ICT Division

শীতে বাড়ছে ঠান্ডাজনিত রোগ

শীত আসতে না আসতেই ঠান্ডাজনিত নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। এসব রোগের অন্যতম নিউমোনিয়া। রোগটিতে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২৪ হাজার শিশু মারা যায়। যদিও রোগটি প্রতিরোধযোগ্য। আর মৃত শিশুদের বেশিরভাগই অপুষ্টির শিকার।

পুষ্টি বিষয়ে মায়ের অথবা পরিবারের অন্য সদস্যদের পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় সচ্ছল পরিবারের শিশুরাও অপুষ্টিতে ভোগে। সে কারণে শিশু সহজেই নিউমোনিয়ার মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। গ্রামের শিশুদের রোগের শুরুতে রেজিস্টার্ড (কমপক্ষে এমবিবিএস) ডাক্তারদের কাছে না নিয়ে প্রচলিত চিকিৎসকের কাছে সস্তায় চিকিৎসা করাতে যায় বলে অনেক শিশুর মৃত্যু হয় কিংবা মারাত্মকভাবে স্বাস্থ্যহানি ঘটে। শিশুর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আরও কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও বায়ুদূষণ অন্যতম। সামান্য সর্দি-কাশি হলেই শুরুতেই চিকিৎসা করাতে পারলে বড় রকমের অসুখের আশঙ্কা কমে যায় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। 

ঢাকার বাইরে শিশুদের নিউমোনিয়া বেশি

ঢাকা শহরে শীত এখনো পড়েনি। কেবল রাতে সামান্য ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে; কিন্তু গ্রামের দিকে এখন বেশ শীত। সেখানেই শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়াসহ ঠান্ডাজনিত নানা রোগের প্রকোপ বেড়েছে। সর্দি-কাশি ও জ্বরতো রয়েছেই। উপজেলা হাসপাতালে নিউমোনিয়ার ডাক্তার থাকলেও চিকিৎসার সরঞ্জাম পর্যাপ্ত নেই। আবার জেলা হাসপাতালে নিউমোনিয়ার চিকিৎসা থাকলেও নেই পর্যাপ্ত সিট। কয়েকটি জেলা হাসপাতাল থেকে সংবাদদাতারা জানান, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদেরও ফ্লোরে বিছানা পেতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। 

৩০ শতাংশের অক্সিজেন স্বল্পতা

নিউমোনিয়া হলে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায় বলে জানিয়েছেন আইসিডিডিআরবির সহযোগী বিজ্ঞানী ড. আহমেদ এহসানুর রহমান। তিনি বলেন, হাসপাতালে নবজাতক ও জন্মের এক মাসের মধ্যে যত শিশু শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়- এদের ৩০ শতাংশের রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা থাকে। এ ছাড়া এই বয়সের যে শিশুরা নিউমোনিয়া সমস্যা ছাড়াও হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকে তাদের ৫ শতাংশের রক্তে অক্সিজেন স্বল্পতা থাকে। 

জানা গেছে, দেশে প্রতি হাজারে ৩৬১ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। আর বছরে মৃত্যু হচ্ছে ২৪ হাজার শিশুর। হাসপাতালে ৪৫ শতাংশ শিশুর মৃত্যুর কারণ নিউমোনিয়া। ৪২ শতাংশের রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি (হাইপোক্সেমিয়া) দেখা যায়। দেশের অধিকাংশ হাসপাতালে রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা নির্ণয়ের ব্যবস্থা নেই। ফলে তাদের ১৩ শতাংশের মৃত্যু ঘটে প্রয়োজনের সময় অক্সিজেন-স্বল্পতার কারণে।

পাঁচ বছরের কম বয়সীদের নিউমোনিয়ায় মৃত্যু বেশি

বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুর হার অপেক্ষাকৃত বেশি। এর প্রথম কারণ নিউমোনিয়া। সম্মিলিতভাবে হাম, এইডস ও যক্ষ্মায়ও এতো মৃত্যুর ঘটনা ঘটে না। এ বিষয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের চিকিৎসক আবু সাঈদ বলেন, ‘পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর ১৮ শতাংশই হয় নিউমোনিয়ায় হয়। আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে শিশুরা সর্দি-জ্বর, কাশিতে ভোগে। নিউমোনিয়া হলো- ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রের রোগ। কাশির সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে শিশুরা নিউমোনিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। সংক্রমণ ও এর পরবর্তী প্রদাহ থেকে এ রোগ হয়। সংক্রমণ হতে পারে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাঙ্গাস ইত্যাদি দিয়ে। নিউমোনিয়া হলে জ্বরের সঙ্গে থাকে কফ ও শ্বাসকষ্ট।’ 

তিনি আরও বলেন, এ ছাড়াও শিশুর অপরিণত জন্ম, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকা এবং নিউমোনিয়া চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে শিশুদেহে জীবাণুর (বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়া) প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার কারণে নিউমোনিয়া সহজে সারানো যায় না। দুই বছরের কম বয়সী শিশুরা বেশি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। 

বারডেম হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, ফুসফুসে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে নিউমোনিয়া হয়। ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি, নিউমোকক্কাস, স্টাফাইলো কক্কাস অরিয়াস- এই তিন ব্যাকটেরিয়া নিউমোনিয়ার প্রধান কারণ। এ ছাড়া আরএসভি নামে ভাইরাসের সংক্রমণেও নিউমোনিয়া হয়। এর বাইরে কিছু ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস নিউমোনিয়ার জন্য দায়ী। করোনা ভাইরাসও ফুসফুসকে আক্রমণ করে। এখনকার করোনা এ ধরনের একটি উদাহরণ। শিশুরা করোনায় সংক্রমিত হলে নিউমোনিয়ার মতো পদ্ধতিতেই চিকিৎসা দেওয়া হয়।

দুই মাসের কম বয়সী শিশুদের শ্বাস নেওয়ার হার মিনিটে ৬০ বারের বেশি, দুই মাস থেকে ১২ মাস বয়সী শিশুদের মিনিটে ৫০ বারের বেশি এবং ১২ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুর মিনিটে ৪০ বারের বেশি শ্বাস-প্রশ্বাস নিলে তাকে শ্বাসকষ্ট বলা হয়। এর সঙ্গে শিশুর বুকের পাঁজরের নিচের অংশ দেবে গেলে, তা নিউমোনিয়ার লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। সাধারণভাবে যেকোনো অসুখেই শিশুরা কম খায়। যদি এমন হয়, শিশু বুকের দুধ, পানি বা কিছুই খায় না, বার বার বমি করা অথবা শিশু অজ্ঞান হয়ে গেলে, খিঁচুনি হলে নিউমোনিয়া হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। এমন হলে শিশুকে বাড়িতে না রেখে হাসপাতালে অথবা শিশু চিকিৎসককে দেখাতে হবে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি

ইউনিসেফ বলছে, নিউমোনিয়া প্রতিরোধে আরও পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী এক দশকে বাংলাদেশে এক লাখ ৪০ হাজার শিশু মারা যেতে পারে। স্টপ নিউমোনিয়া নামে একটি সংস্থা বলছে, বাংলাদেশে নিউমোনিয়ায় মৃত্যু হয় এমন শিশুদের ৪৪ শতাংশ অপুষ্টির শিকার। বাকি ৩০ শতাংশ গৃহস্থালির জ্বালানি দূষণের কারণে এবং ২৬ শতাংশ অপরিণত বয়সে জন্ম নেওয়ায় মারা যায়। নিউমোনিয়ায় মৃত্যু হওয়া শিশুদের অনেকেই বাড়িতে মারা যায় বা চিকিৎসা না পেয়ে মারা যায় অথবা অপচিকিৎসায় মারা যায়। এদের মধ্যে হাতুড়ে ডাক্তারদের অপচিকিৎসা অন্যতম, ওঝা ও কবিরাজের অপচিকিৎসাতো রয়েছেই। 

নিউমোনিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না

বাংলাদেশে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না বলে আইসিডিডিআরবি ও যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটালের (এমজিএইচ) যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে। আইসিডিডিআরবির নিউট্রিশন অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল সার্ভিসেস ডিভিশনের সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ড. মোহাম্মদ যোবায়ের চিশতি এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু বেশ সক্রিয়। এর ফলে শিশুকে দেওয়া অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করায় শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। ড. যোবায়ের বলেন, আইসিডিডিআরবি হাসপাতালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত অ্যান্টিবায়োটিক ও শ্বাসতন্ত্রের উন্নততর চিকিৎসা পাওয়ার পরও ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত কয়েক ডজন শিশু নিউমোনিয়ায় মারা গেছে।’ 

নিউমোনিয়া হলে ফুসফুসের বায়ুথলিতে তরল পদার্থ ও পুঁজ জমা হয় এবং এতে কাশি, জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেয়। কার্যকর চিকিৎসা ছাড়া এই সংক্রমণে মৃত্যুর কারণ হতে পারে। কমবয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ভাইরাসের সংক্রমণেও নিউমোনিয়া হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু শিশুর নিউমোনিয়া ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে হয়নি, হয়েছে ভাইরাস সংক্রমণে। এ ধরনের শিশুদের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে মৃত্যুর আশঙ্কা ১৭ গুণ বেশি।

শিশুর নিউমোনিয়া হলে মা সব খেতে পারবেন

নবজাতকের সর্দি-কাশি হলে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন এমন মায়েদের অনেক খাবারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। যেমন- কলা, টক ইত্যাদি খেতে মানা করা হয়। অবস্থা এমন হয় যে, বিধিনিষেধের ফলে মা পর্যাপ্ত খাবারই পান না। এর ফলে বুকের দুধের নিঃসরণও কমে যায়। পরিণামে বাচ্চারই ক্ষতি হয়। তাই মায়েদের অভয় দেওয়া উচিত- তারা স্বাভাবিক যে খাবার খেতেন, তা-ই খাবেন। এতে শিশুর কাশি বা অন্য রোগ হবে না। 

নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিন শিশুদের ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসজনিত নিউমোনিয়া প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সবার আগে করণীয় হলো সময়মতো টিকা দেওয়া। পরবর্তীতে বাচ্চার প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে স্তন্য পান করানো অপরিহার্য। সেইসঙ্গে ঘরের পরিবেশ শুষ্ক-উষ্ণ-গরম রাখা এবং ঘরে ভালো বায়ু চলাচল থাকা আবশ্যক। পাশাপাশি সর্দি, ফ্লু বা অন্য সংক্রমণ রয়েছে এমন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ এড়িয়ে চলতে হবে। নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে মাকে বারবার হাত ধুতে হবে, বিশেষ করে শিশুকে কোলে নেওয়ার আগে এবং শিশুকে কিছু খাওয়ানোর আগে অবশ্যই সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিতে হবে। কারণ ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসসহ অন্যান্য জীবানু হাতের মাধ্যমেই বেশি আসে।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2022 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //