শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার প্রবণতা, শঙ্কায় অভিভাবক

চলতি বছর জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে ১৯৪ জনই স্কুলগামী। ১৩ থেকে ২০ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি, যা মোট আত্মহত্যার ৭৮.৬ শতাংশ। সম্প্রতি একটি গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি খুব আশনঙ্কাজনক। এটি নির্মূলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বন্ধে সুষ্ঠু পদক্ষেপ নিতে না পারলে সেটি আমাদের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এর থেকে আমাদের বের হতে শিক্ষার্থী ছাড়াও অভিভাবকদেরও কাউন্সিলিংয়ের প্রয়োজন আছে। এসব আত্মহত্যায় পরিবার দায় এড়াতে পারে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, এ প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে বয়ঃসন্ধিকালীন শিশু-কিশোরদের মাঝে। তাদের নানা ব্যর্থতায় তারা এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া, অনেক সময় প্রেমজনিত নানা ঘটনা থাকে, যে সময়টাতে তাদের আবেগ বেশি থাকে। এ সময় বাবা মায়েরা তাদের অনেক বাধা দেয়। ক্ষেত্রবিশেষে তারা মিনি কারাগারে আটকা পড়ে পারবারিকভাবে। তারা বাবা মায়ের ওপর প্রতিশোধের প্রবণতা থেকে এমন কাজে জড়িয়ে পরে। এক্ষেত্রে সন্তানের পাশাপাশি বাবা-মায়েদেরও কাউন্সিলিংয়ের দরকার আছে।

তিনি বলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট যেসব শাখা আছে তাদের আরো জোরালোভাবে এগিয়ে আসতে হবে। এ সংক্রান্ত অনেক প্রতিষ্ঠান আছে তাদেরকেও এগিয়ে আসতে হবে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমানের মতে, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, বেকারত্বের কারণে মানসিক সমস্যা বেড়েছে আর এই মানসিক সমস্যায় বেড়েছে আত্মহত্যা।  এ ধরনের কেস থেকে বের করতে হবে মানুষ ভালো আছে কি না? মৃত্যুর চিন্তা কেন আসে? আর এজন্য পলিসি ঠিক করা দরকার।

তিনি বলেন, এ প্রবণতা দূর করতে মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্র ও পরিবার সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাবা-মায়েরাও সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে তেমন সচেতন থাকেন না। তারা আসলে সন্তানদের একটা ‘প্রেশার কুকারে’র মধ্যে রাখেন। তাদের পছন্দের জীবন কাটাতে বাধ্য করেন। সন্তানদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি আমাদের দেশে আসলে কখনোই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এটা একটা বড় সমস্যা।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী আনোয়ার হোসেন বলেন, আত্মহত্যা থেকে মানুষকে দূরে রাখার জন্য স্কুল-কলেজসহ শিক্ষার প্রতিটি স্তরে পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং ও প্রচারণার ব্যবস্থা করতে হবে। সচেতন হওয়া দরকার সবার। অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বের হতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবতে হবে। ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে।

ঢাকার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সেলিনা আক্তার বলেন, এ প্রবণতা দূর করার প্রধান উপায় হচ্ছে কাউন্সিলিং। এটা মাধ্যমিক পর্যায়ে বেশি বেশি দরকার। এ সময়ের শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি আবেগপ্রবণ থাকে। ইন্টারমিডিয়েট ল্যাবেলে গেলেও সেখানেও এর ধারাবাহিক প্ল্যান থাকতে হবে। যাতে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা জিনিসটাকে কোনোভাবেই সমাধান হিসেবে মনে না করে।

এর আগে গত শুক্রবার আঁচল ফাউন্ডেশন ‘বেড়েই চলেছে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার : আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়া কতটা জরুরি’- শীর্ষক এক সমীক্ষাবিষয়ক প্রতিবেদন উল্লেখ করে। সেখানে বলা হয়, প্রতি মাসে গড়ে ৪৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।  ৩৬৪ জন আত্মহত্যাকারীর মধ্যে স্কুলগামী ৫৩.৩০ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে কলেজ শিক্ষার্থীরা। তারা সংখ্যায় ৭৬ জন, যা ২০.৮৮ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহননকারীর সংখ্যা ৫০, যা ১৩.৭৪ শতাংশ। আত্মহননকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাদরাসায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীও রয়েছে। 

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যায় শীর্ষে ঢাকা বিভাগ। ঢাকায় গত আট মাসে ২৫.২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। চট্টগ্রাম বিভাগে এই হার ১৬.৪৮ শতাংশ এবং খুলনা বিভাগে ১৪.০১ শতাংশ। রংপুর বিভাগে আত্মহত্যাকারী শিক্ষার্থী ৮.৭৮ শতাংশ। বরিশাল বিভাগে ৯.৬২ শতাংশ, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭.৪২ শতাংশ এবং রাজশাহী বিভাগে ১৪.০১ শতাংশ। সিলেট বিভাগে তুলনামূলকভাবে কম শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, যা ৪ শতাংশ।

আত্মহত্যায় নারী শিক্ষার্থী বেশি। তারা ২২১ জন বা ৬০.৭১ শতাংশ। পুরুষ শিক্ষার্থী ১৪৩ জন বা ৩৯.২৯ শতাংশ।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫০ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পুরুষ শিক্ষার্থী ৬০ শতাংশ এবং নারী শিক্ষার্থী ৪০ শতাংশ। কলেজপড়ুয়া আত্মহত্যাকারী ৭৬ জন। এর মধ্যে ৪৬.০৫ শতাংশ পুরুষ ও ৫৩.৯৫ শতাংশ নারী। স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যায় ওপরে। তারা ১৯৪ জন। এর মধ্যে ৩২.৯৯ শতাংশ পুরুষ ও ৬৭.০১ শতাংশ নারী। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪৪ জন আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে ৩৯.২৯ শতাংশ পুরুষ ও ৬০.৭১ শতাংশ নারী।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩ থেকে ২০ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি, যা ৭৮.৬ শতাংশ। ২১ থেকে ২৬ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৩.৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। ১৩ বছরের নিচে যাদের বয়স, তারাও এই পথ থেকে পিছপা হয়নি। ছয় থেকে ১২ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭.৯৭ শতাংশ, অর্থাৎ ২৯ জন আত্মহত্যা করেছে। ১৪ থেকে ১৬ বছরের কিশোর-কিশোরী সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছে, যার সংখ্যা ১৬০।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //