক জগত নিয়ে বিশেষ আগ্রহ ছিল আবুল মাল আব্দুল মুহিতের। মন্ত্রী থাকার সময় অনেক ব্যস্ততার সময়ও তিনি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে হাজির হতেন।

গানের অনুষ্ঠান, চিত্র প্রদর্শনী এবং নানাবিধ সাংস্কৃতিক আয়োজনে আবুল মাল আব্দুল মুহিত প্রায়শই উপস্থিত থাকতেন।

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //