প্রথম বাঙালি ‘রানী’ ভবানী

নাটোরের মহারানী ‘ভবানী’ প্রথম বাঙালি রানী। জন্মেছিলেন বগুড়ার এক ছোট জমিদার ঘরে। তার স্বামী নাটোর এস্টেটের ‘জমিদার’ রাজা রামকান্ত মৈত্র। দান, ধ্যান, শিক্ষা, পানীয় জলের ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, চিকিৎসা ও ধর্মীয় কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তার প্রজারা তাকে ‘মহারানী’ নামে আখ্যায়িত করে। কালক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন সকলের প্রিয় ‘রানীমা’। 

দশ বছর বয়সে নাটোরের রাজকুমার রামকান্তের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব এলে ভবানী রাজকুমার রামকান্তকে ৩টি শর্তে বিয়ে করতে রাজী হন। এক. বিয়ের পর এক বছর তাকে বাপের বাড়িতে থাকতে দিতে হবে। দুই. এলাকার দরিদ্র মানুষকে দান করতে হবে প্রচুর জমি। তিন. বাবার জমিদারি থেকে নাটোর পর্যন্ত রাস্তা বানিয়ে সেটা লালশালু দিয়ে ঢেকে দিতে হবে, যার ওপর দিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাবেন তিনি। রামকান্ত অবশ্য প্রত্যেকটা শর্তই মেনে নিয়েছিলেন। 

বিয়ের পর এমন অদ্ভুত শর্ত দেওয়া জেদি একরোখা মেয়েটিই হয়ে উঠলেন নাটোরের জমিদারগিন্নি, রানী ভবানী। জমিদারগিন্নি থেকে তার রানী হয়ে ওঠার পথটা অবশ্য মসৃণ ছিল না। তার ও রামকান্তের তিন সন্তানের মধ্যে মেয়ে তারাসুন্দরী বাদে দুই ছেলে ছোটবেলাতেই মারা যান। এই তারাসুন্দরীকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। সে অন্য গল্প। রামকান্ত অকালে মারা যান। তখন বাংলার নবাব ছিলেন আলিবর্দী খাঁ। রামকান্তের মৃত্যুর পর নবাব আলিবর্দী জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেন রানী ভবানীর হাতে। 

সুনিপুণ শাসনে রানী ভবানীর জমিদারি বিস্তৃত হয় রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, যশোর, রংপুর, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ছাড়িয়ে মালদা পর্যন্ত। তিনি নবাবকে রাজস্ব দিতেন বছরে প্রায় সত্তর লক্ষ টাকা। ১৭৪৮ থেকে ১৮০২ সাল পর্যন্ত ৫৪ বছর ধরে এত বিশাল জমিদারি সামলিয়ে তিনি সারা বাংলায় পরিচিতি পান ‘অর্ধবঙ্গেশ্বরী’ নামে। হলওয়েল সাহেব লিখে গেছেন, নবাব এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, দুই পক্ষই রানীকে বেশ সমীহ করে চলতেন। তবে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পক্ষ নেওয়ায় ইংরেজদের চক্ষুশূল হতে হয় তাকে। তারপর থেকেই তিনি ধীরে ধীরে হারাতে থাকেন জমিদারি। 

রানী ভবানীর সময়ই ইতিহাসের সেই ভয়ঙ্কর ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ ঘটে (১৭৭৬ খ্রি.)। ইতিহাসের এই ক্রান্তিলগ্নে নাটোরের রানী ভবানী নিজের রাজকোষ শূন্য করে লক্ষ লক্ষ প্রজার অন্নকষ্ট নিবারণের জন্য মুক্তহস্তে দান করেছিলেন। ফলে প্রজারা নিদারুণ খাদ্য কষ্ট থেকে রক্ষা পান।

অনাড়ম্বর ব্যক্তিগত জীবনযাপনের সঙ্গে রানী ভবানীর উদারতা এবং সমাজহিতৈষী মনোভাব তাকে সাধারণ মানুষের মাঝে জনপ্রিয় করে তোলে। তিনি বাংলায় শত শত মন্দির, অতিথিশালা এবং রাস্তা নির্মাণ করেন। প্রজাদের পানীয় জলের কষ্ট দূর করার জন্য অনেক পুকুরও খনন করেন। শিক্ষা বিস্তারের জন্য তিনি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদারভাবে দান করেন। 

১৭৫৩ সালে কাশীতে ভবানীশ্বর শিব ও দুর্গাবাড়ী, দুর্গাকুণ্ড, কুরুক্ষেত্রতলা নামক জলাশয় স্থাপন করেন। তিনি তারাপীঠ মন্দিরেরও সংস্কার করেন। হাওড়া থেকে কাশী পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করেন, বর্তমানে এটি মুম্বাই হাইওয়ের অংশ। শুধু তাই নয়, উত্তরবঙ্গের রেলপথ তৈরিতে তার ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। 

জমিদারির কাজে তাকে সাহায্য করতেন দেওয়ান দয়ারাম। তার মতো সৎ, বিশ্বস্ত আর কর্মঠ অনুচর খুবই দুর্লভ। এদিকে ইংরেজ রাজত্ব শুরু হলে রানীর দেবোত্তর ও ব্রহ্মোত্তর সম্পত্তির ওপর মাত্রাতিরিক্ত কর বসতে থাকে। পাঁচশালা বন্দোবস্তে কোম্পানির রাজস্বও হয়ে ওঠে খুব চড়া। জিনিসপত্রের দাম হয় আকাশছোঁয়া। 

এরপর জমিদারির নানা বিষয়ে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের সঙ্গে রানী ভবানী বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। নানা যন্ত্রণা আর অপমানে ইংরেজরা তার জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। ভারাক্রান্ত মনে দত্তক পুত্র রামকৃষ্ণর হাতে রাজ্যভার দিয়ে তিনি মুর্শিদাবাদ চলে আসেন। সেখানকার বড়নগরে কন্যাসহ বসবাস করতে থাকেন। ওয়ারেন হেস্টিংস পরবর্তীকালে জোর করে নাটোরের জমিদারি কেড়ে নেন। পরে নাটোরের বিখ্যাত ‘রানীমা’ রানী ভবানী ১৮০২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

সাম্প্রতিক দেশকাল ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

Epaper

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

Logo

ঠিকানা: ১০/২২ ইকবাল রোড, ব্লক এ, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

© 2024 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh

// //